Breaking News

যারা দিল সবই, পেল না কিছুই

_17

ভোর সাড়ে ৪টা। পাখিরা তখনো জেগে ওঠেনি। শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে সাবিনাকে বিছানা ছাড়তে হলো। দ্রুত রান্না ও গোসল সারতে হবে। ৪ রুমের ২৪ জনের জন্য একটি টয়লেট ও দুটি চুলা। যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র। দেড়-দুই কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে কারখানায় পৌঁছুতে হবে। তারপর চলবে দম বন্ধ করা আবেগ-অনুভূতিহীন রোবটের মত বার-চৌদ্দ ঘন্টার অমানুষিক খাটুনি। রাত ৯টায় নিঃশেষিত দেহে বাসায় ফেরা। যেখানে আলো- বাতাসের প্রবেশ নিষেধ, তবু ছয় জনের গাদাগাদি করে রাত্রিযাপন। অধিকাংশ রাতে খাবার বলতে শাক-আলুভর্তা, এক ফালি মিষ্টি কুমড়া দিয়েই সারতে হয়। এরপর শয়নে, স্বপনে, জাগরণে কেবলই ভাবনা সুঁই-সুতা, প্রোডাকশন আর প্রোডাকশন। এত কিছুর পরও মাসের অর্ধেক ফুরাবার আগেই মজুরি শেষ। সে ভুলেই যায় — সে একজন মানুষ, তারও একটা মন আছে, সে কারো না কারো মেয়ে-বোন। এই সাবিনা হলো দেশের প্রধান শিল্পখাত গার্মেন্টস শিল্পের একজন অধিকারবঞ্চিত শ্রমিক।

বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে চেনবার অনেকগুলো মাধ্যমের একটি হলো পোশাক শিল্প। বাংলাদেশের তৈরিকৃত পোশাক ব্যবহৃত হয় না – এমন দেশ কম-ই আছে। এই শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ আয় করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা। শাসকদের অহংকার ডলারের বিশাল রিজার্ভ এ খাতের অবদান। বাণিজ্যিক ঘাটতি কমিয়ে আনতে প্রধান ভূমিকা রাখছে এ শিল্পখাত। পাহাড়সম আমদানি ব্যয়ও মিটিয়ে চলছে গার্মেন্টস শিল্পের আয়। এত সব বড় বড় অর্জনের পিছনে ৪০ লক্ষ গার্মেন্টস শ্রমিকের প্রধান ভূমিকা।

স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে অভূতপূর্ব রপ্তানি আয়ের গৌরবে শাসকদের নামে জয়ধ্বনি দেয়া হলেও কোথাও এতটুকু আলোচনা নেই — কেমন আছে গার্মেন্টস শ্রমিকরা, কী খায় তারা, কী রকম বাসস্থানে তারা থাকে , স্বাস্থ্য সেবা কতটুকু পায়, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার কতটুক? রাষ্ট্র-সরকার, প্রধান রাজনৈতিক শক্তি কারো এসব প্রশ্নে কোনো আগ্রহ নেই।

SUFIA20170501161751বিগত অর্থবছরে গার্মেন্টস শিল্প আয় করেছে প্রায় ২ হাজার ৮১৫ কোটি ডলার। ইউরোপ-আমেরিকার প্রধান প্রধান দেশগুলোর বাইরে এশিয়া-ল্যাটিন আমেরিকার অনেক নতুন মার্কেটেও বাংলাদেশ অর্ডার সরবরাহ করছে। বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে, উৎপাদন ও মালিকের মুনাফা বাড়ছে, বাড়ছে না শ্রমিকের মজুরি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০১৩ সালের পরে বাজারের সকল পণ্যের মূল্য ৩০ ভাগ করে বেড়ে গেছে। কিন্তু সত্যি হলো, শ্রমিক এলাকাগুলোতে এ হার ৪০ ভাগ। প্রায় পাঁচ বছর পূর্বে নির্ধারিত মজুরিতে কিভাবে বাঁচছেন শ্রমিকরা। মালিকরা মজুরি বৃদ্ধির কথা শুনলেই লোকসানের অজুহাত তোলে। অথচ ২০১৩ সালের পরে বাংলাদেশে তৈরি সকল গার্মেন্টস পণ্যের দাম বিশ্ববাজারে বেড়েছে। তৎকালীন সময় মজুরি বাড়ার ফলে মালিকের ক্ষতি হয়নি, বরং মুনাফার হার বেড়েছিল। মজুরি বাড়ার কয়েক মাসের মধ্যেই সারাদেশের কারখানাগুলোতে হয়েছে ব্যাপক ছাঁটাই। সেই থেকে ৩ জনের কাজ একজন শ্রমিকের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে। শ্রমিকের কাঁধে অতিরিক্ত খাটুনির বোঝা- ঘন্টা প্রতি প্রোডাকশন টার্গেট ৪০ ভাগ বাড়ানো হয়েছে। মালিকরা সর্বদা মজুরি বাড়ানোর বিরুদ্ধে দুটি অপপ্রচার চালায় ‘অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, ক্রেতারা বাংলাদেশে আর অর্ডার দেবে না’। কিন্তু বাস্তব চিত্র হল এই যে, সক্ষমতার দিক থেকে এগিয়ে থাকা দেশগুলোতে মজুরির হার বাংলাদেশের তুলনায় অনেক গুণ বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও দ্বিগুণ মজুরি দিচ্ছে। এ শিল্পে এক ঘন্টা শ্রম দিয়ে শ্রমিকরা মালিকের জন্য যে পরিমাণ মুনাফা সৃষ্টি করে তা অন্য যে কোন শিল্পখাতের চেয়ে বেশি। শ্রমিকের সৃষ্ট বড় অংকের মুনাফা থেকে মালিকরা কেন শ্রমিকদের বাঁচার মতো মজুরি দিবে না? শহর এলাকায় পাড়ার মোড়ে ছোট্ট রেষ্টুরেন্টের শ্রমিকের পিছনে মালিক থাকা-খাওয়া, মজুরি বাবদ ৬ হাজার টাকার বেশি খরচ করে। সেখানে কেন গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকের মজুরি ৫৩০০ টাকা হবে (ইপিজেডে ৫৬০০ টাকা)?

মালিকরা যুক্তি দেখায় একজন শ্রমিক উক্ত বেতন কাঠামোয় মাস শেষে ৮ হাজার টাকার অধিক বেতন পায়। কিন্তু, সেটা ৮ ঘন্টায় মজুরি নয়, প্রতিদিন ৪ ঘন্টা করে ওভার টাইম ডিউটির মজুরি। আর প্রতিবার ঘোষিত মজুরি কাঠামোর সুফল পায় নতুন নিযুক্ত শ্রমিকরা। পুরনো শ্রমিকের বেতন বাড়ে খুব সামান্যই। বাস্তব চিত্র এমন, ১৩ বছর ধরে কাজ করা শ্রমিক পায় সাড়ে ১২ হাজার টাকা। আর তিন বছর ধরে কাজ করা শ্রমিক পায় ১১ হাজার টাকা মজুরি। এটাই হল মজুরি কাঠামোর শুভঙ্করের ফাঁকি! প্রত্যেক গ্রেডে বর্তমান মজুরি থেকে শতকরা হিসেবে মজুরি বৃদ্ধি হলে তার সুফল পোশাক শিল্প শ্রমিকরা পেত। সম্প্রতি মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে। শ্রমিকদের আশঙ্কা এবারও তাদের ঠকানো হবে। একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের শারীরিক পরিশ্রমের বিবেচনায় দৈনিক ২৬০০ কিলোক্যালরি সুষম খাবার গ্রহণ জরুরি। কিন্তু, বিদ্যমান মজুরিতে প্রায় দ্বিগুণ মূল্যস্ফীতিতে বাসা ভাড়া, পরিবহন খরচ, চিকিৎসা-শিক্ষাসহ নানা পারিবারিক ব্যয় মিটিয়ে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ কি সম্ভব? আজকের বাজারে পরিস্থিতিতে ১৬ হাজার টাকার নীচে ৪ জনের পরিবারের সুস্থ্য ভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

নাগরিকের মতপ্রকাশের, সংগঠিত হওয়ার, ইউনিয়ন গঠন করার অধিকার সংবিধানে সংরক্ষিত আছে। আইএলও কনভেনশনের এ সংক্রান্ত ঘোষণা শাসক শ্রেণিও স্বীকার করে, কিন্তু ৪০ লক্ষ গার্মেন্টস শ্রমিককে এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। দেশের জাতীয় ও স্থানীয় সকল প্রতিনিধি নির্বাচনে শ্রমিকরা ভোট দিতে পারলেও নিজেদের পেশায় ও কারখানায় প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে না। ইপিজেডে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন আইনত নিষিদ্ধ। তথাকথিত শ্রমিক কল্যাণ সমিতির বিধান আছে, তবে হাতে গোনা কয়েকটি কারখানা ছাড়া কোথাও নির্বাচন হয় না। সেই নির্বাচনে ম্যানেজমেন্টের পছন্দ অনুযায়ী প্রতিনিধি বেছে নিতে হয়। শ্রম আইনে ইপিজেডের বাইরের কারখানাগুলোতে ট্রেড ইউনিয়ন করার বিধান আছে। কিন্তু, শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও মালিকের যোগসাজশে এই উদ্যোগ শুরুতেই ধ্বংস করা হয় এবং উদ্যোগী শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হয়। কারখানায় কারখানায় কাজের অতিরিক্ত চাপ, বাধ্যতামূলক ওভারটাইম, ছুটি ও বোনাসের টাকা না দেয়া, মজুরিহীন অতিরিক্ত খাটুনি, কথায় কথায় অন্যায়ভাবে ছাঁটাই, শারীরিক নির্যাতন, নিয়োগ- পদোন্নতিতে অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে শ্রমিকদের চাপা ক্ষোভ বিরাজ করে। মাঝে মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে ফেটে পড়লেও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার না থাকায় এত বড় একটি শিল্পখাতের শ্রমিকরা পুরোপুরি অসংগঠিত। কারখানাভিত্তিক সংকট নিরসনে ও পেশাগত জাতীয় যথার্থ দাবি তুলে ধরার প্রতিনিধির অভাবে মালিক-সরকারের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের জোরদার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে উঠছে না, আর অবহেলা-বঞ্চনারও অবসান হচ্ছে না।

দেশে এখনো যতটুকু রাষ্ট্রায়ত্ত কল-কারখানা আছে সেখানে তুলনামূলক ভালো মজুরি, ডরমেটরির ব্যবস্থা, পরিবহন সুবিধা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি এবং পেনশন সুবিধা আছে। আশির দশকে এরকম শত শত কারখানা বন্ধ করে দিয়ে লাখ লাখ শ্রমিককে বেকার করা হয়েছে। গ্রামে-গঞ্জে কৃষিভিত্তিক শিল্প বিকশিত না হয়ে গ্রামভিত্তিক কর্মসংস্থানের পথকে সংকুচিত করা হলো। বেকারের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে, শ্রমবাজারকে পরিকল্পিতভাবে সস্তা করা হয়েছে। একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারে গ্রামের সকল কর্মক্ষম লোককে কৃষিপেশায় ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাছাড়া পেশা হিসাবে কৃষি দিন দিন অলাভজনক হওয়ায় গরীব-মাঝারি কৃষককে পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় পরিবারকে সহযোগিতা করা ও দু’মুঠো খেয়ে কোনো মতে জীবন ধারণ করার প্রয়োজনে কারখানাগুলোতে কাজ নিয়েছে নারী শ্রমিকরা। এরাই গার্মেন্টস শিল্পের শতকরা ৭০ ভাগ। কিন্তু, কী নির্মম পরিহাস! শাসকরা নারীর ক্ষমতায়নের ধুয়া তুললেও এ নারীরাই সবেতনে চারমাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি পায় না। গর্ভবতী নারী শ্রমিকদের নানা অজুহাতে ছাঁটাই করা হয়। যেখানে নেপালের মত পিছিয়ে পড়া দেশেও নারী শ্রমিকদের জন্য প্রতি মাসে পিরিয়ডকালীন দুই দিন ছুটির বিধান রয়েছে, সেখানে দেশের ৯০ ভাগ কারখানা শ্রম আইনও মানে না। অর্থনীতির চালিকা শক্তি এই নারীদের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত করুণ। অতিরিক্ত খাটুনি ও অপুষ্টির স্বীকার হয়ে বয়স ৩৫ হওয়ার আগেই বুড়িয়ে যাওয়া, কিডনি রোগ, মেরুদন্ড ক্ষয়সহ নানা জটিল রোগে তারা ভুগে। এই নারী শ্রমিকদের মধ্যে বাড়ছে বন্ধ্যাত্বের হারও। শ্রমিক এলাকাগুলোতে এই নারী শ্রমিকদের জন্য নেই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ। শ্রমিক এলাকাগুলোতে সরকারি হাসপাতালের দাবি বারবার উপেক্ষা করা হয়েছে। এই শ্রমিকদের বেতনের বড় অংশ ব্যয় হয় বাসা ভাড়ায়। শ্রমিক অঞ্চলে বাসা ভাড়ার হার অন্য এলাকাগুলোর প্রায় দ্বিগুণ। প্রতি বছর রুম প্রতি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা করে বাড়ে। ১টি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা গার্মেন্টস কারখানার চেয়ে কম মুনাফা করে শ্রমিকদের জন্য ডরমেটরির ব্যবস্থা করতে পারলে সেক্ষেত্রে গার্মেন্টস মালিকরা কেন শ্রমিকদের জন্য কলোনি নির্মাণ করবে না? রেশনিং সুবিধাও এখন সময়ের দাবি। সরকারের সামরিক-আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা কোনোরকম উৎপাদন কাজে অংশ না নিয়ে বড় অংকের বেতন পাওয়া সত্ত্বেও রেশনিং সুবিধা পেলে গার্মেন্টস শ্রমিকরা কেন রেশন পাবে না এই প্রশ্নের কোনো জবাব নেই।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলেছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি- রপ্তানি আয় ছুটছে সমান তালে। মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে নাকি আর বেশি দেরি নেই। সত্যি এ কি উন্নয়ন! দেশের প্রধান শিল্পখাতের বিশাল সংখ্যক শ্রমিক যখন অধিকার বঞ্চিত থাকে। আর কত দিন এই তথাকথিত উন্নয়নের নিচে চাপা পড়ে থাকবে গার্মেন্টস শ্রমিকের হাহাকার!

সাম্যবাদ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

Check Also

140226102130_1_540x360

কৈশোরের সারল্য — লুটে নিচ্ছে কারা?

সময়ের সাথে সাথে পাল্টাচ্ছে পত্রিকার খবর। সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় একদিকে উন্নয়নের সংবাদ আসে, আরেক দিকে …