গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর দেশের জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে অগণতান্ত্রিক—অবৈধ পন্থায় ক্ষমতা দখল করে রেখেছিল। পুলিশ ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে একতরফা নির্বাচন, রাতের ভোট, ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছিল। যার ফলশ্রম্নতিতে গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয় এবং দেড় সহস্রাধিক মানুষের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।
বিগত দেড় বছরের বেশি সময় অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে পারেনি। দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাজারে হামলা, প্রথম আলো—ডেইলি স্টারে আগুন দেয়াসহ ‘মব সন্ত্রাস’ জনজীবন ত্রস্ত্র করে রেখেছিল। এসব ঘটনায় সরকারের দৃশ্যমান তৎপরতা ছিল না। ফলে একটা আশঙ্কা ছিল যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংসদ নির্বাচন কতটা সুষ্ঠুভাবে করতে পারবে। কিছু জায়গায় জাল ভোট, কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা, হামলা—পাল্টা হামলা, পোলিং এজেন্ট বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটলেও সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিজয়ী ও পরাজিত সকল দলই রায় মেনে নিয়েছেন।
গণঅভ্যুত্থানে শুধু শেখ হাসিনা সরকারের পতন নয়, রাষ্ট্রের সংস্কারেও জনগণের আকাঙ্খা ছিল প্রবল। সংস্কার কার্যক্রমে অন্তবর্তী সরকার সঠিক প্রক্রিয়া অবলম্বন না করে সাংবিধানিক সংস্কার প্রশ্নে গণভোটের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে এবার একইসাথে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নির্বাচনে সকল দল সমান সুযোগ পাবে, টাকা—মিডিয়া—পেশীশক্তির দাপট কমবে — অভ্যুত্থান পরবর্তীকালে এটাই প্রত্যাশা ছিল। সেটা আমরা দেখতে পেলাম কি? বাস্তবে প্রচার মাধ্যম, বিপুল টাকা, ধর্ম ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে দেশের জনগণকে দুই মেরুতে ঠেলে দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করে কোনো না কোনো পুঁজিপতিদের দলকে সমর্থন করতে বাধ্য করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় বিএনপি প্রায় দুই তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে।
বিগত নির্বাচন কেমন ছিল
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছিল। জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পর্যন্তÑসবগুলোর ফলাফলই তাদের ইচ্ছা অনুসারে হতো। ফলে অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রের মতো দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিও ছিল দীর্ঘদিনের। অন্তবর্তী সরকার ‘নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন’ গঠন করেছিল। কিন্তু সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সংস্কার সম্পন্ন করেনি। উল্টো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে জামানতের বিধান ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়। ফলে প্রথমত, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা কারও পক্ষে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়াই কঠিন করে তোলা হয়।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচন আপেক্ষিকভাবে শান্তিপূর্ণ হলেও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র ছিল অসম। এই অসমতা রাষ্ট্রক্ষমতার শ্রেণিগত বিন্যাসের স্বাভাবিক ফল। যে রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসনিক কাঠামো এবং অর্থনৈতিক প্রভাববলয়ের নিকটবর্তী, তারা নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় স্বাভাবিকভাবেই অগ্রাধিকার পায়। ফলে নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে বহুদলীয় হলেও বাস্তবে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ থাকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক—অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে। অর্থাৎ ভোট হয়েছে, কিন্তু যে কোনো প্রতিযোগিতার যে নীতি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’— নির্বাচন কমিশন তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
তৃতীয়ত, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরেও একটি অস্বাভাবিক আর্থিক গতিশীলতা লক্ষ্য করা গেছে, যা নির্বাচনী রাজনীতিতে কালোটাকার ব্যবহার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে এসেছে, ততই ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে নগদ অর্থের প্রবাহ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে যা নির্বাচনী ব্যয়ের বাস্তব চরিত্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে (ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি) দেশে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে নির্বাচনী প্রচারণা, কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং মাঠপর্যায়ের ব্যয় মেটাতে প্রার্থীদের বড় অংশ নগদ অর্থ উত্তোলন করেছেন, যার ফলে এই অস্বাভাবিক নগদ প্রবাহ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনে পোস্টার, মিছিল, পরিবহন, কর্মী ভাতা, স্থানীয় প্রভাব বিস্তার, জনসংযোগ কিংবা ভোটার ব্যবস্থাপনার বড় অংশই নগদ অর্থের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে বিপুল অর্থ নির্বাচনী মাঠে প্রবেশ করে, যার উৎস স্বচ্ছ নয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, নির্বাচনের আগে মানুষের হাতে হঠাৎ নগদ অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া সরাসরি নির্বাচনী ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং এখান থেকেই কালোটাকার ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়।
সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আবারও দেখিয়েছে যে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি ক্রমশ পুঁজিনির্ভর হয়ে উঠছে। নির্বাচনে বিপুল অর্থব্যয়, কালোটাকার ব্যবহার, ধর্মের ব্যবহার এবং স্থানীয় পেশিশক্তির সক্রিয়তা প্রমাণ করে যে বুর্জোয়া সংসদীয় রাজনীতি আদর্শের নয়, বরং বিনিয়োগের ক্ষেত্র। এখানে প্রার্থী হয়ে ওঠে বিনিয়োগকারী। নির্বাচনে ব্যয় করা অর্থ পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের প্রবণতা তৈরি করে, যা দুর্নীতি ও লুটপাটের কাঠামোগত ভিত্তি শক্তিশালী করে। ফলে সংসদ জনগণের প্রতিনিধিত্ব হারিয়ে ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক শ্রেণির আধিপত্যে চলে যায়।
এই সংসদেও ব্যবসায়ী—পুঁজিপতিদের আধিপত্য
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান ক্রমশ: ধনী ও ব্যবসায়ী শ্রেণির নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত ২৯৭ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২৭১ জনই কোটিপতি, যা মোট সদস্যের প্রায় ৯১.২৫ শতাংশ। অর্থাৎ জাতীয় সংসদে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ শ্রমিক, কৃষক, নিম্নবিত্ত কিংবা সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর বাস্তব সামাজিক অবস্থানের প্রতিফলন প্রায় অনুপস্থিত। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সংসদ সদস্যদের প্রায় অর্ধেকেরই বিপুল অঙ্কের ব্যক্তিগত দায় বা ঋণ রয়েছে, যার মোট পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। এই বিপুল ঋণনির্ভর সম্পদ রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ব্যবসায়িক স্বার্থের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককেই সামনে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে সংসদে সরাসরি গার্মেন্টস শিল্পের অন্তত ১৫ জন মালিকের উপস্থিতি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে যেখানে শ্রম আইন, ন্যূনতম মজুরি, শ্রমিক নিরাপত্তা কিংবা রপ্তানিমুখী শিল্পনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেখানে নীতিনির্ধারক যদি নিজেরাই বড় শিল্পপতি হন, তবে সেই আইন কতটা শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে দাঁড়াবে? বাস্তবতা হলো, যখন রাষ্ট্রক্ষমতা সম্পদশালী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন নীতি প্রণয়ন জনকল্যাণের পরিবর্তে পুঁজির সুরক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে প্রশ্নটি কেবল ব্যক্তিগত সম্পদের নয়; গণতন্ত্রের চরিত্র সম্পর্কিত। জাতীয় সংসদ কি জনগণের আশা—আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করবে, নাকি কোটিপতি ব্যবসায়ী শ্রেণির অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় পরিণত হবে? এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক নয় কি!
বিএনপি—জামায়াতকে কেন্দ্র করে মেরুকরণ
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতার লড়াই দীর্ঘদিন ধরেই দুটি প্রধান ধারার রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যেই আবদ্ধ থেকেছে। অতীতে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচন আবর্তিত হতো আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই পুরোনো মেরুকরণের কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে নতুন এক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক বিভাজনের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতে ইসলামী একটি কৌশলগত রাজনৈতিক বয়ান সামনে আনে—বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশে পুনরায় চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতাচর্চার বিস্তার ঘটবে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এই বক্তব্য সমাজের একটি অংশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং তারা বিএনপির বিকল্প হিসেবে জামায়াতের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। অর্থাৎ রাজনৈতিক অসন্তোষকে ব্যবহার করে জামায়াত নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা পুনর্গঠনের চেষ্টা চালায়।
কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের গভীরতম দ্বন্দ্বটি প্রকাশ পায়। কারণ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার বিরোধিতা, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার ঐতিহাসিক দায় জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে সমাজের গণতান্ত্রিক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ও প্রগতিশীল অংশ জামায়াতের উত্থানকে সম্ভাব্য বিপদ হিসেবে বিবেচনা করে। অতীতে এই ভয় থেকে অনেকে আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকেছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের উপস্থিতি না থাকায় একটা অংশ এবার জামায়াতকে ঠেকানোর যুক্তিতে বিএনপির দিকে অবস্থান নেয়।
ফলে দেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্র আবারও একটি বিভাজনের মধ্যে আটকে যায়—একদিকে জামায়াতবিরোধী অবস্থান, অন্যদিকে বিএনপিকে নিয়ে আশঙ্কা। জনগণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আদর্শ, নীতি বা সামাজিক রূপান্তরের প্রশ্নে নয়; বরং আবারো ‘মন্দের ভালো’ নির্বাচন করার মানসিকতায় নির্ধারিত হতে থাকে। এই পরিস্থিতি গণতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থে বিকশিত না করে বরং সংকুচিত করে, কারণ জনগণ ইতিবাচক রাজনৈতিক বিকল্পের বদলে প্রতিরোধমূলক ভোটের রাজনীতিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তির বিকাশ কোনো একক দলের সৃষ্টি নয়। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগ যেমন রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কারণে বিভিন্ন সময়ে ধর্মভিত্তিক শক্তিকে প্রশ্রয় দিয়েছে, তেমনি বিএনপিও তাদের রাজনৈতিক জোট ও ক্ষমতার কৌশলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে বৈধতা দিয়েছে। ফলে মৌলবাদ কেবল বিরোধী শক্তি হিসেবে নয়, বরং বড় বড় দলগুলোর আশ্রয় প্রশ্রয়েই জায়গা তৈরি করেছে। ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক সমর্থন ও রাজনৈতিক সংগঠন সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিকে দুর্বল করেছে।
গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন মানুষ এসব দেখে এক আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ইতিহাসের শিক্ষা প্রমাণ করে যে, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লড়াই মানেই কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা নয়। ধর্মনিরপেক্ষতা কথার যথার্থ অর্থ হচ্ছে রাজনীতি, রাষ্ট্র, শিক্ষা, আইন, কানুন ইত্যাদির সাথে ধর্মের সম্পর্ক থাকবে না। ধর্ম পালনের অধিকার মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত ইউরোপের নবজাগরণ থেকে আসা এই চিন্তা আমাদের দেশ এবং উপমহাদেশে চর্চা করা হয়নি। ফলে ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, জাত—পাত এই বিষয়গুলো ধুরন্ধর রাজনৈতিক শক্তির ক্ষমতা লাভের হাতিয়ার হয়ে জনসাধারণের একতাকে ছিন্ন করতে পারছে। সাম্প্রদায়িকতা রুখতে গেলে গরীব—মেহনতি মানুষের উপর নেমে আসা একের পর এক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইকে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আদর্শিক লড়াইয়ের সাথে যুক্ত করতে হবে। জনগণকে সংগঠিত করে ক্রমাগত এই অর্থনৈতিক আক্রমণের বিরুদ্ধে জঙ্গি আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। শুধু কনভেনশন, মিটিং, মিছিলের কর্মসূচী দিয়ে এই আক্রমণ রোখা যাবে না। আজকের দিনে রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার মর্মবস্তুকে হাতিয়ার করে বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক মানুষের ঐক্যের ভিত্তিতে এই আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে। বিগত সময়ে শাসন ক্ষমতায় থাকা প্রত্যেক দলের সাথেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সম্পর্ক গভীর। ভোটের রাজনীতি যারাই করেন, এই কাজ তারা জেনেবুঝেই করেন। ফলে ভোটের মাধ্যমে নয়, সাম্প্রদায়িকতাকে মোকাবেলা করতে হবে এর বিরুদ্ধে আদর্শিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে তীব্র করে।
মৌলিক অধিকারের শর্তহীন সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে সংস্কার করতে হবে
গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্র ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার, যাতে ক্ষমতার কাঠামো জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক হয় এবং নাগরিক অধিকার বাস্তব অর্থে নিশ্চিত হয়। কিন্তু সামনের দিনে এই সংস্কার কতটা বাস্তবায়িত হবে— তা নিয়ে জনমনে স্পষ্ট উদ্বেগ আছে। এই আশঙ্কার বাস্তব রাজনৈতিক ভিত্তিও রয়েছে। বিশেষত যখন ৯০—এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তিন জোটের রূপরেখা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগ— কেউই বাস্তবায়ন করেনি। কিন্তু তারা ক্ষমতায় ছিল। এর ফলে জনগণের মনে এই আশঙ্কা থাকা স্বাভাবিক যে, তারা কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে হাঁটবে, নাকি বিদ্যমান ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবস্থাকেই বজায় রাখবে।
শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ, নারী সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনা এবং মৌলিক অধিকারসমূহের শর্তহীন সাংবিধানিক স্বীকৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপি কিংবা জামায়াতসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কেউই অবস্থান গ্রহণ করেনি। অন্যদিকে ঐকমত্য কমিশনে যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিক দায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে যদি কোনো রাজনৈতিক শক্তি গড়িমসি করে বা পিছিয়ে যেতে চায়, তাহলে জনগণের পক্ষের শক্তিগুলোকে নীরব দর্শক হয়ে থাকা চলবে না। গণভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে জনগণকে সঙ্গে নিয়েই সংস্কারের দাবিতে ধারাবাহিক গণচাপ ও গণআন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে সংস্কার কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রম্নতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব রাষ্ট্রীয় রূপান্তরে পরিণত হয়।
জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, ন্যায়বিচারের দাবি এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল— তা এখনও সমাজের ভেতরে সক্রিয় ও জীবন্ত রয়েছে। কিন্তু যেহেতু এটা বিপ্লব নয়, রাষ্ট্রক্ষমতার মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি — ফলে শাসকগোষ্ঠী মূলত সেই পুরোনো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে। এখানে পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থই নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। ফলে ক্ষমতাসীন দল ক্রমান্বয়ে এমন সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে, যা সাধারণ জনগণের জীবনসংগ্রাম, দ্রব্যমূল্যের চাপ, কর্মসংস্থানের সংকট কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নকে উপেক্ষা করে ধনিকগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণকেই অগ্রাধিকার দেয়। এর স্বাভাবিক ফল হিসেবে জনঅসন্তোষ ও বিক্ষোভ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাবে, যার প্রাথমিক লক্ষণ ইতোমধ্যেই সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে দৃশ্যমান।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— গণঅভ্যুত্থানের যে অসম্পূর্ণ আকাঙ্ক্ষা সমাজে রয়ে গেছে, তা কোন রাজনৈতিক শক্তি ধারণ করবে। ইতিহাস দেখায়, যখন গণমানুষের ন্যায্য দাবি সংগঠিত রাজনৈতিক রূপ পায় না, তখন সৃষ্টি হয় এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা। আর এই শূন্যতার সুযোগই গ্রহণ করে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তিগুলো, যারা জনগণের বাস্তব অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান না দিয়ে আবেগ, ধর্মীয় বিভাজন এবং পরিচয়ের রাজনীতিকে ব্যবহার করে সমাজকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করে। ফলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শক্তি দুর্বল হয় এবং রাষ্ট্র আরও প্রতিক্রিয়াশীল পথে অগ্রসর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এমন বাস্তবতায় দেশের জনগণের করণীয় অত্যন্ত স্পষ্ট।
প্রথমত, শুধুমাত্র ক্ষমতার পালাবদলের প্রত্যাশায় সীমাবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার চরিত্র সম্পর্কে সচেতন রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, কৃষক, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর বাস্তব দাবির ভিত্তিতে বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে সংগঠিত ও শক্তিশালী করার সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে।
তৃতীয়ত, আমেরিকা, ভারতসহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর আগ্রাসন ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, গণতান্ত্রিক, যুক্তিবাদী, অসাম্প্রদায়িক জনগণের ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শক্তি গড়ে তুলতে হবে।
গণতন্ত্র কেবল নির্বাচননির্ভর কোনো প্রক্রিয়া নয়; এটি জনগণের অর্থনৈতিক অধিকার, সামাজিক মর্যাদা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ধারাবাহিক সংগ্রামের ফল। ফলে গণঅভ্যূত্থানের আকাঙ্খা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণ, গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতা এবং জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক শক্তিকে শক্তিশালী করা।
