Breaking News

সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ষড়যন্ত্রে নিজ দেশে পরবাসী লাখো ভারতীয়

IMG_6680

ভারতের আসাম রাজ্যে মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ মুসলিম। অর্থ্যাৎ প্রতি তিনজনে একজন মুসলিম। ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের পর এ অঞ্চলটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল। আসামের ৩৪টি জেলার নয়টি মুসলিম অধ্যুষিত। সেখানকার ৩৫টি প্রাদেশিক পরিষদ আসনের নির্বাচনের ভাগ্য মুসলিম ভোটারদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আসামের নির্বাচনে আসম গণ পরিষদ (এজিপি) এবং বিজেপি এই পরিসংখ্যান ব্যবহার করে আসামের বাংলাভাষী মুসলিমদের অধিকাংশ আসামে অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশী বলে অভিযোগ তুলে তাদের উপর চাপ  সৃষ্টির চেষ্টা করছে।

বিদেশী বিতাড়নের নামে উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী সাম্প্রদায়িক হামলা-মামলাসহ নির্যাতনের পর রাষ্ট্রীয়ভাবে গায়ের জোরে নিজ নাগরিকদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। নতুন করে তথাকথিত এনআরসি বা জাতীয় নাগরিক পঞ্জি তালিকা থেকে বাদ দিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার আসামে উস্কে দিয়েছে সাম্প্রদায়িক সংঘাত – যেখানে আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়। কখনও বলছে ৪০ লাখ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী, কখনও আবার বলছে ৫০ লাখ অনুপ্রবেশকারীতে ভরে গেছে আসাম। তাই তাদের দেশ থেকে বিতাড়ন করতে হবে – এমন হুংকার দিয়ে আসছে দেশটির সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো। যার পেছনে মদদ রয়েছে বর্তমান শাসক দল বিজেপিসহ পূর্বতনরা। 

ভারতের সেভেন সিস্টার খ্যাত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আসামে এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি কারা সৃষ্টি করলো এবং এখান থেকে মুক্তির উপায় কী – তা জানতে একটু পেছনে ফেরা যাক। ১৯৭৯ সালে বৃহত্তর আসামসহ পুরো উত্তর-পূর্ব ভারতে তথাকথিত অনুপ্রবেশের ধুয়া তুলে সৃষ্টি করা হয়েছিল ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা। এসব শক্তির প্ররোচনায় সংবাদমাধ্যমগুলোতে খবর তুলে ধরা হয় বিদেশী তথা বাংলাদেশী নাগরিকে ভরে যাচ্ছে আসাম, ত্রিপুরাসহ পুরো এলাকা। তাই তাদের বিতাড়ন করতে হবে। ভারতবর্ষের নীতি অনুযায়ী যারা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে ভারতে এসেছেন তারাই ভারতীয় নাগরিক। ১৯৭১ সালকে ভিত্তি বছর ধরে নাগরিকত্বের বিষয়টি মেনে নিয়েছিল আসামের রাজনৈতিক দলগুলো। এমনকি ১৯৮৫ সালে ‘আসু’ ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছিল, যা আসাম চুক্তি বলে পরিচিত সেখানেও নাগরিকত্বের ভিত্তি বছর ধরা হয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। স্বদেশি নির্ধারণে দুইবারের মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল কুমার মোহন্তের  শাসনে ৬/৭ বার নাগরিকত্ব পরিচয় দিতে হয়েছে সংখ্যালঘু মুসলিম আসামী জনগোষ্ঠীর। এমনই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে ঐ ১০ বছরের বাংলাদেশী খেদাও আন্দোলন ছাড়া অন্য কোনো কর্মসূচী ছিল না। একদিকে শোষণ-বঞ্চনায় জর্জরিত পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিল্প কল-কারখানা স্থাপন না করায় দ্রুত গতিতে বাড়ে দারিদ্র্য। অন্যদিকে বাড়তে থাকে জাত্যাভিমান। যার ফলাফল হিসেবে উগ্র প্রাদেশিকতাবাদ, পৃথকতাবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রসার ঘটতে থাকে। 

৪০/৫০ লাখ বিদেশী খুঁজতে অনুসন্ধানে  কাজ শুরু করে রাজ্য সরকার। কিন্তু বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরোর মতো উবে যায় লাখ লাখ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীর প্রচারণা। রাজ্য সরকারের অনুসন্ধানে মাত্র ৭/৮ হাজার অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত হয়। সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রোপাগান্ডা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। সত্য প্রকাশিত হওয়ায় চক্রান্ত শুরু হয় মুসলিম সংখ্যালঘুদের কোণঠাসা করতে। ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালে ৩ লাখ ৭০ হাজার মুসলিম আসামবাসীকে সন্দেহজনক ভোটার বা ডি ভোটার  বানানো হয়েছিল। গায়ের জোরে প্রায় ১৪/১৫ বছর তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। পরবর্তীতে আদালতে উপযুক্ত প্রমাণপত্র দেখিয়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ ভোটের অধিকার ফিরে পায়। বাকীদের উপযুক্ত কাগজপত্র থাকলেও দরিদ্র, হতদরিদ্র হওয়ায় আদালতে যেতে পারেনি পয়সার অভাবে। 

এখন নতুন করে বিজেপি ও পারিষদ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থে রাজ্য সরকার হাতে নিয়েছে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি)। যেখানে উপযুক্ত সময় ও কাগজপত্র দাখিলের সুযোগ না পাওয়ায় অনেকেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। বেশির ভাগই শ্রমজীবী হতদরিদ্র, ফলে নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরায় তাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন সমস্ত কাগজ সময় মতো দাখিল করা। ভারতীয় নাগরিক হিসেবে তারা বহু বছর ধরে বসবাস করছে, তাদের সন্তানরা সেখানেই জন্ম গ্রহণ করে স্কুল-কলেজে পড়াশুনা করছে। প্রচলিত বিচাব্যবস্থায় রীতি হচ্ছে, যিনি অভিযোগ করবেন, তাকেই প্রমাণ করতে হবে অভিযোগের সত্যতা। অথচ আসামের ক্ষেত্রে উল্টো আইন চলছে। গেল প্রায় ৪০ বছর ধরে দফায় দফায় নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখালেও নতুন নতুন কৌশলে সমস্যা জিইয়ে রাখা হচ্ছে। অনেকটা নির্বাচনী ট্রাম্পকার্ডের মতো যখন প্রয়োজন তখন বাংলাদেশী খেদাও আন্দোলনকে উস্কে দেওয়া হচ্ছে। 

ভারতের ‘সোশ্যালিস্ট সেন্টার অব ইন্ডিয়া (কমিউনিস্ট)’ বা এসইউসিআই(সি) দলের বাংলা মুখপত্র সাপ্তাহিক গণদাবী পত্রিকার ৫ -১১ অক্টোবর, ২০১৮ সংখ্যায় লেখা হয়েছে – “বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বলেছেন, ‘২০১৯-এ লোকসভা নির্বাচন জিতে সরকার গঠনের পরে আমরা দেশের প্রতিটি কোনা থেকে অনুপ্রবেশকারীদের এক এক করে খুঁজে বের করব এবং বিতাড়ন করব।’ … … প্রচারের জোরে বহু মানুষের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, ‘অন্য রকমের দল’ বলে দাবি করা বিজেপি ক্ষমতায় এলে সত্যিই হয়ত তাঁদের জীবনের সমস্যাগুলির সমাধান করবে। কিন্তু চার বছরের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁরা বুঝে গেছেন, কংগ্রেসের মতো বিজেপিরও মানুষকে আরও মূল্যবৃদ্ধি, আরও বেকারি, আরও ছাঁটাই, আরও বেসরকারিকরণ, আরও দুর্নীতি ছাড়া দেওয়ার কিছু নেই। … … তাঁদের জনবিরোধী শাসনে সাধারণ মানুষের জীবনের সমস্যাগুলি বেড়েই চলেছে। তার অনিবার্য পরিণতিতে মানুষের ক্ষোভও বাড়ছে। বিজেপি নেতারা খুব ভাল করে জানেন, মানুষের এই ক্ষোভ যে কোনও সময় বিক্ষোভের আকারে ফেটে পড়বে এবং তা শেষ পর্যন্ত শাসক হিসাবে তাঁদের বিরুদ্ধেই যাবে। এই বিক্ষোভ আটকাতে … … তাঁরা এবার অনুপ্রবেশকে ইস্যু হিসাবে তুলে এনেছেন। তাঁরা প্রচার করছেন, তোমার চাকরি নেই কেন – অনুপ্রবেশ দায়ী। মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে কেন – অনুপ্রবেশ দায়ী। নতুন কলকারখানা হচ্ছে না কেন – অনুপ্রবেশ দায়ী। বাস্তবে অনুপ্রবেশকে নির্বাচনী ইস্যু করে ভোটে ফয়দা তোলাই তাঁদের আসল লক্ষ্য। … … ধর্মে ধর্মে বিদ্বেষ এবং ঘৃণা তৈরি করে মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে তারা এবার নির্বাচনে জিততে চায়। তাই অনুপ্রবেশের ইস্যুকেই তুরুপের তাস করে মানুষের জীবনকে বাজি রেখে তারা গদির দখল নিতে চায়। বিজেপির এ এক সর্বনাশা ফ্যাসিবাদী পদক্ষেপ।” পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীরা জনগণকে বিভক্ত করতে কিভাবে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে কাজে লাগায় তার উদাহরণ আসামের পরিস্থিতি। 

সবাই জানেন, রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকে না, বহুমত-বহুধর্মের নাগরিকদের নিয়েই গড়ে ওঠে রাষ্ট্র। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার সকল নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই দায়িত্ব অস্বীকার করে চলছে নতুন ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসন।

ইতিহাস-ঐতিহ্যসহ সবকিছু পায়ে দলে গায়ের জোরে ভারতীয় নাগরিকদের অনুপ্রবেশকারী বা বিদেশি বলে বিতাড়নের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করেনি কংগ্রেস, বিজেপিসহ কোনো রাজনৈতিক দল। দুঃখজনক হলেও সত্য, পশ্চিমবঙ্গে টানা ২৪ বছর শাসন করলেও সিপিএমসহ বামপন্থী শক্তিগুলো কংগ্রেস-বিজেপির সুরেই কথা বলেছে। একমাত্র এসইউসিআই (সি) দল শুরু থেকে আসামের এই উগ্র-সাম্প্রদায়িক ও প্রাদেশিকতাবাদী ভ্রাতৃঘাতী ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে। 

এভাবেই আরএসএস, শিবসেনার মতো উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলোর উপর ভর করে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক কর্মকান্ডে মদদ দিয়ে যাচ্ছে শাসক বিজেপি সরকার। 

সাম্যবাদ অক্টোবর ২০১৮

Check Also

cach-mang-tu-san-anh

বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রসঙ্গে

বিভিন্ন বুর্জোয়া রাষ্ট্রের সংবিধানের তুলনামূলক চুলচেরা বিচারে, প্রচুর ফারাক থাকা সত্ত্বেও সকল দেশেই বুর্জোয়ারা এটা …