Tuesday, April 16, 2024
Homeফিচারশিক্ষাধ্বংসকারী ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম-২০২১’: কয়েকটি প্রশ্নোত্তর

শিক্ষাধ্বংসকারী ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম-২০২১’: কয়েকটি প্রশ্নোত্তর

১। জাতীয় শিক্ষাক্রম নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কী বলা হচ্ছে?
– সরকারের ভাষ্যে, এটি শিক্ষার্থীদের পুরনো মুখস্ত নির্ভর মানুষ থেকে সৃজনশীল মানুষে পরিণত করবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপযোগী করে গড়ে তুলবে, প্রচলিত পরীক্ষানির্ভরতা থেকে মুক্তি দেবে, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমাবে, সকলকে একই ছাঁচে গড়ে না তুলে যার যেমন দক্ষতা ও উৎসাহ, তাকে সেভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করবে। বলা হচ্ছে, আমাদের দেশে নতুন আবিস্কার হয় না, পেটেন্টে আমরা খুবই পিছিয়েÑ এই শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক করবে। উচ্চশিক্ষিতদের চাকরির আশায় বসে থাকার বদলে উদ্যোক্তা হওয়ার মতো প্রয়োজনীয় দক্ষতা সৃষ্টি করবে। এটা প্রকৃতপক্ষে উদ্যোক্তা তৈরির শিক্ষাক্রম।

২। বারবার শিক্ষাক্রম ও শিক্ষাপদ্ধতি পরিবর্তন করে শিক্ষার মান বৃদ্ধি করা যাবে কি? শিক্ষাক্ষেত্রে অতীতের পরিবর্তনগুলো কি আদৌ ছাত্রস্বার্থে করা হয়েছিলো? আগের শিক্ষাক্রম কি কারণে পরিবর্তন করা হলো?
– আশির দশকে মাধ্যমিক স্তরে ল্যাবনির্ভর বিজ্ঞান বই চালু করা হয়েছিলো। তখন বলা হয়েছিলো বিজ্ঞান শিক্ষা ল্যাব এবং সরাসরি অভিজ্ঞতা ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না। শিক্ষার্থীরা ল্যাবে বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিখবে এবং এভাবেই বিজ্ঞান হয়ে উঠবে আনন্দময়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অনুপযুক্ত পরিবেশে এ কথাগুলো বিজ্ঞান শিক্ষায় নতুন সংকট তৈরি করলো।
বাস্তব যা হলো- ঢাকা শহরসহ দেশের গুটিকয়েক স্কুলের ল্যাব, ল্যাব উপকরণ এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকলেও দেশের অধিকাংশ স্কুলেই এসব ছিলো না। ফলে বিজ্ঞানের তত্ত্বনির্ভর বই এবং অনুশীলন থেকে যতটুকু শেখার সুযোগ ছিলো এ পদ্ধতিতে তাও নষ্ট হলো। ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষার্থী বিজ্ঞান বিভাগ না নিয়ে অন্যান্য বিভাগ, বিশেষ করে বাণিজ্য বিভাগের দিকে ধাবিত হলো।
এরপর ১৯৯৬ সালে মুখস্ত নির্ভরতা কমানোর জন্য এমসিকিউ পদ্ধতি চালু করা হলো। বলা হলো, ‘রচনামূলক প্রশ্নগুলোর উত্তর হয় ব্যাখামূলক। ফলে বড় বড় প্রশ্ন মুখস্ত করে শিক্ষার্থীরা পাশ করে। অনেকে মূল লেখাটিও পড়ে না, শুধু প্রশ্নের উত্তর মুখস্ত করে। এমসিকিউ থাকলে তাকে বই খুঁটিয়ে পড়তে হবে।’ তখন ৫০ শতাংশ রচনামূলক এবং ৫০ শতাংশ এমসিকিউ রাখা হলো।
বাস্তবে যা হলো- নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নের প্রশ্ন ব্যাংক তৈরি হলো। সেখান থেকেই মুখস্ত করে পরীক্ষার্থীরা পাশ করতো। রচনামূলকে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর মুখস্ত করার জন্য যতখানি পড়তে হতো, সেটাও কমে গেল।
২০০৯ সালে পিইসি এবং জেএসসি চালু করা হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, ‘এ পরীক্ষা দুটি দশম শ্রেণির পর যে এসএসসি পরীক্ষায় বসতে হয় তাতে ভয় কাটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কম বয়সে দুটি সার্টিফিকেট পেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে এবং পড়াশোনার প্রতি তারা আগ্রহী হবে।’
বাস্তবে যা হলো- ২০১৫ সালের মধ্যে শতভাগ প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করে দ্রুত ‘গউএ’ এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার জন্য গণহারে পাশ করিয়ে দেয়া শুরু হলো। খাতায় কিছু লিখলেই নম্বর দেয়া, শিক্ষকের সহযোগিতায় পরীক্ষার হলে উত্তর লিখে দেয়া এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়াসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটতে থাকলো। এ দুটি পরীক্ষার কারণে গাইড এবং কোচিং নির্ভরতা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেলো।
এরপর ২০১২ সালে মুখস্তের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করে নিয়ে আসা হলো ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’। তখন বলা হয়েছিল, ‘এই পদ্ধতি চালু হলে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, বিশ্লেষণ ও কাজÑ এই প্রত্যেকটি ক্ষেত্রের মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। শুধু মুখস্ত করে বা সিলেবাস পড়ে ভালো ফলাফলের দিন শেষ। কোচিং এবং গাইড ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে।’
বাস্তবে যা ঘটলো- শিক্ষক সংকট, মানসম্মত শিক্ষক এবং প্রশিক্ষণের অভাব, নিম্ন আর্থিক বরাদ্দ এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে ছাত্র ও শিক্ষক উভয়ই বিপদে পড়লেন। কী করে পড়াতে এবং প্রশ্ন করতে হয় সে সম্পর্কে ভালো ধারণার অভাবে শিক্ষকরা গাইড দেখে প্রশ্নপত্র তৈরি করতে লাগলেন। সাথে সাথে শিক্ষার্থীরাও এসবের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হলো। কোচিং ও গাইড ব্যবসা আরও বৃদ্ধি পেলো। প্রশ্নফাঁস এবং নম্বর বাড়িয়ে দেয়ার ফলে প্রায় শতভাগ পাশ নিশ্চিত হলো। শিক্ষার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকলো।
এই সকল ঘটনা থেকে কোন শিক্ষা না নিয়ে ঝরে পড়ার জন্য, না বুঝে মুখস্ত করার জন্য, শিক্ষার নিম্ন মানের জন্য শিক্ষাক্রমকে দায়ী করে আবার শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পূর্বের পরিবর্তনগুলোর ব্যর্থতার কারণ নিয়ে কোন জরিপ বা গবেষণা চালানো হয়নি। এগুলোর কোন রিপোর্টও প্রকাশিত হয়নি। প্রচলিত পাঠদান ও মূল্যায়ন এবং শিক্ষার নিম্ন মান নিয়ে সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে যুক্ত করে কোন পর্যালোচনা হয়নি। একতরফাভাবে শিক্ষাক্রম ও পরীক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করে রাতারাতি প্রায় সম্পূর্ণ পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর আগে ২০১০ সালে প্রণীত ‘জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০’-এ ঘোষিত অনেক প্রস্তাবনা ও পদ্ধতি খারিজ করা হয়েছে, কিন্তু কোন পর্যালোচনা রাখা হয়নি। শিক্ষার বিদ্যমান সমস্যাগুলোও চিহ্নিত করা হয়নি।

৩। অতীতের পর্যালোচনা না করলেও, শিক্ষাক্রম প্রণেতারা কি খসড়া শিক্ষাক্রমের উপরে ব্যাপক মতামত নিয়েছেন? শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তাদের তাদের মনোভাব কি গণতান্ত্রিক?
– সাধারণ মানুষ নতুন এই শিক্ষাক্রম তৈরির বিষয়টি জানতেই পারেনি, মতামত দেয়া তো দূরের কথা। শিক্ষাক্রমটির খসড়া-বক্তব্য নামকাওয়াস্তে ওয়েব সাইটে উন্মুক্ত রাখা হয় এবং এর ওপর মতামত দেয়ার জন্য খুবই অল্প সময় বেঁধে দেয়া হয়। এ সম্পর্কে জনগণকে জানানো এবং মতামত নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রচার-প্রচারণা একেবারেই করা হয়নি। মেট্রোরেলের একটি স্টেশন, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ের একটা অংশ কিংবা বিমানবন্দরের অসমাপ্ত ৩য় টার্মিনাল ঢাক-ঢোল বাজিয়ে, কোটি কোটি টাকা খরচ করে দেশবাসী এবং বিশ্ববাসীকে জানিয়ে উদ্বোধন করা হয়- অথচ জাতীয় শিক্ষাক্রমের মত জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় জনগণকে অজ্ঞাতে রেখে বাস্তবায়নের কারণ আমাদের বোধগম্য হয়নি।
যে প্রতিষ্ঠান এটি প্রণয়ন করেছে সেটিও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্রিয়া করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ড. ছিদ্দিকুর রহমান শুরুতে এই শিক্ষাক্রমের সাথে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। তিনি বলেন, “কমিটিতে থেকে যদি মতামতের প্রতিফলন না ঘটে, শুধু নাম রাখার জন্য থাকাটা ঠিক হবে না। তাই অব্যাহতি নিয়েছি।. . . কারিকুলামে যে সব টার্ম ব্যবহার করা হয়েছে, আমার বিশ্বাস এগুলো সম্পর্কে তাদের অনেকেরই সুস্পষ্ট ধারণা নেই।”

এই শিক্ষাক্রমের বিভিন্ন বিষয়ে যারা সমালোচনা করেছেন ও বক্তব্য রেখেছেন, তাদেরকে পাঠ্যপুস্তক বোর্ড থেকে নানা জায়গায় বদলি করা হয়েছে। গত দুই বছরে ৫০ জনেরও বেশি কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। এরমধ্যে গত ৬ মাসে বদলি করা হয়েছে কমপক্ষে ৩৫ জনকে। পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের প্রাথমিক শিক্ষা উইংয়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান। তাকে ইতিমধ্যে ওএসডি করা হয়েছে। মতবিরোধের কারণে এই কাণ্ড হয়েছে বলে তিনি পত্রিকাকে জানিয়েছেন। (দৈনিক ভোরের কাগজ অনলাইন, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৪)
শুধু প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকার অগণতান্ত্রিক আচরণ করেছে শুধু তাই নয়, এটি বাস্তবায়নেও সরকার চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক ও আগ্রাসী। এই শিক্ষাক্রম সম্পর্কে কোন ধরনের সমালোচনা, পরামর্শ ও ভিন্ন বক্তব্যকে সরকার রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকান্ড বলে আখ্যায়িত করছে। এমনকি যারা এই শিক্ষাক্রমের ক্ষতিকর দিক নিয়ে আলোচনা করছেন, সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি করছেন কিংবা আন্দোলন সংগঠিত করার চেষ্টা করছেনÑ সরকার তাদের কোচিং, গাইড ব্যবসায়ী বলে তকমা দেয়ার চেষ্টা করছে, তাদেরকে গ্রেফতার করা হচ্ছে, রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে। শিক্ষাক্রম বাতিলের দাবিতে সারাদেশে ‘সম্মিলিত শিক্ষা আন্দোলন’ নামে আন্দোলনের একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে। আন্দোলনের সাথে যুক্ত ৪ জন শিক্ষক-অভিভাবককে সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায় এবং ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। শিক্ষাক্রম বাতিলের দাবিতে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ঘোষিত ৫ লক্ষ গণস্বাক্ষর সংগ্রহের কর্মসূচীতে বিভিন্ন জায়গায় সরকার দলীয় সংগঠনের নেতা-কর্মীরা মারধর এবং বাধা প্রদান করে। ‘বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’ এই বিষয়ে একটি সেমিনার আয়োজনের উদ্যোগ নিলে শেষ মুহূর্তে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ মিলনায়তনের বরাদ্দ বাতিল করে দেয়।

নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের প্রদানকালে বলে দেয়া হয়েছে, এই শিক্ষাক্রমের সাথে বিরোধাত্মক হয়, এমন কোন মতামত দেয়া যাবে না। ঢাকা শহরের একটি খ্যাতনামা স্কুলের শিক্ষক বলেছেন, ‘অধিকাংশ শিক্ষকই এই শিক্ষাক্রমের পক্ষে নয়, কিন্তু তাদের হাত-পা বাঁধা। চাকরি রক্ষার জন্যই তারা এসব করছেন।’ স্কুলগুলোর অভিভাবক বৈঠকে শিক্ষকদের দিয়ে বলানো হচ্ছে, কোন অভিভাবক যদি এই শিক্ষাক্রমের বিরুদ্ধে কথা বলেন তবে আপনার সন্তানের ক্ষতি হবে। এরইমধ্যে দ্্ুইজন শিক্ষক পাঠ্যপুস্তকের কিছু ভুলভ্রান্তি, অসংগতি এবং শিক্ষাক্রম নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি করায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে।

৪। বর্তমান অবকাঠামোর মধ্যে ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকর করা যাবে কি?
– নতুন শিক্ষাক্রমে পরীক্ষা এবং মূল্যায়ন সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি হাজির করা হয়েছে বলা হচ্ছে। তা হলো- ধারাবাহিক মূল্যায়ন। যদিও ধারাবাহিক মূল্যায়ন একেবারে নতুন নয়, ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমেও ধারাবাহিক মূল্যায়নের উল্লেখ ছিল। কিন্তু এবারে এর উপর ব্যাপক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একেই প্রধান করা হয়েছে। ধারাবাহিক মূল্যায়ন মানে পরীক্ষাব্যবস্থা তুলে দেয়া নয়। বরং ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক কিংবা বার্ষিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করার চেয়ে, সারাবছর বিভিন্ন ধরনের ক্লাস টেস্ট এর মধ্য দিয়ে মেধা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া অনেক স্কুলই অনুসরন করে।

কিন্তু এটা সে ব্যাপার নয়। এখানে ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে প্রতিদিন। একটি ক্লাসে ৩৫-৪০ মিনিট সময়ে কোন নির্দিষ্ট বিষয় পড়ানো, বোঝানো, এক্সারসাইজ দেয়া এবং তা মূল্যায়ন এবং লিপিবদ্ধ করা, বাড়ির কাজ, অ্যাসাইমেন্ট দেয়া ও নেয়া- এগুলো নিঃসন্দেহে উন্নত প্রক্রিয়া, কিন্তু এটি বাংলাদেশে প্রায় অসম্ভব। পৃথিবীর যে সমস্ত দেশগুলোতে ধারাবাহিক মূল্যায়ন প্রচলিত সেখানে ছাত্র শিক্ষক অনুপাত প্রায় ১:১০। সরকারি প্রতিবেদন বলছে, আমাদের দেশে সে অনুপাত ১:৫৪। বাস্তবে এখানে প্রাথমিক বা মাধ্যমিকের একজন শিক্ষককে গড়ে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জনের ক্লাস পরিচালনা করতে হয়।

কর্তৃপক্ষ বলছেন, তারা ইতিমধ্যে শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ বছর থেকে শ্রেণিকক্ষে ৫৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী রাখা যাবে নাÑ এই নির্দেশ তারা জারি করেছেন। ধীরে ধীরে তা আরও কমিয়ে আনা হবে। মনে হয়, যারা শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করেন তারা দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে অবহিত নন। দেশের ২০ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোগুলোর মধ্যে মাত্র ৬৮৪টি সরকারি, বাকি সবগুলো বেসরকারি। গত বছরের জুলাই মাসে এই বিদ্যালয়গুলোর হাজার হাজার শিক্ষক ঢাকার রাস্তায় অবস্থান নিয়েছেন, বিক্ষোভ করেছেন, অনশন করেছেন। তাদের উপর লাঠিচার্জ হয়েছে, শেষ পর্যন্ত জোর করে, কিছু আশ্বাস দিয়ে তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই শিক্ষকরা তাদের চাকরি জাতীয়করণের দাবি তুলেছিলেন। তারা তাদের করুণ অবস্থার কথা বলেছেন, বিদ্যালয়ের করুণ অবস্থার কথা বলেছেন। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের দুর্নীতি, শিক্ষকদের স্বল্প বেতন, কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ দেয়ার পর সৃষ্ট জটিলতাসহ বিভিন্ন সংকটে ভারাক্রান্ত মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। এই অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটিয়ে বিদ্যমান শিক্ষাক্রমে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার পরই শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের কথা ভাবা যায়। এটা না করে শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করা মানে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়া- তাতে বাস্তবে ভাঙাচোরা যে শিক্ষাব্যবস্থাটা কোনরকমে টিকে ছিল, সেটাও ধ্বংস হয়ে যাবে।

৫। অবকাঠামো উন্নত করলে ও শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত কমিয়ে আনলেই কি ধারাবাহিক মূল্যায়নের সুফল মিলবে? যে ধরনের ধারাবাহিক মূল্যায়ন এই শিক্ষাক্রমে প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটা কি উন্নত পদ্ধতি? যে সকল স্কুলে ভাল অবকাঠামো আছে সে সকল স্কুলে এই এক বছরের অভিজ্ঞতা কী বলছে? এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা দূর হবে ও চাপ কমবে বলে শিক্ষাক্রম প্রণেতারা যে দাবি করেছেন সেটা কি বাস্তবে সম্ভব হয়েছে?
– এই শিক্ষাক্রমে প্রণীত ধারাবাহিক মূল্যায়নে ‘পারফরমেন্স ইন্ডিকেটর’ ও ‘বিহেভেরিয়াল ইন্ডিকেটর’ নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলোর ক্লাস পর্যায়ে ও পরবর্তীতে সমষ্টিগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে সামগ্রিক মূল্যায়ন তৈরি করার জন্য যে জটিল ম্যাট্রিক্স সৃষ্টি করা হয়েছে- তা শিক্ষকদের কাছে দুর্বোধ্য। একটা অ্যাপে শিক্ষার্থীদের সমগ্র ফলাফল লিপিবদ্ধ থাকার কথা। সেই অ্যাপ উদ্বোধন করা হয়েছে শিক্ষাবর্ষ শুরুর ৮ মাস পর এবং কিছুদিন পরই সেটি প্রায় বিকল হয়ে পড়ে। সে কারণে এক বছর পর বেশিরভাগ স্কুল তাদের শিক্ষার্থীদেরকে হাতে লেখা রিপোর্ট কার্ড দিয়েছে। বেশিরভাগ শিক্ষকের এ ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা না থাকার কারণে এই মূল্যায়ন হয়েছে ভাসাভাসা এবং প্রায় নব্বই ভাগ শিক্ষার্থীকেই ফলাফলে সর্বোচ্চ স্তরে রাখা হয়েছে বেশিরভাগ জায়গায়। নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও পর্যাপ্ত ছিল না। মাত্র দুই থেকে পাঁচদিন প্রশিক্ষণ দিয়ে এই প্রায় সম্পূর্ণ নতুন এই শিক্ষাক্রম চালু করা হচ্ছে। ধারাবাহিক মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বাসায় যে সকল অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হয়েছে সেগুলো সম্পন্ন করতে শিক্ষার্থীদের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যেটা গরীব শিক্ষার্থীদের জন্য একেবারেই অসম্ভব। অ্যাসাইমেন্ট ও বাড়ির কাজ হিসেবে যা করতে দেয়া হচ্ছে, সেগুলোও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনর্থক। যেমনÑ পরমাণুর মডেল পড়ানোর সময় দেখা গেল সবাইকে শোলা দিয়ে সেই মডেল বানিয়ে আনতে বলা হচ্ছে। এটা সময় ও অর্থের অপচয়। শিক্ষক ক্লাসরুমে ভাল একটি থ্রিডি মডেল অথবা মাল্টিমিডিয়ায় দেখালে, শিক্ষার্থীরা এর চেয়ে ভাল বুঝতে ও শিখতে পারতো।

বলা হচ্ছে, ধারাবাহিক মূল্যায়নে ‘পিআই’ ও ‘বিআই’ এর মূল্যায়ন হিসেবে ত্রিভুজ, বৃত্ত বা চতুর্ভুজ দেয়া হবে। কিন্তু চুড়ান্ত মূল্যায়নে কিন্তু এই ত্রিভুজ, বৃত্ত বা চতুর্ভুজ থাকবে না। চূড়ান্ত মূল্যায়ন প্রকাশিত হবে সাত ধরনের ভিন্ন ভিন্ন শব্দে। সেগুলো হলো- অনন্য, অর্জনমুখী, অগ্রগামী, সক্রিয়, অনুসন্ধানী, বিকাশমান এবং প্রারম্ভিক। এগুলোকে বলা হচ্ছে পারদর্শিতার স্তর। বলা বাহুল্য এই স্তরে সবার উপরে আছে ‘অনন্য’ আর সবার নিচে আছে ‘প্রারম্ভিক’।

অন্য সকল আয়োজন আছে ধরে নিলেও এই মূল্যায়ন বিভিন্ন দিক থেকে ত্রুটিপূর্ণ। পারদর্শিতা অর্থাৎ ‘পিআই’ এর ক্ষেত্রে তাও একটা অবজেকটিভ বা নৈর্ব্যক্তিক ব্যাপার আছে। সেখানে কিছু দক্ষতার মূল্যায়ন শিক্ষককে করতে হয়। কিন্তু আচরণগত অর্থাৎ বিআই এর ক্ষেত্রে সকল সূচকের মূল্যায়ন সাবজেকটিভ বা ব্যক্তিগত। অর্থাৎ শিক্ষক নিজে ঠিক করবেন একজন শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষে নিষ্ঠা, সততা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা (যেগুলো বিআই এর সূচক) ইত্যাদি কেমন এবং সে অনুযায়ী মূল্যায়ন করবেন। আর এই প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা কমবে না। কারণ, খালি চোখেই বোঝা যাচ্ছে ‘অনন্য’ আর ‘প্রারম্ভিক’ এর মধ্যে পার্থক্য আছে। ‘এ প্লাস’ না লিখে ‘অনন্য’ লিখলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মন থেকে প্রতিযোগিতা চলে যাবে, এটা সঠিক চিন্তা নয়। নম্বর পদ্ধতি বাদ দিয়ে গ্রেডিং চালু করার সময় যে ধরণের যুক্তি করা হয়েছিল, এখন ‘এ প্লাস’, ‘এ’, ‘বি’ ইত্যাদি গ্রেডিং তুলে ‘অনন্য’, ‘প্রারম্ভিক’ ইত্যাদি করার সময় একই ধরণের যুক্তি করা হচ্ছে। আসলে শিক্ষাক্রম প্রণেতারা সমস্যার কারণ ধরতে পারছেন না, বা জেনেও সমস্যার মূলে যেতে চাইছেন না।

৬। এই শিক্ষাক্রম কি বিজ্ঞানী তৈরি করবে? নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারকেও যদি একটা মানদণ্ড ধরি (যেটা শিক্ষাক্রম প্রণেতারা বারবার উল্লেখ করছেন), সেটা কি এই শিক্ষাক্রমের মধ্য দিয়ে অর্জিত হবে?
– প্রযুক্তি আবিষ্কারের জন্য বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়কে ভালভাবে জানতে হয়। শিক্ষাক্রমকে জ্ঞানমুখী হতে হয়। কিন্তু এই শিক্ষাক্রম জ্ঞানমুখী নয়, দক্ষতামুখী। বারবারই এই শিক্ষাক্রমে এই দক্ষতা অর্জনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেজন্য কারিগরি শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রতিটি ক্লাস সমাপনীর পর সার্টিফিকেট দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, সেটা নিয়ে যে কোন ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ে যুক্ত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। এই ধরণের দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম দিয়ে বিজ্ঞানী সৃষ্টি করা যায় না। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ যে অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে থাকেন, তাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আয়োজন না থাকলে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাও শিক্ষার্থীদের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই আমাদের মতো দেশে প্রতিষ্ঠানমুখী শিখনব্যবস্থা দরকার, প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন শক্তিশালী করা দরকার। অথচ এই শিক্ষাক্রমে করা হয়েছে উল্টোটা। প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব কমিয়ে দিয়ে আশেপাশের পরিবেশ থেকে শেখার নামে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের বাইরে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। অ্যাসাইনমেন্ট ও হোমওয়ার্ককে ধারাবাহিক মূল্যায়নের একটা বড় অংশ করে দিয়ে পারিবারিক দায়িত্ব বাড়ানো হয়েছে, যেখানে মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত-গরীব পরিবারের সন্তানরা কিছু শিখতে পারবে না।

৭। ৯ম শ্রেণিতে বিভাগ বিভাজন উঠিয়ে দেয়াটাকে কিভাবে দেখবো?
– দীর্ঘ দিন ধরেই এ অঞ্চলের শিক্ষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত জনগণ ‘কম্প্রিহেনসিভ এডুকেশন’ চালুর দাবি করে আসছেন। বর্তমান কারিকুলামে নবম-দশম শ্রেণির বিভাগ বিভাজন তুলে দেয়া হয়েছে। এতে অনেকেই মনে করছেন এবার ‘কম্প্রিহেনসিভ এডুকেশন’ চালু হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। সামগ্রিক শিক্ষা চালুর অন্যতম শর্ত হলো আগে একই ধারার শিক্ষা চালু করা। বর্তমান কারিকুলাম শিক্ষায় একই ধারা চালু করেনি। ইংরেজি মাধ্যম, মাদ্রাসা, কারিগরি ও সাধারণ ধারা সবই আছে। উপরন্তু শিক্ষার সাধারণ ধারার মধ্যে বিভাগ বিভাজন তুলে দিয়ে সমন্বিত বিজ্ঞান শিক্ষাকে উন্নত করার বদলে এর মানের অবনমন ঘটানো হয়েছে, অনেক বেশি কারিগরিনির্ভর করা হয়েছে। পূর্বে বিজ্ঞান বিভাগ আর মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের বিজ্ঞান শিক্ষার মধ্যে যে ফারাকটা ছিল, সেটাকে তারা কিভাবে ভারসাম্যে নিয়ে আসলেন- তা পরিষ্কার নয়। এতে মানবিকের শিক্ষার্থীরা হয়তো পূর্বের চেয়েও একটু ভাল শিখতে পারবে, কিন্তু ভবিষ্যতে বিজ্ঞান পড়ুয়াদের জন্য সংকট সৃষ্টি করবে। যদিও শিক্ষাক্রম প্রণেতারা এটা স্বীকার করছেন না। তারা বলছেন, শ্রেণিকক্ষে বরাদ্দ সময় ও বিষয়বস্তুÑ কোন দিক থেকেই বিজ্ঞানশিক্ষা আগের চেয়ে কমানো হয়নি। কিন্তু বাস্তবতা তা বলে না। বিজ্ঞানের ক্লাস সংখ্যা কমানো হয়েছে। আবার বিষয়বস্তু কমেছে শুধু নয়, ‘অনুসন্ধান’ ও ‘অনুশীলন’- দুটি আলাদা বই করে বিষয়ভিত্তিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এমনিতেই দেশে বিজ্ঞান শিক্ষকের সংকট, দক্ষ ও মানসম্পন্ন শিক্ষকের সংকট আরও বেশি। এর মধ্যে যদি বইয়ের ব্যাখ্যা কমিয়ে দেয়া হয়, সেটা বিজ্ঞান শিক্ষাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে।
সমন্বিত শিক্ষায় একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি পর্যন্ত সকলের জন্য অভিন্ন পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানের (সমাজবিজ্ঞান ও প্রকৃতিবিজ্ঞান) মৌলিক ধারণাগুলি দেয়ার কথা। কিন্তু অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার কথা বলে বিজ্ঞানের তত্ত্বীয় ধারণাকে অপ্রধান করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক শুধু দেখলে হবে না, এখানে একজন শিক্ষার্থীকে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত ‘ইন্টার ডিসিপ্লিনারি’ শিক্ষা দেয়া হবে, যাতে সে সকল বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। প্রাক-প্রাথমিকে কোন পাঠ্যপুস্তকই নেই। নবম ও দশমের ধারাবাহিকতায় যে বিজ্ঞান পড়ানো হতো এবং শেষে দুটো ক্লাসে পড়ানো কোর্সের সম্পূর্ণটা নিয়ে পরীক্ষার আয়োজন করা হতোÑ তার একটা উদ্দেশ্য ছিলো। এই ধারাবাহিকতাকে ভেঙে নিচ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার আয়োজন করতে হলে নিচের স্তরের শিক্ষাভ্যবস্থার সে সক্ষমতা থাকা দরকার। সেটা একেবারে নেই।
আবার এই ‘ইন্টার ডিসিপ্লিনারি’ শিক্ষা চালু করতে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ের মৌলিক ধারণা ও বিষয় (কন্টেন্ট) কমানো হয়েছে। কোন একটি বিষয় নিয়ে মৌলিক ধারণা না থাকলে একজন শিক্ষার্থী অন্য বিষয়ের সাথে এর সম্পর্ক কী, তা বুঝতেই পারবে না। রসায়ন, পদার্থ, জীববিজ্ঞানÑ তিনটি বিষয়কে একসাথে করতে গিয়ে সব বিষয়েরই অধ্যায় কমানো হয়েছে। আর তার জায়গায় ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা’, ‘জীবন-জীবিকা’ ইত্যাদি অমৌলিক বিষয়কে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে শিক্ষার বুনিয়াদি স্তরে ইন্টার ডিসিপ্লিনারি শিক্ষা কার্যত বিশেষ বিশেষ ‘ডিসিপ্লিন’ সম্পর্কে সম্যক ধারণা গড়ে উঠার পথকেই মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করবে। এটি বহু আকক্সিক্ষত সমন্বিত শিক্ষা নয়।

৮। এই শিক্ষাক্রম মুখস্ত শিক্ষা ও শিক্ষার্থীর উপর চাপ কি কমাবে?
মুখস্ত শিক্ষা, প্রতিযোগিতা- এসবের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলে বারে বারেই শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি, এমসিকিউ, কমিউনিকেটিভ ইংরেজি- ইত্যাদি প্রতিটি পরিবর্তনের আগে এই মুখস্ত শিক্ষার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রতিবারই দেখা গেলো ‘মুখস্ত শিক্ষা’, ‘প্রতিযোগিতা’Ñ ইত্যাদি থাকলো, কিন্তু কারিকুলামে পরিবর্তন আনা হলো। কেন শিক্ষার্থীরা মুখস্ত করে, এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ কীÑ সেটা চিহ্নিত ও নিশ্চিহ্ন করতে না পারলে এই মুখস্ত শিক্ষা, প্রতিযোগিতা নির্মূল করা যাবে না। বর্তমান কারিকুলাম প্রণেতাদের মত হলোÑ পরীক্ষা পদ্ধতিই মুখস্ত শিক্ষা ও প্রতিযোগিতার একমাত্র কারণ। তাই তারা পরীক্ষাই তুলে দিতে চাইছেন। প্রাথমিক ধাপ হিসেবে ১ম থেকে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা তুলে দিয়েছেন। পরীক্ষাবিহীন, দুর্বল অবকাঠামোয় শিক্ষা নেয়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কিছু শিখতেই পারবে না। এক অর্থে এটা প্রতিযোগিতা কমাবেÑ নিম্নবিত্তরা উচ্চবিত্তের ভাল স্কুলের সন্তানদের সাথে প্রতিযোগিতা করার আর কোন ক্ষমতাই রাখবে না। তথাকথিত ভাল স্কুলগুলোতে পরীক্ষা ঠিকই চালু থাকবে, বাণিজ্যিক স্কুলের সংখ্যা বাড়বে। পরীক্ষা বাদ দিয়ে ড্রপ আউট কমাতে গিয়ে স্কুলগুলোই ড্রপ আউট হয়ে যাবে।
এ দেশে উচ্চ শিক্ষায় ভর্তি, চাকুরিসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিশ্চয়তা। এসব ক্ষেত্রে সাফল্য পেতে হলে একজনকে তীব্র অসুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই প্রতিযোগিতার রিলে রেসে সৃজনশীল ভাবনা, মননশীলতার কোন স্থান নেই। মানুষের ভাবনা চিন্তা ও গণতান্ত্রিক চর্চার অবাধ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হলে জ্ঞান চর্চা, গবেষণা, সৃজনশীল ভাবনা ইত্যাদির প্রবাহ রুদ্ধ হতে বাধ্য। সমাজ ও রাষ্ট্রে এ রকম বন্ধ্যাত্ব বহাল রেখে শুধু পরীক্ষা তুলে দিলেই মুখস্ত নির্ভরতা, প্রতিযোগিতা ইত্যাদি কমবে না।

৯। এই শিক্ষাক্রমের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?
এই শিক্ষাক্রম শিক্ষার উদ্দেশ্যকেই পাল্টে দিচ্ছে। নবজাগরণ সামন্তীয় সমাজ ভেঙ্গে সবার জন্য, বিজ্ঞানভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক শিক্ষার ধারণা নিয়ে আসে। মানুষের মধ্যে স্বাধীন চেতনা ও সৃজনশীল চিন্তাশক্তি সৃষ্টির জন্য জ্ঞানচর্চার প্রয়োজন থেকেই গড়ে উঠে নবজাগরণের শিক্ষাব্যবস্থা। এ জন্য শিক্ষাক্রম সাজানো হতো ‘জ্ঞান-দক্ষতা-আচরণ’ এই ক্রম অনুসারে। আজ পুঁজিবাদের আর বিকাশ ঘটছে না। গোটা অর্থনীতি সংকটগ্রস্ত। উৎপাদিকাশক্তি অলস পড়ে আছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অব্যাহত বিকাশ এখন তার আর প্রয়োজন নেই। প্রকৃত বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে উঠলে যে কোন মানুষ এই ব্যবস্থাকে ভাঙতে চাইবে। তাই এখন তারা স্লোগান তুলছে দক্ষতা ভিত্তিক শিক্ষার। আর এ জন্য তারা কারিকুলামকে সাজাচ্ছে ‘দক্ষতা-জ্ঞান-আচরণ’ এই ক্রমানুসারে। অর্থাৎ জ্ঞান নয়, দক্ষতাকেই প্রধান করা হচ্ছে। আর এ জন্য শিক্ষাক্রমে আসছে থিমভিত্তিক শিক্ষার কথা। যার ফলে বিষয়বস্তুগুলো হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিভিন্ন ছোট ছোট বাণিজ্যিক কোর্সের মতো।

নতুন শিক্ষাক্রমে উল্লেখ করা হয়েছে ‘রূপান্তরমূলক দক্ষতা’ ও ‘অভিযোজন’ সক্ষমতা অর্জনের কথা। সংকটগ্রস্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পুঁজি আজ এক সেক্টরে তো কাল আরেক সেক্টরে বিনিয়োগ হচ্ছে। তাই স্থায়ী কোন কর্মসংস্থান গড়ে উঠছে না। এরূপ অস্থিতিশীল ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কর্মীবাহিনী যেন একটি খাত থেকে অন্যখাতে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে এরই পোশাকি নাম হচ্ছে অভিযোজন সক্ষমতা ও রূপান্তরমূলক দক্ষতা। অথচ এক সেক্টর থেকে অন্য সেক্টরে গিয়ে মানিয়ে নিতে পারলেই একজনের নিশ্চিত চাকুরি হবেÑ বিষয়টি মোটেই এমন নয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় একজনের কর্মসংস্থানের সুযোগ, কাজের নিরাপত্তাÑ এমনকি গোটা জীবনটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এই সংকটের কারণ কী, কেন শিল্পেন্নোয়ন হচ্ছে না, কেন আমাদের সবচেয়ে বড় শিল্পখাত গার্মেন্টস খাতে যত মুনাফা বাড়ছে তত কর্মসংস্থান বাড়ছে নাÑ এর কারণ অনুসন্ধান না করে গোটা জাতিকে বিভিন্ন কাজে ‘সুপারস্কিল্ড’ করেও কোন লাভ হবে না। রাষ্ট্রের শোষণের ফলে সৃষ্ট সংকটকে ব্যক্তির ঘাড়ে চাপানোর জন্য তাকে বলা হচ্ছে, তোমার দক্ষতা নেই, তাই তুমি চাকরি পাচ্ছ না। অথচ পলিটেকনিক থেকে পাশ করে শিক্ষার্থীরা বেকার পড়ে আছে। আর শিক্ষাক্রমে বার বার কর্মমুখী শিক্ষাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

শিক্ষাক্রমে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন শিক্ষাক্রম এসেছে মূলতঃ The Organization for Economic Cooperation and Development (OECD) এর লার্নিং ফ্রেমওয়ার্ক এর সুপারিশ এবং Sustainable Development Goal (SDG) সূচক অর্জনের জন্য। ঙঊঈউ সংস্থাটি সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থকে রক্ষায় বিশ্বব্যাপী বাজার অর্থনীতিকে উৎসাহিত করে। ২০০৯ সালে এ সংস্থা ‘অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা নীতি: দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক উন্নতির নতুন পদ্ধতি অনুসন্ধান’ নামক একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে সংস্থাটি তার সদস্য দেশগুলিকে পরামর্শ দেয় যে, চলমান অর্থনৈতিক সংকট থেকে বাঁচার উপায় হলো ‘শিক্ষায় বিনিয়োগ’। আর এর পরিপূরক করে শিক্ষাব্যবস্থাকে সাজাতে ‘দক্ষতাভিত্তিক’ ও ‘যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষা’ ধারণাকে আমদানি করা হয়েছে। অর্থাৎ এ শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে বিষয়গুলি নতুন চালু করা হলো, তা মূলত বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী সংস্থার দ্বারা নির্ধারিত।

১০। নতুন শিক্ষাক্রম কি বাণিজ্যিকীকরণ-বেসরকারিকরণ বৃদ্ধি করবে, শিক্ষার ব্যয় বাড়াবে?
– অ্যাসাইনমেন্ট ও হোমওয়ার্ক তৈরিতে যে খরচ হবে সেটা বহন করা দরিদ্র-নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কোন পাঠ্যপুস্তক নেই, পর্যাপ্ত আয়োজন নেই। প্রাথমিকের প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা নেই। এই পরিস্থিতিতে সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলো চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হবে, যত্নের সাথে শেখানোর দায়িত্ব নিয়ে গজিয়ে উঠবে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। সন্তানরা যাতে কিছুটা হলেও শেখে, সেই আশায় অভিভাবকরা এসকল প্রতিষ্ঠানে সন্তানদের ভর্তি করবেন। অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ ও মর্যাদাপূর্ণ বেতনভাতা ঘাটতির সাথে নতুন শিক্ষাক্রম শিক্ষকদের শিক্ষাদানকে কঠিন করে তুলবে। এসবকিছুর সমষ্টিগত প্রভাবে কোচিং ও গাইড নির্ভরতা বাড়বে। অতীতেও একই চিত্র দেখা গেছে।

বলা যায় সমস্ত দিক থেকে এই রকম একটি গণবিরোধী শিক্ষাক্রম আওয়ামী সরকার প্রণয়ন করেছে নানান গাল ভরা প্রগতিশীল শব্দ আউড়ে। এতে বহু মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ এ রকম মোহ বা বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে বলেই এতদিন গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকতে পারছে। এ গণবিরোধী শিক্ষাক্রম বাতিলের আন্দোলন শুধু শিক্ষার অধিকার রক্ষার আন্দোলন নয়, বরং ফ্যাসিবাদের ভাবাদর্শিক হাতিয়ারকে রুখে দেয়ারও আন্দোলন। এই আন্দোলনে সকলকে যুক্ত হওয়ার জন্য আমরা আহবান জানাই।

RELATED ARTICLES

আরও

Recent Comments