Breaking News

স্বাধীনতার ৪৭ বছর — গণতন্ত্র কতদূর?

a83b8316b7385c69100c79c0492c6b6f

২৬ মার্চ, দেশ পদার্পণ করবে তার ৪৭ তম স্বাধীনতা দিবসে। স্বাধীনতা দিবস প্রতিবারের মতো এবারেও উদযাপিত হবে মহাআড়ম্বরে। সেদিন ভাষণ হবে, স্মৃতিসৌধে লাইন ধরে ফুল দেবে মানুষ, শহরের বড় বড় ভবনগুলো সাজবে লাল-নীল বাতিতে। স্বাধীনতার দিন যায় আবার আসে! এভাবেই আসে যায় করে স্বাধীনতার ৪৬টি বছর আমাদের কেটে গেল! ৪৭ তম স্বাধীনতা দিবসে আমরা নিজেকে প্রশ্ন করি, কী পেলাম আমরা? গণমানুষের ভাগ্যের কি কোনো পরিবর্তন ঘটেছে এতদিনে?

স্বাধীনতা সংগ্রামকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা অন্যান্য বুর্জোয়া দল ও তাদের বুদ্ধিজীবীরা যেভাবে ব্যাখ্যা করেন —ইতিহাসটা মোটেও সেরকম নয়। ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে পরিচালিত স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশের সকলে একই উদ্দেশ্য নিয়ে লড়েনি। বাংলাদেশের এই মুক্তি সংগ্রামে একদিকে ছিল শ্রমিক, কৃষক, নিম্নমধ্যবিত্ত, ছাত্রসহ সর্বস্তরের শোষিত মানুষ, অন্যদিকে ছিল বাংলাদেশের উদিয়মান বুর্জোয়াশ্রেণি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এই দুই শ্রেণির লক্ষ্যও ছিল ভিন্ন। শোষিত মানুষের লক্ষ্য ছিল সকল প্রকার শোষণ থেকে মুক্তিলাভ, আর উঠতি বুর্জোয়াশ্রেণি, যারা স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের লুটের বাজারে নগণ্য হিস্যাদার ছিল, তাদের উদ্দেশ্য ছিল কোনোরকমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতাটি দখল করার মাধ্যমে সেই বাজারে একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।

বাংলাদেশের শ্রমিকশ্রেণি এই দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় বুর্জোয়া শ্রেণির দল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের মাধ্যমে দেশের বুর্জোয়া শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতা করায়ত্ত করে এবং এখানে একটি স্বাধীন বুর্জোয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। জন্মের পরপরই এই দেশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জোট নিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করে, যা সেসময়ে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত পুঁজিবাদী দেশগুলি অনুসরণ করত। স্বাধীনতার পর দেশের বড় বড় শিল্প কারখানাগুলো জাতীয়করণ করা হলেও উদ্দেশ্য ছিল পুঁজিবাদকে আরও সংহত করা। দেশের অভ্যন্তরে ব্যক্তিপুঁজির পারস্পরিক দ্বন্দ্বকে কমিয়ে সামগ্রিকভাবে জাতীয় পুঁজির প্রতিযোগিতার শক্তি বাড়ানোর জন্যই পুঁজিবাদের স্বার্থেই এই জাতীয়করণ করা হয়েছিল। সেখানে উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল সর্বোচ্চ মুনাফা এবং উৎপাদন সম্পর্ক ছিল মালিক-শ্রমিকের। এই জাতীয়করণে রাষ্ট্রীয় পুঁজির একটা জাতীয় পোশাক পড়ানো থাকে, তা জনগণের মধ্যে আরও বেশি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং জাতীয় স্বার্থের কথা বলে জনগণকে আরও নির্মমভাবে শোষণ করে। কার্যত এটি ফ্যাসিবাদের অর্থনৈতিক ভিত্তিকেই পাকাপোক্ত করে।

স্বাধীনতার পর একদিকে দেশ ইতোমধ্যে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক শোষণে বিপর্যস্ত, তার উপর যুদ্ধের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি। এরপর যখন দেশের সরকার বিশ্বপুঁজিবাদের চরম সংকটকালে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে দেশ পরিচালনা করে এবং পুঁজিপতি ও কায়েমী স্বার্থবাদীদের দেশ পরিচালনায় প্রাধান্য দেয় — তখন দেশে এক চূড়ান্ত অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। তার উপর কালোবাজারি, অসাধু ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী-আমলা-আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অবাধ প্রশ্রয় দেয়ার ফলে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়। ভয়াবহ খাদ্যসংকট সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্র বাজেট ঘাটতিতে পড়ে বেশি করে নোট ছাপাতে থাকে ও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়। শুরু হয় মুদ্রাস্ফীতি। সাথে সাথে চলতে থাকে দেশি-বিদেশি লুটপাট, বিদেশে অর্থ পাচার, বৈদেশিক মুদ্রার কালোবাজার। মানুষের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। বিক্ষোভ বাড়তে থাকে এবং তখন একে দমনের জন্য রাষ্ট্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে ব্যাপক দমন শুরু করে, ন্যূনতম মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারেরও গলা টিপে ধরে। পুলিশ প্রশাসনের সাথে যুক্ত হয় রক্ষীবাহিনী। রক্ষীবাহিনী গ্রেফতারের পর বিচারের বিষয় ছিল না। হাজার হাজার মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করে রক্ষীবাহিনী। ১৯৭৪ সালে দেশে রাষ্ট্রপতির শাসন ব্যবস্থা জারি করা হয়। সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে দিয়ে একটিমাত্র রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়। সরকারি পত্রিকা ব্যতীত আর সকল পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা খর্ব করা হয়। এইভাবে দেশ এক চূড়ান্ত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে চরম দেউলিয়াত্বের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়।

এই হলো দেশের শুরু। এরপর ক্যু, পাল্টা ক্যু, হত্যা, পাল্টা হত্যা — প্রথমে জিয়াউর রহমান ও তারপর এরশাদের স্বৈরাচারী সামরিক সরকার ক্ষমতায় এলো। এরশাদের স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন করে, অনেক প্রাণ দিয়ে নির্বাচনের দাবি আদায় করল মানুষ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাস্তবে ১৯৯১ সালেই একটা আপেক্ষিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকে দেশ গেল। এর আগে ১৯৭৩ সালে একটি নির্বাচন হয়েছিল। সেটাও ব্যাপক কারচুপি আর দখলদারিত্বের মধ্য দিয়ে হয়েছিল। সামরিক সরকারগুলোর সময়ে যে নির্বাচনগুলো হয়েছিল সেগুলোকে তো কোনভাবেই ন্যূনতম গণতান্ত্রিক বলা যায় না। ফলে স্বাধীনতার ২০ বছর পরই বাস্তবে একটা নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচন দেশে হলো। মানুষ মনে করেছিল এবার তাদের ভাগ্যের কিছুটা পরিবর্তন হবে, কারণ অন্তত আনুষ্ঠানিক অর্থে দেশে একটা সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলো। এতে হয়তো খানিকটা হলেও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে। জনগণের প্রতিবাদ করার মৌলিক অধিকারগুলোকে খর্ব করা হবে না।

কিন্তু মানুষের সে আশা ভেঙে যেতে বেশি সময় লাগল না। ১৯৯১ থেকে শুরু করে বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ পালা করে দেশ শাসন করেছে, মানুষ একদলের শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে আরেক দলকে ভোট দিয়েছে, কিন্তু তাতে ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। দু’দলেরই নির্বাচনে একবার জিতলে ক্ষমতা না ছাড়ার মনোভাব বারে বারে সংকট নিয়ে এসেছে। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়েছে। দু’বছর জরুরি অবস্থা থাকার পর ২০০৯ -এ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় যায়। ২০১৪ -তে একটি একদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসেছে। এই অন্যায় শাসনকে টিকিয়ে রাখার জন্য চূড়ান্ত ফ্যাসিস্ট ভূমিকা গ্রহণ করেছে। এটাকে এখন আর ভেঙে বলার প্রয়োজন রাখে না। এসব ইতিহাস সবাই জানেন। এই তো গণতন্ত্র! দেশ স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার করেছে, কিন্তু বুর্জোয়া অর্থেও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ সে তৈরি করতে পারেনি। বুর্জোয়াদের গোষ্ঠীগত সংঘাত এখানে এত তীব্র যে, ৫ বছর পরপর লুটপাট কে করবে তা ঠিক করার জন্য বুর্জোয়া দেশগুলোতে যে নির্বাচন হয়, শান্তিপূর্ণ ভাগাভাগি হয়, সেই ন্যূনতম পরিবেশ তারা এখনও সৃষ্টি করতে পারেনি।

৪৬ বছরের এই পুঁজিবাদী শোষণে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ক্রমাগত বেড়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এক ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বিতীয়বারের মতো মতায় আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। সংসদীয় গণতন্ত্রের চিহ্নটুকুও এখন আর নেই। ফলে দমন-পীড়ন-লুটপাটের মধ্য দিয়ে চরম ফ্যাসিবাদী শাসন সে কায়েম করে রেখেছে। বিরোধীদলগুলোকে রাজনৈতিকভাবে সর্বস্বান্ত করার এক মাস্টার প্ল্যান হাতে নিয়েছে সরকার। যেন আওয়ামী লীগ ছাড়া কারোরই দেশে থাকবার অধিকার নেই। প্রতিবাদ করলেই স্বাধীনতাবিরোধী তকমা লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে। সরকারের কিছু ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিছু টাকা, প্রতিষ্ঠা আর বড় বড় কিছু পদ পাওয়ার লোভে আওয়ামী লীগের নেতাদের পায়ের কাছে পড়ে থাকতে পারেন এমন লোকেরা ঠিক করে দিচ্ছেন কে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি, কে স্বাধীনতার বিপক্ষে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কীভাবে লেখা হবে তাও তারা ঠিক করে দিচ্ছেন। এর বাইরে কিছু লেখা যাবে না, লিখলে তা হবে আইনের বিরোধী। পাঠ্যপুস্তকের পিছনে লিখে দেওয়া হচ্ছে ‘শিক্ষা দিয়ে গরবো দেশ, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ’। দেশ যেন সম্পূর্ণ আওয়ামী লীগের। এই হচ্ছে আজকে ৪৭ তম স্বাধীনতা দিবসে দেশের অবস্থা, এই হচ্ছে ৩০ ল মানুষের প্রাণের বিনিময়ে প্রাপ্ত স্বাধীনতার মূল্যায়ন। অথচ জয় বাংলা স্লোগান চলছে ঘরে বাইরে। স্বাধীনতার পরে শক্তি বলে নিজেদের মুখে ফেনা তুলছে আওয়ামী লীগ।

কাজেই স্বাধীনতার চেতনা বাস্তবায়ন করে একটি শোষণহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন বামপন্থীদের নেতৃত্বে জনগণের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং বর্তমান আওয়ামী ফ্যাসীবাদকে তীব্র গণতান্ত্রিক গণআন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিহত করা।

সাম্যবাদ মার্চ ২০১৮

Check Also

59822-004-3BE11980

মার্কস স্মরণে — পল লাফার্গ

[এ বছর সর্বহারা শ্রেণির মুক্তি সংগ্রামের পথপ্রদর্শক মহান কার্ল মার্কসের ২০০তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে বছরব্যাপী …