Breaking News

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বামপন্থীদের করণীয়

IMG_3716

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের বিরুদ্ধে জনতার বিক্ষোভ ও বিক্ষুব্ধতার পারদ এখন থার্মোমিটারের সবচেয়ে উপরের স্কেলে। কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন আপাতদৃষ্টিতে দু’টি দাবিভিত্তিক আন্দোলন হলেও দাবির পরিসরে তা সীমাবদ্ধ থাকেনি। সরকারের চূড়ান্ত দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের সীমাহীন বিক্ষোভ এর সাথে যুক্ত হয়েছিল। ঘটনা দু’টি প্রমাণ করে দিয়েছে যে মানুষ আন্দোলন চায়, চায় সাহসের সাথে কেউ দাঁড়াক, লড়ুক। এ কারণে কিশোরদের আন্দোলনে রাস্তা যখন বন্ধ, ঢাকা যখন অচল- তখনো মানুষের মুখে বিরক্তি নয়, বরং এই কিশোরদের প্রতি সমর্থনই ব্যক্ত হয়েছে। এটি শুধু দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের প্রতিক্রিয়া নয়, কারোরই বুঝতে অসুবিধা নেই এটি গত দশ বছর ধরে চলতে থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসনের ফলাফল। ক্ষোভ-বিক্ষোভ বারুদ হয়ে জমে আছে সমাজের স্তরে স্তরে – একটু আগুনের কণা পেলেই তা বিস্ফোরিত হতে চায়।

এই পরিস্থিতিতে দেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে এসেছে। আওয়ামী লীগ যে কোন প্রকারে ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়, অথচ এই মূহুর্তে তার কোন জনভিত্তি নেই। আপাত অর্থে সুষ্ঠু নির্বাচন (বুর্জোয়া ব্যবস্থায় এর বেশি আশা করা যায় না) হলে আওয়ামী লীগের আবার ক্ষমতায় আসার কোন উপায় নেই। দেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে চায় না। প্রতিটি সেক্টরেই সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমে আছে, ফাঁক পেলেই তা বিস্ফোরিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় ক্ষমতায় আসতে হলে আওয়ামী লীগকে আরেকটি সাজানো নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হবে। আওয়ামী লীগ আরেকটা সাজনো নির্বাচনের দিকেই এগোচ্ছে, কিন্তু প্রতিরোধ করার মতো কোন বিরোধী শক্তি নেই।

এই সাজানো নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকেই আওয়ামী লীগ যাচ্ছে। এছাড়া তাদের কোন উপায়ও নেই। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তারা এই সাজানো নির্বাচনের মহড়া দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এর নাম দিয়েছেন ‘নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন’। একই মডেল আওয়ামী লীগ জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনুসরণ করবে। প্রশ্ন হলো দেশের অপরাপর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি জনগণকে সংঘবদ্ধ করে এই প্রহসনের নির্বাচন ঠেকাতে পারবে কি না? জনগণকে সাথে নিয়ে প্রবল প্রতিরোধ সৃষ্টি করে আবার একটা অবৈধ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসা আটকাতে পারবে কি না?

জনগণের অসংগঠিত স্বতঃস্ফুর্ত বিক্ষোভ একে ঠেকাতে পারবে না। এই অসন্তোষ ও বিক্ষুব্ধতাকে স্থায়ী আন্দোলনে রূপ দিতে পারে এমন কোন নেতৃত্বও এই মূহুর্তে এদেশে নেই। বিএনপি প্রধান বিরোধী দল হলেও অসংগঠিত। তাদের নেত্রী খালেদা জিয়া জেলে। গোটা দলকে ঐক্যবদ্ধ করে একটা আন্দোলন কিংবা নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে এমন গ্রহণযোগ্য দ্বিতীয়  কোন ব্যক্তি এ দলে নেই। ফলে সরকারের এত ব্যর্থতার পরও বিএনপি দাঁড়াতে পারছে না। জনদাবীতে আন্দোলন গড়ে তোলা বিএনপি’র লক্ষ্য নয়, কারণ সে বিপ্লবী শক্তি নয়। কিন্তু বুর্জোয়া অর্থেও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য, নির্বাচনে লড়ার জন্য যে মনোভাবের প্রয়োজন হয়, যে ঝুঁকি নিতে হয় – এই মূহুর্তে সেটাও তারা দেখাচ্ছে না। তাদের নেতারা রাজপথে নামলে, রাস্তায় মার খেয়ে পড়ে থাকলে মানুষের ঢল তাদের দিকেই যেতো, কারণ বুর্জোয়া মিডিয়ায় সরকারবিরোধী যতটুকু প্রচার-প্রচারণা সেটার কেন্দ্র তারাই। কিন্তু বিএনপি কোন সংবাদই সৃষ্টি করতে পারছে না। 

ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি বিকল্প হিসেবে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়

সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষিত-সচেতন-গণতান্ত্রিক চিন্তাসম্পন্ন মানুষেরা মৌলবাদের প্রসার নিয়ে খুবই চিন্তিত। এই সময়ে বেশ কিছু জায়গায় জঙ্গী হামলার ঘটনা ঘটছে। লেখক-ব্লগার-প্রকাশকদের উপর একের পর এক হামলা হয়েছে। এর পুলিশি তদন্তে দেখা গেল যে এই নেটওয়ার্ক বেশ সংগঠিত ও শক্তিশালী এবং দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় তাদের যোগাযোগ আছে। এদের রিক্রুটমেন্টের উৎস এখন শুধু মাদ্রাসা ছাত্র নয়, ঢাকার উচ্চবিত্ত ঘরের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছাত্ররাও এদের সাথে যুক্ত। প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা কিংবা সচিবদের সন্তানদেরও এখন আত্মঘাতী স্কোয়াডের নেতৃত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে। একইসাথে হেফাজতে ইসলামসহ মৌলবাদী শক্তিগুলোর যৌথ মহড়া মানুষের মনে মৌলবাদের উত্থানের শঙ্কা জন্ম দিয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা তীব্র বিক্ষোভ নেতৃত্বহীন অবস্থায় বসে থাকতে পারে না। সঠিক বিপ্লবী শক্তি সেটা ধারণ না করলে কারও না কারও ভোটের বাক্সে সে জমা হবে কিংবা প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি একে ব্যবহার করবে। 

তবে ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তিগুলো স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে জেতার মতো সামর্থ্য এখনও অর্জন করেনি। এদেরকে কেন্দ্র করে দেশে কোন গণজোয়ারও সৃষ্টি হয়নি। যদিও ধর্মীয় মৌলবাদের প্রচার ও নতুন করে ধর্মীয় সংস্কৃতিকে গ্রহণ করার একটা ঝোঁক ইদানিংকালে বেশ চোখে পড়ার মতো। এর কারণ শুধু জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীও এই প্রেক্ষাপট সৃষ্টির জন্য দায়ী। মুসলমানরা সন্ত্রাসী ও দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি – গোটা বিশ্বে এটাই এখন মুসলমানদের পরিচিতি। আমেরিকা ও ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে তৈরি করেছে আবার এখন তারাই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণা করেছে, মুসলমানদের এক নম্বর জাতীয় শত্রু হিসেবে গণ্য করছে। এতে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি সাধারণ মুসলমানদের প্রতি অবিশ্বাস ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার অভিবাসী মুসলমানদের প্রতিনিয়ত অপমানিত হতে হচ্ছে। এই অবমাননাবোধ থেকে সঠিক রাস্তা না পেয়ে যুব সমাজের একটা অংশ ইসলামী জঙ্গীবাদের সাথে যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু এটা দেশের মধ্যে একটা জাগরণ তুলে ইসলামী বিপ্লবের দিকে দেশকে নিয়ে যাবে – অবস্থাটা এরকম হয়নি। 

বামপন্থীদের নেতৃত্বে সৃষ্ট গণআন্দোলই এ সময়ে পথ দেখাতে পারতো, কিন্তু তাদের বড় অংশই ভোটের রাজনীতিতে মগ্ন

বামপন্থীদের নেতৃত্বে গণআন্দোলন গড়ে উঠলে এই জনবিক্ষোভ একটা সঠিক রাস্তা পেতো। জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সংগ্রাম কমিটি গঠনের মাধ্যমে বামপন্থীরা সত্যিকারের লড়াই গড়ে তুলতে পারলে, জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে শুধু প্রতিক্রিয়াধর্মী কর্মসূচী নয়, জনগণকে সাথে নিয়ে কার্যকর আন্দোলনের চেষ্টা করলে বামপন্থীরা ধীরে ধীরে দেশের মানুষের ভরসার কেন্দ্রে আসতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি। বামপন্থীদের অনেকেই আন্দোলন-সংগ্রামের এই ধারাবাহিক ও কষ্টকর পথ বাদ দিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে কিছু পাওয়া যায় কিনা সে চেষ্টাই করছেন। বিশেষ করে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে, যেখানে জনগণকে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে একটা গভীর শূন্যতা বিরাজ করছে, সেখানে নির্বাচনী বিকল্প হিসেবে এই বামপন্থীরা আসতে চাইছেন। বামপন্থীরা জনগণের নেতা হয়ে উঠুক তা আমরাও চাই, কিন্তু সেটা কিভাবে? বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট শূন্যস্থানে কৌশলী ভূমিকা নিয়ে আবির্ভূত হওয়ার মাধ্যমে – যা প্রকান্তরে বুর্জোয়াদের ‘এসকেপ রুট’ হবে? নাকি তারা তাদের নিজস্ব কর্মসূচীর মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করবে? 

বাসদ (খালেকুজ্জামান) ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেছেন মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য, বদরুদ্দোজার বিকল্প ধারা, ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, কাদের সিদ্দিকীর কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগ ইত্যাদি দলগুলোর সাথে বামপন্থীদের একটা জোট গঠনের মাধ্যমে একটা বিরাট জোট হিসেবে প্রচারে আসতে, রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যে একটা জায়গা নিতে। কামাল হোসেন-বদরুদ্দোজাদের নাম-ধাম আছে এবং মিডিয়া এদের বেশ প্রচারও দেয় – তারা সেটা ব্যবহার করতে চেয়েছেন। আবার বামপন্থীদের ব্যক্তিগত সততা নিয়ে জনগণের মধ্যে একটা ইমেজ আছে। বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ কিছু বামপন্থী দল মনে করেছেন যে, কামাল হোসেন-বদরুদ্দোজাদের প্রচার এবং জনগণের মধ্যে বামপন্থীদের ইমেজ – এই দু’টোকে কাজে লাগিয়ে তারা জনগণের আওয়ামী লীগ বিরোধী মনোভাবটাকে একটা জায়গা দিতে পারবেন এবং নির্বাচনেও একটা গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারণকারী ফ্যাক্টর হিসেবে উপস্থিত হতে পারবেন। 

বাস্তবে এই তথাকথিত উদারপন্থীরা জনগণের দাবি-দাওয়াকে কেন্দ্র করে রাস্তায় দাঁড়ালে, প্রতিটি ইস্যুতে প্রতিবাদ করলে, জনগণের ঘরে ঘরে গেলে – আমরা কি বলছি না বলছি তার উপর কিছু নির্ভর করতো না – মানুষ এই গভীর সংকটে তাদের কাছে টেনে নিতোই এবং যারা আন্দোলন চায় তাদের সকলকেই এই শক্তিগুলোর সাথে যুক্ত হতে হতো। বামপন্থীদের তাদেরকে টেনে টেনে আন্দোলনে আনতে হতো না। আন্দোলনভিত্তিক ঐক্য এভাবেই গড়ে ওঠে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের কতিপয় বামপন্থী বন্ধুরা তা বুঝতে পারলেন না। যে কোন শক্তি, যে রাষ্ট্রের এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে আন্দোলনে নামবে, রুখে দাঁড়াবে- তখন তার সাথে ঐক্য হবে কি হবে না সে প্রশ্ন আসে। কিন্তু শুধু গোলমিটিং করে পত্রিকায় ছবি ছাপতে থাকলে, এই আমরা নামছি এমন ভাব দেখালে কাজের কাজ কিছুই হবে না। 

তাহলে বামপন্থী দাবিদার দলগুলো এই ধরনের চিন্তা করেন কেন? আন্দোলন মাথায় থাকলে এই সকল যুক্তি আসার কথা নয়। প্রকৃত সত্য এই যে, এই ধরনের বিশ্লেষণ আসার পেছনে একমাত্র কারণ হলো, এই বামপন্থীদের মনে অন্দোলন থেকে নির্বাচনই বেশি প্রাধান্য নিয়ে আছে। তারা নির্বাচনে যোগ্যতা প্রমাণের জন্য ও মানুষের সামনে ‘দৃশ্যমান’ হওয়ার জন্য আন্দোলন করেন। 

অথচ কে না জানে, এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার মধ্যে ভোট যত সুষ্ঠুই হউক না কেন বাস্তবে তা মানি-মাসল-মিডিয়ার প্রভাবাধীন। সুষ্ঠু বলা হচ্ছে মানে এসব কিছুর প্রভাবের মধ্যে জনগণ অন্তত নিজে নিজের ভোটটা কেন্দ্রে গিয়ে দিয়ে আসতে পারছেন। সেটাকেই মহাসমারোহের সাথে বলা হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচন। এই নির্বাচনের ভীড়ে বামপন্থীরা জায়গা নিতে চান, তার জন্য মাথাটা গলিয়ে দেয়া শুরু করেছেন। অথচ সারা দেশে তাদের সংগঠন দাঁড়ায়নি, দেশের প্রান্তে প্রান্তে জনগণের বিভিন্ন দাবিতে লড়াই করতে করতে তাদের একঝাঁক নেতা তৈরি হয়নি, জনগণের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বড় একদল সমর্থক সৃষ্টি হয়নি। এই সকল প্রস্তুতি থাকলেও মানি-মাসল-মিডিয়ার নির্বাচনে তাদের এক-দুইটি আসনে জেতাও কষ্টকর হতো। অথচ এর কিছুই ঘটলো না, বামপন্থীদের উদ্যোগে অতি অল্প কাজ হয়েছে মাত্র, এর মধ্যেই তাদের মধ্যে ভোটের স্বপ্ন খেলা করতে শুরু করলো। একটা বড় জোট যদি বামপন্থী ও কামাল হোসেন-বদরুদ্দোজাদের নিয়ে হয়, আর বুর্জোয়া মিডিয়া যদি একে বেশ প্রচার দেয়া শুরু করে, তাতে বেশ কিছু মানুষের মনে একটা কিছু হচ্ছে বলে যদি একটা ভাবও তৈরি হয় – তবে বুঝতে হবে যে সেটা বুর্জোয়াদের সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই হচ্ছে, আন্দোলনের জন্য হচ্ছে না। 

রাজনীতি ও নির্বাচন শ্রেণী নিরপেক্ষ কোন ব্যাপার নয়

নির্বাচন শ্রেণীর সার্বিক পরিকল্পনার বাইরের কোন ব্যাপার নয়। দেশের ব্যবসায়ী-পুঁজিপতিশ্রেণীর এখানে নির্ধারণকারী ভূমিকা আছে। বিশেষ করে দেশে যখন কিছু একচেটিয়া পুঁজিপতিগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে, তখন তাদের ব্যবসার স্বার্থ নিশ্চিত করার জন্য যাকে দরকার, যাকে দিয়ে তার কাজ সবচেয়ে ভাল হবে তাকেই সে ক্ষমতায় আনবে। এ কারণেই ব্যবসায়ী-পুঁজিপতি শ্রেণী আওয়ামী লীগকে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এনেছিল। দেশের মানুষ না মানলেও এই শ্রেণীর সমর্থনের জোরেই আওয়ামী লীগ পাঁচ বছর ক্ষমতায় টিকে থাকতে পেরেছে। খালেদা জিয়াকে পরিকল্পিতভাবে সে জেলে পুরে রাখতে পারলো, এর বিরুদ্ধে কোন প্রকার কার্যকর আন্দোলন বা প্রতিক্রিয়া বিএনপি দেখাতে পারলো না – তা এই শ্রেণীর কারণে। একচেটিয়া পুঁজিপতিগোষ্ঠীর সকলে একমত হয়ে এই কাজ করছে কিনা সেটা বড় প্রশ্ন নয়, ঘটনাগুলো সেভাবে ঘটেও না। কিন্তু এটা ঠিক যে এদের একটা বড় অংশের সমর্থন না পেলে বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় কোন শক্তি আসতে ও টিকে থাকতে পারে না। 

অনুন্নত পুঁজিবাদী দেশ হওয়ায় এদেশের রাষ্ট্রক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সা¤্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের একটা ভূমিকা থাকে। এই মূহুর্তে এদেশে ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের উপর ভারত তার পূর্বের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। ভুটানে ধীরে ধীরে চীন ঢুকছে, ভুটানের যুবসমাজের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। একটি সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে এ অঞ্চলে প্রভাব ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশকে সে তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দিতে পারে না। ভারত আওয়ামী লীগ সরকারকে এতদিন পুরোপুরি সমর্থন করে এসেছে। এদেশে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সুবিস্তৃত নেটওয়ার্ক আছে, বিভিন্ন প্রশাসনিক ও পররাষ্ট্রবিষয়ক পদক্ষেপে সরাসরি ভারতের প্রভাব আছে। বাংলাদেশ-আমেরিকা সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ভারত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে আমেরিকার একমাত্র মিত্র ভারত। সেকারণে বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের সাথে কোন দ্বন্দ্বে আমেরিকা যাচ্ছে না। চীন বিরাট ব্যবসা পাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে, কিন্তু কৌশলগত কিংবা অন্য যে কোন কারণেই হউক, ব্যবসার বাইরে রাজনৈতিক বিষয়ে সে এখনও যুক্ত হয়নি। রাশিয়ার সাথে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও অস্ত্রশস্ত্র ক্রয়ের ব্যাপারে বাংলাদেশের বড় বড় চুক্তি হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে কেউই আওয়ামী লীগের ব্যাপারে নাখোশ নয়। সবাইকেই সে খুশি রেখেছে। শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই সরকারকে অন্যদের মতো করে সমর্থন করছে না। তারা ২০১৪ সাল থেকেই এই সরকারের বৈধতার ব্যাপারে তাদের প্রশ্ন উত্থাপন করে আসছে এবং বিভিন্ন সময়ে সরকারের মানবাধিকারবিরোধী কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করেছে। তবে ইংল্যান্ড এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রশ্নে আমেরিকার সাথে ঐক্যবদ্ধ। 

ভারতের অবস্থান একই জায়গায় আগের মতো করে নেই

ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের প্রাক্তন হাই কমিশনার ও ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর একটা নিবন্ধ বেরিয়েছে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রকাশ করে এমন একটি পত্রিকায়। এতে তিনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটা চিত্র এঁকে, বিভিন্ন ফ্যাক্টর আলোচনা করে সবশেষে বলেছেন, “ঢাকায় যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন ভারত তার সাথে কাজ করবে। তাই বলে কোন হাসিনাবিরোধীকে ভারত বিকল্প মনে করছে, এমন কিছু ভাবা হবে কষ্টকর কল্পনা। অবশ্য হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও তার প্রতি ভারতের সমর্থন অনিবার্য মনে করাটা ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয় – ভারতে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে ক্রমেই এমন অনুভূতিও জোরালো হচ্ছে।” এ থেকে স্পষ্ট একটা বার্তা যায় যে, আগে যেমনই হউক, হাসিনার সবকিছুকেই এ সময়ে ভারত চোখ বন্ধ করে সমর্থন করবে না। 

জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের ‘মৌলবাদের হুমকি’ ও ‘মন্দের ভাল’ তত্ত্ব

মানুষ আওয়ামী লীগকে একেবারেই চাইছে না। প্রতিটি জনবিস্ফোরণ বার্তা রেখে যাচ্ছে, এই সরকারকে তারা মানছে না। কিন্তু বিক্ষুব্ধ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলনে নামাবে এরকম কোন শক্তিও সংগঠিত অবস্থায় এখন উপস্থিত নেই। বিএনপি’র সাংগঠনিক শক্তির ব্যাপারে আমরা আগেই বলেছি। আবার বিএনপি’র ক্ষেত্রে জনগণের মধ্যে এই প্রশ্নও আছে যে, আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি তো ভাল কিছু নয়। তারা ক্ষমতায় গেলেও একই কা- করবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দেশের সম্পদ লুট, প্রাকৃতিক সম্পদকে বহুজাতিক কোম্পানীর হাতে পানির দামে তুলে দেয়া – ইত্যাদি সকল গর্হিত কাজ বিএনপিও করবে। তার দু’বারের দেশ শাসন তাই প্রমাণ করে। দেশের অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল এক অংশকে আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবীরা এসব যুক্তি দেখিয়ে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন। তারা দেখাচ্ছেন যে, আওয়ামী লীগ খারাপ কাজ করছে ঠিক, কিন্তু বিএনপি কোন সমাধান নয়। বিএনপি তো একই কাজ করে। সেও তো আওয়ামী লীগকে একেবারে নিঃশেষ করে দেয়ার পরিকল্পনা করেছিল। দু’জন প্রথম সারির নেতাকে বক্তৃতামঞ্চে হত্যা করেছে, শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে চেয়েছে। আবার বিএনপি’র সাথে মৌলবাদী শক্তিগুলো জড়িত। এরাসহ বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসলে দেশের পরিস্থিতি কী হতে পারে? তাই মন্দের ভাল হিসেবে আওয়ামী লীগই ভরসা। আওয়ামী লীগের ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীরা এই ধরনের তর্ক তুলছেন। আওয়ামী লীগ খুব ভাল দেশ চালাচ্ছে, সেকথা বলার কোন উপায়ই যেহেতু নেই, সেহেতু সরকারের যৌক্তিকতা কিভাবে তুলে ধরা যায় নিরন্তর প্রচেষ্টার মাধ্যমে সেই বাক্যগুলো রচনা করতে মাথার সমস্ত বুদ্ধি খাটাচ্ছেন এই বুদ্ধিজীবীরা।

নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে

গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই সরকারের পতনের সম্ভাবনা এই মুহূর্তে নেই। কারণ কোন একটা নেতৃত্ব আন্দোলনের উপর ক্রিয়া করছে না। সংগঠিত আন্দোলন এখনও সে মাত্রা নিয়ে গড়ে উঠেনি। কিন্তু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটা বড় গোলযোগ দানা বেঁধে উঠতে পারে। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন স্থানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেভাবে সম্ভব হযেছে, জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে তা হবে না  বলে অনেকে মনে করেন। কারণ স্থানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকার কয়েকটি জায়গায় সমস্ত শক্তিকে সংহত করেছে। জাতীয় নির্বাচনের বিস্তৃতির কারণে এটি সম্ভব নয়। সম্ভব না হলে আওয়ামী লীগের পরাজয় নিশ্চিত। আওয়ামী লীগ সেটা কোনমতেই হতে দেবে না। তার পেছনে দাঁড়ানো ভারত সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে যে সকল অবস্থাতেই আওয়ামী লীগ ভারতের সহায়তা পাবে এটা যেন সে না ভাবে। দেশের ভেতরের একচেটিয়া পুঁজিপতিগোষ্ঠীর সাথে কিছু কিছু দ্বন্দ্ব আওয়ামী লীগের হচ্ছে – যা ভেতরের স্তর অতিক্রম করে বাইরেও একটু-আধটু বেরোচ্ছে। যদিও আওয়ামী লীগকে সরানোর ব্যাপারে এদেশের একচেটিয়া পুঁজিপতি গোষ্ঠী কিংবা ভারত সরকার – কেউই সিদ্ধান্ত নেয়ার জায়গায় যায়নি। আবার কিছু চিন্তাভাবনাও তারা যে করছে না তা নয়। কারণ বুর্জোয়া ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে থাকে একদিকে শোষণ, অন্যদিকে প্রতারণা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার উপর। আওয়ামী লীগ নিয়ে জনগণকে আর বিভ্রান্ত করা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ পুরোপুরি উন্মোচিত জনবিরোধী শক্তি। জনগণকে বিভ্রান্ত করতে না পারলে নির্মম দমন-পীড়ন ছাড়া রাষ্ট্রের হাতে আর কিছু থাকে না। সঠিক নেতৃত্ব না থাকার কারণে এখনই কোন অভ্যুত্থান সৃষ্টি হচ্ছে না এটা ঠিক, কিন্তু এভাবে বেশিদিন চলতে পারে না। তাই বুর্জোয়া শ্রেণি আওয়ামী লীগের বিকল্পও ভাবছে। গণমাধ্যমে বারবার ‘এসকেপ রুট’ বলে যে কথাটা আসছে এটা তারই অভিব্যক্তি। অর্থাৎ ক্ষমতা ছাড়লে কোন্ রাস্তা দিয়ে সে বের হবে। তাদের এতদিনের দমন-পীড়নের ফলে সৃষ্ট ও পুঞ্জিভূত ক্ষোভ ক্ষমতা ছাড়া মাত্রই তাদের প্রতি ভয়াবহ প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে। এটা একটা নৈরাজ্যও তৈরি করতে পারে। সেটাও তাদের একটা চিন্তার দিক।

সেজন্য পরবর্তী সরকার গঠনের সময় কোন দলের হাতে যাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা না যায়, ক্ষমতা যাতে বিভাজিত হয়, ক্ষমতার ভারসাম্য যাতে বজায় থাকে – এ ব্যাপারটি নিয়ে এখন বুর্জোয়া নীতি নির্ধারকরা চিন্তিত। একটা আলোচনা এই সময়ে এসেছে। কামাল হোসেন-বদরুদ্দোজা-মান্নাদের সাথে বিএনপি’র একটা ঐক্য হতে যাচ্ছে। এতে মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদের সাথে আনোয়ার ইব্রাহিমের ঐক্য যে প্রক্রিয়ায় হয়েছে, সে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ একটা চুক্তি হবে নির্বাচনের আগে, সেই চুক্তি অনুসারে প্রথম আড়াই বছর প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ পাবেন কামাল হোসেন-বদরুদ্দোজা-মান্নাদের মধ্য থেকে, বাকি আড়াই বছর পাবেন বিএনপি থেকে। এ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় একটা ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হবে। এই রাস্তাটি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্রিয়াশীল হতে পারে। 

এ না হলে এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতা না ছাড়লে বা বুর্জোয়ারা বিকল্প রাস্তাকে ক্রিয়াশীল করতে না পেরে আওয়ামী লীগকে রাখার চিন্তা করলে এবং জনঅসন্তোষের মাত্রা এই প্রকারে বৃদ্ধি ঘটতে থাকলে দেশে যে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হবে, সেটাকে মোকাবেলা করার জন্য আওয়ামী লীগ সেনাবাহিনীকে মাঠে নামিয়ে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করতে পারে। সেনাবাহিনীর মধ্যে প্রয়োজনীয় রদবদল এরমধ্যেই তারা সেরে নিয়েছে। এটি আরও ভয়াবহ মাত্রার দমন-পীড়নের পথ এবং ইতিহাস প্রমাণ করে এই পথের শেষ সমূলে পতনের মধ্য দিয়েই ঘটে।

এই অবস্থা তৈরি হওয়া ঠেকাতে দেশের সবগুলো বিরোধী শক্তি, যারা এই মূহুর্তে সংগঠিত নয়, বিভিন্নভাবে সংগঠিত হয়ে মাঠের লড়াইয়ে নামবে কি? কারণ সবার জন্যই একটা চূড়ান্ত পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার দিকে দেশ যাচ্ছে এবং চূড়ান্ত সময় প্রায় উপস্থিত। 

আমাদের করণীয়

আমরা বামপন্থী দলগুলোকে সবসময় আহবান করে এসেছি নির্বাচনের মোহ ত্যাগ করে আন্দোলনমুখী হওয়ার জন্য। বামপন্থীরা বিভিন্ন ঘটনাতে প্রতিক্রিয়াধর্মী কর্মসূচী পালন করেন, কিন্তু কোন একটা ইস্যু ধরে ধীরে ধীরে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলার দিকে তাদের তেমন নজর নেই। তাদের সংখ্যা অল্প এটা ঠিক, আবার একটা গন্ডি ভেঙে, ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যমও তেমন লক্ষ্য করা যায় না। এ সময়ে একদিকে যেমন প্রচন্ড রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উপর দমন-নিপীড়নও হচ্ছে ভয়াবহ মাত্রায়। এই অবস্থায় স্থিরভাবে কোন একটা ইস্যু ধরে একটু একটু করে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করলে জনগণের মধ্যে যে মনোভাব এখন আছে তাতে ভাল ফল পাওয়া যেতো। বামপন্থীরাই জনগণের সত্যিকারের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারতো। কিন্তু সেটা এখনও ঘটেনি। নির্বাচন নিয়ে বামপন্থীরা এখনও মগ্ন। বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা এক ব্যাপার আর বাস্তব পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করে একটু একটু করে বিপ্লবী শক্তি সৃষ্টি করা আরেক ব্যাপার। এই ব্যাপার ধরতে না পারলে অস্থিরতা আসে, রাতারাতি কিছু করে ফেলার চিন্তা আসে। কোন বিপ্লবী শক্তি রাতারাতি কিছু করতে পারে না। দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন ছাড়া মানুষের ভরসার জায়গায় আসতে পারে না। বামপন্থীরা মানুষের ভাবনায় আছে, কিন্তু বাস্তব সাংগঠনিক অবস্থানে নেই। এই অবস্থান এর সাথে-তার সাথে জোট করে, পত্রিকার খবর হয়ে আসতে পারে না, নির্বাচনের জাঁক দেখিয়েও আসতে পারে না। এরজন্য স্থায়ী ও জঙ্গী গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবেই। সেই আন্দোলনের রাস্তায় অনেকের সাথেই ঐক্য হতে পারে, কিন্তু একটা লোক দেখানো ঐক্যের কোন মানে নেই। 

এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ৮টি বামপন্থী দল মিলে ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’ গঠন করা হয়েছে। কিন্তু জোটের কেউ কেউ এখনও নির্বাচনকেই তাদের ধ্যান-জ্ঞান করে রেখেছেন। তাদের যে সকল খবরাখবর পত্রিকায় আসে সেখানেও প্রার্থী, কেন্দ্র – এই কথাগুলোই কেবল শোনা যায়। সাংবাদিকদের সাথে জোট নিয়ে যখন তারা আলোচনা করেন তখনও তাকে তারা ভোটের আলোচনার দিকে নিয়ে যান। এই উপসর্গগুলো বজায় থাকলে এই জোটও কার্যকর কিছু দাঁড় করাতে পারবে না। তবে জোটের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি নিয়ে ধারাবহিক কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। একটা ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলার শক্তি হিসেবে এই জোট দাঁড়াতে পারলে মানুষ এই অন্ধকারে ক্ষীণ হলেও একটা আলোর রেখা দেখতে পাবে।

একইসাথে কামাল হোসেন-বদরুদ্দোজাদের সাথে বিএনপি’র যে ঐক্য হতে চলেছে, তারা কাকুতি-মিনতি করে কিছুই করতে পারবেন না। নির্বাচন আপাত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হলেও আন্দোলন করতে হবে। সবাই মিলে যদি বাম গণতান্ত্রিক জোট উত্থাপিত শর্তগুলো পূরণ না করা পর্যন্ত নির্বাচন সংঘটিত হতে না দেয়ার দাবি তুলে অর্থাৎ –

১. নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পূর্বে বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করে সব দল ও সমাজের অপরাপর মানুষের মতামতের ভিত্তিতে ‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তদারকি সরকার’ গঠন করতে হবে।

২. নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পূর্বে বর্তমান জাতীয় সংসদ ভেঙে দিতে হবে।

৩. জনগণের আস্থাহীন সরকারের অনুগত বর্তমান নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে।

৪. সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রবর্তনসহ টাকার খেলা ও পেশীশক্তিনির্ভর বিদ্যমান গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে। 

এই দাবিগুলো নিয়ে যদি বিএনপি-কামাল হোসেন-বদরুদ্দোজাসহ সমস্ত বিরোধী দল আন্দোলনে নামেন, তাহলে রাজনৈতিক চিত্র ভিন্ন হতে পারে। রাস্তার সাহসী ও সংগ্রামী আন্দোলনের জোয়ারে বামপন্থীদেরও তখন ঐক্যের ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে হতে পারে; তবে সেটা আন্দোলনে নামার পরই, তার আগে নয়।

সাম্যবাদ অক্টোবর ২০১৮

Check Also

cach-mang-tu-san-anh

বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রসঙ্গে

বিভিন্ন বুর্জোয়া রাষ্ট্রের সংবিধানের তুলনামূলক চুলচেরা বিচারে, প্রচুর ফারাক থাকা সত্ত্বেও সকল দেশেই বুর্জোয়ারা এটা …