শাসকের কাছে এই চোখের জলের মূল্য নেই

fcda85bf208fc3c053c2789d86c761f8-59dc88af62eab

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ‘ভাত দেবার মুরোদ নাই কিল দেয়ার গোঁসাই।’ বর্তমানে দেশের খেটে খাওয়া মানুষের জন্য এ কথাটা যেন এক মহাসত্য হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রতিনিয়ত জীবন যাপনের খরচ বেড়ে যাচ্ছে, গ্যাস-বিদ্যুৎ-তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে, গাড়ি ভাড়া-বাড়ি ভাড়া লাগামহীন। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠার অবস্থা। এর মধ্যে ‘ভাত দেবার মুরোদহীন’ সরকার যদি মুখের গ্রাসটুকুও কেড়ে নেয় তবে আর থাকে কী?

বলছিলাম বগুড়ার হতদরিদ্র রিকশা শ্রমিকদের কথা। গত ৪ অক্টোবর বগুড়া শহরে যানজট কমানোর অজুহাতে শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিয়েছে প্রশাসন। বিআরটিসি’র পরিকল্পনা হিসাবে তারা বগুড়া শহরে ব্যাটারি চালিত রিকশা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। তাদের যুক্তি হলো — এই রিকশাগুলোর কোনো লাইসেন্স নেই, এদের চলাচল অনিয়ন্ত্রিত, রাস্তায় নানা দুর্ঘটনা ঘটায়, তারা ট্রাফিক জ্যামের অন্যতম কারণ ইত্যাদি। তাই পূর্বঘোষণা ছাড়াই আচমকা অভিযান চালিয়েছে জেলা প্রশাসন। কেবল আটক নয়, গুড়িয়ে দিয়েছে রিকশাগুলো। বাহাদুরের কাজই করেছে বটে!

যদিও জীবনের সম্বলটুকু হারিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠা মানুষগুলো আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কেউ তা জানে না। এই মানুষগুলো প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের হাতে-পায়ে ধরে, কাকুতি মিনতি করেও তাদের আয়ের উৎসকে বাঁচাতে পারেনি। গত ক’দিনে যোগাযোগ মাধ্যমে খবর-ছবিগুলো প্রচারিত হয়েছে। কী ভীষণ কষ্টের, অসহনীয় যন্ত্রণার! হতদরিদ্র এই মানুষগুলোর চোখের নোনা জলের ছবি ছুঁয়ে গেছে অনেককে। কেবল মন গলেনি শাসকদের। অবশ্য তাতে অবাক হবার কিছু নেই। ক্ষমতার মসনদে থেকে মানুষের উপর ছড়ি ঘুরাতে হলে আর শ্রমজীবীদের রক্ত-ঘাম নিংড়ানো সম্পদ আত্মসাৎ করতে হলে তো এমন অমানবিক-ই হওয়া চাই!

কিন্তু কিছু প্রশ্ন সামনে চলে আসে। রিকশাই কি যানজটের মূল কারণ? তা-ই যদি হয়, তবে এই চালকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা কী করা হয়েছে? কেন এই মানুষগুলো রিকশা চালায়? যারা এই রিকশাগুলো বাজারজাত করে তাদের বিরুদ্ধে কি সরকার কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে?

খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এই রিকশা চালকদের বেশিরভাগই গ্রাম থেকে শহরে এসেছে পেট চালানোর দায়ে। উন্নয়নের মহাসমারোহে গ্রামে তেমন কোনো কাজ নেই! কেবল দিনমজুরি করেও সংসার চালানো যায় না। কেননা জিনিসপত্রের দাম শ্রমজীবী মানুষের নাগালের অনেক বাইরে। তাই বাড়তি কিছু আয়ের রাস্তা বের করতে তারা রিকশা চালায়। শহরেই যে সব ধরনের কাজ আছে তাও নয়। রিকশা চালানোর কাজটা একটু বেশি পাওয়া যায়। শরীরের রক্ত পানি করে, পাশবিক পরিশ্রম করেই তবে তারা দুটো টাকা আয় করতে পারে। এই টাকা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে, হয়তো ছেলে-মেয়ের পড়াশুনা আর যৎসামান্য চিকিৎসার খরচটাও। রিকশাটাও হয়তো কোনো এনজিও বা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে কিনে কিংবা প্রতিদিন তিনশ টাকার বিনিময়ে চালাতে পারে। এতকিছু পর যদি সেই উপার্জনের বাহনকে গুড়িয়ে দেয়া হয় তাহলে বেঁচে থাকার অবলম্বন আর থাকে কিছু? এ তো জীবনকেই গুড়িয়ে দেবার শামিল।

যানজটের দায় যে রিকশাওয়ালাদের উপর দেয়া হচ্ছে, তা-ই বা কতটুকু সঠিক? যানজটের তো প্রধান কারণ প্রাইভেট গাড়ির আধিক্য, পাবলিক যানের স্বল্পতা। বগুড়া শহরে তো কোনো পাবলিক যান নেই। এছাড়াও রয়েছে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালনা করা, খানা-খন্দপূর্ণ রাস্তা ইত্যাদি। এগুলোর কোনোটারই ব্যাপারে সরকার উদ্যোগ না নিলেও রিকশাচালকদের উপরই দায় চাপালো। প্রশাসন কি পারবে যানজটের প্রধান কারণ প্রাইভেট গাড়িগুলো বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিতে? পারবে না। কেননা ওই গাড়িতে বসে টাকাওয়ালা ধনিক শ্রেণি। তাদের গায়ে ফুলের টোকাও শাসকরা পড়তে দেয় না।

অথচ মেহনতি মানুষগুলোর রক্ত-ঘামেই চলে আমাদের দেশ। এদের ট্যাক্সের টাকাতেই প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের বেতন-বোনাস আসে। তাদের বিলাসবহুল গাড়ির ডিজেল-পেট্রোলের যোগানও আসে এদের পরিশ্রমের পয়সায়। শ্রমজীবী মানুষরাই দেশের সমস্ত সম্পদ সৃষ্টি করে। কিন্তু তাদের সাথেই গদিতে বসে থাকা একদল সুবিধাভোগী কর্মকর্তা প্রতিনিয়ত নির্মম আচরণ করে! এই আসকারা তারা পায় কোথা থেকে? পায় বিদ্যমান এই ব্যবস্থা থেকেই। যেখানে সংখ্যালঘু সুবিধাভোগীদের জন্য রাষ্ট্রের সমস্ত আয়োজন থাকে। তারা তাঁদের শোষণ বলবৎ রাখার জন্য অযৌক্তিক-অনৈতিক সবকিছুই করতে পারে। আইন-আদালত-প্রশাসন সবই থাকে তাদের অনুগত। এই ব্যবস্থার নাম পুঁজিবাদী ব্যবস্থা।

বগুড়ায় যারা রিকশা গুড়িয়ে দিল, তারা কি একবার ভেবেছে তাদের এক সিদ্ধান্তের বলি হয়ে এতগুলো মানুষ যে পথে বসে যাবে? তাদের যে দিনের পর দিন না খেয়ে, বিনা চিকিৎসায় মরতে হবে? তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ যে ধুলায় মিশে যাবে? না, তারা ভাবতে পারেনি, পারবেও না। শ্রমজীবী মানুষের সাথে সম্পর্কহীন, কেবল জোঁকের মতো রক্ত শোষণ করা শাসকরা কোনোদিন শোষিতের কান্না শুনতে পায় না। তাই তাদের জন্য প্রয়োজন কঠিন প্রত্যাঘাতের। যেদিন চোখের জল কষ্টের নিনাদ নয় বরং তেজের মশাল জ্বালাবে- সেদিনই কেবল নড়ে উঠবে ওই অমানুষদের ক্ষমতার মসনদ। সেজন্য প্রয়োজন সংগঠিত হবার, প্রয়োজন তেমন জাতের সংগঠন। কেননা শাসকরা নিপীড়িতদের কষ্টোপার্জিত সম্পদ আত্মসাৎ করে আনন্দ পেলেও, ভয় পায় তাদের সম্মিলিত শক্তিকে। সেই লক্ষ্যেই আমাদের প্রত্যেকের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। বগুড়ার রিকশা শ্রমিকভাইদেরও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সাম্যবাদ অক্টোবর ২০১৭

Check Also

soviet

সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে সাতটি কল্প কাহিনী — স্টিভেন গাউন্স

২২ বছর পূর্বে ১৯৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায়; মার্কসবাদের …