Monday, April 13, 2026
Homeফিচারআমেরিকার সাথে ড. ইউনুস সম্পাদিত দেশবিরোধী চুক্তি বাতিল কর

আমেরিকার সাথে ড. ইউনুস সম্পাদিত দেশবিরোধী চুক্তি বাতিল কর

গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক দুইদিন আগে দেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন কালো চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ডক্টর ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আমেরিকার সাথে সম্পাদিত ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতি, কৃষি, বাণিজ্য, পররাষ্ট্রনীতিকে হুমকির মধ্যে ফেলা হয়েছে। ইউনুস সরকার তড়িঘড়ি করে এবং কঠোর গোপনীয়তার সাথে এই চুক্তি সম্পাদন করে।

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বাণিজ্য যুদ্ধের অংশ হিসেবে বাংলাদেশী সকল পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন, এর আগ পর্যন্ত যা গড়ে ১৫ শতাংশ ছিল। নতুন এই শুল্ক আরোপের ফলে পোশাক রপ্তানি ব্যবসায়ীদের মধ্য শঙ্কা সৃষ্টি হয়। এরপর থেকেই সরকার এবং ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার স্বার্থে যেকোন মূল্যে আমেরিকার সাথে সমঝোতায় যেতে চায়। ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে দেন—দরবার করে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে চুক্তি সম্পাদন করা হয়।
এই নতুন চুক্তির ফলে আমেরিকা তার শুল্ক কমিয়ে ১৯ শতাংশ করেছে, কিন্তু বিনিময়ে দীর্ঘস্থায়ীভাবে বাংলাদেশকে নানা শর্তে জিম্মি করার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করেছে। বাংলাদেশ এ ব্যাপারে তার সম্মতিও দিয়ে এসেছে।

এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী —
১. বাংলাদেশকে আমেরিকার কাছ থেকে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম কিনতে হবে। অন্য দেশ (যেমন- চীন, রাশিয়া) থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা কমাতে হবে।
২. আমেরিকার জন্য ঝুকিপূর্ণ কোন দেশ থেকে নতুন করে পারমাণবিক চুল্লী, জ্বালানি ইত্যাদি কেনা যাবে না। বাংলাদেশ চীন, রাশিয়ার মত দেশের সঙ্গে কোন অর্থনৈতিক চুক্তি করলে আমেরিকা এই চুক্তি বাতিল করে শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করবে।
৩. আমেরিকা যদি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অন্য কোন দেশের বিরুদ্ধে সীমান্ত বা বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেয় তাহলে বাংলাদেশকেও ‘পরিপূরক বিধিনিষেধ’ আরোপ করতে হবে।
৪. চুক্তির শর্তানুযায়ী বাংলাদেশকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি (এলএনজি), ১৫টি বোয়িং বিমান, প্রতিবছর সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের কৃষি পণ্য (গম, সয়াবিন, গরু মাংস ইত্যাদি) কিনতে হবে। আমেরিকার প্রায় ৪ হাজার ৪০০টি পণ্য বিনাশুল্কে আমদানি করতে দিতে হবে। এভাবে কয়েক লক্ষ কোটি টাকার পণ্য কেনার বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে। যা দেশের ওপর নতুন করে বৈদেশিক ঋণের বোঝা বাড়াবে।
৫. বাংলাদেশকে বন্দর, টার্মিনাল ও জাহাজ পরিচালনায় এমন ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে যেন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোন দেশ তথ্য না পায়। মার্কিন পণ্য যাতে অন্য দেশে রপ্তানি না হয় তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য পর্যবেক্ষণের জন্য কাস্টমস লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য স্ক্রিন শেয়ার করতে হবে। এধরনের শর্ত দেশের অর্থনীতির উপর মার্কিন নজরদারি বৃদ্ধি করবে।
৬. যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা সামগ্রী, ঔষধ, কৃষিপণ্য দেশে কোন পরীক্ষা ছাড়াই আমদানির অনুমতি দিতে হবে। যা দেশের নিরাপত্তা ও মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াবে।

উপরোক্ত শর্তগুলো দেখলে যেকোন বিবেকবান মানুষ বুঝবেন কীভাবে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া হয়েছে। আমেরিকা ইরান, ভেনেজুয়েলা, ফিলিস্তিনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সামরিক হামলা করছে। লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করছে। বিভিন্ন দেশের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোটি কোটি মানুষকে মানবেতর জীবনে ঠেলে দিচ্ছে। চীন, রাশিয়া, ইউরোপের দেশগুলোর সাথে আমেরিকার দ্বন্দ্ব ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতে আমেরিকার সাথে এমন নতজানু এবং তাঁবেদারি চুক্তি বাংলাদেশকে ভয়াবহ বিপদের দিকে ঠেলে দিবে। পনের বছর আমরা দেখেছি আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার দেশের স্বার্থ বিকিয়ে বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী দেশ বিশেষত ভারতের সাথে বিভিন্ন চুক্তি করেছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম দাবি ছিল দেশবিরোধী সকল চুক্তি বাতিল করতে হবে। সকল বৈদেশিক চুক্তি সংসদে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে ও জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু হাজারো ছাত্র জনতার প্রাণের বিনিময়ে সংঘটিত অভ্যূত্থানের মধ্যে দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এই জনদাবী উপেক্ষা করে একের পর এক সিদ্ধান্ত, বিশেষত: আমেরিকার স্বার্থসংশ্লিষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা ক্ষমতা গ্রহণ করে চট্টগ্রাম বন্দর, লালদিয়া—পাঁনগাও টার্মিনাল ইজারা দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। মায়ানমারে মানবিক করিডোর দেয়ার নামে দেশকে যুদ্ধের দিকে নিতে চেয়েছে। জনগণ, বিশেষত বামপন্থীদের আন্দোলনের চাপে কিছু সিদ্ধান্ত তারা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। সর্বশেষ নির্বাচনের আগ মূহুর্তে তড়িঘড়ি করে এই কালো চুক্তি করেছে। বাসদ (মার্কসবাদী) দলসহ বামপন্থী দেশপ্রেমিক জনগণ এই চুক্তি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছে। নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকার এই চুক্তি বাতিলের কোন পদক্ষেপ এখনও গ্রহণ করে নাই। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে নবনির্বাচিত সরকার দেশের স্বার্থ দেখবে নাকি ইউনুস সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার পদলেহন করবে— তা তাদেরকেই নির্ধারণ করতে হবে। তা না হলে দেশপ্রেমিক জনগণ আন্দোলনের মাধ্যমে সকল কালো চুক্তি বাতিলে সরকারকে বাধ্য করবে।

RELATED ARTICLES

আরও

Recent Comments