রায়ের প্রতিক্রিয়ায় সরকারের কর্তৃত্বকারী ভূমিকার নগ্ন প্রকাশ ঘটেছে

 

Sinha_Hasina

একসময় এ ভূখন্ডে রাজাদের শাসন ছিল। রাজা ছিলেন সর্বশক্তিমান, তিনিই ছিলেন রাষ্ট্র। তার ইচ্ছার ভিত্তিতে সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে বলে মনে করা হতো। প্রকৃতি যেমন ঈশ্বর পরিচালনা করেন, তেমনি সমাজ পরিচালনা করেন তিনি। রাজাকে সবদিক থেকে পূজনীয় করে তুলতেন ধর্মীয় নেতারা। মানুষকে তারা বোঝাত রাজা হলো ‘ঈশ্বরের প্রতিনিধি’। ঈশ্বরের যেমন কোনো ভুল নেই তেমনি রাজাও কোনো ভুল করতে পারে না। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের গায়ে তাই একসময় খোদাই করা ছিল ‘King can do no wrong’। সময় পাল্টেছে, এমন চিন্তা-চেতনারও পরিবর্তন এসেছে। মানুষ নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত হয়ে একসময় বুঝেছে এই ধারণাগুলো নেহাতই মিথ্যাচার — ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে কিছু নেই, মানুষ মাত্রই ভুল করে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বোধহয় কথাগুলো এভাবে খাটে না! এখানে যখন যে ক্ষমতায় থাকে সেই শাসক আর তার দোসরদের কোনো ভুল হয় না, তাই সমালোচনাও করা যায় না। সমালোচনা করলে শাসকরা তা সহ্য করেন না। কেউ করলে তার জবাব ‘রাজা যত দেয় সভাসদ দেয় দশগুণ’। এখানে চারদিকে মোসাহেবদের ছড়াছড়ি। তারা বোঝাতে চায় ‘King can do no wrong’। কথাগুলো বলা হলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক একটি ঘটনা নিয়ে আলোকপাত করার প্রয়োজনে। সরকার সংবিধানের যে ১৬তম পরিবর্তন ঘটিয়েছিল তা গত ৩ আগস্ট বাংলাদেশের সর্বোচ্চ কোর্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বাতিলের রায় দেন। রায়ের পাশাপাশি প্রধান বিচারপতিসহ বিচারকগণ কিছু পর্যবেক্ষণ (Observations) রাখেন যাকে আইনের ভাষায় বলে ‘অবিটার ডিকটা’। ব্যস, আর যায় কোথায়? অমনি শুরু হয়ে গেল মোসাহেবদের তৎপরতা। রায় ভালো করে না পড়লেও তাদের অনেকেই প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে ‘পাকিস্তানপ্রেমী’, ‘দালাল’, ‘সংখ্যালঘু’, ‘মনিপুরী’, ‘প্রধানমন্ত্রীর আর্শীবাদে নিয়োগপ্রাপ্ত’ ইত্যাদি বলার পাশাপাশি তুই- তোকারী সম্বোধনও করলেন। কেউ বললেন ‘বিএনপির ষড়যন্ত্র আছে’, বা ‘একটি ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক এই রায় লিখে দিয়েছেন’। কেউবা প্রধান বিচারপতির অপসারণ চাইলেন। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি নির্লজ্জ এবং নজিরবিহীনভাবে দুইবার সংবাদ সম্মেলন করে রায়ের সমালোচনা করলেন, শিল্প-সংস্কৃতি বেঁচে খান এমন সংস্কৃতিজীবীরা কালো পতাকা প্রদর্শন করলেন, ডাক্তার নেতারা বন্যার্ত মানুষদের পাশে না দাঁড়ালেও প্রেসক্লাবে বিশাল মানববন্ধন করলেন, হিন্দু নেতারা তাদের জাত গেল বলে রব তুললেন আর টেলিভিশন-পত্রিকায় ভাড়াখাটা বুদ্ধিজীবীরা প্রধান বিচারপতির চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করেই ছাড়লেন। কোথায় যেন হারিয়ে গেল দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় আর তার বিচারকের সম্মান!

রায় নিয়ে কেন এত তোলপাড়?
কী ছিল সেই ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে কিংবা তার পর্যবেক্ষণে — যা নিয়ে এত তোলপাড়? মোসাহেবদেরএত তৎপরতা? আসুন পাঠক, এখন সেই বিষয়গুলো নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক।

১৯৭১ সালে আমাদের দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। তার প্রেক্ষিতে ১৬ ডিসেম্বর আসে আমাদের স্বাধীনতা। এর ঠিক এক বছর বাদে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমাদের সংবিধান প্রণীত ও কার্যকর হয়। এই সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে লেখা ছিল বিচার বিভাগ পৃক করতে হবে। ১১৬ অনুচ্ছেদে বিচারকদের শৃঙ্খলা সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছিল। আর ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা ছিল জাতীয় সংসদের হাতে। ১৯৭৫ সালে দেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদিকে ‘বাকশাল’ কায়েম করেন, অন্যদিকে বিচারক নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে নিয়ে আসেন। এর পরবর্তীতে বাংলাদেশের আরেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা প্রধান বিচারপতি ও আরও দুইজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতির দ্বারা গঠিত ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’র হাতে ন্যস্ত করেন। ২০১৪ সালে ষোড়শ সংশোধনী করে এই বিধান পুনরায় জাতীয় সংসদের হাতে ফিরিয়ে নেয়া হয়। এখন বর্তমান রায়ের কারণে সেই সংশোধনী বাতিল হয়ে গেল। অর্থাৎ দেশের সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন, বিচারকরা যদি সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের দায়ে অভিযুক্ত হন, তবে তদন্ত করা ও তাদের অপসারণের জন্যে জাতীয় সংসদ নয় বরং সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ক্রিয়াশীল থাকবে।

রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ থাকে। আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উন্মেষের কালে বলা হয়েছিল, এই তিনটি বিভাগ পরস্পর থেকে আলাদা থাকবে এবং আপেক্ষিক স্বাধীনতা ভোগ করবে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা প্রবন্ধের পরে আলোচিত হবে। কিন্তু ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের মাধ্যমে বিচার বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ — বিচারক অপসারণের ক্ষমতা আইন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের হাতে চলে গেল। এতে সরকারপক্ষ নাখোশ হয়েছে। তাদের দেখাদেখি নাখোশ হয়েছে তাদের পোষা ‘সুশীল’ ব্যক্তিবর্গ। শুধু রায়ের কারণে নয়, সরকারের কর্তাব্যক্তিদের রাগ করার আরও কিছু কারণ আছে। আর সেটা আছে রায়ের পর্যবেক্ষণে, প্রধানত প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণে। খুব সংক্ষেপে বললে পর্যবেক্ষণগুলো দাঁড়ায় — ১. সংবিধান সুরক্ষার ভার সুপ্রিম কোর্টের হাতে। ২. জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, সংসদ নয়। ৩. দেশের শাসনকার্যে ‘আমিত্ব’ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। প্রয়োজন ‘আমরাত্ব’। ৪. সবকিছুর ব্যক্তিকরণের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে একটি ‘ভুয়া ও মেকি গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ৫. সংসদ একটি ‘অকার্যকর’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ৬. রাজনীতি এখন বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। ৭. ক্ষমতার অপব্যবহার ও দাম্ভিকতা দেখানোর ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। ৮. নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়নি। ৯. গ্রহণযোগ্য নির্বাচনব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়নি এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া গ্রহণযোগ্য সংসদ প্রতিষ্ঠা পায় না। ১০. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সাংসদেরা দলের হাইকমান্ডের কাছে জিম্মি। ১১. সংসদ পঞ্চদশ সংশোধনী পাশের সময় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশনা মানেনি। ১২. রাষ্ট্রক্ষমতা সম্প্রতি গুটিকয়েক মানুষের একচ্ছত্র বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ১৩. সামরিক শাসকেরা ক্ষমতার দখলদার এবং তারা দু’বার দেশে সামরিক ব্যবসায়ী অভিজাত শ্রেণির যোগসাজশের শাসনব্যবস্থা (ব্যানানা রিপাবলিক) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৩. চর্তু সংশোধনী ছিল সংবিধান পরিপন্থী এবং তার মাধ্যমেই বিচার বিভাগের জবাবদিহিতা রাষ্ট্রপতির কাছে ন্যস্ত করা হয়। ১৪. পঞ্চদশ সংশোধনীতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার বিধান আপেক্ষিকভাবে বিচারবিভাগের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে। ১৫. সামরিক শাসনের কণামাত্র সংবিধানে রাখা হয়নি — এমন দাবি অসার। কেননা সেক্যুলারিজম ও রাষ্ট্রধর্ম, বিসমিল্লাহ রহমানির রহিম একই সংবিধানেই আছে ইত্যাদি।

১৫৪টি সিটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে আর সবকিছুকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিদের স্বাভাবিকভাবেই এসব সমালোচনা ভালো লাগেনি। সংসদ অকার্যকর, গণতান্ত্রিকতার অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করেছে — এসব কথা তাদের ভালো লাগবে কেন? তাই তারা তারস্বরে এর প্রতিবাদ করছে। কেউ কেউ চূড়ান্ত অশ্লীল কথাও বলেছে। যদিও এখন পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হয়নি। সবচেয়ে সমালোচনা হয়েছে প্রধান বিচারপতির একটি পর্যবেক্ষণ নিয়ে — ‘কোনো এক ব্যক্তির দ্বারা দেশ বা জাতি তৈরি হয়নি।’ এর মাধ্যমে নাকি শেখ মুজিবুর রহমানকে কটাক্ষ করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো ৭৯৯ পৃষ্ঠার রায়ে শেখ মুজিবুর রহমান নামটি ইতিবাচক অর্থে ১১ বার আনা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির জনক’ও সম্বোধন করেছেন। রায়ে কোথাও তাঁকে তো খাটো করা হয়নি। দেশের চলমান ব্যবস্থা নিয়েও প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারকগণ কোথাও বিদ্রোহের কথা বলেননি, নিরঙ্কুশ আনুগত্যেরই প্রমাণ দিয়েছেন। আরেক আলোচনায় প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘এখানে রায় নিয়ে এত শোরগোল। অথচ পাকিস্তানে বিচার বিভাগের রায়ে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পাল্টে গেল।’ এ কথা বলার কারণে প্রধান বিচারপতি ‘পাকিস্তানপ্রেমী’ হয়ে গেলেন! একজন মন্ত্রী তাঁকে পাকিস্তানেই চলে যেতে বললেন। কেউ বললেন এর মাধ্যমে প্রধান বিচারপতি সরকারকেই উৎখাতের পরিকল্পনা করছে। আসলে জনগণের সমর্থন ছাড়া কেবল গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকলে সামান্য সমালোচনাতেই যে সরকারের ভিত কেঁপে ওঠে — এবারের ঘটনাতে তারই প্রমাণ পাওয়া গেল।

আরও কিছু কারণ
ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে জানা গেল সুপ্রিম কোর্টে যত মামলা আছে তার ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে সরকার একটি পক্ষ। মামলায় দুই পক্ষের কেউ হারতে চায় না — এটাই স্বাভাবিক। যদি উচ্চতর আদালতে সরকারের কর্তৃত্ব কমে যায় তবে এই মামলাগুলোর কী হবে? রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে যদি সরকার বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করে তবে নাগরিকদের ন্যায় বিচার পাবার সম্ভাবনা কম থাকে। এ কথার সত্যতাও পাওয়া যায়। নিয়ন্ত্রণ থাকলে কতটা প্রভাব ফেলা যায়- তা একটি পরিসংখ্যানে বোঝা যাবে। এই সময়ে সরকার দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বিচারাধীন প্রায় সাত হাজারের বেশি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসবের মধ্যে এমনকি খুনের মামলাও আছে। (তথ্যসূত্র : দৈনিক প্রথম আলো) এর ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না কেন ৪৬ বছরেও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগবিধি তৈরি হয় না, কেন সরকার বিচারবিভাগকে তাদের হাতে রাখতে চায়।

সংবিধান সংশোধনী নিয়ে কিছু কথা
এ কথা সকলের জানা, সংবিধান সংশোধন করার এখতিয়ার কেবলমাত্র জাতীয় সংসদের। যেকোনো আইন প্রণয়নের ক্ষমতাও ন্যস্ত থাকে সংসদের উপর অর্থাৎ আইন বিভাগের উপর। কেবল জাতীয় নির্বাচনকালীন সংসদ যখন স্থগিত থাকে তখন রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে নতুন আইন প্রণয়ন করতে পারেন। সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদের দুই তৃতীয়াংশ ভোটে সংবিধানের বিধান সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন বা রহিতকরণ করা যায়। তবে এই ক্ষমতাটি নিরুঙ্কুশ নয়। সংবিধানের আরও কিছু ধারা দিয়ে এই ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। যেমন ৭(খ)-তে বলা হয়েছে, “সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, নবম-ক ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোনো পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য হইবে।” আবার ৭(২) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।” এবং মৌলিক অধিকার অধ্যায়ের ২৬ (২) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্র এই ভাগের কোনো বিধানের সহিত অসামঞ্জস্য কোনো আইন প্রণয়ন করিবেন না এবং অনুরূপ কোনো আইন হইলে তাহা এই ভাগের কোনো বিধানের সহিত যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।” অর্থাৎ সংবিধানের বিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দুই তৃতীয়াংশ সমর্থন থাকলেও সংবিধানের সাথে বিরোধপূর্ণ (যার তালিকা সংবিধানে দিয়েছে) আইন বাতিল বলে গণ্য হবে।

এখানে আসে বিচার বিভাগের ভূমিকার দিকটি। আদালতের মাধ্যমেই সাধারণত বাতিলের কাজটি সম্পন্ন হয়। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়টি তেমনই একটি রায়। আদালত বিবেচনা করে সংবিধানের কোনো সংশোধনী যদি সংবিধানের কোনো ধারার সাথে সাংঘর্ষিক হয় কিংবা মৌলিক কোনো কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তখনই সেই সংশোধনী বাতিল করে। সংবিধানের ‘মৌলিক কাঠামোগুলো’ কী — এ সম্পর্কে অষ্টম সংশোধনীর মামলাসহ বিভিন্ন মামলার রায় ও পর্যবেক্ষণে বিচারক, অ্যামিকাস কিউরাবৃন্দ তুলে ধরেছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে মৌলিক কাঠামোর (Basic Structure) কোনো তালিকা তৈরি করা যায়নি। তবে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে আদালত ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’কে মৌলিক কাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সেই অনুযায়ী ষোড়শ সংশোধনী সংবিধানের ৯৪(৪) ও ১৪৭(২) নং অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছে।

অনুচ্ছেদ ৯৪(৪) এ বলা হয়েছে, “এই সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক বিচারকার্যপালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন।” এবং ১৪৭(২) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “এই অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হয়, এইরূপ কোনো পদে অধিষ্ঠিত বা কর্মরত ব্যক্তির কার্যভারকালে তাঁহার পারিশ্রমিক, বিশেষ-অধিকার ও কর্মের অন্যান্য শর্তের এমন তারতম্য করা যাইবে না, যাহা তাঁহার পক্ষে অসুবিধাজনক হইতে পারে।” অর্থাৎ আদালত বিবেচনা করেছে, ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যদি বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকে তবে সংবিধানের আলোচ্য দুটি অনুচ্ছেদ ৯৪(৪) এবং ১৪৭(২) লঙ্ঘিত হয়। তাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকে না। মূলত এই যুক্তিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করেছে।

এখন প্রশ্ন আসে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কথাটির অর্থ কী? বিচার বিভাগ কতটুকু স্বাধীন? কার কাছে স্বাধীন? সব কিছুর দায়বদ্ধতা যদি জনগণের স্বার্থের প্রতি হয়, তাহলে বিচার বিভাগের দায়বদ্ধতা কার কাছে? বিচার বিভাগের তো জনগণের সাথে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। আসলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ধারণা আপেক্ষিক। এই স্বাধীনতা চূড়ান্ত কোনো বিষয় নয়, রাষ্ট্রকে ছাপিয়েও নয়। বিচার বিভাগ এমনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবে যেন অন্য দুটি বিভাগ-আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগ তাদের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে না পারে। বাংলাদেশের আদি সংবিধানে বিচার বিভাগ আলাদা করার কথা বলা হলেও তার বহুদিন বাদে মাজদার হোসেন মামলায় আদালত এ সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু প্রস্তাবনা রাখে। তাতে করে বিচারকদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আলাদা কিছু পরীক্ষা আর বেতন- কাঠামোর পরিবর্তন ছাড়া এখন পর্যন্ত কাজের কাজ কিছুই হয়নি। পূর্বের আলোচনাতেও দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশের নিম্ন আদালত প্রায় সবকিছুর জন্য সরকারের মুখাপেক্ষী। আবার সংবিধান অনুযায়ী উচ্চ আদালতে প্রধান বিচারপতির নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান বিচারপতির সাথে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারকগণকে নিয়োগ দেন। (অনুচ্ছেদ ৯৫(১)) আমরা জানি, রাষ্ট্রপতি একজন দলীয় ব্যক্তি। তাহলে একজন দলীয় ব্যক্তি দিয়ে কীভাবে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন বিচারক নিয়োগ হবে? তার মানে বিচারক নিয়োগেও পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। তাই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া যেমন প্রশ্নবিদ্ধ তেমনি বিচারক অপসারণে দুই তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যদের সমর্থনও ত্রুটিপূর্ণ।

কেমন হবে রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের সম্পর্ক?
ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে এত যখন শোরগোল, তখন একটি কথা না এসে পারে না। আর তা হলো, কেমন হবে রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ — আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ আর বিচার বিভাগের মধ্যকার সম্পর্ক। ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মঁতাস্কু ক্ষমতাবিভাজন তত্ত্বের উদ্ভাবক। তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘স্পিরিট অব ল’ বইতে দেখালেন, প্রশাসন, আইন ও বিচার — এই তিনটি বিভাগ প্রত্যেকেই পারস্পরিক হস্তক্ষেপমুক্ত হয়ে যদি স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পায়, তবেই রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা ও মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকতে পারে। বলা বাহুল্য মঁতাস্কু যখন ক্ষমতা বিভাজনের এই তত্ত্বটি নিয়ে আসলেন তখন তা সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে উঠেছিল। কেননা সেই সময় অর্থনীতিতে ছিল অবাধ প্রতিযোগিতার যুগ। অর্থনীতিতে একচেটিয়া পুঁজি আসার আগে বুর্জোয়ারা অবাধ প্রতিযোগিতার উপরিকাঠামো হিসেবে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারণা এনেছিল। এই ধারণা গড়ে উঠেছিল সামন্ত স্বৈরতন্ত্র বা গীর্জার শাসনকে মোকাবেলা করতে গিয়ে। সামন্ত ব্যবস্থায় শাসন, আইন ও বিচারের ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকত। এমন ‘এক ব্যক্তির শাসন’ ছিল পুঁজিবাদ বিকাশের পথে বাধা। সে কারণে পুঁজিবাদ আসার পর সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারণা যখন এল তখন বলা হলো ‘সংসদ’ হবে জনগণের আশা আকাঙ্খার প্রতীক। কিন্তু বুর্জোয়া শাসনব্যবস্থা একদিকে যেমন অর্থনীতিতে অবাধ প্রতিযোগিতার অবস্থাকে রক্ষা করতে পারেনি তেমনি রাজনৈতিকভাবেও প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের ধারণাও টেকেনি। অর্থনীতির একচেটিয়াকরণ রাজনীতির মঞ্চেও ফ্যাসিবাদী শাসন কাঠামো কায়েম করেছে। এই ফ্যাসিবাদ কখনো এসেছে সামরিক লেবাসে, কখনো এসেছে দুই পার্টির সংসদীয় রাজনীতির খোলসে, কখনো বা মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক শক্তির রূপ ধরে। ফলে বুর্জোয়া পার্লামেন্টের মধ্যেই গণতন্ত্রের সমাধি রচিত হয়েছে।

জনতার প্রতিভূ সংসদ পরিণত হয়েছে ঠুঁটো জগন্নাথে
বলার অপেক্ষা রাখেনা, ‘দেশের সর্বোচ্চ আইন’ সংবিধানও তার মর্যাদা ধরে রাখতে পারেনি। শাসক দলের যেকোনো অংশ, যারা যখন ক্ষমতায় এসেছে, তারা প্রত্যেকেই ক্ষমতার প্রয়োজনে সংবিধানের কাঁটাছেঁড়া করেছে। আমাদের দেশেও এ পর্যন্ত ১৬ বার সংবিধান পরিবর্তিত হয়েছে। পরিবর্তন হতেই পারে। সংবিধান কোনো ধর্মগ্রন্থ নয় যে তা পাল্টাতে পারে না। সময় পাল্টে গেলে, আশা- আকাঙ্খারও বদল ঘটে। কিন্তু দেখা যাবে, পরিবর্তনগুলো জনগণের প্রয়োজন থেকে না হয়ে শাসকদের প্রয়োজনে হয়। আসলে প্রতিবার এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য থাকে সংবিধানের কাঠামোর বিভিন্ন অংশের মধ্যে যে ক্ষমতার বিভাজন আছে তারই পরিবর্তন করে শোষণমূলক ব্যবস্থাটিকে অক্ষুন্ন রাখা। এর মাধ্যমে যেমন সর্বোচ্চ পরিমাণ মুনাফা লোটা যায়, তেমনি সকল প্রকার অন্যায়, অযৌক্তিকতা, জবরদস্তিকে আইনসঙ্গতও করা যায়। তাই দেখা যায়, কতকগুলো ভালো ভালো কথা যুক্ত করে সংবিধান সংশোধন করা হলেও আদতে জনগণের তাতে কোনো ফায়দা হয় না। ফলে ক্ষমতা বিভাজনের যে তত্ত্ব একদিন বুর্জোয়া ব্যবস্থা এনেছিল তারও কোনো কার্যকারিতা থাকে না। পরস্পরের মধ্যে আপেক্ষিক স্বাধীনতার সম্পর্কও রক্ষিত হয় না। ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ রাখার প্রয়োজনে যখন যে বিভাগকে সামনে আনা প্রয়োজন তাকেই বুর্জোয়ারা সামনে আনে।

এ কথাটিও মনে রাখা প্রয়োজন, রাষ্ট্রের যে তিনটি অঙ্গ সেগুলো মূলত শাসকশ্রেণির স্বার্থকে রক্ষা করার জন্যই তৈরি হয়। কিন্তু যখনই এদের একটির সাথে অন্যটির দ্বন্দ্ব তৈরি হয় তখন শাসন ব্যবস্থাকে সংকটমুক্ত রাখার জন্যই তারা নিজেরা নিজেদের সাথে আপোষ করে। আমাদের দেশেও তেমনটি ঘটেছে। যেমন — ২০১৩ সালে শাসনব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখার জন্য আদালতকে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা হয়েছে। একইভাবে বাসাবাড়িতে জ্বালানি গ্যাসের মূল্য কমাতে আদালতের রায়কে কাজে লাগানো হয়েছে। আবার সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে নিম্ন আদালতে বিচারক নিয়োগ, বদলি, বেতন ইত্যাদির ক্ষমতা রাখা হয়েছে আইন বিভাগের হাতে। এদের মধ্যে কখনো দ্বন্দ্বও তৈরি হয়। আদালতের রায় যতক্ষণ সরকারের কাজে লাগে ততক্ষণ ‘সংবিধান মহান’ এমন বুলি আওড়ায়। কিন্তু যখনই আদালত কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে, সরকারের কর্মকান্ডে বাধা তৈরি করে, বা বাধা তৈরির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তৈরি করে তখনই এক ধরনের বিরোধ তৈরি হয়। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে, সরকারের সাথে প্রধান বিচারপতির দ্বন্দ্ব। আদতে এটি আইন বিভাগের সাথে বিচার বিভাগের দ্বন্দ্ব। আবার এই দ্বন্দ্ব এই শোষণমূলক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে বেশিদিন স্থায়ীত্বও পাবে না। তারা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে একটা সমঝোতায় পৌঁছে যাবে।

তবুও বিচার বিভাগের আপেক্ষিক স্বাধীনতার প্রয়োজন আছে
একদিন বুর্জোয়া শ্রেণিই ‘আইনের চোখে সবাই সমান’, ‘আইনের শাসন’ ইত্যাদি কথা সামনে এনেছিল। ক্ষমতা কাঠামোতে স্বেচ্ছাচার আটকাতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজনের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে চেয়েছিল। তারা বুঝেছিল যদি বিচারবিভাগকে অন্য সকল কিছু থেকে আলাদা করে আপেক্ষিকভাবে স্বাধীন করে রাখা যায়, তবে রাষ্ট্রের অন্য কোনো বিভাগের অন্যায়, ক্ষমতার অপব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। একের ত্রুটি, একের অন্যায় অপরের দ্বারা সংশোধিত হবার পথ যদি খোলা থাকে তবেই কেবল আইনের শাসন কথাটার একটা মানে থাকে। তাই এ কথা বলা যায়, বুর্জোয়া ব্যবস্থায় সব সীমাবদ্ধতাকে মনে রেখেও যদি ক্ষমতা বিভাজনের তত্ত্বকে প্রয়োগ করে বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে বিশেষত বিচার বিভাগের মধ্যে আপেক্ষিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায়, তবে এই সমাজেও বিচার যতই ব্যয়বহুল, কষ্টসাধ্য আর সময়সাপেক্ষ হোক না কেন, একজন নাগরিক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ও প্রশাসকের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে সুবিচারের দাবি জানাবার তবু একটা জায়গা পায়। এটা না থাকলে সেই ন্যূনতম জায়গাটুকুও আর থাকে না।

সমস্ত প্রতিষ্ঠান সরকারের মুখাপেক্ষী করা ফ্যাসিবাদী শাসনেরই লক্ষণ
সামাজিক চিন্তা গড়ে ওঠার স্বাভাবিক ও একান্ত প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া হলো নানা চিন্তা-মত-পথের নিয়ত দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ। এটা বাদ দিয়ে কোনো দিন সমাজে নতুন চিন্তা-ভাবনার জন্ম হতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন আপেক্ষিক স্বাধীনতার। সেটা ব্যক্তিগত স্তরে যেমন তেমনি প্রতিষ্ঠানগত দিকেও। কিন্তু সরকারের দমন-পীড়ন থাকলে, সবক্ষেত্রে সরকারের চিন্তাকে প্রয়োগ করার বাধ্যবাধকতা থাকলে কোনো ক্ষেত্রেই এই আকাক্সিক্ষত গণতান্ত্রিক পরিবেশ নির্মিত হতে পারে না। চিন্তা-ভাবনায় স্থবিরতা চলে আসে, রাজনৈতিক শাসনে আসে ফ্যাসিবাদ। বিচারপতিদের মাথায় যদি শাস্তির খড়গ ঝুলতে থাকে, শাসন বিভাগের কর্মকর্তাদের যদি সরকারি নিয়মনীতি পালনেরই কেবল বাধ্যবাধকতা থাকে তবে তিন বিভাগের ভারসাম্য (check and balance) কখনোই রক্ষিত হতে পারে না। সবাইকে সরকারের পায়ের কাছে নত হয়েই থাকতে হয়। অবস্থাদৃষ্টে কখনো মনে হয়, এ যেন সেই রাজার শাসন। অথচ রাজা-যাজকদের সামন্ত্রতন্ত্রকে পরাস্ত করে একদিন বুর্জোয়া দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর ‘লিবার্টি’ গ্রন্থে বলেছিলেন, “যদি সমগ্র মানবজাতির মধ্যে একজন ব্যক্তিও অন্য সকলের সঙ্গে চিন্তায় একমত না হতে পারে, তবে সেই একজনের চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা ঠিক তেমনি থাকে, যেমন এই একজনেরও কোনো অধিকার নেই তার একার চিন্তা ও মতকে চাপিয়ে দিয়ে বাকি সকলের কণ্ঠরোধ করার।” এসব আলোচনা আজকে আমাাদের কাছে বড় বড় কথা ছাড়া আর কিছুই না! রাষ্ট্র যে মাত্রায় ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠেছে সেখানে ব্যক্তি- প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অবস্থান বারবার আμমণের শিকার হচ্ছে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। নবম শ্রেণির প্রশ্নপত্রে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অবমাননা করা হয়েছে’ (যদিও প্রশ্নপত্রের কোথাও নামটা পর্যন্ত উল্লেখ ছিল না) এই মিথ্যা অভিযোগ তুলে চট্টগ্রামের একটি স্কুলের ১৩ জন শিক্ষককে জেলে পাঠানো হয়েছে কিছুদিন আগে। (তথ্যসূত্র : বিবিসি বাংলা) এ যখন অবস্থা তখন ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা কথাটির কোনো মানে থাকে কি?

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে কি
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়েছে?
এর আগে অষ্টম সংশোধনী বাতিলের মামলা (হাইকোর্টকে ছয়টি বিভাগীয় শহরে স্থানান্তর) নিয়েও খুব শোরগোল উঠেছিল। সামরিক সরকারের সময়ে প্রণীত সংশোধনী বাতিলের সেই মামলাটি বেশ আলোচিত ছিল। এবারও ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে খুব আলোচনা হচ্ছে। এর বোধহয় একটি বড় কারণ কোনো একটি সরকার ক্ষমতায় থাকতেই তার করা সংশোধনের বিরুদ্ধে আদালতের রায়। আমাদের দেশে এতটুকু গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি তৈরি হয়নি যে, সরকার তা মেনে নেবে। আরও কিছু বিষয় আছে, প্রধান বিচারপতি যেভাবে তাঁর পর্যবেক্ষণে সংসদ, প্রচলিত রাজনীতি এবং প্রতিনিধিত্বহীন নির্বাচনের সমালোচনা করেছেন তাতে সরকারের গাত্রদাহ না হয়ে উপায় নেই। যদিও এসব মতামতের আইনগত মূল্য কতটা তা নিয়ে প্রশ্নব আছে। কিন্তু তারপরও এমন বন্ধ্যা সময়ে, যখন সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যখন সামান্য প্রতিবাদ-প্রতিরোধকেও সরকার নস্যাৎ করতে উদ্যত হয়ে উঠছে, সেখানে উচ্চ আদালত থেকে এমন কিছু আলোচনা সরকারকে বিব্রত করেছে বৈকি। তার উপর সরকার প্রধান থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপিদের বক্তব্য-বিবৃতি এই উত্তপ্ত আলোচনায় ঘি ঢেলেছে, সন্দেহ নেই। একইসাথে প্রধান বিচারপতির দৃশ্যমান অনমনীয় মনোভাবে সরকার যে কিছুটা হতচকিত হয়ে পড়েছে, তা দেখে অনেকের মধ্যে পুলক ও আশাবাদ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই রায় আসলে কতটুকু কার্যকরী হবে?
সরকারের দিক থেকে এখনও রিভিউ নেবার সুযোগ বাকী আছে। আদালতকে চাপ প্রয়োগ করে বিপরীত কিছু করার সম্ভাবনাকে নাকচ করা যায় না। আবার ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে সপ্তদশ সংশোধনী সংসদে পাশ করা হবে কিনা — তা নিয়েও তৈরি করা হয়েছে সংশয়। তারপরও রায়কে ঘিরে আরও কিছু বিষয় আছে, যা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। যেমন —

  • সংশোধনী বাতিলের রায়ের মাধ্যমে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে অবিকল ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু এরও দুর্বল দিক আছে। এই কাউন্সিল আসলে প্রধানমন্ত্রীর পূর্বানুমোদন ছাড়া কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তই শুরু করতে পারবে না। এ সম্পর্কে রায়ে কোনো পর্যবেক্ষণ নেই।
  • উচ্চতর আদালতের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে দেয়া হলেও নিম্ন কোর্টের কী হবে? অথচ নিম্ন কোর্ট উচ্চতর কোর্টের চেয়ে ১৫ গুণ বেশি মামলা পরিচালনা করে। অনুচ্ছেদ ১১৬-তে বলা হয়েছে ‘বিচারবিভাগীয় দায়িত্বপালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল-নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত থাকবে।’ এই যদি হয় অবস্থা তাহলে নি¤œ আদালতে কীভাবে নিরপেক্ষতা মেনে, সরকারি চাপ উপেক্ষা করে বিচারকার্য করা সম্ভব? ১১৬ অনুচ্ছেদ বাতিল না করে কি বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সামগ্রিকভাবে দেখা হলো?
  • অধস্তন আদালত ও উচ্চ আদালতের বিচারকরা অবসরে গেলে সরকারি সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করবেন কি না বা সেই সময় সরকারের সাথে বিচার বিভাগের সম্পর্ক কেমন হবে — সে সম্পর্কে রায়ে কোনো আলোচনা নেই।
  • আলোচ্য রায়ে ৭০ অনুচ্ছেদ (কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হয়ে কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি যদি উক্ত দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন তাহলে সংসদে তার আসন শূণ্য হবে) নিয়ে অনেক সমালোচনা হলেও এরকম একটি একটি কালো আইন যে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার সাথেই সাংঘর্ষিক এবং বাতিলযোগ্য — ব্যাপারটা সেভাবে আসেনি। যদিও ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের অন্যতম কারণ হিসেবে ৭০ অনুচ্ছেদকে আনা হয়েছে, কিন্তু এই অগণতান্ত্রিক বিধানটি সংবিধানে রয়েই গেল। এ কারণে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার উৎস প্রধানমন্ত্রী রয়ে গেলেন। এর মাধ্যমে আর যাই হোক, ক্ষমতার বিভাজন তত্ত্ব কার্যকর হতে পারে না। একইভাবে পারে না বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত হতে।

বাহাত্তরের সংবিধানের দোহাই 
ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় যেদিন দেয়া হয়, সেদিন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমাদের স্বপ্ন ছিল বাহাত্তরের আদি সংবিধানে ফেরার। কিন্তু এই রায়ের মধ্য দিয়ে আমাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না। এজন্য আমরা দুঃখ ও হতাশা প্রকাশ করছি।’ বাস্তবতা হলো, এভাবে কথায় কথায় বাহাত্তরের সংবিধানে ফেরত যাবার কথা বলা এক ধরনের ভাওতাবাজি। বাহাত্তরের সংবিধানে ৩৮ অনুচ্ছেদের মধ্য দিয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু এই ধারা ফিরে আসলেও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সরকার বন্ধ করেনি। সংবিধানে একইসাথে সেক্যুলারিজম এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম আছে। যা একসাথে থাকতে পারে না। আবার বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ১১৬ নং অনুচ্ছেদে বলা ছিল, ‘নিম্ন আদালতের সমস্ত কিছু উচ্চতর আদালতের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’ সেটা এখন আছে পুরোপুরি সরকারের হাতে। এভাবে প্রতিনিয়ত বাহাত্তরের সংবিধানের বিপরীতে হাঁটলেও সরকার কেবল ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের সময় কতগুলো কথা নিয়ে আসছে।

সমাধান কোথায়?
ষোড়শ সংশোধনী আলোচনা করতে গিয়ে আমরা দেখলাম অনেকগুলো বিতর্কিত বিষয় এসেছে। একদিকে বিচার বিভাগের আপেক্ষিক স্বাধীনতার কথা এসেছে, যেটি না হলে সুষ্ঠু বিচার সম্ভব না। আবার দেখা যাচ্ছে আইন বিভাগের প্রধান ‘প্রধানমন্ত্রী’র হাতেই সব ক্ষমতা আবদ্ধ। একদিকে প্রধান বিচাপতিকে যা ইচ্ছা তাই বলা যাচ্ছে, অন্যদিকে ‘বিচার বিভাগকে সমুন্নত’ রাখার কথা বলে দলীয় সরকারের নেতৃত্বেই নির্বাচন হচ্ছে। আবার আমরা দেখছি উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণ ত্রুটিপূর্ণ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে থাকলেও নিম্ন আদালত থাকছে সরকারের নিয়ন্ত্রণে। এই যখন অবস্থা তখন উপায় কী? এই উত্তর পেতে হলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লিপসন তাঁর ‘গ্রেট ইস্যুস অব পলিটিক্স’ গ্রন্থে যা বলেছেন তা বুঝতে হবে — “আইন রাজনীতিকে নির্ধারণ করে না বরং প্রধানত রাজনীতিই আইনকে নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করে। আইনের শাসন ও গঠনতান্ত্রিক শাসনের প্রতি মর্যাদাবোধ রাজনীতিগতভাবে একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে না বরং স্বাধীনতার মর্যাদার ভিত্তিতে যে রাজনীতি সেটাই আইনের শাসন বা সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধার মনোভাব গড়ে তোলে। তাই যাকে বলা হয় ‘আইনের মুক্ত আকাশ’ সেটা স্বনির্ভর নয় — রাজনীতির চরিত্রের উপর তা দাঁড়িয়ে থাকে।” অর্থাৎ আইন-আদালত যা কিছু নিয়েই আমরা আলোচনা করি না কেন, কোন শক্তির হাতে রাজনীতি — তা আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে। জাতীয় সংসদে কারা বসে আছে — তা দিয়েও আমাদের সংবিধানের পরিবর্তনগুলোকে বুঝতে হবে। ষোড়শ সংশোধনীর আলোচনাও এই প্রেক্ষাপটের বাইরে নয়।

আমরা সুস্পষ্টভাবেই জানি, কারা আমাদের দেশকে পরিচালনা করছে। সংসদে যে ৩৫০ জন সদস্য আছেন তারা কোটি কোটি টাকার মালিক। তাদের হাত ধরেই এ দেশ থেকে গত বছর ৭৪ লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। সংসদে বসা বেশিরভাগ সদস্যদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি-ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আছে। এরা এ দেশের ধনিক শ্রেণির প্রতিনিধি। এই শ্রেণির নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছিল বলে স্বাধীনতার পরে সংবিধানে ‘সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারগুলো’ মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। এরা গত ৪৬ বছরে সংবিধানে যতটুকু ভালো কথা লেখা রয়েছে তার বাস্তবায়ন ঘটায়নি। এদের হাতে পড়ে সংবিধান ১৬ বার কাঁটাছেঁড়া হয়েছে কিন্তু তাতে জনগণের স্বার্থের কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে এই রাজনৈতিক শক্তির হাতে যখন দেশের আইন-বিচার ব্যবস্থা পড়ে তখন তার পরিণতি কী হবে — সেটা খুব সহজেই বোঝা যায়।
তবুও আমরা এগুলো নিয়ে কথা বলছি কেন? এ ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য খুব পরিষ্কার। এই বুর্জোয়া ব্যবস্থায় পরিচালিত সংবিধান জনগণের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাতে পারবে না। এই সত্য ভাষণটি আমরা জনগণের মধ্যে নিয়ে যেতে চাই বারবার। কিন্তু তারপরও সংবিধানের মধ্যে রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের মধ্যে সম্পর্ক, আপক্ষিক স্বাধীনতা এবং জনগণের স্বার্থে পরিচালনার যে ন্যূনতম সুযোগটি থাকে তাকে অক্ষুন্ন রাখার কথাও আমরা বলব। এই স্বাধীনতার জায়গাটুকু খর্ব করলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করব। পাশাপাশি দেশের সকল প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটানোর দাবিও আমরা তুলেছি। মতামত প্রকাশের অধিকার এবং তেমন স্বাধীন পরিবেশ নির্মাণের আকাঙ্খাও সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাই। কেননা আমরা জানি, এই ব্যবস্থার পক্ষে জনগণকে পূর্ণাঙ্গরূপে গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতা প্রদান করা আর সম্ভব নয়। অথচ মানুষ চাইছে আরও উন্নত সামাজিক ব্যবস্থা। এই যে বিরোধ, তার পথ বেয়েই এবং তার সঙ্গে ছেদ টেনেই স্বাধীনতা ও অধিকারের পূর্ণতা অর্জনের সংগ্রাম মানুষকে নিয়ে যাবে উন্নততর সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার দিকে। আমাদের সকল সংগ্রাম সে পথেই ধাবিত করতে হবে। সেটাই আমাদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।
সহায়ক পুস্তিকা/ নিবন্ধ
ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান
বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রসঙ্গে- এসইউসিআই (সি)
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পর্যবেক্ষণে উপেক্ষিত- মিজানুর রহমান খান
ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে অস্থিরতা নয়- কামাল আহমেদ

সাম্যবাদ সেপ্টেম্বর ২০১৭

Check Also

IMG_20171006_170552

অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষ স্মরণে উদ্বোধনী সমাবেশ

সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের চেতনায় পুঁজিবাদবিরোধী লড়াই জোরদার করুন সভ্যতার বয়স কয়েক হাজার বছরের। একদিনের গুহাবাসী মানুষ …