ভারতে সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ হত্যা — ধর্মীয় উগ্রতা লুপ্ত করছে মনুষ্যত্ব-মানবিকতা

journalist_835x547_1785483_835x547-m

হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছেন ভারতের বিশিষ্ট সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ। গত ৫ সেপ্টেম্বর বেঙ্গালুরু শহরের রাজরাজেশ্বরী এলাকায় নিজ বাড়ির দরজায় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি ছিলেন আরএসএস-বিজেপিসহ উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের কঠোর সমালোচক, মুক্ত চিন্তা ও যুক্তিবাদের সমর্থক। লঙ্কেশ তার পত্রিকার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সপক্ষে এবং বিজেপি’র দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদের বিপক্ষে মতামত প্রকাশ করতেন। এছাড়া তিনি হিন্দু ধর্মের দলিত (নিম্ন বর্ণের লোক) ছাত্রআন্দোলন সমর্থন করতেন। বিজেপি নেতাদের দুর্নীতির বিষয়ে বিভিন্ন খবর তিনি তার সম্পাদিত কাগজে প্রকাশ করেছেন। নির্ভীক এবং স্পষ্টভাষী হিসাবে তিনি ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীল সঙ্ঘ পরিবারের চক্ষুশূল।

ভারতের প্রবল প্রতিক্রিয়াশীল বিজেপি সরকার হিন্দুত্ববাদী চিন্তা উস্কে দিয়ে ভারতের জনগণকে বিভক্ত করছে প্রতিদিন। একটি দেশে বিভিন্ন ধর্মের লোক বাস করে। তারা প্রত্যেকে অপরের ক্ষতি না করে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে — এটাই একটি গণতান্ত্রিক দেশের রীতি। এর বদলে যদি দেশের বেশিরভাগ মানুষ যে ধর্মের লোক সেই ধর্মীয় অনুভূতিকে ধ্বংসাত্মক পথে উস্কে দেয়া হয়, তবে অনেক সাধারণ মানুষ ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে এতে যুক্ত হয়ে পড়ে। মানুষ তখন আর মানুষ থাকে না। প্রচন্ড উগ্রতায় নিজের ধর্মকেই শ্রেষ্ঠ মনে করে অন্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সুযোগ সন্ধানী রাজনীতিবিদরা তখন এসব ঘটনা থেকে নিজেদের ফায়দা তুলেন। রাষ্ট্রের ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে এবং প্রকৃতপক্ষে গোটা দেশ নিয়ন্ত্রণ করে যে পুঁজিপতিশ্রেণি, তারাই একেবারে মেপে মেপে হিসেব করে এই সকল ঘটনা ঘটায়।

সম্প্রতি ভারতে গরুর মাংস বহন করার কারণে গণপিটুনি খেয়ে স্টেশনে মারা গেছে এক তরুণ। বাসায় গোমাংস রাখার দায়ে গ্রামবাসী মিলে খুন করেছে, কিংবা গরু পাচারকারী সন্দেহে পিটিয়ে মেরেছে —  এমন ঘটনা তো অহরহ। ধর্মীয় গোঁড়ামি আর কুসংস্কার কত গভীর হলে গরুর জন্য মানুষ কেঁদে অস্থির হয় আর মানুষকে কীটপতঙ্গের মতো হত্যা করে — তা আমরা এতদূর থেকেও বুঝতে পারি।

ভারতের শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীসহ প্রগতিশীল দলসমূহ ক্রমান্বয়ে ঘটে চলা এ সকল ঘটনার প্রতিবাদ করছেন, সরব হয়ে উঠেছেন। অনেকেই রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ফেরত দিয়েছেন, রাস্তায় নেমেছেন। গোটা ভারত আজ প্রতিবাদমুখর। নৈতিক এবং রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য একজন প্রবীণ সাংবাদিকের প্রাণ হারানোর ভয়ংকর ঘটনা ভারতের নাগরিক সমাজকে আন্দোলিত করে তুলেছে। গৌরী লঙ্কেশের আগে একই কায়দায় হত্যা করা হয়েছে মহারাষ্ট্রের নরেন্দ্র দাভোলকর (২০১৩) ও গোবিন্দ পানসারে (২০১৫) এবং কর্নাটকের এমএম কালবুর্গিকে (২০১৫)। এঁরা প্রত্যেকেই হিন্দুত্ববাদীদের কঠোর সমালোচক ছিলেন। এঁদের হত্যাকারীরা মোটরসাইকেলে করে এসে হামলা করেছে। প্রতিটি হত্যাকা-ে একই ধরনের বুলেট ব্যবহার করা হয়েছে। ‘রাষ্ট্রবিরোধিতার’ অভিযোগে খুনের হুমকি দেয়া হয়েছে সাংবাদিক সাগরিকা ঘোষ, লেখিকা শোভা দে, অরুন্ধতী রায়, কবিতা কৃষ্ণণ ও শেহলা রশিদকে।

বাংলাদেশের অনেক লোকই হিন্দুত্ববাদীদের এই কাণ্ডের বিরোধী। কিন্তু আমাদের দেশের কী অবস্থা? একের পর এক হত্যাকান্ড কি এদেশেও ঘটছে না? যারা নিহত হয়েছেন তাদের সকলের সকল বক্তব্যের সাথে আমরা একমত নই, তাদের মত প্রকাশের ধরন নিয়েও কথা থাকতে পারে, কিন্তু মতের ভিন্নতা থাকলেই তাকে মেরে ফেলতে হবে?

অথচ হত্যা করা হচ্ছে। একদিকে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা এই কাজ করছেন, আরেকদিকে রাষ্ট্রও একই কাজ করছে। মতের ভিন্নতা হলে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, গুম করে দেয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী এসবে কীভাবে জড়িত তা প্রকাশ্যে এসেছে। তারপরও এর কোনো পরিবর্তন ঘটছে না।

ভারত এবং বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে মাত্রাগত ভিন্নতা থাকলেও স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর এবং বিরোধী চিন্তার ওপর আক্রমণের ধরন একই। আসলে শুধু এ দুই দেশে নয়, গণতান্ত্রিক বলে পরিচিত ইউরোপ-আমেরিকাসহ গোটা দুনিয়া জুড়েই ভিন্ন মতের ওপর হামলা ও আক্রমণের ধরন এক। ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্র-সমাজ সর্বত্রই একটা মনোভাব প্রবল হচ্ছে — কোনো সমালোচনা করা যাবে না, বিরোধিতা করা যাবে না। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই মনোভাব ও শাসন পদ্ধতিকে আমরা ফ্যাসিস্ট হিসাবে আখ্যায়িত করে থাকি। সমস্ত গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনার মানুষ আজ এই উগ্রতা ও ফ্যাসিস্ট প্রবণতার উত্থানে শঙ্কিত। মানুষ ভাবছে, এই উগ্রতার অবসান কীভাবে হবে? বাংলাদেশে রাষ্ট্রশক্তি প্রয়োগ করে মৌলবাদী শক্তিকে মোকাবেলা করার একটা প্রচেষ্টা আমরা দেখছি। এ প্রচেষ্টা সমাজ মনন থেকে মৌলবাদী ফ্যাসিস্ট মনন কি দূর করতে পারছে? না। বরং এই মনন ক্রমাগত বাড়ছে।

তাহলে উপায় কী? উপায় হলো, এসব হত্যাকান্ড বা আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো, বিচার আদায় করার জন্য রাষ্ট্রের ওপর চাপ প্রয়োগ করার পাশাপাশি সমাজে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ গড়ে তোলার অন্দোলন জোরদার করা। গণতান্ত্রিক চিন্তা যতটুকু আছে তা প্রসারের জন্য চেষ্টা করা। অজ্ঞতা, কূপমন্ডূকতা, উগ্রতার হাতে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি-মানবিক মূল্যবোধকে ছেড়ে দেয়া যায় না।

সাম্যবাদ অক্টোবর ২০১৭

Check Also

soviet

সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে সাতটি কল্প কাহিনী — স্টিভেন গাউন্স

২২ বছর পূর্বে ১৯৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায়; মার্কসবাদের …