Breaking News

গার্মেন্টস শিল্পে মালিক-শ্রমিকের ‘আকাশ পাতাল’ পার্থক্য

garments labour copy

বরাবরের মতোই দেশের উন্নয়ন হচ্ছে। দেশে এখন ৫০ হাজার কোটিপতি। দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে ৪ কোটিরও বেশি মানুষ। শতকরা ২৫ ভাগেরও বেশি লোক একবেলা খেতে পারে না। এর মধ্যেও সরকার দেশের উন্নয়নের ঢোল যখন বিরাট আড়ম্বরে বাজাতে থাকেন, সেই রণবাদ্যে সবার আগে বেজে ওঠে গার্মেন্টস খাত।

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কী দিয়ে বুঝব? আমাদের গার্মেন্টস খাত এরই মধ্যে একবার রপ্তানিতে চীনকেও অতিক্রম করেছে। ২০২১ সালে পোশাক রপ্তানি ৫০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন এ শিল্পের উদ্যোক্তারা। পোশাক শিল্পে দেশ সবাইকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরি হচ্ছে এখানে — এ আমাদের গৌরব। দেশের উন্নয়ন। সরকারের ক্রেডিট।

তাই এ খাতকে টিকিয়ে রাখতে হবে একথা যখন বলা হয় তখন কেউই এতে না করার কোনো কারণ খুঁজে পান না। কিন্তু, পোশাক খাতের গৌরবের কৃতিত্ব কার? যে ঘাম ঝরিয়ে এই পোশাক তৈরি করে তার, নাকি যে পুঁজি বিনিয়োগ করে তার? কৃতিত্বটা মালিকের নাকি শ্রমিকের?

এই প্রশ্ন শুধু তৈরি পোশাক ক্ষেত্রে নয়, সকল ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। দেশের উন্নয়ন, দেশের স্বার্থ বলে অহরহ যা বলা হয় তাতে একটা ফাঁক থাকে। দেশটা কোন অবিভাজ্য দেশ নয়। দেশটা শ্রেণিবিভক্ত। শ্রমিক ও মালিক — এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। তাই দেশের স্বার্থ, দেশের উন্নয়নের কথা উঠলে এ প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, কার স্বার্থ, কার উন্নয়ন?

একথা স্পষ্ট হয়ে যাবে কিছু উদাহরণের দিকে তাকালে। গত ২০ জানুয়ারি ১২টি গার্মেন্টস্ শ্রমিক সংগঠন ‘গার্মেন্টস শ্রমিক অধিকার আন্দোলন’ একটি সংবাদ সম্মেলন করে। গার্মেন্টস শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ১৬০০০ টাকা, ১০% ইনক্রিমেন্ট, স্থায়ীভাবে রেশনিং ব্যবস্থা চালু, ভেরিয়েবল ডিএ, কন্ট্রিবিউটরি প্রভিডেন্ট ফান্ড ঘোষণার দাবি করে তারা। বর্তমানে গার্মেন্টস শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ৫ হাজার ৩০০ টাকা, যা দিয়ে একটা শ্রমিক পরিবারের জীবন-যাপন অসম্ভব। বেঁচে থাকার জন্য তারা শরীর নিস্তেজ না হওয়া পর্যন্ত ওভারটাইম করে। অক্সফামের সাম্প্রতিক রিপোর্টে এসেছে — বিশ্বের প্রধান ৭টি তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশে শ্রমিকদের মজুরি সবচেয়ে কম। বাংলাদেশে বসবাসের জন্য শোভন মজুরি প্রয়োজন ২৫২ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ। অথচ বাংলাদেশে একজন শ্রমিক পান ৫০ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। কোনো কারণে ফ্যাক্টরির লোকসান ঘটলে তার আঘাত সবার আগে এসে পড়ে শ্রমিকদের উপর। আগুনে পুড়ে, ভবন চাপা পড়ে শ্রমিক মারা যায় — তাদের ব্যাপারে রাষ্ট্র কোনো দায়িত্ব নেয় না। তাজরীন গার্মেন্টস, স্পেকট্রাম গার্মেন্টস, রানা প্লাজার ঘটনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে তা দেখিয়ে দিয়েছে। অথচ মালিকের ব্যাপারে রাষ্ট্রের ভূমিকা এমন নয়। ২০১০-২০১৫ এ পাঁচ বছরে গার্মেন্টস মালিকরা সরকার থেকে নগদ সাহায্য পেয়েছে ৪ হাজার ২১৫ কোটি টাকা। ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের রিপোর্ট অনুসারে, ২০০৮ এর পর ২৭০টি গার্মেন্টস এর ঋণ মওকুফ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাষ্ট্রীয় ৮ ব্যাংকের মোট খেলাপী ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ আটকে আছে গার্মেন্টস মালিকদের কাছে।

শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর কথা বললে, গার্মেন্টস খাতের নানা সংকট সামনে নিয়ে আসেন মালিকরা। অথচ তাদের নিজেদের জীবনযাপন সেকথা বলে না। খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘রয়টার্স ’ এর প্রতিবেদনে গার্মেন্টস মালিক ফজলুল আজিমের জীবনযাপন উল্লেখ করেছিল। ঢাকায় তার সুইমিং পুলসহ বিলাসবহুল বাড়ি, আরাম-আয়েসে থাকার বিপুল আয়োজন থাকলেও শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর কথা বললে তিনি আমেরিকায় বাজার কমে যাওয়াসহ নানা সংকটের দোহাই দেন। রিপোর্টটিতে একজন মালিককে দেখিয়ে একটা সাধারণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে মাত্র। ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনলাইন মনিটরিং সিস্টেম থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়,এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে ১৮টি প্রতিষ্ঠান ছিল, আয় প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের উপর।

পোশাক শিল্পে মালিকরা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা না দিলেও কানাডায় গড়ে তুলেছেন ‘বেগমপাড়া’। কানাডিয়ান একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে যে, গার্মেন্টেস মালিকরা দেশে থাকেন, আর তাদের স্ত্রীরা থাকেন কানাডায়। গার্মেন্টস মালিকরা কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নাগরিকত্ব নিয়েছেন। মালয়েশিয়া এখন ‘সেকেন্ড হোম’। আগুনে পুড়ে শতাধিক গার্মেন্ট কর্মী নিহত হওয়া তাজরীন গার্মেন্টসের মালিক অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। সেখানে রয়েছে তার বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কোনো গার্মেন্টস ব্যবসায়ীর চার সদস্যের পরিবারে বিএমডব্লিউসহ মোট গাড়ি রয়েছে সাতটি। কারও ড্রয়িং রুমে রয়েছে আন্ডার গ্রাউন্ড গ্যালারি। কারও বাসায় রয়েছে টেনিস কোর্ট ও সুইমিং পুল। কেউ সিঙ্গাপুরে বাড়ি করেছেন। অথচ তার গ্রুপের তিনটি গার্মেন্টসের প্রায় তিন হাজার শ্রমিক তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে বিক্ষোভ করেছে অসংখ্যবার। ‘সিপিডি’র প্রকাশ করা একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই বছরে সুইস ব্যাংকসমূহে বাংলাদেশি নাগরিকদের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। পাচার করা অর্থ দিয়ে খোলা হয়েছে এসব অ্যাকাউন্ট। গত ১৩ বছরে মালয়েশিয়ার ‘মাই সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচিতে ৩ হাজার ৬১ জন বাংলাদেশি অর্থ পাঠিয়েছেন। ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটির (জিএফআই) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ হলো ৪ লাখ ৪১ হাজার ৪২০ কোটি টাকারও বেশি। ‘লেস ডেভেলপড কান্ট্রিজ (এলডিসি) বা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সরকারের কাছ থেকে ছলচাতুরির মাধ্যমে নেওয়া বিভিন্ন সুবিধার অপব্যবহারকারী পোশাকশিল্প মালিকরা এখন অর্থ পাচারের শীর্ষে। তাদের এই অবৈধ কারবার চলছে ‘বন্ডেড ওয়্যার হাউজ’ বা বন্ড সুবিধার আড়ালে। বন্ড সুবিধায় আমদানি করা শুল্কমুক্ত কাপড় খোলাবাজারে বিক্রির ফলে ধ্বংসের মুখে পড়েছে টেক্সটাইল শিল্প। অনেকের পোশাক কারখানা না থাকার পরও, বন্ড লাইসেন্স নিয়ে আমদানি করা পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার তথ্য মিলেছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে। ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের সর্বশেষ তথ্য-উপাত্তে দেখা গেছে, বাস্তবে কোনো ধরনের পোশাক কারখানা না থাকার পরও ৪৭৯টি প্রতিষ্ঠানের নামে আছে বন্ড লাইসেন্স। এসব বন্ড লাইসেন্স ব্যবহার করে পণ্য আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করেছেন কালোবাজারের সঙ্গে জড়িত পোশাক শিল্প মালিকরা। এত অনিয়মের পরও ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে বিভিন্ন ধরনের কর ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি পোশাক মালিকদের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছে সরকার।

এ গল্পের যেন শেষ নেই। খালি চোখে বোঝাও যাবে না কীভাবে জীবন চলে এ শিল্পের ৪০ লাখ শ্রমিকের। এ বিরাট বিত্তের পাহাড় যাদের রক্তের উপর তৈরি, ১৬০০০ টাকা মাসিক মজুরি তাদের জন্য কি খুব অতিরিক্ত চাওয়া?

সাম্যবাদ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

Check Also

140226102130_1_540x360

কৈশোরের সারল্য — লুটে নিচ্ছে কারা?

সময়ের সাথে সাথে পাল্টাচ্ছে পত্রিকার খবর। সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় একদিকে উন্নয়নের সংবাদ আসে, আরেক দিকে …