শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়-
ফ্যাসিবাদের বিলোপ ও বৈষম্যহীন সমাজের জন্য চাই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন।
শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই শক্তিশালী করতে বাসদ (মার্কসবাদী)-কে কাঁচি মার্কায় ভোট দিন।
আওয়ামী লীগের ভয়াবহ ফ্যাসিবাদী শাসনে অবসান ঘটালো রক্তস্নাত জুলাই গণঅভ্যুত্থান। প্রায় দেড় হাজারের অধিক মানুষের প্রাণের বিনিময়ে এই গণঅভ্যুত্থান বিজয়ী হয়েছে। প্রায় ২৫ হাজার লোক আহত হয়েছেন, ছয়শত লোক তাদের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে প্রহসনের তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনগুলোতে মানুষকে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দেয়া হয়নি। একদিকে দেশের জাতীয় সম্পদ ও ব্যাংক লুটপাট, সীমাহীন দুর্নীতি, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, জীবন-জীবিকা ধ্বংস, খুন-বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিবাদের ন্যূনতম শক্তিকে স্তব্ধ করে দেয়া; অন্যদিকে মানুষকে তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে তাদের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারকে কেড়ে নেয়া- এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। গণঅভ্যুত্থান ছিল এসবের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদ।
সেই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের মনে যে বিরাট আকাঙ্ক্ষা ও উৎসাহ থাকার কথা, সেটা নেই। বরং মানুষের মনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। মাজার-খানকাহ্-মন্দিরসহ ভিন্ন মত ও পথের মানুষের ধর্ম ও সংস্কৃতির উপর আক্রমণ এবং বীভৎস হত্যাকাণ্ড, নারীদের উপর শারীরিক আক্রমণ ও অনলাইন ব্যাশিং হাতেনাতে প্রমাণ করছে যে- ফ্যাসিবাদ যায়নি, গিয়েছে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্বকারী একটি দল। ব্যবস্থাটি বেশ ভালমতোই টিকে আছে, এর প্রতিনিধিত্বকারী পাল্টেছে মাত্র।
শুধু সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংকটই নয়, গণঅভ্যুত্থানের পরে মানুষের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদাও নিশ্চিত করতে পারেনি রাষ্ট্র। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। গরীব-নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত মানুষ তাদের অসহ্য জীবনযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পায়নি। এর কোন চেষ্টাও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার করেনি। দেশের মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশের মালিকানা সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে। এর মধ্যে শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর কাছেই রয়েছে মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। দেশের অর্ধেক অর্থাৎ ৫০ শতাংশ মানুষ মাত্র ৪.৭ শতাংশ সম্পদের মালিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রায় ৯ থেকে ১১ হাজার কোটি টাকার নতুন ব্যাংক হিসাব যুক্ত হয়েছে, যার সংখ্যা বর্তমানে মোট ১ লাখ ২৮ হাজার ছাড়িয়েছে। একইসাথে দরিদ্র ও কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি বৈষম্যবৃদ্ধির এক চূড়ান্ত নিদর্শন, যা স্বাধীনতার পর থেকেই চলমান এবং গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়েও এর কোন ব্যতিক্রম হয়নি। ফলে বোঝাই যায়, আওয়ামী লীগ সরে গিয়ে যারাই আসুক, রাষ্ট্র পরিচালনা করে সেই ১০ শতাংশ ধনী, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে সেই দশের মধ্যে ১ শতাংশ। অথচ গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যহীনতা, সমতা, সাম্য- এই স্লোগানগুলো উঠেছিল। গণতন্ত্রের পক্ষে, দুর্নীতি-লুটপাটের বিরুদ্ধে মানুষ আওয়াজ তুলেছিল। কিন্তু পরিবর্তন ঘটেনি। মানুষ আজও মুক্তির রাস্তা খুঁজছে।
বাসদ (মার্কসবাদী) কোন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়
যে কোনভাবেই নির্বাচনে অংশ নিতে হবে, যে কোন পন্থায় ভোট জোগাড় করতে হবে, সিট বাড়াতে হবে, যার সাথে ঐক্যে গেলে সিট বাড়ানো যায় তার সাথে ঐক্যে যেতে হবে- এই ধরনের নীতিহীন সুবিধাবাদী রাজনীতির চর্চা একটা যথার্থ মার্কসবাদী দল হিসেবে আমরা কখনও করিনি। আমরা শতকরা ১০ শতাংশ ধনীদের স্বার্থরক্ষার রাষ্ট্রের পরিবর্তে শতকরা ৯০ শতাংশ সাধারণ মানুষের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আমরা মনে করি, সমাজবিপ্লবের মধ্য দিয়ে বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই একমাত্র এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব। সেই লক্ষ্যে আমরা জনগণের জ্বলন্ত সমস্যাগুলোকে নিয়ে আন্দোলন করি। যারা আমাদের চেনেন, তারা এটা জানেন। আমরা মনে করি, বর্তমান সমাজব্যবস্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, জনগণের মৌলিক সমস্যার কোন সমাধান হবে না। এটা আগেও হয়নি, এখনও সম্ভব নয়। এটা একমাত্র সম্ভব হতে পারে বর্তমান সমাজব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে। তা সত্ত্বেও একটা বিপ্লবী দল হিসেবে আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত শোষিত জনগণকে বিপ্লবের জন্য আদর্শগতভাবে, রাজনৈতিকভাবে, সাংগঠনিকভাবে ও নৈতিকভাবে প্রস্তুত করতে না পারছি- ততক্ষণ এই ব্যবস্থায় বারবার নির্বাচন আসবে, জনগণ ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক নির্বাচনকেই তার অবস্থা পরিবর্তনের হাতিয়ার মনে করবে, এর জালে জড়িয়ে পড়বে। এই জনগণকে নির্বাচন সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ধরানোর জন্য, নির্বাচনের মোহ কাটানোর জন্য এবং সংসদের অভ্যন্তরে শোষিত জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি উত্থাপন ও প্রতিবাদ ধ্বনিত করার জন্য আমরা নির্বাচনে লড়ি। একইসাথে সংসদের বাইরে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের সংগ্রাম ও গণআন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য আমরা নির্বাচনে লড়ি। এটাই বিশ্বসাম্যবাদী আন্দোলনের মহান পথপ্রদর্শক কমরেড লেনিনের শিক্ষা।
একটা যথার্থ মার্কসবাদী দল হিসেবে ভোটের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় গেলে কী করবে সে সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা দিয়েছিলেন মহান লেনিনের সুযোগ্য ছাত্র, বিশ্বসাম্যবাদী আন্দোলনের মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষ। তিনি বলেছেন, একটি যথার্থ বামপন্থী সরকার-
১) শ্রমিক-কৃষক ও মধ্যবিত্ত জনগণের ন্যায়সঙ্গত গণআন্দোলনকে উৎসাহিত করবে। ‘ল অ্যান্ড অর্ডার” রক্ষার নামে অন্য বুর্জোয়া সরকারগুলোর মতো পুলিশ দিয়ে সেগুলোকে দমন করবে না।
২) আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা খর্ব করে সংগঠিত সচেতন জনগণের উপর নির্ভর করে সরকার চালাবে।
৩) দুর্নীতিমুক্ত নিরপেক্ষ প্রশাসন চালাবে এবং সরকারি অর্থ জনকল্যাণমূলক খাতে এবং সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের স্বার্থে কাজে লাগাবে। এবারের নির্বাচনে আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতেই অংশগ্রহণ করব।
বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস নিয়ে আমাদের বক্তব্য
আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত কৃতিত্ব তাদের দল ও শেখ মুজিবের বলে প্রচার করেছে। অথচ পাকিস্তান পর্বে গোটা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আপোষহীন নেতা ছিলেন মওলানা ভাসানী। ভাসানীই প্রথম প্রকাশ্য জনসভায় স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, বামপন্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও বামপন্থীদের বন্ধু। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংবিধান রচনার সমালোচনা তিনি যেমন করেছেন, তেমনি গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে সংবিধানে যুক্ত করার ব্যাপারে জোর দাবি জানিয়েছেন। সারাটা জীবন ধরে ভাসানী লড়েছেন। প্রথমে লড়েছেন বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, এরপর পাকিস্তানি উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে, লড়েছে সমস্তরকম রাজনৈতিক সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের পক্ষে। সর্বোপরি তিনি লড়েছেন মজলুমের পক্ষে জালেমের বিরুদ্ধে। একারণে দেশের উঠতি বুর্জোয়া শ্রেণি ভাসানীকে নেতা হিসেবে সামনে রাখতে চায়নি। দেশের উঠতি বুর্জোয়াশ্রেণির দল আওয়ামী লীগের হাতে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব থাকার কারণে তারা ও ভারত মিলে ভাসানীকে গোটা মুক্তিযুদ্ধ থেকেই বিচ্ছিন্ন করে রাখে। কারণ এই উঠতি বুর্জোয়া শ্রেণি ও ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ- উভয়েই জানতো ভাসানী তাদের জন্য কতবড় হুমকি।
ভাসানীকে ধর্মীয় দলগুলোও পছন্দ করতো না সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর বিশ্বাসের কারণে ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়ে তাঁর অবস্থানের জন্য। ফলে আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা ধর্মীয় দলগুলোর কেউ-ই তাকে সামনে আনেনি। প্রত্যেকে তাদের মতো করে বাংলাদেশ গঠনের ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করেছে।
বাংলাদেশ গঠনের প্রকৃত ইতিহাস অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় উপনিবেশিক শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানের উপর নিপীড়ন, পাকিস্তানভিত্তিক মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিপরীতে ভাষাভিত্তিক বাঙালী জাতীয়তাবাদের উৎপত্তি, গোটা পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনপর্বে ভাসানীর ভূমিকা- এই বিষয়গুলো ইতিহাসের ব্যাখ্যায় আমাদের দল ইতোপূর্বে বারবার তুলে ধরেছে। একইসাথে বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয়দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও সত্তরের নির্বাচন- আর এই সমগ্র আন্দোলনের ধরাবাহিকতায় যে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, এই ধারাবাহিক ইতিহাস আমাদের দল জনগণের সামনে তুলে ধরেছে।
মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব পূর্ব পাকিস্তানের উঠতি বুর্জোয়া শ্রেণির দল আওয়ামী লীগের হাতে থাকায় স্বাধীনতার পর দেশটি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক পথে চলা শুরু করে। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল শক্তিকে নিয়ে লড়াইয়ের যুক্তফ্রন্ট গঠন করলো না, স্বাধীনতার লাভের পর এই সকল শক্তিকে যুক্ত করে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করলো না, গণপরিষদ নির্বাচন না করেই সংবিধান প্রণয়ন করলো এবং সর্বোপরি স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচনে (১৯৭৩ সালের নির্বাচন) রিগিং করলো- যে নির্বাচনে বিজয় তার নিশ্চিত ছিল। এতেই সে থামেনি। এরপর নিজেদের প্রণয়ন করা সংবিধান নিজেরাই সংশোধন করে এর মধ্যে গণতন্ত্রের যতটুকু চিহ্ন ছিল- সেটাও মুছে দিতে তৎপর হলো। সর্বশেষ চতুর্থ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে সকল দলকে বিলুপ্ত করে দিয়ে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল কায়েম করলো। এটা খুবই দুঃখজনক যে, এসময় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যেত, একটি প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টির অনুপস্থিতির কারণে তা করা যায়নি। এরপর থেকে যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারাই এই ব্যবস্থাই বহাল রেখেছে। এই পটভূমিতেই আওয়ামী লীগের চরম ফ্যাসিবাদী শাসনের আবির্ভাব- যার বিরুদ্ধে সংঘটিত হলো ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান।
জুলাই অভ্যুত্থানের তাৎপর্য ও ফ্যাসিবাদ প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্য
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রাষ্ট্রের প্রায় সকল প্রতিষ্ঠান অকার্যকর ও পঙ্গু হয়ে পড়েছিল। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর হাতেই সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী কোন সরকারই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে ছিল না, কিন্তু আওয়ামী লীগের বিগত ১৫ বছরের শাসনামলের মতো রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকে এতখানি কুক্ষিগত কেউ করতে পারেনি। নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশনসহ সকল সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি দলীয় আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। কার্যতঃ অনির্বাচিত সংসদ, দলীয় প্রশাসন ও বিচার বিভাগের মাধ্যমে সমস্ত ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।
জনগণ ছিল অতীষ্ঠ। প্রতিবাদ করলেই তা দমন করা হত। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ২ হাজার ৬৯৯ জন, গুম হন ৬৭৭ জন, কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন ১ হাজার ৪৮ জন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের তালিকাসহ ২০২৪ সালের ঘটনা যুক্ত করলে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় তিন হাজার। (মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর তথ্য অনুযায়ী)
বোঝাই যায় কী ধরনের পরিস্থিতি দেশে সৃষ্টি হয়েছিল! অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির দেয়া তথ্য অনুসারে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিদেশে পাচার করা হয়েছে প্রায় ২৮ লক্ষ কোটি টাকা, শেয়ার বাজার থেকে আত্মসাৎ করা হয়েছে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা, বিভিন্ন প্রকল্প থেকে লুটপাট করা হয়েছে প্রায় পৌনে ৩ লক্ষ কোটি টাকা। ধনী-গরীবের বৈষম্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, বেড়েছে মুদ্রাস্ফীতি। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ নিঃশ্বাস নিতে পারছিলেন না। শ্রমিকদের সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাদের প্রতিবাদ সমাবেশে গুলি চালানো, কৃষকদের ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া- এ ছিল স্বাভাবিক চিত্র। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও দফতরগুলোতে ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাটের কারণে সাধারণ মানুষ ন্যূনতম পরিসেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছিলেন। শ্বেতপত্রে প্রকাশ- ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ নেতারা ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন, আমলারা নিয়েছেন ৯৮ হাজার কোটি টাকা।
এর বিরুদ্ধে মানুষের মনে যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল তার ফলাফল এই গণঅভ্যুত্থান। আওয়ামী লীগের গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব জাগরণ এই গণঅভ্যুত্থান। প্রায় দেড় হাজারেরও অধিক প্রাণ দিয়েছেন এই আন্দোলনে। আহত হয়েছেন ২৫ হাজারেরও অধিক। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গণঅভ্যুত্থানে বামপন্থীরা লড়েছে, রক্ত ঝরিয়েছে। এদেশে কোন গণঅভ্যুত্থানকেই এত রক্তের স্রোত পাড়ি দিতে হয়নি। এত মানুষকে চোখের দৃষ্টি হারাতে হয়নি, পঙ্গু হতে হয়নি। এই বিরাট আত্মত্যাগ এই সময়ে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের দল জুলাই হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত প্রতিটি ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে লড়বে।
এই গণঅভ্যুত্থান থেকে ফ্যাসিবাদ ধ্বংসের স্লোগান উঠেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের পতন মানেই ফ্যাসিবাদের পতন নয়। ফ্যাসিবাদ কোন দল আনে না, ফ্যাসিবাদ আনে একটি ব্যবস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে উন্নত কিংবা অনুন্নত সকল দেশেই ফ্যাসিবাদী প্রবণতা দেখা যায়। ফ্যাসিবাদ কায়েম একদলীয় শাসনের মাধ্যমে হতে পারে, দ্বি-দলীয় শাসনের মাধ্যমে হতে পারে, সামরিক শাসনের মাধ্যমে হতে পারে। দুনিয়ার দেশে দেশে ফ্যাসিবাদ গণতন্ত্রের মুখোশ পড়েই এসেছে। আজকের যুগে কোন পুঁজিবাদী দেশই জনজীবনের কোন সমস্যার সমাধান করতে পারে না। ফলে সে জনগণের বিক্ষোভ দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে। এই ফ্যাসিবাদী প্রবণতা এ যুগে প্রত্যেকটি পুঁজিবাদী দেশে বিদ্যমান। অর্থাৎ পুঁজিবাদী রাষ্ট্র মাত্রেই সে আজ কমবেশি ফ্যাসিবাদী।
এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিলোপ ঘটেনি, ফ্যাসিবাদ পিছু হটেছে মাত্র। রাষ্ট্রের নানা গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি এই অভ্যুথান পরবর্তীতে উঠেছে। কারণ আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে। এই গণতান্ত্রিক সংস্কার অপরিহার্য, তাতে দেশের গণতান্ত্রিক প্রথা ও প্রতিষ্ঠান কিছুটা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু তাতে ফ্যাসিবাদের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ সম্ভব নয়। এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার উচ্ছেদ না ঘটিয়ে ফ্যাসিবাদের উচ্ছেদ সম্ভব নয়। তা না হলে অনেক আত্মত্যাগের মাধ্যমে বারবার ভোটের অধিকার, মতপ্রকাশের অধিকার অর্জিত হবে- আর গণআন্দোলনের শক্তি দুর্বল হলে, আন্দোলনের নেতৃত্ব পুঁজিপতি-শিল্পপতিদের দলগুলোর হাতে থাকলে, বারবারই তা হাতছাড়া হবে। আবারও নেমে আসবে নির্মম গণতন্ত্রহীন পরিবেশ। তাই কোন পথে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন প্রকৃত অর্থেই সফল হতে পারে- সেটা নির্ধারণ করা ও সে পথে সংগ্রাম পরিচালনা করা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, এরপর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পেরিয়ে আবার ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থান এবং এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান- এই শিক্ষাই আমাদের সামনে তুলে ধরছে।
মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্য
গণঅভ্যুত্থানের পর উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির তৎপরতা বেড়েছে। মাজার, মন্দির, খানকায়ে হামলা ও আক্রমণ হয়েছে। নারীদের উপর রাস্তাঘাটে আক্রমণ হয়েছে, নিপীড়ণ হয়েছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর উপর আক্রমণ হয়েছে। প্রতিদিনই তাদের আস্ফালন গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। কিন্তু এই সাম্প্রদায়িকতার উত্থান গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ঘটেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়েই এই সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটেছে। তারা সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নিজেদের রাজনৈতিক কূটকৌশল বাস্তবায়নে ব্যবহার করেছেন। স্বাধীনতার পর থেকে যে সরকারই ক্ষমতায় গেছে- তারাই উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রসদ জুগিয়েছে, জনগণকে বিভক্ত করার জন্য ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঘায়েল করার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করেছে। আজ আমরা তার ফলাফল দেখতে পাচ্ছি।
এ ঘটনা ঘটতে পারলো কেন? একটা যথার্থ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে এই ধরনের ঘটতে পারতো না। ইতিহাসের শিক্ষা প্রমাণ করে যে, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লড়াই মানেই কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা নয়। ধর্মনিরপেক্ষতা কথার যথার্থ অর্থ হচ্ছে রাজনীতি, রাষ্ট্র, শিক্ষা, আইন,কানুন ইত্যাদির সাথে ধর্মের সম্পর্ক থাকবে না। ধর্ম পালনের অধিকার মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। ধর্মবিশ্বাসী এবং কোনো ধর্মে বিশ্বাস করেন না- এই দুই ধরনের নাগরিককে রাষ্ট্র সমদৃষ্টিতে দেখবে। এই চিন্তা এসেছিল ইউরোপের নবজাগরণ থেকে যা আমাদের দেশ এবং উপমহাদেশে চর্চা করা হয়নি। এর ফলেই ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, জাত-পাত এই বিষয়গুলো ধুরন্ধর রাজনৈতিক শক্তির ক্ষমতালাভের হাতিয়ার হয়ে জনসাধারণের ঐক্যকে টুকরো টুকরো করে দিতে পারছে। একে আটকাতে গেলে জোরদার আদর্শগত লড়াই চালাতে হবে। গরীব-মেহনতি মানুষের উপর যে একের পর এক অর্থনৈতিক আক্রমণ আসছে এর বিরুদ্ধে লড়াইকে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আদর্শিক লড়াইয়ের সাথে যুক্ত করতে হবে। জনগণকে সংগঠিত করে ক্রমাগত এই অর্থনৈতিক আক্রমণের বিরুদ্ধে জঙ্গি আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। শুধু কনভেনশন, মিটিং, মিছিল এই ধরনের কর্মসূচী দিয়ে এই আক্রমণ রোখা যাবে না। বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক মানুষের ঐক্যের ভিত্তিতে এই আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে।
একটা গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পরে দেশ যখন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত হয়, তখন বুর্জোয়া শ্রেণি একটা অখণ্ড জাতি গঠনের উদ্দেশ্যে যদি সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ঝাণ্ডাকে তুলে না ধরে, অর্থাৎ ওই ভৌগলিক ভূ-খণ্ডে নানান জাতিসত্ত্বা-ধর্ম-বর্ণ এসবের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, এগুলোকে যদি সমাধান না করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার বদলে ক্রমাগত বিভেদের চক্রান্ত করতে থাকে, তবে স্বাভাবিক নিয়মেই জাতিবিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা এসব কুৎসিত বিষয় জন্ম নেয় এবং যথার্থ অখণ্ড জাতি গড়ে উঠে না। আজকের দিনে এটা একমাত্র সম্ভব রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার মর্মবস্তুকে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে।
বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি কিংবা অধুনা উদার সাজা জামায়াতে ইসলামী প্রত্যেকের সাথেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সম্পর্ক গভীর। ভোটের রাজনীতি যারাই করেন, এই কাজ তারা জেনেবুঝেই করেন। ফলে ভোটের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতাকে নির্মূল করা যাবে না। সাম্প্রদায়িকতাকে মোকাবেলা করতে হবে আদর্শিক ও রাজনৈতিকভাবে। এই বিভাজন ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত করছেন না- নিজের ধর্মকেও খাট করছেন, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা করছেন। আমাদের দল এই সত্যটি জনগণের সামনে তুলে ধরবে ও এই দলগুলোর প্রকৃত চেহারা উন্মোচন করবে।
সাম্রাজ্যবাদ প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্য
বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই দুনিয়ার বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, যেমন- ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো এবং পরবর্তীকালে চীন, রাশিয়া, জাপান ইত্যাদি দেশুগলো তাদের বাজার সম্প্রসারনের লক্ষে এদেশের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের উপর বারংবার হস্তক্ষেপ করেছে। বর্তমান সময়ে এই হস্তক্ষেপ অনেকগুণ বেড়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল দরপত্র ছাড়াই, গোপন চুক্তির মাধ্যমে যেভাবে ইজারা দেয়া হচ্ছে এবং এ ব্যাপারে সরকার যে ধরনের বেপরোয়া ভাব দেখাচ্ছেন- তাতে আমরা শঙ্কিত। বিগত সময়ে ভারতসহ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর কাছে আওয়ামী লীগের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি আমরা দেখেছি। গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা এমন একটি সরকার প্রত্যাশা করেছি- যে সরকার সকল ধরনের বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দেবে। আমাদের দল মনে করে, সবরকম সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত। দেশকে কোনভাবেই জিম্মি রাখা যাবে না। দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা সরকারের অবশ্য কর্তব্য।
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্য
রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দীর্ঘ প্রায় ৮ মাস আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক শেষে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যে জুলাই সনদ প্রণয়ন করে, সেটি এই দীর্ঘ আলোচনার মর্মবস্তুকে ধারণ করতে পারেনি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা উদ্বোধনী সভায় বলেছিলেন যে, সবাই যে সকল বিষয়ে একমত হতে পারবে, সেগুলোই গ্রহণ করা হবে। ফলে আলোচনার সময়ে বিভিন্ন প্রস্তাবে বিভিন্ন দল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়ার পর সেই ‘নোট অব ডিসেন্ট’-গুলোকে যুক্ত করেই সনদ রচনা করা হলো। এই কারণগুলোসহ নিম্নলিখিত কারণে আমরা জুলাই সনদের আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেও তাতে স্বাক্ষর করতে পারিনি-
১. আমরা জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনাকালেই বারবার বলেছি, যেসব বিষয়ে সবার ঐকমত্য রয়েছে কেবলমাত্র সেসব বিষয়েই সবার স্বাক্ষর নেয়া যেতে পারে। ভিন্নমতগুলো অতিরিক্ত (এনেক্স) প্রতিবেদন হিসেবে সনদে সংযুক্ত থাকতে পারে।
২. সনদের প্রথম অংশে পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। আমরা বারবার সংশোধনী দিলেও সেগুলো সন্নিবেশিত করা হয়নি।
৩. শেষ অংশে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করতে বলা হয়েছে। সেখানে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ভিন্নমত থাকলে তা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার কিভাবে সম্ভব তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।
৪. অঙ্গীকারনামার ২নং-এ জুলাই সনদ সংবিধানের তফসিলে বা যথোপযুক্ত স্থানে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। আমরাও সর্বসম্মত জুলাই সনদ সংবিধানে যুক্ত করার পক্ষে। কিন্তু নোট অব ডিসেন্টসহ কীভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে, তা আমাদের বোধগম্য নয়।
৫. অঙ্গীকারনামার ৩নং-এ উল্লেখ করা হয়েছে- “জুলাই সনদ নিয়ে কেউ আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবে না”। এটি নাগরিকের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থী। যে সকল বিষয়ে একটা দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল- সেটা বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিলে, সেই দল আদালতের শরণাপন্ন হতেই পারে। এই অধিকার কেড়ে নেয়ার কোন উপায় নেই।
আমরা বলেছিলাম যে, উপরোক্ত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি না হওয়াতে আমাদের পক্ষে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে সংবিধানে বিদ্যমান চার মূলনীতি- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ পরিবর্তনে সম্মতি প্রদান ও আদালতে প্রশ্ন করা যাবে না এমন বিষয়ে অঙ্গীকার করতে হয়- এমন কোনো সনদে ভিন্নমত দিয়ে আমরা স্বাক্ষর করতে পারি না। এই কথাগুলো আমরা সেসময় সংবাদ সম্মেলন করে জাতির সামনে তুলে ধরেছিলাম।
গণভোট প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্য
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে আমরা নীতিগতভাবে গণভোটকে সমর্থন করেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যেভাবে সাংবিধানিক সংস্কারগুলোকে চারটি প্রশ্নের একটি প্যাকেজের মধ্যে এনে পুরো প্যাকেজের উপরেই ‘হ্যাঁ/না’ ভোটের সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি ছিল পুরোপুরি অগণতান্ত্রিক। কেউ এর অনেকগুলোর সাথে একমত, অনেকগুলোর সাথে দ্বিমত থাকতে পারেন। সবগুলোর সাথে একমত হলেও, কোন একটি প্রস্তাবের সাথে দ্বিমত হলেও তার সেই মত প্রকাশের অধিকার আছে। কিন্তু তাকে সেই সুযোগ দেয়া হয়নি। এই ধরনের গণভোট কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ফলে আমরা এই গণভোটের প্রক্রিয়ার সাথে একমত হতে পারিনি। আমরা চাই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কার হউক। কিন্তু ঐকমত্য কমিশন যে প্রক্রিয়ায় এ ব্যাপারে এগিয়েছেন, সেটাকে মেনে নেয়া যায় না।
এক নতুন নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে দেশ গড়ে তুলতে হবে
প্রচুর আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে হয়েছে, এখনও হচ্ছে। এখনও অনেক মানুষ আছেন, যারা সত্যিকার অর্থেই একটা পরিবর্তন চান। রাজনীতিতে যে দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, লুটপাট ও ক্ষমতার দাপট দেখানোর যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে তার অবসান চান। আমাদের দল তাদের সামনে এই পুঁজিপতি-শিল্পপতি শ্রেণির সহায়ক রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিকতা ও মূল্যবোধহীন অসার এবং স্বার্থপর রাজনীতিকে উন্মোচন করার চেষ্টা করেছে। এর পরিবর্তে সমাজতন্ত্রের উচ্চ মূল্যবোধ ও হৃদয়বৃত্তির রাজনীতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী বলেছিলেন- রাজনীতি হলো একটি মহৎ কর্মপ্রয়াস যার লক্ষ্য সমাজ হতে অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ ও নির্যাতনের অবসান ঘটানো। আমাদেরকে আজ মওলানা ভাসানীসহ বিভিন্ন মনীষীদের জীবন ও সংগ্রামকে সামনে আনতে হবে। একটা নতুন চরিত্র গড়ে তোলার সংগ্রাম সূচনা করতে হবে।
আমাদের প্রার্থীদের প্রচারে যুক্ত হয়ে ও আমাদেরকে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করুন
অন্যান্য দলগুলো শিল্পপতি, বড় ব্যবসায়ী, ব্যাংক লুটপাটকারীদের টাকা নিয়ে লড়ে। এই নির্বাচনকে ঘিরে যে প্রচার এতদিন ধরে চলছে, তা দেখেও আপনারা বুঝতে পারছেন যে, কী পরিমাণ অর্থ নিয়ে বড় বড় দলগুলো নির্বাচনে নেমেছে। বড় বড় মিডিয়াও তাদেরই প্রচার দিচ্ছে। এটাই চলবে ভোট পর্যন্ত। এই দলগুলো অর্থের শক্তি, পেশিশক্তি ও মিডিয়ার শক্তি দিয়ে নির্বাচনে লড়ে। আর এর বিপরীতে আমাদের দলের শক্তির উৎস হলো দলের আদর্শ, উন্নত নৈতিক বল এবং সাধারণ জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালোবাসা। এই বিশ্বাস নিয়েই আমরা নির্বাচনে লড়ছি।
আমরা মনে করি, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে একটা পরিবর্তন এসেছে বাংলাদেশের জনগণ ও ছাত্র-যুবক-তরুণদের মনে। তারা পথ খুঁজছেন। আমরা বিশ্বাস করি, এই তরুণ-যুবকরা অর্থের বিনিময়ে নিজের বিবেককে বিক্রি করবেন না। আত্মমর্যাদা ও মনুষ্যত্ব নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবেন, যেমন দাঁড়িয়েছিলেন গণঅভ্যুত্থানে। আমরা এই লড়াইয়ের ঝাণ্ডাই বহন করে চলেছি। আমরা আপনাদের কাছে আবেদন রাখছি- আমাদের দলকে শক্তিশালী করুন, নির্বাচনেও আমাদের সমর্থন করুন। নিম্নাক্ত দাবিগুলো নিয়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে লড়াই গড়ে তোলার জন্য আমাদের দলকে সমর্থন করুন।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে
১. জুলাই হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত প্রতিটি ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় এনে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা।
মৌলিক অধিকার
১. জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কাজ- এগুলো মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার। এগুলো শর্তহীনভাবে রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এই বিষয়টি আমরা বারবার তুলে ধরেছি। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনায় এই ব্যাপারে শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল যে, রাষ্ট্রের সম্পদের প্রাপ্যতা সাপেক্ষে এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করা হবে। আমরা এর বিরোধিতা করেছি। পরবর্তীতে ঐকমত্য কমিশনে এর সুনির্দিষ্টতা আরও কমানো হলো- তখন আমরা এ ব্যাপারে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রদান করেছি।
২. এলাকা অনুযায়ী দারিদ্র্যসীমা নির্ধারণ করা ও দারিদ্র্যসীমার নিচের সকল মানুষের জন্য সামরিক বাহিনীর রেটে পূর্ণ রেশনিং চালু করা।
৩. চাল, ডাল, আটা ও তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু ও ন্যায্যমূল্যের দোকান খোলা। ধীরে সমগ্র খাদ্য বাণিজ্যকে রাষ্ট্রের আওতায় নিয়ে আসা।
৩. বয়স্ক, দুঃস্থ, অনাথ ও এতিম শিশু, পঙ্গু ও প্রতিবন্ধীদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নেয়া।
৪. বেকারদের কাজের ব্যবস্থা করা। কাজে সক্ষম বেকারদের বেকার-ভাতা প্রদান।
৫. পুনর্বাসন ছাড়া রিক্সা, হকার ও বস্তি উচ্ছেদ বন্ধ করা।
৬. সরকারি খাস জমি প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে বরাদ্দ দেয়া। বেদখল জমি ও দুর্নীতিবাজদের জমি-সম্পত্তি উদ্ধার করা। শহরে খাস জমিতে স্বল্পমূল্যে ঘর নির্মাণ এবং বস্তিবাসীসহ নিম্ন আয়ের মানুষদের কাছে কিস্তিতে হস্তান্তর করা, ভাড়া দেওয়া।
৭. ঢাকাসহ সব বড় শহরে জমির সিলিং ঘোষণা। বাড়ি ভাড়া-গাড়ি ভাড়া সুনির্দিষ্ট করা।
৮. নাগরিকদের জন্য বিনামূল্যে সকল ধরনের চিকিৎসা নিশ্চিত করা। প্রতিটি নাগরিককে হেলথ কার্ড প্রদান করা ও প্রতিটি ওয়ার্ডে হেলথ সেন্টার চালু করা।
৯. রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করা।
কৃষি ও কৃষক
১. জাতীয় বাজেটে কৃষিখাতে উন্নয়ন বাজেটের ৪০% বরাদ্দ দেয়া।
২. কৃষি ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। সব বড় হাট-বাজারে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র চালু করা যাতে ফসল উঠানোর সাথে সাথে খোদ কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য দামে ফসল ক্রয় ও সংগ্রহ করা যায়।
৩. বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-কে কার্যকর ও দুর্নীতিমুক্ত করে তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত করা।
৪. কৃষিতে ভর্তুকি প্রদান। সার, বীজ, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণ ন্যায্যমূল্যে সময়মত সরবরাহ করা।
৫. নামমাত্র সুদে ফসলী ঋণ ও শস্যবীমার মাধ্যমে আবাদে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ক্ষতিপূরণের বিধান চালু করা
৬. আলু, পেয়াজ, মরিচসহ সকল পঁচনশীল সবজি সংরক্ষণের জন্য সরকারি বিশেষায়িত হিমাগার নির্মাণ ও আলুর হিমাগার ভাড়া ১০০ টাকা নির্ধারণ করা।
৭. শিল্প-কৃষিতে ডব্লিউটিও, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ-সহ সকল বিদেশি হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ধ্বংসকারী কীটনাশক ও প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ রোধ করা।
শিল্প ও শ্রমিক
১. শ্রমিক-কর্মচারীদের মনুষ্যোচিত ‘ন্যূনতম মজুরি’ আইন করে ঘোষণা করা। প্রতি বছর ‘জাতীয় ন্যূনতম মজুরি’ ঘোষণা করা।
২. সকল সরকারি-বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়োগপত্র, চাকুরির বিধিমালা প্রণয়ন ও আইএলও সনদ মোতাবেক ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ সকল সুবিধাদি নিশ্চিত করা।
৩. ইপিজেড-এর নামে জাতীয় স্বার্থ ও শ্রমিক স্বার্থবিরোধী আইন-বিধি বাতিল করা।
৪. শিশুশ্রম বন্ধ করা। শিল্পাঞ্চলে শ্রমিককলোনি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য ও শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র খোলা। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে ‘ডে কেয়ার সেন্টার’ চালু করা।
৫. রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-প্রতিষ্ঠানের বিরাষ্ট্রীয়করণ বন্ধ করা। অতীতে বিরাষ্ট্রীয়করণকৃত কারখানা ও বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর সকল দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার করা। শ্রমিক-কর্মচারীদের পুনর্বাসন ছাড়া কারখানা-শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ না করা।
৬. জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ও গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা বাস্তবায়ন করা।
৭. দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকের পরিবারকে এক জীবনের আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৮. শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনাসমূহ বাস্তবায়ন করতে হবে।
নারী
১. সংসদে নারী আসনের সংখ্যা ১০০-তে উন্নীত করা ও নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিধান করা।
২. ‘ইউনিফরম সিভিল কোড’ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারিবারিক আদালত চালু করা। সংরক্ষণ প্রত্যাহারসহ সিডো সনদ বাস্তবায়ন করা। কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমমজুরি ও সর্বক্ষেত্রে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা।
৩. ফতোয়াবাজীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ নেয়া।
৪. নারী ও শিশু পাচারকারী এবং নারীদের পতিতাবৃত্তিতে নিয়োগকারী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করা। আর্থিক কারণে পতিতাবৃত্তিতে যুক্ত নারীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
৫. অশ্লীল সিনেমা নির্মাণ ও প্রদর্শনের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আইন করা। নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনে নারীদেহের স্থূল প্রদর্শন বন্ধ করা। নাটক-সিনেমা-সাহিত্যে, ওয়াজ-নসিহতে নারীদের অশ্লীল উপস্থাপনা ও তাদের সম্পর্কে অসম্মানজনক উক্তি বন্ধ করা।
৬. প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই সঙ্গীত-নাটক-নৃত্য-চিত্রাঙ্কনসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধূলার আয়োজন করা। মনীষী জীবনচর্চাসহ সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ নিশ্চিত করা।
৭. মাদক ও জুয়া বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া।
৮. প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রবাসে বাংলাদেশের দূতাবাস যাতে শ্রমিকদের সকল রকম সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেয় ও শ্রমিক বান্ধব হয়, সেটা নিশ্চিত করা।
৯. গৃহপরিচারিকাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। তাদের ন্যূনতম মজুরি ও সাপ্তাহিক ছুটি নিশ্চিত করতে হবে।
১০. সকল শ্রেণির পেশাজীবী নারীদের গর্ভকালীন সময়ে ১৬ সপ্তাহ বেতনসহ ছুটি নিশ্চিত করা।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠী
১. পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান সংকটের রাজনৈতিক সমাধান করা। পার্বত্য চট্টগ্রামে অঘোষিত সেনাশাসন প্রত্যাহার করা।
২. পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য গঠিত ভূমি কমিশন কার্যকর করে ভূমি সমস্যার সমাধান করা।
৩. বাংলাদেশের পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।
৪. বিভিন্ন জাতিসত্ত্বার মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা।
৫. মাতৃভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রত্যেক জাতিসত্ত্বার সাংস্কৃতিক ও কৃষ্টিগত ঐতিহ্য, স্বাতন্ত্র্য রক্ষার ব্যবস্থা করা।
জাতীয় সম্পদ
১. মুক্তবাজারের নামে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি ধ্বংসের নীতি বাতিল করা। তেল-গ্যাসের উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) সহ জাতীয় স্বার্থবিরোধী সকল অসম চুক্তি বাতিল করা।
২. দেশের সম্পদকে কাজে লাগিয়ে, একে ভিত্তি করে শিল্প কারখানা স্থাপন করা। সম্পদ উত্তোলন ও ব্যবহারে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা।
সাম্রাজ্যবাদ ও পররাষ্ট্রনীতি
১. ফিলিস্তিনসহ দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও গণহত্যা বন্ধ, দখলদারিত্বের অবসানের দাবিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে সোচ্চার ভূমিকা পালন করা।
২. কিউবা, উত্তর কোরিয়া, জিম্বাবুয়েসহ বিভিন্ন দেশের ওপর আরোপিত সাম্রাজ্যবাদী অবরোধ প্রত্যাহারে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সকল ফোরামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা
৩. মার্কিন যুদ্ধ-তৎপরতার অংশ হিসাবে বাংলাদেশকে ব্যবহারের ষড়যন্ত্র বন্ধ করা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমেরিকা, ভারত, রাশিয়া, চীনসহ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। সাম্রাজ্যবাদী কোনো যুদ্ধ জোটে যোগ না দেওয়া।
৪. সাম্রাজ্যবাদী ভারত কর্তৃক সীমান্ত হত্যা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। ভারত থেকে গঙ্গা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করা। ভারতের আন্তঃনদীসংযোগ প্রকল্পের নামে ব্রহ্মপুত্রের পানি অপসারণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ভারতের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে ভারতের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জনগণ ও শক্তির সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া।
৫. বিদেশী বিনিয়োগের নামে সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানির লুটপাট বন্ধ করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া। জাতীয় স্বার্থবিরোধী শর্তযুক্ত বিদেশী ঋণ-অনুদান গ্রহণ বন্ধ করা।
উপরোক্ত দাবিসমূহ বাস্তবায়ন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংসদের ভেতরে ও বাইরে লড়াই জোরদার করার জন্য আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী)-এর প্রার্থীদের ‘কাঁচি’ মার্কায় ভোট দেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি।
বাসদ (মার্কসবাদী)-এর প্রার্থী তালিকা-
১. নীলফামারী-১ (ডিমলা ও ডোমার উপজেলা) রফিকুল ইসলাম
২. নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ উপজেলা) মাইদুল ইসলাম
৩. রংপুর-১ (সিটি করপোরেশন ওয়ার্ড ১-৯ ও গঙ্গাচড়া উপজেলা) আহসানুল আরেফিন তিতু
৪. রংপুর-৩ (রংপুর সদর, সিটি করপোরেশনের বাকি অংশ ও সেনানিবাস এলাকা) আনোয়ার হোসেন বাবলু
৫. রংপুর-৪ (পীরগাছা ও কাউনিয়া উপজেলা) প্রগতি বর্মণ তমা
৬. রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর উপজেলা) বাবুল আক্তার
৭. কুড়িগ্রাম-৪ (রৌমারী, রাজিবপুর ও চিলমারী উপজেলা) রাজু আহমেদ
৮. গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ উপজেলা) পরমানন্দ দাস
৯. গাইবান্ধা-২ (গাইবান্ধা সদর উপজেলা) আহসানুল হাবিব সাঈদ
১০. গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি ও সাঘাটা) রাহেলা খাতুন
১১. জয়পুরহাট-১ (সদর ও পাঁচবিবি উপজেলা) তৌফিকা দেওয়ান লিজা
১২. বরিশাল-৫ (সদর উপজেলা ও সিটি করপোরেশন) সাইদুর রহমান
১৩. শেরপুর-৩ (শ্রীবর্দী ও ঝিনাইগাতি উপজেলা) মো: মিজানুর রহমান
১৪. ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলা) আব্দুর রাজ্জাক
১৫. ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর উপজেলা)- আরিফুল হাসান
১৬. ময়মনসিংহ-৪ (সদর উপজেলা ও সিটি করপোরেশন)- শেখর রায়
১৭. কিশোরগঞ্জ-১ (সদর ও হোসেনপুর)- আলাল মিয়া
১৮. ঢাকা-৫ (ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড ৪৮-৫০ ও ৬২-৭০)- ডেমরা ও যাত্রাবাড়ি- শাহিনুর আক্তার সুমি
১৯. ঢাকা-৭ (ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড ২৩-৩৩, ৩৫, ৩৬, ৫৬ ও ৫৭)
-লালবাগ, চকবাজার, বংশাল, কতোয়ালী (আংশিক) ও কামরাঙ্গির চর (আংশিক) –সীমা দত্ত
২০. ঢাকা-৮ (ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড ৮-১৩, ১৯, ২০ ও ২১)- মতিঝিল, পল্টন, শাহবাগ, শাহজাহানপুর ও রমনা- রাফিকুজ্জামান আখন্দ ফরিদ
২১. ঢাকা-০৯ (ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড ১-৭ ও ৭১-৭৫)- খিলগাঁও, সবুজবাগ, মুগদা) খন্দকার মিজানুর রহমান (বাবলু)
২২. ঢাকা-১৬ (ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড (২,৩,৫,৬) -পল্লবী ও রূপনগর রাশিদুল ইসলাম
২৩. গাজীপুর-১ (কালিয়াকৈর, সিটি কর্পোরেশনের ১-১৮ ওয়ার্ড) তসলিমা আক্তার বিউটি
২৪. গাজীপুর-২ (সিটি কর্পোরেশনের ১-৬ ও ১৩-৩১ ওয়ার্ড)
মাসুদ রেজা
২৫. মাদারীপুর-২ (রাজৈর উপজেলা ও সদর উপজেলার একাংশ) মো: দিদার হোসেন
২৬. মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া উপজেলা) সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী
২৭. ফেনী-২ (সদর) জসীম উদ্দীন
২৮. নোয়াখালী-৪ (সুবর্ণচর ও সদর উপজেলা) বিটুল তালুকদার
২৯. নোয়াখালী-৫ (কবিরহাট ও কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা) মুনতাহার বেগম প্রীতি
৩০. চট্টগ্রাম-৯ (সিটি কর্পোরেশনের ১৫-২৩ ও ৩১-৩৫ ওয়ার্ড) শফিউদ্দিন কবির আবিদ
৩১. চট্টগ্রাম-১০ (সিটি কর্পোরেশনের ৮, ১১-১৪ ও ২২-২৬ ওয়ার্ড) আসমা আক্তার
৩২. চট্টগ্রাম-১১ (সিটি কর্পোরেশনের ২৭-৩০ ও ৩৬-৪১ ওয়ার্ড) দীপা মজুমদার
৩৩. সিলেট-০১ (সদর ও সিটি কর্পোরেশন) সঞ্জয় কান্ত দাস
