Breaking News

উত্তর কোরিয়া নাকি আমেরিকা — দুনিয়ার জন্য হুমকি কে?

170809143550-mobapp-trump-jungun-north-korea-flag-02-large-169

গেল বছর সারা পৃথিবীর মানুষের উদ্বেগের অন্যতম বিষয় ছিল আমেরিকা-উত্তর কোরিয়া সম্পর্ক। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে যায় কিনা সেই নিয়ে নানান আলোচনায় মেতে ছিল বিশ্ব-মিডিয়া। এই যুদ্ধ উত্তেজনা যদিও একেবারে নতুন কিছু না, তবু এবছরের মাঝামাঝি উত্তর কোরিয়ার দূর পাল্লার সফল মিসাইল ক্ষেপণ (যা তাত্ত্বিকভাবে আমেরিকাতেও আঘাত হানতে সম্ভব) এবং নিজেকে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে দাবি করা তাতে নতুন মাত্রা এনেছে।

পারমাণবিক বোমা মানুষের জন্যে কল্যাণকর কিছু বয়ে আনতে পারে না; একথা যেমন সত্য তেমনি একে অন্য আরেকটি দিক থেকেও ভেবে দেখা দরকার। বিগত কয়েক দশক ধরেই কোরীয় সীমান্তে আমেরিকা এবং দক্ষিণ কোরিয়া দ্বিবার্ষিক সামরিক মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে — সেটা যে উত্তর কোরিয়াকে চাপে রাখার একটা অংশ তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। জবাবে উত্তর কোরিয়া প্রতিবারই পাল্টা সামরিক মহড়া বা এরকম মিসাইল ক্ষেপণের চেষ্টা চালিয়েছে, যেমনটি এবারও আমরা দেখতে পেলাম এবং এখন নিজেকেই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে দাবি করছে উত্তর কোরিয়া।

অনেক বিশেষজ্ঞের মতেই উত্তর কোরিয়ার এই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রে হামলা করার জন্যে নয়, বরং আত্মরক্ষার জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক সামরিক বাজেট যেখানে ১০০০ বিলিয়ন ডলারের কাছে সেখানে উত্তর কোরিয়ার বাজেট মাত্র নয় বিলিয়ন ডলার। প্রযুক্তির দিক থেকেও উত্তর কোরিয়া বেশ পিছিয়ে। তবু লিবিয়া, ইরাক বা সিরিয়ার মতো উত্তর কোরিয়া যে এখনো আমেরিকার আগ্রাসনের শিকার হয়নি তার অন্যতম কারণ দেশটির ‘সম্ভাব্য পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা’ — এটা বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না।

আমেরিকাসহ বুর্জোয়া মিডিয়ার একতরফা প্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে শিক্ষিত-সচেতন মানুষদের একটা ব্যাপার ভেবে দেখা দরকার — আমেরিকার একক আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিশ্বশান্তি রক্ষার গ্যারান্টি কী? এ প্রশ্ন কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও উঠেছিল। আমেরিকা পারমাণবিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে যখন তখন, যাকে তাকে হুমকি দেবে, এর ঘরের উপর চড়াও, ওর উপর হামলা চালাবে — আর কেউ এর বিরুদ্ধে দাঁড়ালেই সবাইকে বলবে দেখ, আমাকে খেপাচ্ছে। এটা মেনে নিয়ে কি দুনিয়ায় শান্তি আসতে পারে? আমেরিকার কাছে দাসখত লিখে দিয়ে থাকাটাই কি শান্তিতে থাকা? দুনিয়ার ভারসাম্যের জন্যই তখন সামরিক শক্তিতে সোভিয়েতকে আমেরিকার সমকক্ষ হতে হয়েছে। তখন আমেরিকা যেসব জায়গায় অন্যায্য হস্তক্ষেপ করতে চেয়েছে সেগুলোকে রুখে দেয়া গেছে।

উত্তর কোরিয়া সামরিক শক্তিতে আমেরিকার সমকক্ষ নয়। কিন্তু তার আত্মরক্ষার অধিকার আছে। আমেরিকা তার সামরিক শক্তি দিয়ে বিশ্বের কতগুলো দেশকে নিঃশেষ করেছে তার তালিকা করতে গেলে গবেষণার দরকার পড়বে না। শুধু বর্তমানে কী করছে তার অংশবিশেষ বোঝার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালেই চলবে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার সে রেকর্ড আছে কি? উত্তর কোরিয়া তাবৎ দুনিয়ার জন্যে হুমকি হয়ে উঠছে, এই জুজুর ভয় দেখাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তারা নিজেরা কী করেছে? তথাকথিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে বিশ্বের কয়েকটি দেশকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে, লক্ষ লক্ষ বেসামরিক লোককে হত্যা করেছে। এর বিপরীতে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো উত্তর কোরিয়ার ভিন দেশে হামলা বা বেসামরিক লোককে আঘাত করার কোন ঘটনা আছে কি?

20727838_1495280927161781_196635360020455257_nএকটি পারমাণবিক যুদ্ধের সূচনা সাধারণ মানুষের জন্য কাক্সিক্ষত কোনো ঘটনা নয়। তেমন কিছু না ঘটলেও বিশ্বজুড়েই ছোট ছোট যুদ্ধ, আঞ্চলিক উত্তেজনা, যুদ্ধ-যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আছে বাণিজ্যিক অবরোধ। আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার সাথে সরাসরি যুদ্ধ করতে না পারলেও একের পর এক বাণিজ্যিক অবরোধ চালিয়ে তাকে কোণঠাসা করতে চাইছে। নানাবিধ বৈশ্বিক অবরোধের মধ্যে থেকে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরের প্রকৃত চিত্র খুঁজে পাওয়া দুরূহ। অনেকেই সে দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে চিন্তিত। সংবেদনশীল মানুষ মাত্রই সেসব নিয়ে চিন্তিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একই সাথে এটাও চরম পরীক্ষিত সত্য যে, মার্কিন আগ্রাসন উত্তর কোরিয়ার অবস্থার কোনো উন্নতি ঘটাবে না। ‘স্বৈরাচার উৎখাত’ এর নামে গাদ্দাফি বা সাদ্দাম বিরোধী অভিযানের ফলাফল এখনো আমাদের চোখের সামনে বাস্তব।

উত্তর কোরিয়ার ভালো-মন্দ ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার প্রথমত ও প্রধানত সে দেশের মানুষের। তাই একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে আরেকটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে যেকোনো অজুহাতে, যেকোনো ধরনের মার্কিন মিত্রশক্তির আগ্রাসনের তীব্রভাবে বিরোধিতা করা। উত্তর কোরিয়া কখনও যদি অন্য দেশকে বিনা কারণে আক্রমণ করে তাহলেও আমরা তার বিরুদ্ধে দাঁড়াব। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক শক্তি অর্জন সম্পর্কে আমেরিকার একতরফা বক্তব্য আমরা কিছুতেই মানতে রাজি নই। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে দুনিয়াকে রক্ষা করার একমাত্র পথ হলো দেশে দেশে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই জোরদার করা।

সাম্যবাদ জানুয়ারি ২০১৮

Check Also

1514978075066-171900565 copy

জেরুজালেম প্রশ্নে ট্রাম্প — ধর্ম নয়, অস্ত্র বিক্রির বাজারটাই আসল কথা

জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটালো ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের …