Breaking News

আওয়ামী দুঃশাসন রুখে দাঁড়ান — বাসদ (মার্কসবাদী)

ধনিকশ্রেণীর দ্বি-দলীয় অপরাজনীতির বিপরীতে বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি গড়ে তুলুন!

ভোটাধিকারসহ গণতন্ত্র রক্ষায় ও জনজীবনের সংকট নিরসনে আন্দোলন গড়ে তুলুন!

Zainul-Abedin

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়ে উঠছে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই ক্ষমতা দখলে রেখেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জনগণ ভোট দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। সরকার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ রুদ্ধ করে দমন-নিপীড়নের পথে স্বৈরতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী শাসন চালাচ্ছে। বিচার বিভাগ, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ চূড়ান্ত দলীয়করণের শিকার। শোষণ-বৈষম্য, রুটি-রুজির সংকট, বেকারত্ব, গুম-খুন-সন্ত্রাস, জানমালের নিরাপত্তাহীনতা এসবে জনজীবন বিপর্যস্ত।

আওয়ামী লীগ সরকারের নিপীড়নমূলক স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবের নমুনা গত ২০ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরায় বাম গণতান্ত্রিক জোটের জেলা নির্বাচন অফিস অভিমুখে শান্তিপূর্ণ মিছিল থেকে বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা এড. খগেন্দ্রনাথ ঘোষ, অধ্যাপক প্রশান্ত রায় ও বাসদ নেতা নিত্যানন্দ সরকারকে গ্রেপ্তার ও মিথ্যা অভিযোগে জেলে প্রেরণ। তাদের বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে ‘পরিকল্পিতভাবে নাশকতামূলক কার্যকলাপ সংঘটনের উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ হইয়া অপরাধের প্রস্তুতি গ্রহণ ও ষড়যন্ত্রের অপরাধ’-এর অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার এজাহারে পঞ্চাশোর্ধ বয়সের এই তিন নেতাকে বলা হয়েছে বিএনপি-র ‘উচ্ছৃঙ্খল’ নেতাকর্মী, অন্যদিকে বলা হয়েছে তাদের হাতে বাম গণতান্ত্রিক জোট লেখা ব্যানার ও হ্যা-বিল পাওয়া গেছে। দলীয়করণকৃত পুলিশ প্রশাসন সরকারবিরোধীদের হয়রানি করতে কিভাবে ভুয়া ও ভিত্তিহীন মামলা সাজায় তার উদাহরণ এই ঘটনা।

এই পটভূমিতে দেশে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। গত ৪৭ বছরের অভিজ্ঞতা হল দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোন সুযোগ নেই। আর সরকার অনুগত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের পক্ষে তা সম্ভব নয়। যেকোনভাবে ক্ষমতায় থাকার জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই অতীতে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বর্তমান সরকার জনগণের ভোটাধিকার পুরোপুরি কেড়ে নিয়েছে।

মহাজোট সরকার ‘উন্নয়ন’-এর শ্লোগান দিচ্ছে। অথচ, সাধারণ মানুষের খেয়ে-পরে বাঁচবার উপায় নেই। ক্ষমতায় আসার আগে ‘১০ টাকা সের চাল’ দেয়ার প্রতিশ্রুতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে সরকার। চালসহ নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির জন্য দায়ী মজুতদার-মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। অথচ, গ্রামের কৃষক ফসলের দাম না পেয়ে পথে বসেছে। ক্ষেতমজুরদের কাজ নেই সারা বছর। গার্মেন্টস শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরী ঘোষিত হয়েছে মাত্র ৮ হাজার টাকা। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে নি¤œতম মজুরি নির্ধারিত হয়েছে সাড়ে ১৫ হাজার টাকা। দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির দাম, বাড়ছে বাড়ি ভাড়া-গাড়ি ভাড়া।

প্রত্যেক ঘরে চাকুরীর প্রতিশ্রুতি রাখেনি সরকার। এখন কেরানীর চাকুরীর জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়। শিক্ষা-চিকিৎসা নিয়ে চলছে ব্যবসা। ঔষধের দাম বাড়ছে। বেসরকারি হাসপাতালের নামে মুনাফার চক্রে মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছে। সর্বব্যাপক বাণিজ্যিকীকরণ গরীব মানুষের শিক্ষা নেয়ার রাস্তাকে সংকুচিত করেছে। ভর্তি ফি, বেতন, পরীক্ষার ফি প্রতি বছরই বাড়ছে। অপ্রয়োজনীয় দুুটি পাবলিক পরীক্ষা(পিইসি, জেএসসি) অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করে শিশু মনে নিরর্থক চাপ বাড়াচ্ছে। প্রশ্ন ফাঁস শিক্ষার নৈতিক ভিত্তিকে ধসিয়ে দিচ্ছে। বাড়ছে নারী নির্যাতন-ধর্ষণ, বিস্তার ঘটছে মাদক-জুয়া-পর্ণোগ্রাফীর।

সাধারণ মানুষের জীবন যতই দুঃসহ হোক, ক্ষমতাসীন ও সংশ্লিষ্টদের পোয়াবারো। বেপরোয়া চুরি-দুর্নীতি-লুটপাট চলছে। ফ্লাইওভার, হাইওয়ে ও সেতু ইউরোপ-আমেরিকার চেয়েও ৩/৪ গুণ বেশী খরচে নির্মিত হচ্ছে। খেলাপী ঋণের পরিমাণ এখন সোয়া লক্ষ কোটি টাকা। গত ১০ বছরে ৬ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। ব্যাংকগুলো থেকে জনগণের আমানত লুট করছে ব্যাংক মালিক, ব্যবসায়ীরা। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হেফাজতে ক্রসফায়ার-গুম নামে বিনা বিচারে হত্যা-আটক-নির্যাতন চলছেই। প্রতিবাদের ক্ষীণ কণ্ঠটুকুকে স্তব্ধ করে দেয়া হচ্ছে গায়ের জোরে। পরিকল্পিতভাবে ভীতি সঞ্চারী পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

মহাজোট সরকারের গণবিরোধী নীতি, মূল্যবৃদ্ধি, দমনমূলক শাসন, চূড়ান্ত লুটপাট-দুর্নীতি, দখলদারিত্ব, দলীয়করণ সবকিছু মিলে মানুষ অতিষ্ঠ। অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অতীতে কম-বেশি একই কায়দায় দেশ চালিয়েছে। মানুষ এ অবস্থা থেকে মুক্তি চায়। কিন্তু বিকল্প কী? জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া যথার্থ বিকল্প গড়ে উঠবে না। বিপ্লবী শক্তির নেতৃত্বে ধারাবাহিক গণআন্দোলনের পথেই কেবল বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি নির্মাণ সম্ভব। আমাদের পার্টি বাসদ(মার্কসবাদী)সহ বাম গণতান্ত্রিক জোট সেই লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

সমাজের সমস্ত শোষিত-সাধারণ মানুষ শোষণ-বৈষম্যে পর্যুদস্ত। সর্বত্র দাপট আজ ক্ষমতাবানদের, টাকার মালিকদের। কৃষক খাদ্যের যোগান দেয়, কিন্তু তার খাবার জোটে না। শ্রমিক বৈদেশিক মুদ্রা আনে, বাঁচার মত মজুরি পায় না। গরীব মানুষের ট্যাক্সে ও শ্রমে স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল গড়ে ওঠে, অথচ তাদের শিক্ষা-চিকিৎসার সুযোগ নেই। এসবই পুঁজিবাদী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার ফলাফল। এই ব্যবস্থায় শ্রমজীবী মানুষের তৈরি সম্পদ মালিকানার জোরে হস্তগত করে কিছু ধনীরা। এদের হাতেই থাকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ। বিপ্লবী শক্তির উত্থান ছাড়া পুঁজিবাদের বদল করা যাবে না। জনগণের অধিকার আদায়ের দাবিতে লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই কেবল এর উত্থান হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা দেশের সচেতন মানুষ, বুদ্ধিজীবীসহ সমস্ত গণতান্ত্রিক শক্তিকে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় ও জনজীবনের আশু সংকট নিরসনে আন্দোলন গড়ে তোলার আবেদন জানাচ্ছি।

দাবিনামা
১. নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পূর্বে বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করে সব দল ও সমাজের অপরাপর মানুষের মতামতের ভিত্তিতে ‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার’ গঠন করতে হবে। সরকারের অনুগত বর্তমান নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। নির্বাচনে টাকার খেলা বন্ধ কর, জামানত কমাও। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক রাজনৈতিক দল নিবন্ধন-এর অগণতান্ত্রিক প্রথা বাতিল কর। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালুসহ নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কার কর।
২. দমন-পীড়ন, মামলা-হামলা বন্ধ কর। সাতক্ষীরায় গ্রেপ্তারকৃত এড.খগেন্দ্রনাথ ঘোষ, অধ্যাপক প্রশান্ত রায় ও নিত্যানন্দ সরকার-এর অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি চাই, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার কর। রাষ্ট্রীয় হেফাজতে বিচারবহির্ভূত আটক-হত্যা, গুম-ক্রসফায়ার বন্ধ কর। মত প্রকাশের অধিকার হরণ করা চলবে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নিপীড়নমূলক ধারা বাতিল কর।
৩. দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ কর। কালো টাকার মালিক-অর্থপাচারকারী-ঋণখেলাপী-ব্যাংক লুটেরাদের গ্রেপ্তার কর, আয়ের সাথে সঙ্গতিবিহীন সম্পদ বাজেয়াপ্ত কর।
৪. চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সংস্থা ঞঈই-কে সক্রিয় কর, গরীব-মধ্যবিত্তের জন্য রেশন ব্যবস্থা চালু কর। ওএমএসে ১০ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহ কর। গ্যাস-বিদ্যুতের বর্ধিত দাম প্রত্যাহার কর। রেল-বিআরটিসিসহ সরকারি গণপরিবহন বিস্তৃত কর। নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য সরকারি উদ্যোগে অল্প ভাড়ায় বহুতলবিশিষ্ট আবাসন প্রকল্প বা কলোনী নির্মাণ কর। বাড়িভাড়া-গাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর কর।
৫. শ্রমিকদের ন্যূনতম জাতীয় মজুরী ১৬ হাজার টাকা নির্ধারণ, অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত কর।
৬. কৃষি ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হাটে হাটে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র চাই। খাদ্যশস্যের রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু কর। স্বল্পমূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ কর। ক্ষেতমজুরদের সারা বছর কাজ ও রেশন চাই। ভূমিহীনদের খাস জমি বরাদ্দ দাও।
৭. ‘ঘরে ঘরে চাকুরী’র প্রতিশ্রুতি রক্ষা কর। বেকারদের নাম তালিকাভুক্ত করে কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে বেকার ভাতা দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় শূণ্যপদে নিয়োগ দাও। সরকারি চাকুরীতে কোটা কমাও।
৮. নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে দোষীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাও। মাদক, পর্ণোগ্রাফী ও জুয়ার বিস্তার রোধ কর। মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন কর।
৯. শিক্ষা বাণিজ্য ও প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ কর। পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল কর। চিকিৎসা নিয়ে ব্যবসা বন্ধ কর। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অধীনে প্রত্যেক নাগরিকের উপযুক্ত চিকিৎসা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।
১০. ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ পর্যন্ত সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলা-আক্রমণের ঘটনাসমূহের নিরপেক্ষ তদন্ত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের ভূমি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অঘোষিত সেনাশাসন প্রত্যাহার কর।
১১. ভারতের কাছ থেকে তিস্তাসহ সব অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় কর। নতজানু পররাষ্ট্রনীতি বাতল কর। রামপালে সুন্দরবন ধ্বংসকারী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ কর। মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল রুপপুর পরমাণু বিদ্যুৎপ্রকল্প চাই না।

মহাজোট সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক দুঃশাসন-জুলুম-লুটপাটের প্রতিবাদে,
নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ-গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে
গণতান্ত্রিক বাম জোটের ডাকে
সচিবালয় অভিমুখে বিক্ষোভ
১৪ অক্টোবর সকাল ১১টা, জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে
যোগ দিন, সফল করুন


বাসদ-মার্কসবাদীবাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী)
কেন্দ্রীয় কার্য পরিচালনা কমিটি
২২/১ তোপখানা রোড(৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা।
ফোন: ৯৫৭৬৩৭৩,০১৭১১৮৯৫৮৪৫

ওয়েবসাইট : spbm.org
প্রকাশকাল : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

Check Also

LDJ_141018

নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তদারকি সরকার গঠন করতে হবে

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক দুঃশাসন-জুলুম-লুটপাটের প্রতিবাদে, জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তদারকি …