Breaking News

আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম জারি রাখা জরুরি – কমরেড মুবিনুল হায়দার চৌধুরী

23737827_10214975262323891_7416223380953699894_oচারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আয়োজিত ‘নভেম্বর বিপ্লবের শতবর্ষে ঐকতান’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে জানাই শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন। আমাদের সঙ্গে প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আছেন। উনিও আলোচনা করবেন। আমি মানব সভ্যতায় নভেম্বর বিপ্লবের অবদান সংক্রান্ত কিছু আলোচনা করব।

বিপ্লবপূর্ব রাশিয়ার অবস্থা কী ছিল? রাশিয়া ছিল ইউরোপের সবচেয়ে বড় দেশ এবং সবচেয়ে গরিব দেশ। সেদেশের শ্রমিক কৃষক সাধারণ মানুষই দেশে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটিয়ে দিল। তারা সেদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করল, যে সমাজতন্ত্র এতদিন তত্ত্বের আকারে ছিল এবং প্রায় কিছুই ছিল না; সেইদেশ তারা গড়ে তোলার জন্যে এক বিরাট কর্মকান্ড শুরু করল।

প্রতিষ্ঠিত হলো নতুন এক সমাজব্যবস্থা। যে রাষ্ট্রের প্রায় কিছুই ছিল না, মাত্র পনেরো বছরের মধ্যে তারা হয়ে উঠল পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পোন্নত দেশ। ক্ষুদ্র চাষীদের দেশ ছিল রাশিয়া। লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র চাষী ছিল খুবই পিছিয়ে পড়া অবস্থায়। কাঠের লাঙল দিয়ে তারা চাষ করত। শুভদিন দেখে বীজ বপন করত। তার আগে পবিত্র পানি মাঠে ছিটিয়ে দিত। এই অবস্থা থেকে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটেছিল পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে। সোভিয়েত রাষ্ট্রের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গড়ে তোলা হলো সমবায় ও যৌথ খামার। এই প্রক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র চাষীদের যুক্ত করা হল। সকল রকমের ব্যক্তিসম্পত্তি থেকে মানুষকে মুক্ত করতে এবং সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করার জন্যে সমবায় ও যৌথ খামার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যেও কিছুটা ব্যক্তিমালিকানার উপাদান থেকে যায়। এই কারণে যৌথ খামারকে উন্নত করে রাষ্ট্রীয় খামার স্থাপন করা হলো, যেখানে আর ব্যক্তিগত মালিকানা বলে কিছু নেই।

এই নতুন সামাজিক ব্যবস্থা বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করল। দেখা গেল কৃষি, শিল্পসহ উৎপাদনের সমস্ত ক্ষেত্রে অতীতের সমস্ত রেকর্ডকে ভেঙে দিয়ে তারা নতুন করে দেশ গড়ার আন্দোলন শুরু করল। কৃষি ব্যবস্থার ব্যাপক আধুনিকায়ন ঘটালো। কাঠের লাঙলের পরিবর্তে ট্রাক্টরের চাষবাস শুরু হলো। চাষীরা আধুনিক জীবনের সংস্পর্শে এলো।

এই বিরাট কর্মকান্ডকে এক মিটিংয়ে বলে শেষ করা যাবে না, বোঝানোও যাবে না। তারপরও খন্ড খন্ড দু’একটা উদাহরণ দিই। তারা যখন অটোমোবাইল কারখানা তৈরি করবে ঠিক করল, তখন লক্ষ্য ঠিক করল যে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অটোমোবাইল কারখানা বানাবে। এই কাজ এই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময়ের মধ্যেই শেষ করবে – এটা তাদের সংকল্প। জার্মানি থেকে, ইংল্যান্ড থেকে, আমেরিকা থেকে যেসব ইঞ্জিনিয়াররা বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ করবার জন্যে সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিল, তারা একথা শুনে আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘এত বড় একটা অটোমোবাইল কারখানা তৈরি করতে কমপক্ষে ২০ বছর সময় লাগবে। আর তোমরা অনভিজ্ঞ। তোমাদের দক্ষতা নেই। তোমরা এটা এত অল্প সময়ের মধ্যে করতে পারবে না।’ সাধারণ শ্রমিকরা বলল, ‘আমাদেরকে করতেই হবে। আমাদের বেশি সময় হাতে নেই। আমাদের কোনো উপায় নেই। আমরা এই কাজ অবশ্যই করব, যেভাবে হোক করব। আমাদের জান-প্রাণ যা কিছু আছে তা ঢেলে দিয়ে করব।’ সেই অনভিজ্ঞ লোকেরা প্রবল ইচ্ছাশক্তির বলে শুধু দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অটোমোবাইল কারখানাই নয়, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার কাজও চার বছরের মধ্যে শেষ করে ফেলল। বিভিন্ন সমস্যা-সংকটকে মোকাবেলা করে করে তারা সামনের দিকে এগোতে লাগলো।

এই কাজ করার জন্য যে উৎসাহ – উদ্দীপনা সমাজ অভ্যন্তরে তারা তৈরি করেছিল তারই একটা নমুনা হল ‘স্তাখানভাইট মুভমেন্ট’। স্তাখানভ নামে একজন কয়লা খনির শ্রমিক কয়লা তোলার নতুন এক কৌশল বের করে একদিনে একটি খনির কয়লা তোলার ক্ষেত্রে আগের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিল। এবার তাকে কেন্দ্র করে সারাদেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। কে কত বেশি উৎপাদন বৃদ্ধির এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কে কাকে হারিয়ে কত বেশি দেশের জন্য উৎসর্গ করতে পারে। নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এরকম করে একটা বিরাট আন্দোলন শুরু হয়েছিল।

শুধু কৃষিক্ষেত্রে কিংবা শিল্পক্ষেত্রে নয়, সর্বত্র এই উদ্দীপনা সঞ্চারিত হলো – সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও। যেহেতু আমরা একটা সাংস্কৃতিক প্লাটফর্ম থেকে কথা বলছি, এই ক্ষেত্রেও তাদের বিরাট অবদান আছে। শেক্সপিয়ার, গ্যেটে, বালজাক, ডিকেন্স এই ধরনের বিশ্ববিখ্যাত নামকরা সাহিত্যিকদের রচনাসমগ্র লক্ষ লক্ষ কপি ছেপে সাধারণ মানুষের কাছে তারা নিয়ে গেল। সেগুলো পড়ে সাধারণ মানুষদের সাহিত্য বোঝার ক্ষমতা অর্জিত হলো। সোভিয়েত ইউনিয়নে বিভিন্ন ভাষার এত সাহিত্য এবং তার প্রকাশনা এত বিরাট আকারে হয়েছে যে, শুধু পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময়কালেই জার্মানি, ইংল্যান্ড ও জাপানের সম্মিলিত যে প্রকাশনা, সোভিয়েত ইউনিয়ন একা তার চেয়ে অনেক বেশি বই প্রকাশ করেছে। ফলে শিক্ষার ক্ষেত্রে এবং সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে বিরাট একটা ভূমিকা তারা পালন করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সৃষ্টি হওয়ার আগেও রাশিয়ায় উন্নত সাহিত্য ছিল। দস্তয়েভস্কি, তুর্গেনেভ, গোগোল, পুশকিন, টলস্টয়ের মতো বিরাট বিরাট সাহিত্যিকেরা তখন জন্মেছিলেন। পরবর্তীতে ব্যাপক সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে গোকির্র মতো সাহিত্যিকের জন্ম হয়েছিল। পাশাপাশি শলোকভ, মায়াকোভস্কি ও মার্শাখ প্রমুখ সাহিত্যিকেরা বিশ্বসাহিত্যে ভূমিকা রেখেছিলেন। একইসাথে থিয়েটারে স্তানিস্লাভস্কি, মেয়ারহোল্ড, গনেশ্চেঙ্কো প্রভৃতি নাট্যকাররা অবদান রেখেছেন। চলচ্চিত্রে পুদভকিন, আইজেনস্টাইন, গনেশ্চেঙ্কো, কস্টিলোভা; সংগীতে শস্টাকোভিচ, প্রকোভিয়েভ প্রমুখ ব্যক্তিরা সমাজে প্রবল আলোড়ন তুললেন। সূক্ষ্ম ও সুন্দর জিনিস তারা তৈরি করলেন, তার সঙ্গে মানুষের সাংস্কৃতিক উপলব্ধি এবং উপভোগ করার ক্ষমতাও বিকশিত হলো। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ঘটল বিশাল অগ্রগতি।

বলশয় থিয়েটার ব্যালে নাচের জন্য জগদ্বিখ্যাত ছিল। অতীতে ব্যালে নৃত্যের চর্চা ছিল ইতালিতে। ফরাসি বিপ্লবের সময়কালে তা ফ্রান্সে আসে। পরবর্তীতে সেটা আসে রাশিয়ায়। রাশিয়াতে আসার পরে এই নৃত্য অভিজাত শ্রেণির আনন্দ উপভোগ করার একটা উপাদান ছিল। কিন্তু বিপ্লবের পরে থিয়েটারকে জনগণের উপভোগের মতো করে গড়ে তুলবার সংগ্রাম শুরু করল। ধীরে ধীরে বলশয় থিয়েটারের নৃত্যকলা, তার উন্নত সাংস্কৃতিক রূপ, তার সূক্ষ্ম কাজগুলিকে উপভোগ করার মতো শিক্ষিত হয়ে উঠলো জনগণ। বলশয় থিয়েটার গ্যালিয়া উলানোভা, মায়া পিসেস্কায়া এ ধরনের বড় বড় বিশবিখ্যাত ব্যালেরিনাদের সৃষ্টি করল, যারা মানুষকে সমস্ত রকমের আনন্দ উপভোগ করবার একটা উচ্চমানে নিয়ে গিয়েছিল।
সংগীতের ক্ষেত্রে চায়কভোস্কি, মিখাইল গ্লিঙ্কা – তাদের যে ট্রাডিশনাল অর্কেস্ট্রেশন পূর্ব থেকেই ছিল, সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য করার জন্য সেটার একটা নতুন রূপ দেয়া শুরু হলো।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সোভিয়েতের অবদান ছিল বিরাট। সব রকমের মৌলিক অধিকার তারা জনগণকে দিয়েছে। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সঠিকভাবে নির্বাচকমন্ডলীর প্রতিনিধিত্ব না করতে পারলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের তারা কলব্যাক করে নিয়ে আসতে পারতো। কলব্যাক করা হলো সদস্যপদ কেড়ে নেওয়া এবং পুনরায় নির্বাচন। এই অধিকার দুনিয়ার কোনো পুঁজিবাদী দেশ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জনগণকে দেয়নি। সকল প্রাপ্তবয়স্কদের সরকার কাজ দিতে বাধ্য ছিল। সমস্ত রকমের বেকার সমস্যা সোভিয়েত ইউনিয়নে উধাও হয়ে গিয়েছিল। বেকার সংকট আর ছিল না। স্যানাটোরিয়াম করে শ্রমিকদের অবসর যাপনের ব্যবস্থা করেছিল। শিক্ষাব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ অবৈতনিক, সর্বজনীন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক। সম্পূর্ণ অবৈতনিক শিক্ষা প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষার স্তর পর্যন্ত চালু ছিল। যে সমস্ত বৈষম্য মেয়েদের উপর ছিল, তা দূর করে তাদেরকে সমস্ত রকম মানবিক অধিকার, যৌক্তিক অধিকার, পুরুষদের সঙ্গে সমান অধিকারের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছিল। সোভিয়েত নারীরাই প্রথম আকাশে উড়েছে, প্রথম নারী মহাকাশে গেছে এবং এইভাবে নারীদের উন্নতির সমস্ত পথ খুলে দিয়েছে। দুনিয়ার আর কোথাও মেয়েদের মধ্যে এত বেশি ডাক্তার – ইঞ্জিনিয়ার ছিল না। এভাবে একটা উন্নত জাতি হিসেবে তারা গড়ে উঠলো। স্ট্যালিনের নেতৃত্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অবিস্মরণীয় বিজয় আসলো। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৪১ সালের জুন মাসে হিটলারের ফ্যাসিস্ট বাহিনী একতরফাভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধে স্ট্যালিনের আহবানে সাড়া দিয়ে রুশ লালফৌজ কেবল নয়, গোটা রুশ জনগণ সমাজতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামে মরণপণ ঝাঁপিয়ে পড়ে।

Battle of Stalingrad-এর কথা আপনারা জানেন। প্রায় তিন মাস ধরে ১০ লক্ষ জার্মান বাহিনী এ জায়গাটাকে ঘেরাও করে রেখেছিল। স্ট্যালিনগ্রাদকে দখল করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তিন মাস ধরে সমস্ত রকমের শক্তি সামর্থ্য দিয়ে রুশ জনগণ তাদের বিরুদ্ধে লড়ে। তাতে প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ মারা যায়। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই জার্মানরা তাদেরকে আয়ত্তে আনতে পারেনি। এখান থেকেই জার্মান বাহিনীর পরাজয় শুরু হয়। এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে তারা ক্রমাগত পিছিয়ে যেতে থাকে এবং তাদেরকে আক্রমণের পর আক্রমণ করার মধ্য দিয়ে একেবারে বার্লিন পৌঁছে দেয় লালফৌজ। বার্লিনের রাইখস্ট্যাগে লাল পতাকা উত্তোলিত হয়।

কমরেড স্ট্যালিনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান ফ্যাসিস্ট বাহিনীকে পরাজিত করে সভ্যতাকে রক্ষা করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। যুদ্ধের পর অল্পদিনের মধ্যে ঊনবিংশ পার্টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেই ঊনবিংশ পার্টি কংগ্রেসে কমরেড স্ট্যালিন কিছু বিষয় তুলে ধরলেন। যুদ্ধের মধ্যে থাকাকালীন সময়ে তারা প্রতিকূলতার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারেননি। কর্মীদের চেতনার মান যথেষ্ট উন্নত হয়নি। তিনি বলেছিলেন, প্রথম প্রজন্মের যে কমরেডরা, তাদের ‘দাস ক্যাপিটাল’ আয়ত্তে ছিল। তারা তর্ক – বিতর্ক করতে পারত, আলাপ-আলোচনা করতে পারত এবং এইসব বিষয়ে মতামত দিতে পারত। পরবর্তীকালের কমরেডরা পড়াশোনা করত কিন্তু অন্যান্য কাজে যুক্ত থাকার কারণে তারা এ মান অর্জন করতে পারেনি। এতে আদর্শগত মানের ঘাটতি দেখা দেয়। এই ঘাটতি তৃতীয় প্রজন্মের মধ্যে আরও প্রকট হয়ে ওঠে। পাশাপাশি যুদ্ধে বিরাট বিজয়ের কারণে কর্মীদের মধ্যে নানা ধরনের আত্মসন্তুষ্টি এসে গেল। এইসব কারণে বিজ্ঞান, সাহিত্য, আদর্শ নানা ক্ষেত্রে যে উন্নতি ঘটেছিল, সেখানে ঘাটতি তৈরি হল। সংকটগুলো স্ট্যালিন ঠিকই ধরেছিলেন। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেননি। তিনি অল্প সময়ের মধ্যে মারা যান।

আমরা জানি যে, সমাজতন্ত্র হলো পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদে যাওয়ার অন্তর্বর্তীকালীন একটি সমাজব্যবস্থা। সমাজতন্ত্র – পুঁজিবাদ এবং সাম্যবাদ, এই দুই বিরোধী অবস্থার উপাদানগুলি নিয়ে পরিচালিত। ফলে সমাজতন্ত্রের মধ্যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অনেক দোষ এবং অনেক রকমের ব্যক্তিবাদী ঝোঁক থাকে। এ ব্যাপারে কমরেড শিবদাস ঘোষ সতর্ক করেছিলেন। কিভাবে সমাজতন্ত্রের মধ্যে ব্যক্তিবাদী ঝোঁক কাজ করছে তা তিনি দেখিয়েছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক উন্নতি জনগণের মধ্যে নানা সুবিধার জায়গা তৈরি করেছিল। সোভিয়েত যত অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হয়েছে, নানা দিক থেকে জনগণকে নানারকম সুবিধা দিয়েছে, তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও আদর্শগত চেতনা যথার্থ উন্নত না থাকার জন্য তাদের মধ্যে নানা ধরনের সুবিধাবাদী ঝোঁকও তৈরি হতে থাকে। ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার ঝোঁক বাড়তে থাকে। কমরেড শিবদাস ঘোষ একে বলেছেন, ‘সমাজতান্ত্রিক ব্যক্তিবাদ’। ব্যক্তিবাদ একটি বিচিত্র রূপে আসার জন্য এভাবে বলেছেন। সমাজতন্ত্রের এ ব্যক্তিবাদী ঝোঁক সমাজতন্ত্রের বিরাট বিপর্যয় ঘটিয়ে দিল। পতনের পথে অগ্রসর করল। সমাজতন্ত্র নানাদিক থেকে পতিত হবার বাস্তবতা তৈরি হলো। বাইরের শক্তি সমাজতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারেনি। ক্ষতি হয়েছে ভিতর থেকেই। আজকে এ বিষয়গুলি আমাদের ভালোভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

পুঁজিবাদ সোভিয়েত ইউনিয়নে ফিরে এসেছে ঠিকই, আবার এও ঠিক যে, সমাজতন্ত্র অপরাজেয়। আজ সারাবিশ্বের অবস্থা দেখুন। বিশ্বের বেশিরভাগ পুঁজিবাদী দেশগুলোতে কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বেকারি বাড়ছে। টাকা খাটানোর জায়গা না পেয়ে তারা সুদের ব্যবসা করছে। কোনোভাবেই তারা উৎপাদন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে পারছে না। সুদের ব্যবস্থা করে কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে বিপর্যয়গুলিকে ‘ইকোনমিক ওয়ার’-এ পরিণত করে দেশে দেশে নানা জায়গায় পুঁজিবাদ যুদ্ধ-বিদ্রোহ লাগিয়ে রেখেছে। তার সঙ্গে আবার আছে তাদের নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা। ফলে সমগ্র পুঁজিবাদ আজ ধ্বংসোন্মুখ।

সমাজ বিকাশের যে নিয়ম সেই বিকাশের নিয়মের দ্বারাই যথার্থভাবে সমাজতন্ত্র একটা দেশে এসেছে। একটা দেশে ৭২ বছর ধরে সমাজতন্ত্র টিকে ছিল এবং সমাজতন্ত্র একটা দেশে টিকে থাকতে পারার সমস্ত বাস্তবতা সৃষ্টি করে দিয়েছিল। যেহেতু ভিতর থেকে তাকে রক্ষা করার যে আদর্শগত – সংস্কৃতিগত সংগ্রাম, নানাদিক থেকে মানুষকে সামাজিক আন্দোলনে এনে ঐক্যবদ্ধ রেখে এ লড়াইটাকে বাঁচিয়ে রাখার যে সংগ্রাম – সেটা তারা করতে পারেনি, সে-কারণে একটা সমাজতান্ত্রিক দেশের পতন ঘটেছে। কিন্তু সমাজতন্ত্র আবার ফিরে আসবে। ফিরে আসবে এই জন্য যে, সমাজবিকাশের নিয়ম অনুযায়ী পুঁজিবাদ যখন আর কোনো সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে পারছে না, যখন আর মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয়তাকে ধারণ করতে পারছে না, যখন মানুষকে বিকশিত করতে পারছে না, তখন পুঁজিবাদ শেষ কথা হতে পারে না। সমাজতন্ত্র পুনরায় আসবে। কিছু ভুলের জন্য সমাজতন্ত্রের যে পতন হয়েছিল সেই ভুলগুলি থেকে মুক্ত হয়ে আবার সমাজতন্ত্র অপরাজেয় শক্তি হিসেবে এই দুনিয়াতে ফিরে আসবে, সমস্ত শক্তি নিয়ে ফিরে আসবে। এই বিশ্বাসের দৃঢ়তায় জনগণকে সমাজতন্ত্রের পক্ষে আকর্ষণ করার জন্য আমাদের চেষ্টা করতে হবে। কারণ সমাজতন্ত্রই একমাত্র বাঁচার পথ। সমাজতন্ত্রই একমাত্র ভবিষ্যতে আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এই কথা বলে আপনাদের সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে, সবাইকে আমার ব্যক্তিগত অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য এখানেই শেষ করছি।

(গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ মহান নভেম্বর বিপ্লবের শতবর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আয়োজিত ‘নভেম্বর বিপ্লবের শতবর্ষে ঐকতান’- এ বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), কেন্দ্রীয় কার্যপরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মুবিনুল হায়দার চৌধুরী যে আলোচনা করেন তা এখানে সামান্য পরিমার্জনা করে তুলে ধরা হল।)

নভেম্বর বিপ্লবের শতবর্ষে ঐকতান – চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র

Check Also

DLA

লুটেরাদের স্বার্থে প্রণীত গণবিরোধী বাজেট প্রত্যাখ্যান করুন – গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা

গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার নেতৃবৃন্দ কালো টাকা, ঋণখেলাপী ও লুটেরাদের স্বার্থে প্রণীত গণবিরোধী বাজেট প্রত্যাখ্যান করার …