Breaking News

বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রসঙ্গে

cach-mang-tu-san-anh

বিভিন্ন বুর্জোয়া রাষ্ট্রের সংবিধানের তুলনামূলক চুলচেরা বিচারে, প্রচুর ফারাক থাকা সত্ত্বেও সকল দেশেই বুর্জোয়ারা এটা সাধারণভাবে মেনে নিয়েছিল যে তাদের সংবিধানের ‘মূল কাঠামো’ সব অবস্থাতেই অলংঘনীয় ও অপরিবর্তনীয়। আর এ অভিমতের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই তারা একদিন বলেছিল,“পার্লামেন্ট সংবিধানের যে-কোন অংশের পরিবর্তন বা সংশোধন করতে পারে, তবে সেটা একটা বিধিনিষেধ মেনে নিয়েই করতে পারে, আর তা হল, পার্লামেন্ট কখনো কোন অবস্থাতেই সংবিধানের ‘মূল কাঠামো’তে কোন পরিবর্তন বা সংশোধন করতে পারবে না।” এ প্রসঙ্গে কিছুটা  পুনরাবৃত্তি হলেও, বুর্জোয়াদের সংবিধানে তাদেরই স্বীকৃত ‘মূল কাঠামো’র একটি বিশেষ অংশের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। বিভিন্ন দেশের বুর্জোয়া রাষ্ট্রের সংবিধানে তুলনামূলক বিশদ বিচারে বহু পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সব দেশেই বুর্জোয়ারা-অবশ্যই তাদের চিন্তাধারার ভিত্তি অনুযায়ী, কয়েকটি মানবিক ‘অধিকার’কে অলংঘনীয় বলে মনে করেছে। কোথাও তারা এক মৌলিক মানবিক অধিকার (fundamental rights) বলে বর্ণনা করেছে, আবার কোথাও হয়ত তাকে ‘অধিকার সনদ’ বলে অভিহিত করেছে। তারা এ মানবিক অধিকারগুলোকে (human rights) তাদের সংবিধানের ‘মূল কাঠামো’র অন্তর্গত হিসাবে অপরিবর্তনীয় ও অলংঘনীয় বলেই শুধু মনে করেনি, পাছে কোথাও এই অধিকারের উপর অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ ঘটে এই আশঙ্কায় এক রক্ষণাবেক্ষণের যথাযথ অধিকার ও দায়িত্ব তারা বিচার বিভাগের হাতে অর্পণ করেছে।

এই কারণেই বিষয়টি বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে যে, একদিন বুর্জোয়ারা যে অধিকারগুলোকে অলংঘনীয় বলে মনে করতো, পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী জগতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে আজ সেই অধিকারগুলোই তার প্রথম বলিতে পরিণত হচ্ছে। 

বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ঊষালগ্নে বুর্জোয়ারা তাদের গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনাকে বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে, তাদের লিখিত বা অলিখিত যাই হোক না কেন, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচারকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে কতকগুলো মানবিক অধিকার যেমন চিন্তার স্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সাম্য, নাগরিক মাত্রের সমান সুযোগ, ধর্মের প্রতি আস্থা-অনাস্থার সমান অধিকার, ইত্যাদির স্বীকৃতি দিতে সচেষ্ট হয়েছিল। এই মানবিক অধিকারগুলোকে তাদের সংবিধানের অপরিবর্তনীয় ‘মূল কাঠামো’র অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করা-তাদের যুক্তিতে এর একমাত্র উদ্দেশ্যই হলো, কতকগুলো মানবিক অধিকার, যেমন, জীবন ধারণের অধিকার (Right to life) ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের অধিকার ইত্যাদিকে প্রশাসন বা অন্যান্য রাষ্ট্রযন্ত্রের হস্তক্ষেপের আওতার বাইরে এনে তাকে আইনগত বিধি নিয়মের (Legal principle) অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত করা, যার ফলে এগুলো একমাত্র বিচারবিভাগের তত্ত্বাবধানের বিষয়বস্তুতে পরিণত হতে পারে। বুর্জোয়ারা তখন এমন উক্তিও করেছিল যে এমনকি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচকমন্ডলী কর্তৃক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত পার্লামেন্টকেও সকল সময় মানবিক অধিকারের নিরাপদ রক্ষক মনে না করার যথেষ্ট কারণ থাকতে পারে। আর পার্লামেন্টের হস্তক্ষেপ ও প্রশাসনের আগ্রাসনের বিপদকে প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যেই এই মানবিক অধিকারগুলো রচিত হয়েছিল। বুর্জোয়ারা তখন এই মানবিক অধিকারগুলোকে অলংঘনীয় বলেই মনে করত। একজন বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞের অভিমত হলো,“...We all believe and that is the implication of fundamental rights that man has certain rights that are inalienable and cannot be questioned by any humanily constituted legislative authority…”  অর্থাৎ আমরা সবাই বিশ্বাস করি এবং মানবিক অধিকারের তাৎপর্যই হল এই – মানুষের কতকগুলো অধিকার আছে যা অলংঘনীয়, এবং মনুষ্য সৃষ্ট কোন আইন-সংসদের তা নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার নেই।

অপর একজন এ অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন,“ Nothing is then unchangeable but the inherent and inalienable rights of man.” (Jefferson) অর্থাৎ জন্মগত, এবং যা অলংঘনীয় এমন মানবিক অধিকারগুলো ছাড়া আর কোন কিছুই অপরিবর্তনীয় নয়। এই অধিকারগুলোকে সংবিধানের অন্তর্গত করার স্বপক্ষে যে অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছিল তা হল, “If they are incorporated into the constitution, independent tribunals of justice will consider themselves in a peculiar manner, the guardians of those rights; they (The Court)  will be an impenetrable bulwark against every assumption of power in the Legislative or Executive, They will be naturally led to resist every enroachment upon rights expressly stipulated for in the constitution by the declaration of rights.” (James Madison) অর্থাৎ এই অধিকারগুলো যদি সংবিধানে লিপিবদ্ধ করা হয় তাহলে স্বাধীন বিচারালয় নিজেদের বিশেষভাবে ঐ অধিকারগুলোর অভিভাবক হিসাবে বিবেচনা করবে, এরা (আদালতসমূহ) বিধান সংসদ (Legislative) অথবা প্রশাসন কর্তৃক দখল করা সমস্ত ক্ষমতার দুর্ভেদ্য প্রাকারে পরিণত হবে, এবং স্বভাবতই যে অধিকারগুলো সাংবিধানিক ঘোষণার দ্বারা চূড়ান্ত শর্ত হিসাবে গৃহীত, তার সীমা লঙ্ঘনের সকল প্রচেষ্টাকেই বাধা দেবে। 

যে সকল দেশে এই মানবিক অধিকারগুলো, ‘অধিকার সনদ’  হিসাবে স্বীকৃত, সে সকল দেশেও এ অধিকারগুলোকে লিখিত ধারা হিসাবে সংবিধানের অন্তগর্ত করার স্বপক্ষে এ অভিমতই পোষণ করা হয়েছিল যে, “It must be conceded that there are such rights in every free government beyond the control of the state. A government which recognises no such rights, which held the lives, the liberty and the property of its citizen subject as all times to the absolute disposition and unlimited control of even the most democratic depository of power is after all but a despotism. It is a despotism of the majority, if you choose to call it so. But it is nonethless despotism.” (Justice miller)

আবার জাস্টিস জ্যাকসনের বক্তব্য হল,“The very purpose of a Bill of rights of was to withdraw certain subjects from the vicissitudes of political controversy, to place them beyond the rich of majorities … and to establish them as legal principles to be applied by the courts. One’s right to life, liberty and property to free speech, a free press, freedom of worship and assembly and other fundamental rights may not be submitted to to the vote, they depend on the outcome of no election.” অর্থাৎ এটা অনস্বীকার্য যে, ‘মুক্ত’ শাসনতন্ত্রে, রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণাধীন নয় এমন কতকগুলো অধিকার আছে। যে শাসনতন্ত্র এ অধিকারকে স্বীকার করে না এবং নাগরিকদের জীবন, সাহিত্য ও সম্পত্তিকে, সর্বসময়, এমনকি সর্বাধিক গণতান্ত্রিক শাসন ক্ষমতারও সীমাহীন নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার অধীনে আবদ্ধ রাখে, সে স্বৈরতন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। এটা ঠিক, একে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্র যদি কেউ বলতে চায় তো বলতে পারে, কিন্তু এটা স্বৈরতন্ত্র ছাড়া কিছু নয়। বিচারপতি জ্যাকসন-এর মত হল,‘অধিকার সনদের’ যথার্থ উদ্দেশ্যই হল রাজনৈতিক বিরোধ তথা উত্থান-পতনের গ-ির থেকে কতকগুলো বিষয়কে সরিয়ে নিয়ে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের নাগালের বাইরে রাখা … এবং তাদের বিচারবিভাগের প্রয়োগাধীন আইনগত নিয়মবিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ব্যক্তির জীবনধারণের অধিকার, তার স্বাধীনতা, সম্পত্তি বা তার বাক-স্বাধীনতা, ধর্মবিশ্বাসের অধিকার, সভা-সমাবেশ করার বা অন্যান্য মৌলিক অধিকারগুলোকে ভোটাভুটির আওতায় রাখা যেতে পারে না। এগুলো নির্বাচনী ফলাফলের উপর নির্ভরশীল হতে পারে না। 

কোন এক সময় Dean Roscoe Pound  মন্তব্য করেছিলেন, “The guarantees of liberty … are not … exhortions as to how Government should be carried on or its agencies will operate.They are percepts of the law of the land backed by the power of the courts of law to to refuse to give effect to legislative or executive acts in derogation thereof …Any considerable infringement of guaranted individual or minority rights appears to involve much more than overriding a pronouncement of political ethics in a political instrument. It involves defiance of fundamental law, overthrow of established law upon which the maintenance of the general security rests.” অর্থাৎ, সরকার বা সরকারি যন্ত্র কীভাবে শাসনকার্য চালাবে, স্বীকৃত ব্যক্তিস্বাধীনতা বা মানবিক অধিকারগুলো তার অনুরোধলিপি নয়। এগুলো দেশের আইন স্বীকৃত নীতিবিশেষ এবং বিধান সংসদ বা প্রশাসনের এদের বিরুদ্ধে কোন হানিকর প্রচেষ্টাকে কার্যে রূপায়িত করার ক্ষেত্রে, বিচারালয়ের বাধাদানের আইনসম্মত ক্ষমতার দ্বারা এ অধিকারগুলো সমর্থিত। এদের বিন্দুমাত্র খর্ব করাটা যে-কোন রাজনৈতিক যন্ত্রের ঘোষিত কোন রাজনৈতিক নীতিকে অগ্রাহ্য করার চাইতেও মারাত্মক। এ কাজ মৌলিক নীতিকে পদদলিত করা ও সর্বসাধারণের নিরাপত্তা যাকে অবলম্বন করে রয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠিত আইনকে ভূপতিত করার সামিল। 

আর এই লক্ষ্যবস্তুকে বাস্তবে রূপায়িত করার উদ্দেশ্যে বুর্জোয়ারা ঘোষণা করেছিল যে, যদি কোন আইন মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে সেটা বাতিল বলে গণ্য হবে এবং এ রকম কোন আইনকে বাতিল ঘোষণা করার প্রয়োজনীয় ক্ষমতা বিচার বিভাগের হাতে থাকবে। যে সকল বুর্জোয়া রাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত কোন সংবিধান ছিল না এবং সে কারণে স্বাভাবিকভাবে মৌলিক অধিকারের ওপর তাদের কোন লিখিত সাংবিধানিক ধারা (Constitutional Code) ছিল না। সকল রাষ্ট্রে ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানবিক অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ইত্যাদি অধিকারগুলো দেশের সাধারণ আইনের দ্বারা (Common law of the land) স্বীকৃত, বিচার বিভাগের মতামতের দ্বারা দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত ও ‘হেবিয়াস করপাস’ আইনের সাহায্যে দৃঢ়ভাবে সমর্থিত ও প্রসারিত ছিল, এবং সে অর্থে এ অধিকারগুলোকে সে দেশের বুর্জোয়ারা তাদের সংবিধানের (অলিখিত) অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই গণ্য করত। একসময় বুর্জোয়াদের জগতে একটা প্রবাদ প্রচলিত ছিল যে, “The habeas Corpus Acts declare no principle and define no rights but they for practical purpose worth a hundred constitutional articles guaranteeing industrial liberty.” (Dicey) অর্থাৎ হেবিয়াস করপাস আইন কোন নীতি ঘোষণা করে না, বা কোন অধিকারের সংজ্ঞাও নিরূপণ করে না, কিন্তু উদ্দেশ্য সাধনের অভিপ্রায় হিসেবে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এ আইন, ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সংরক্ষণ করে এমন একশত (লিখিত) সাংবিধানিক ধারার চাইতেও বেশি মূল্যবান। 

কোন একটি প্রখ্যাত বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বুর্জোয়ারা তাদের সংবিধান রচনাকালে প্রস্তাবনা হিসেবে ঘোষণা করেছিল যে, “Men are born and always continue, free and equal in respect of their rights. The end of all political associations is the presentation of the natural and imprescriptible rights of man, and these rights are liberty, property, security and resistance of oppression.”  অর্থাৎ অধিকারের প্রশ্নে সব মানুষ তার জন্ম থেকেই সর্বদা স্বাধীন ও সমান। সমস্ত রাজনৈতিক সমিতির লক্ষ্যই হল এই সহজাত, এবং অধ্যাদেশযোগ্য নয় (imprescriptible) এমন মানবিক অধিকারগুলোকে রক্ষা করা, আর এই অধিকার গুলো হল স্বাধীনতা, সম্পত্তি, নিরাপত্তার অধিকার এবং অত্যাচারকে প্রতিরোধের অধিকার। এখন, যেহেতু সাংবিধানিক প্রস্তাব আইনগত বাধ্যতার পর্যায়ে পড়ে না, বুর্জোয়ারা সে কারণে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্যে তাদের সংবিধানে উপযুক্ত ধারা সংযোজন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল এবং যেহেতু ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর সরকারি কুঠারাঘাতের অন্যতম নগ্ন প্রকাশ ঘটত অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার ও আটক করার মধ্য দিয়ে, সে কারণে অন্যান্য ধারার সঙ্গে তারা একটি ধারা যুক্ত করল – যার বয়ান অনুসারে,“No one may be arbitrarily detained. The judicial authority, the guardian of individual liberty shall ensure the respect of this principle under the conditions stipulated by law.” অর্থাৎ কিনা, কাউকে খেয়ালখুশি মাফিক যথেচ্ছভাবে আটক করে রাখা চলবে না। ব্যক্তিস্বাধীনতার অভিভাবক তথা রক্ষক, বিচার বিভাগ, আইনের শর্তানুসারে এ নীতি যাতে মানা হয় সেটা নিশ্চিত করবে। 

ইতিহাসের এটা এমন একটা যুগ যখন বুর্জোয়ারা দ্বিধাহীন ভাষায় বলতো, “…Constitutional liberties – freedom of the person and of association, equality before the law and liberty of expression – precede and are the conditions of economic advance and social security – both of which are largely the result of constitutional freedom and cannot be obtained without them. That is why those who throw away constitutional safeguards – elected governments, freedom to oppose, independent courts – in the name of economic advance are ultimately betraying the common man and depriving him of the chance of social progress and the very things they promise him…They are the real class traitors – because in the end they impose themselves as masters of those before him whom they parade themselves as liberators.” (Hailsham) অর্থাৎ, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সভা-সমিতি সংগঠিত করার স্বাধীনতা, আইনের চোখে সকলের সাম্য ও বাকস্বাধীনতা – সংবিধান প্রদত্ত এই স্বাধীনতার অধিকারগুলো অর্থনৈতিক উন্নতির শর্ত ও সামাজিক নিরাপত্তার শর্ত এবং তার পূর্বসূরী – আর এ দুটি বিষয়ই অনেকাংশে সংবিধান প্রদত্ত স্বাধীনতার ফলশ্রুতি এবং এ স্বাধীনতা ব্যতিরেকে অর্থনৈতিক উন্নতি ও সামাজিক নিরাপত্তা অর্জন করা সম্ভব নয়। সে কারণে যারা অর্থনৈতিক প্রগতির নামে নির্বাচিত সরকার, বিরোধীমত প্রকাশ করার স্বাধীনতা ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা – এই জাতীয় সংবিধানগত রক্ষাকবচগুলিকে বর্জন করে, তারা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং সামাজিক প্রগতি ও অন্যান্য যে সকল বিষয়ে তারা সাধারণ মানুষের কাছে অঙ্গিকারবদ্ধ, তা থেকে তাদের বঞ্চিত করে। এরাই যথার্থ শ্রেণীশত্রু – কারণ যাদের কাছে এরা নিজেদেরকে মুক্তিদাতা হিসাবে জাহির করে, পরিণামে এরা সেই তাদেরই প্রভু হয়ে বসে।

উন্নত বা অনুন্নত সকল পুঁজিবাদী রাষ্ট্রেই বিশেষ করে তাদের রাষ্ট্র কাঠামোয় আজ বিভিন্নরূপে ফ্যাসিবাদের প্রকাশ ঘটছে

এখন, ইতিহাসের ছাত্রমাত্রেই জানেন যে, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ঊষাকাল চিরকাল টিকে থাকেনি এবং থাকা সম্ভবও নয়। অতিদ্রুত ইতিহাসের ধারাকে অনুসরণ করেই, সামাজিক বিকাশের এক বিশেষ স্তরে এসে প্রাক-একচেটিয়া পুঁজিবাদ, একচেটিয়া পুঁজি ও লগ্নিপুঁজির জন্ম দিল। আজকের যুগের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ মার্কসবাদী-লেনিনবাদী চিন্তানায়ক, আমাদের প্রিয় শিক্ষক ও নেতা, কমরেড শিবদাস ঘোষ অপূর্ব বিশ্লেষণসহ দেখিয়েছেন আজকের যুগে কীভাবে একচেটিয়া পুঁজিবাদ গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাদী অর্থনীতির এই তৃতীয় তীব্র সাধারণ সংকটের যুগে বুর্জোয়ারা, তাদের সংকট জর্জরিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা ও তার থেকেই সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করার উদ্দেশ্যে, রাষ্ট্র পুঁজি ও একচেটিয়া ব্যক্তিপুঁজির সমন্বয় সাধন ও রাষ্ট্রকে একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থরক্ষাকারী গোলামে পর্যবসিত করে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া পুঁজিবাদ – যেটা ফ্যাসিবাদের অর্থনৈতিক ভিত্তিপ্রস্তর, তার জন্ম দিচ্ছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যখন ফ্যাসিবাদের লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে উপরোক্ত অর্থনৈতিক কেন্দ্রীকরণের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তখন এরই প্রকাশ পরিলক্ষিত হচ্ছে রাষ্ট্রের হাতে রাজনৈতিক শক্তির নিরঙ্কুশ কেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে। এটা বিশেষ বিচার্য বিষয় নয় যে ফ্যাসিস্টরা ঠিক কোন বিশেষ ধরনের সরকার বা শাসনযন্ত্রের মাধ্যমে দেশকে শাসন করে, কারণ তা দেশের অবস্থার ওপর নির্ভর করে। যে বিশেষ ধরনের সরকার বা শাসনযন্ত্রই প্রতিষ্ঠা হোক না কেন, উদ্দেশ্য সর্বক্ষেত্রেই এক, অর্থাৎ কি না, বিশ্ব পুঁজিবাদ-সা¤্রাজ্যবাদের বর্তমান চূড়ান্ত অর্থনৈতিক সংকটের যুগে নিজেদের সঙ্কট জর্জরিত পুঁজিবাদী অর্থনীতি তথা রাষ্ট্রকে রক্ষণাবেক্ষণ করা, এক কথায় তাকে টিকিয়ে রাখা। এ প্রসঙ্গে আমাদের প্রিয়তম শিক্ষক ও নেতা, কমরেড শিবদাস ঘোষ যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন তা স্মরণীয়। কমরেড ঘোষ বলেছেন যে, সমস্ত অগ্রসর ও অনগ্রসর পুঁজিবাদী-সা¤্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্রেই, বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন বাস্তব পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে, বিভিন্ন রূপে, পূর্বের চাইতে অনেক বেশি লক্ষণীয়ভাবে আজ ফ্যাসিবাদের প্রকাশ ঘটছে।

সুতরাং ফ্যাসিবাদ ইতিহাসে তার প্রথম আবির্ভাবকালে ইতালি ও জার্মানিতে যে একদলীয় স্বেচ্ছাচারী শাসনের (one party totalitarian rule) রূপ নিয়েছিল, আজও সকল বুর্জোয়া রাষ্ট্রেই সেই রূপই যে তাকে নিতে হবে, এমন কোন কথা নেই। আর সে কারণেই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ফ্যাসিবাদ আজ বিভিন্ন বুর্জোয়া রাষ্ট্রে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের শাসনতন্ত্র তথা প্রশাসনের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করছে ও সংহত রূপ নিচ্ছে। কোথাও হয়ত প্রধানমন্ত্রী কেন্দ্রিক ওয়েস্ট মিনিস্টার ধরনের সরকার (West Minister form of government) সহ তথাকথিত দ্বিদলীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে, যদিও এই দুটি দলই একচেটিয়া পুঁজিবাদের বশংবদ ও নির্ভরশীল দলই হয়ে থাকে। আবার যেখানে প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে শাসনযন্ত্রের সেই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি দখল করে আছেন রাষ্ট্রপতি, সেখানে তার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ ঘটছে। অনগ্রসর পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে, যেখানে পুঁজিবাদের উচ্চ পর্যায়ের বিকাশ না ঘটায় ও পুঁজির অসম বিকাশের ফলে পুঁজিপতিরা স্থানীয় (regonal) ভিত্তিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে আছে, সে সকল রাষ্ট্রে তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের (multi party democracy) মাধ্যমেই ফ্যাসিবাদের বিকাশ ঘটছে। বলাই বাহুল্য যে, এই তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্র আর পুঁজিবাদের বিকাশের যুগের বহুদলীয় গণতন্ত্র মোটেই এক নয়।

সুতরাং রাষ্ট্র তথা শাসনযন্ত্রের অবয়বের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের মধ্যে যে পার্থক্যই থাকুক না কেন, আজকের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসনযন্ত্র মাত্রই ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রতিলিপি ছাড়া আর কিছু নয়।   

[লেখাটি ভারতের এসইউসিআই (সি) প্রকাশিত ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রসঙ্গে’ পুস্তিকা থেকে অংশবিশেষ সংকলিত]

সাম্যবাদ অক্টোবর ২০১৮

Check Also

IMG_6680

সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ষড়যন্ত্রে নিজ দেশে পরবাসী লাখো ভারতীয়

ভারতের আসাম রাজ্যে মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ মুসলিম। অর্থ্যাৎ প্রতি তিনজনে একজন মুসলিম। ভারতের জম্মু …