Breaking News

রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে খাদের কিনারায় ব্যাংকিংখাত

bank-collapse1 (1)
ঢাকা শহরে হরহামেশাই ফুটপাতে চলছে মোটর সাইকেল। মোটর সাইকেল চলাচল বন্ধে নগরপিতারা ফুটপাথের মাঝে বসিয়েছে পিলার। কোথাও বাঁশ, কোথাও লোহার পাইপ আবার কোথাও রোড ডিভাইডারের ব্যবহৃত সিমেন্টের মোটা মোটা পিলার। আইন লংঘনকারীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রয়েছে। অথচ আইনের প্রয়োগ না করে উল্টো বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে পথচারীদের চলাচল। একটু অসতর্ক হলেই পিলারের আঘাতে ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে রাতে এটা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষের নির্বিঘ্নে হাঁটাহাঁটির জন্য ফুটপাথ যেখানে আরও প্রশস্ত হওয়া প্রয়োজন, তখন উল্টো পথে হাঁটছে বাংলাদেশ।

ঠিক একইভাবে উল্টো পথে চলছে ব্যাংকিং খাত, চালানো হচ্ছে। ব্যাংকের ঋণ খেলাপি, জনগণের আমানতের হাজার হাজার কোটি লোপাটকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের জন্য নিয়ম-কানুন শিথিল করেছে সরকার। দুর্নীতি আর অনিয়মের কারণে একের পর এক ব্যাংক যখন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তখন বাড়তি ১০ হাজার কোটি টাকা লোপাটের সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার। ব্যাংকিংখাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্ত লক্ষ লক্ষ আমানতকারীকে পথে বসাবে।

নির্বাচনের বছরে সরকার তহবিল যোগান নিশ্চিত করতেই যে এমন উদ্যোগ নিয়েছে তা বুঝতে কাউকে অথর্নীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেয়ার ক’দিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বিষয়টি সবার কাছে স্পষ্ট হয়েছে। ওইদিনই প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ১৬০ কোটি টাকা দেয়ার খবরও তুলে ধরেছে সংবাদ মাধ্যমগুলো। হাজার হাজার কোটি টাকা পেলে নিশ্চয় এমন উপঢৌকন দিতে কার্পণ্য করবে না ব্যবসায়ীরা!

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী আমানত ১০০ টাকার সংগ্রহ করলে গড়ে ৮৫ টাকা ঋণ দিতে পারবে। গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় ব্যাংকগুলোকে আমানতের সাড়ে ৬ ভাগ টাকা নগদ আকারে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। নগদ-জমা বাধ্যবাধকতা বা সিআরআর (ক্যাশ রির্জাভ রেশিও) ব্যাংকিংখাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি সিদ্ধান্ত। অথচ সম্প্রতি বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের বৈঠকে সিআরআর এক ধাক্কায় এক শতাংশ কমিয়ে সাড়ে ৫ শতাংশ করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর ফলে ব্যাংক ব্যবসায়ীরা বাড়তি ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ প্রদানের সুযোগ পাবে।

এখানেই শেষ নয়, নির্বাচনের বছরে আরও সুবিধা দিয়েছে সরকার। নগদ টাকার সংকট হলে কেন্দ্রিয় ব্যাংক থেকে এক সপ্তাহের জন্য টাকা ধার নিতে পারে ব্যাংকগুলো। এ ধার করার জন্য যে সুদ দিতে হয় তা ব্যাংকিং ভাষায় ‘রেপো’ হিসেবে পরিচিত। সেই রেপোর সুদ হার পৌনে একভাগ কমিয়ে ৬ শতাংশ করেছে কেন্দ্রিয় ব্যাংক। এতে করে ব্যাংকগুলো টাকা ধারের খরচ আগের তুলনায় অনেকাংশে কমবে।

জনগণের আমানত লুটপাটের আরেকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সরকারি তহবিল রাখার হার দ্বিগুণ করেছে। আগে সরকারি সংস্থাগুলোর তহবিলের ৭৫ ভাগ সরকারি ব্যাংকে এবং ২৫ ভাগ বেসরকারি ব্যাংকে আমানত হিসাবে জমা রাখত। অর্থমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে এখন থেকে বেসরকারি ব্যাংকে জমা রাখতে হবে ৫০ ভাগ। অর্থাৎ সরকারি ব্যাংকের সুবিধা কমিয়ে দ্বিগুণ বাড়ানো হলো বেসরকারি ব্যাংকের টাকার যোগান। মনে হতে পারে – কী এমন সমস্যা তাতে? এর আগে জলবায়ু তহবিল হিসাবে ৫০৮ কোটি টাকা ফারমার্স ব্যাংকে রেখেছিল সরকার। কিন্তু সেই টাকা ফেরত দিতে পারছে না আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ব্যাংকটি। এই পরিস্থিতি জানার পরও কেন সরকারি তহবিল বেসরকারি ব্যাংকে জমা রাখার সিদ্ধান্ত নিল সরকার? উত্তর একটাই। ব্যবসায়ীদের সন্তুষ্ট করা, নির্বাচনে লুটেরা গোষ্ঠীকে পাশে রাখা। একই সাথে অল্প কিছু মানুষের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত করার অবাধ সুযোগ তেরি করে দেয়া।

নির্বাচনের বছরে এমনিতেই ৭০/৮০ হাজার কোটি টাকা টাকা পাচার হয়ে যায়। এই পাচারের বড় অংশ হয় আমদানির মাধ্যমে। ওভার ইনভয়েস অর্থাৎ আমদানিকৃত পণ্যের যে দাম তার চেয়ে বেশি দেখিয়ে টাকা পাঠানো হয় বিদেশে। মূল্য পরিশোধের পর বাড়তি টাকা কানাডা, যুক্তরাজ্য, য্ক্তুরাষ্ট্রসহ বিদেশে পাচার করেন ব্যবসায়ীসহ বুর্জোয়া রাজনৈতিকরা। বিশ্বজুড়েই টাকা পাচারের সহজ পন্থা হিসেবে ওভার ইনভয়েসকে ধরা হয়। এছাড়াও হুন্ডির মাধ্যমেও অর্থপাচার হচ্ছে অহরহ।

ডিসেম্বরে নির্বাচন, ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদসহ ব্যবসায়ীরাও এ সময়ে পুঁজির নিরাপত্তায় অর্থপাচার বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে আরও হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের সুযোগ তেরি করে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চায় আওয়ামী লীগ সরকার। ব্যাংক ব্যবসায়ীদের স্বপরিবারে প্রধানমন্ত্রীর চা খাওয়ার আমন্ত্রণে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়েছে। ব্যাংকিংখাতের নৈরাজ্য ও বিশৃংখলা ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে, দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো প্রধানমন্ত্রীর এই আমন্ত্রণ লুটেরাদের জন্য সবুজ সিগন্যাল, সন্দেহ নেই।

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পুঁজি পাচারসহ সম্পদ অল্প কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত করার সিদ্ধান্ত পুঁজিবাদী শাসন শোষণের পুরানো কৌশলের নতুন রূপ মাত্র। মুখে জনগণের কথা, টেকসই উন্নয়নের কথা বললেও আসলে এসব যে ফাঁকা বুলি, তা বুঝতে ব্যাংকিংখাতের এসব জনস্বার্থবিরোধী পরিকল্পনা দেখলেই বোঝা যায়।

সাম্যবাদ এপ্রিল ২০১৮

Check Also

fuel_cost-1

আবারও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারা

আবারও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়েজউল্লাহ জানান, “শুধু শিল্প-কারখানা …