আবারও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি!

লাভের গুড় খাচ্ছে ব্যবসায়ীরা, জনগণের ঘাড়ে ক্ষতির বোঝা

21764857_689045944622757_3594253365523312040_n

দাম বৃদ্ধি ঘটিয়ে জনগণকে আবারো বিদ্যুতের শক দেওয়ার পরিকল্পনা আঁটছে সরকার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিদ্যুতের পাইকারি দাম ১১.৭৮ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। নামে গণশুনানি হলেও (জন)গণের মতামত শোনা হয়েছে এমন কোনো নজির নেই। এবারেও তাই হয়েছে। বিপিডিবি পাইকারি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে ইউনিট প্রতি ৭২ পয়সা। বিইআরসি সায় দিয়েছে ৫৭ পয়সা বাড়ানোর। বিদ্যুতের পাইকারি দাম বাড়লে খুচরা অর্থাৎ গ্রাহক পর্যায়েও দাম বাড়বে। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানি, সংস্থাগুলিও দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ফলে জনগণকে গুণতে হবে বাড়তি অর্থ। জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়বে। বাড়ির মালিক বাসা ভাড়া বাড়িয়ে দিবে। গাড়ি ভাড়া বাড়বে। বাড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও।

স্বঘোষিত ‘উন্নয়নের সরকার’ দশম বারের মতো বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিলো। কেন এই দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী নামধারী বাহিনী যেমন সংবাদ সম্মেলনে ক্রসফায়ারের একই গল্প প্রতিবারই পাঠ করেন, ঠিক তেমনি সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগের আজ্ঞাবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোও পুরনো কথারই জাবর কাটেন। এর আগে নয়বার দাম বাড়াতে গিয়ে যেসব যুক্তি করেছেন এবারও তার বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম ঘটেনি। বলেছেন-“তরল জ্বালানীর ব্যবহার, বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় এবং জ্বালানি ব্যয়ের অংশ বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে উৎপাদন মূল্য ও বিক্রয় মূল্যের মধ্যে ঘাটতি অর্থাৎ লোকসান দূর করার জন্য দাম বাড়াতে হচ্ছে।”

মূল্যবৃদ্ধির এই যুক্তি কতখানি সঠিক আর প্রকৃত কারণই বা কী — আমাদের দল বাসদ (মার্কসবাদী) সহ তেল-গ্যাস জাতীয় কমিটি বিভিন্ন সময়ে সেই ব্যাখ্যা তুলে ধরেছে। সরকারের যুক্তির অসারতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। মূল্য বৃদ্ধির মূল কারণ যে আসলে সরকারের বিদ্যুৎ সম্পর্কিত কায়েমী-বাণিজ্যিক নীতি-পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনার উপর দাঁড়িয়ে আছে সেটাই দেখিয়েছে। কিন্তু ব্যাবসায়ীগোষ্ঠীবান্ধব সরকার বিদ্যুতের নীতি-পদ্ধতিগত কোনো পরিবর্তন আনেনি।

সরকারের পাওয়ার ডেভলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) হিসেব মতে, ২০০৭-০৮ অর্থ বছরে প্রতিষ্ঠানটির দেনার পরিমাণ ছিল ৯১৫ কোটি টাকা। এই দেনা ফি বছর বাড়তে বাড়তে সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে  ৪৪ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকায়। এই পরিসংখ্যান থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয়, আগামী পাঁচ দশ বছরে বিদ্যুতের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে! এই যে বিশাল দেনা বা লোকসানের কথা বলা হচ্ছে — এর জন্য আসলে দায়ী কে? এর জন্য তো বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো আমলা-কর্মকর্তার বেতন কেটে নেওয়া হবে না, কিংবা কারো বেতন-ভাতা এতটুকু কমবে না। এই দেনার ভার আসলে জনগণের উপরেই চাপানো হচ্ছে এবং আগামী দিনেও হবে। কিন্তু জনগণের এই টাকা আসলে যাচ্ছে কোথায়? কেন দেনা কিংবা লোকসান? তাহলে লাভটা হচ্ছে কার?

সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারি ও বিতরণকারি দুই ধরনের প্রতিষ্ঠান আছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাইকারি দামে বিদ্যুৎ ক্রয় করে বিতরণকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ অঞ্চলভেদে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। বিতরণকারি কোম্পানি বা সংস্থাসমূহ পাইকারি ক্রয়মূল্যের সাথে সরবরাহ মূল্য যুক্ত করে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। পিডিবি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে এবং একই সাথে বেসরকারি বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় করে। আর ডেসা, ডেসকো, ডিপিডিসি, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজ করে।

এবার আসি আসল কথায়, মোট বিদ্যুতের কতভাগ সরকার নিজের বিদ্যুৎ উৎপানকারি প্রতিষ্ঠান বিপিডিবি’কে দিয়ে উৎপাদন করান? বিপিডিবি’র উৎপাদন তথ্য মতে, ২০০৯-১০ অর্থ বছরে দেশের মোট প্রায় পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ৭০ শতাংশ ছিল বিপিডিবি’র। এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার মেগাওয়াটে আর তাতে বিপিডিবি‘র উৎপাদন ক্ষমতা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৩ শতাংশে। নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতাকে সংকুচিত করে সরকার দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার সিংহভাগ ছেড়ে দিয়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক খাতে। অস্থায়ী স্বল্প উৎপাদন ক্ষমতার এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রই রেন্টাল-কুইক রেন্টাল নামে পরিচিত। ছোট ছোট এইসব বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালিত হয় ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল দিয়ে। গ্যাসের চেয়ে তেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ আটগুণ বেশি। এসব কেন্দ্র থেকেই বিপিডিবি ইউনিট প্রতি ৮ টাকা ২৫ পয়সা হতে ১৯ টাকা ৯৯ পয়সা পর্যন্ত দরে বিদ্যুৎ ক্রয় করে। তাদের কাছ থেকে চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয় করে ভর্তুকি বা ঋণ গ্রহণ করে জনগণের কাঁধের ওপর বাড়তি দামের বোঝা চাপিয়ে দিলেই তো হলো! ভর্তুকি ঋণ কিংবা সুদের টাকা সেটাও তো জনগণেরই টাকা। জনগণের টাকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে এইভাবে সরকার পঙ্গু-অথর্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। বেসরকারি বাণিজ্যিক রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে শতরকম সুবিধা দিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ করে দিচ্ছে।

পিডিবি যখন হাজার হাজার কোটি টাকার লোকসানের দায় জনগণের ওপর চাপাচ্ছে ঠিক উল্টো দিকে বসে এসবের মালিকরা ধারাবাহিকভাবে হাজার কোটি টাকার মুনাফা করছে। কয়েকটি রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ ব্যবসায়ী কোম্পানির ‘কুইক’ মুনাফাচিত্র দেখলেই বুঝা যাবে! ২০০৪ হিসাব বছরে ডরিন পাওয়ার অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেডের নিট মুনাফা ছিল ১৬ কোটি টাকার নিচে। পিডিবি’র কাছে আরো বেশি বিদ্যুৎ বিক্রি করে ২০১৭ হিসাব বছরের প্রথম নয় মাসেই তা প্রায় ৫৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ২০১৪ হিসাব বছরে সামিট পাওয়ার লিমিটেডের নিট মুনাফা ছিল ২২২ কোটি টাকা। ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকেই তা ৩০২ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের মুনাফা ২০১৪ হিসাব বছরে ৮৪ কোটি টাকার কম থাকলেও চলতি হিসাব বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তা ১৪১ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ২০১৪ হিসাব বছরের ১২ মাসে শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানির নিট মুনাফা ছিল ৪৭ কোটি টাকা, সর্বশেষ হিসাব বছরের প্রথম নয় মাসেই তা ৭৮ কোটি  টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৪ হিসাব বছরে বারাকা পাওয়ারের মুনাফা ছিল প্রায় ২৫ কোটি টাকা, সর্বশেষ হিসাব বছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির নিট  মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৪১ কোটি ৭৩ লক্ষ টাকা! এভাবেই জনগণের পকেট কেটে কোটি কোটি টাকা মুনাফা লুটে নেয়ার রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে সরকার। সম্প্রতি আরো ১০টি নতুন রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছে। এসব বিদ্যুৎ ব্যাবসায়ীরা এই সরকারেরই জ্ঞাতি-গোষ্ঠী।

অনির্বাচিত মহাজোট সরকারের কথিত উন্নয়নের ফানুস বহু আগেই চুপসে গেছে। আইনের শাসন থেকে শুরু করে জনগণের মৌলিক-মানবিক অধিকার চরম আকারে লঙ্ঘিত। সেই সাথে ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যের ঊর্দ্ধগতি জনগণের সাধারণ জীবন নির্বাহকেও দুর্বিষহ করে তুলেছে। চাল-ডাল-পেঁয়াজ-রসুন থেকে শুরু করে সমস্ত নিত্য পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া।

অথচ আমরা বহুদিন ধরেই সুনির্দিষ্টভাবে বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের রূপরেখা সরকারের কাছে তুলে ধরেছি। সরকার কর্ণপাত করছে না। আমরা বলেছি- বেসরকারি বাণিজ্যিক রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বন্ধ করে বিপিডিবি’র নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে, বৃহৎ বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট নির্মাণ করতে হবে, পুরোনো বিদ্যুকেন্দ্র সংস্কার, ডিজেল-ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে গ্যাস-সৌরশক্তি-নবায়ণযোগ্য জ্বালানীভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। একমাত্র এর মাধ্যমেই দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো ও সুলভে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব। কিন্তু সরকার এই নীতিতে এগুচ্ছে না। তারা কতিপয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থেই বিদ্যুৎখাতকে ক্রমাগত বেসরকারিকরণ করছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করছে।

এই পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী — তা নিয়ে বারবার আমাদের ভাবতে হবে। আমরা যদি টুঁ শব্দটিও না করি, যদি সবকিছু নির্বিবাদে মেনে নিই তবে খুব সহজেই এমন অগণতান্ত্রিক-অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়ে যাবে। শুধু এবার নয়, সামনে আরও বড় মূল্যবৃদ্ধির বোঝা আসবে। তাই আমাদের সংগঠিত হওয়া এবং প্রতিরোধে নামা ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই।

Check Also

soviet

সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে সাতটি কল্প কাহিনী — স্টিভেন গাউন্স

২২ বছর পূর্বে ১৯৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায়; মার্কসবাদের …