Breaking News

চলন্ত বাসে গণধর্ষণ ও হত্যা — এ সমাজে নারীর অবস্থান কোথায়?

sex assault copy

অনেক গল্প আমরা শুনি প্রতিদিন। ব্যাথার গল্প, ব্যর্থতার গল্প, অপমানের গল্প এ সমাজে তৈরি হচ্ছে প্রতি মুহূর্তেই। আমাদের আজকের গল্পটা এসব থেকে আলাদা। ছেচল্লিশ বছর আগে যে জাতি প্রবল আবেগে, বিপুল গৌরবে পরাধীনতা থেকে মুক্ত হওয়ার লড়াই করেছিল নতুন দেশ নতুন মানুষ গড়বে বলে — সে জাতি আজ প্রতিদিন কেমন মানুষ সৃষ্টি করছে? এ সমাজকে কি আজ চেনা যায়? সেই গল্প শোনা যাক আজ। গল্পটি এদেশেরই একটা মেয়েকে নিয়ে, তার নাম রূপা।

মাস্টার্স পাশ করে একটা কর্পোরেট অফিসে চাকুরি করত রূপা। জীবনের বহু পথ পাড়ি দিয়ে একটু একটু করে নিজেকে বড় করেছিল সে। ছোটবেলায় হারিয়েছিল বাবাকে। বাবা হারানোর কষ্ট আর দারিদ্র্যের প্রবল কষাঘাত তাকে দমাতে পারেনি। শুধু নিজে নয়, পড়াশুনা করিয়েছিল ছোট বোনকেও। ঈদের আগে চাকুরিতে বেতন বেড়েছিল। দারুণ আনন্দে ভেবেছিল এবার ঈদে বাড়িতে গিয়ে মাকে চমকে দেবে। মাও খুব খুশি হবেন। বাপমরা মেয়েটিই তো পরিবারের অন্যতম সম্বল। কিন্তু মায়ের সাথে সুখের মুহূর্তটি আর এলো না। মেয়ে ফিরলো বাড়িতে, কিন্তু নিথর দেহে। শোকে পাগলপ্রায় মা হাসপাতালের বেডে চিৎকার করে বলেছেন, ‘আমার দরদী বেটি। কত কষ্ট করে যে লেখাপড়া শিখেছে।’ মায়ের এই বিলাপ পাষাণ হৃদয়েও ঝড় তুলবে। মৃত্যু কষ্ট দেয়। জন্ম নিলে মানুষকে মরতে হবে ঠিক। কিন্তু এমন মৃত্যু কে চেয়েছিল? এমন যন্ত্রণা আর অপমানের মরণ কেন রূপার মতো মেয়েদের জীবনে আসে?

গত ২৫ আগস্ট রূপা উঠেছিল বগুড়া থেকে ময়মনসিংহগামী একটি বাসে। সেদিন কোনো কারণে বাসে যাত্রী কম ছিল। একসময় সে-ই হয় একমাত্র যাত্রী। বাসে স্টাফ ছিল মোট ৫ জন। তারা সবাই মিলে রূপাকে গণধর্ষণ করে, একসময় আত্মরক্ষায় চিৎকার করলে রূপাকে ঘাড় মটকে তারা মেরে ফেলে। লাশ ফেলে দেয় টাঙ্গাইলের কাছে মধুপুরে। এমন নৃশংসতার সম্পূর্ণ বিবরণ অসম্ভব। ন্যূনতম বিবেকসম্পনড়ব মানুষ এমন ঘটনায় শিউরে উঠবেন, উঠেছেনও। কিন্তু আশ্চর্য্যরে বিষয় হলো, যারা এই অপকর্মটি করলো, তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র বিকার দেখা যায়নি। যেন খুবই স্বাভাবিক একটা কাজ করেছে তারা। এমনকি তারা পরেরদিন গাড়ি চালিয়েছে, স্বাভাবিক কাজকর্ম করেছে। এ কীভাবে সম্ভব? কেমন করে মানুষ এমন পাশবিক আর হৃদয়হীন হতে পারে? প্রবৃত্তির লালসা কি তাদের সমস্ত মানবিক অনুভূতিকে নিঃশেষ করে দিয়েছে?
রূপার মতোই তনু, ত্বকী, সাগর, রুনীসহ আরও অসংখ্য মানুষকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। শিশুদের সংখ্যাও কম নয়। প্রতিদিন নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, ঘরে-বাইরে নারী নির্যাতনের সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে। নিষ্ঠুর নৃশংসতা তৈরি হচ্ছে সমাজে, প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে ধর্ষক আর খুনিরা। জন্ম দিচ্ছে এই সমাজ। অর্থনৈতিকভাবে প্রবল বৈষম্য, রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী আচরণ, গুম-খুন-ক্রসফায়ার সবই সমাজে চরম আধিপত্যের মনস্তত্ব তৈরি করছে। এই আধিপত্য সংখ্যালঘুর উপর সংখ্যাগরিষ্ঠের, দুর্বলের উপর সবলের, নারীদের উপর পুরুষতন্ত্রের। সমাজ পরিবেশের মধ্যে পারস্পরিক অশ্রদ্ধা, হিংসা, ক্ষমতা দখলের লড়াই, অর্থ- বিত্তের প্রতাপ আর উন্মত্ত যৌনতার বিস্তার এমন ধর্ষক আর খুনি তৈরির জমিন তৈরি করছে প্রতিদিন।

সবচেয়ে বড় ব্যাপারটি হলো মুষ্টিমেয় বড়লোকের স্বার্থে পরিচালিত এ সমাজে শাসকশ্রেণি এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার নতুন মন্ত্র আবিষ্কার করেছে। এজন্য ছোট বয়স থেকেই চলছে নীতি-নৈতিকতা-মূল্যবোধ-মনুষ্যত্ব ধ্বংসের নানা আয়োজন। দেশব্যাপী আজ পর্নোগ্রাফির রমরমা ব্যবসা চলছে। নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনে নারীকে পণ্যরূপে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ছোটকাল থেকেই এসব দেখে দেখে তরুণ-যুবকদের দৃষ্টিভঙ্গিটাই গড়ে উঠছে ভিন্নরকম হয়ে। অন্যায় আজ আর তাদের কাছে অন্যায় নয়। ন্যায়-অন্যায় বিচারের বোধটা পর্যন্ত ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। ভোগবাদকে উস্কে দেয়া হচ্ছে। আর সে ভোগবাদ মানুষকে অমানুষ করে তুলছে। আনন্দ এখন বিভৎসতায় রূপ নিয়েছে। আর এ বিভৎসতার শিকার হলেন রূপা। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, রাস্তা থেকে বাসস্ট্যান্ড, অফিস থেকে পাড়ার দোকান, রেস্টুরেন্ট সর্বত্রই চলছে বিভৎসতা। কোনো নীতি-নৈতিকতা-মূল্যবোধের ব্যাপার নেই, স্ফূর্তিই যেন জীবনের উদ্দেশ্য। তার জন্য উত্তেজনা চাই। দেশজুড়ে তাই বিভিন্ন নেশাদ্রব্যের রমরমা ব্যবসা। এই সমস্ত কিছু নিয়ে যে প্রজন্ম গড়ে উঠছে সে প্রজন্ম মেয়েদের কোন দৃষ্টিতে দেখবে, তা বলাই বাহুল্য।

রূপার খুনিরা ধরা পড়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের শাস্তি হবে কিনা আমরা জানি না। এই সংশয় এমনি এমনি তৈরি হয়নি। অতীতেও এমন বহু ঘটনা ঘটেছে, অপরাধীরা শাস্তি পায়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অপরাধীরা সরকার দলীয় কেউ। ফলে তারা পার পেয়ে গেছে। এই যখন অবস্থা তখন রূপার মতো মেয়েদের এমন পরিণতি আমাদের আরও ভীত-সন্ত্রস্ত করতে পারে। আমাদের মা-বোন-স্ত্রী-স্বজন নিয়ে আমরা আরও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারি, আরও সংকুচিত হয়ে পড়তে পারি। কিন্তু এর কোনোটাই বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাবে না। আমাদের প্রত্যেকের সরব-সচেতন ভূমিকা ছাড়া দুর্বৃত্তদের এমন নৃশংসতা কমবে না। এই ভূমিকা দরকার শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান-অফিস-আদালত-কারখানা সব জায়গায়। ঘরে-বাইরে, পথে-ঘাটে লড়াই বিস্তৃত করার মধ্য দিয়েই আমরা কেবল শ্বাস নিতে পারব, বেঁচে থাকার মর্যাদাটুকু রক্ষা করতে পারব। রূপার মর্মান্তিক পরিণতি, তাকে হারানোর শোক আমাদের মধ্যে যেন সেই শক্তির জাগরণ ঘটায়।

সাম্যবাদ সেপ্টেম্বর ২০১৭

Check Also

lenin-stalin copy

মানবকল্যাণে সোভিয়েতের দান

(দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার উপর হিটলারি নাৎসী বাহিনীর আক্রমণের পর বাংলার শিল্পী-সাহিত্যিক-বিজ্ঞানী-বুদ্ধিজীবীরা জনগণের উদ্দেশ্যে এক আবেদনপত্র …