Monday, June 24, 2024
Homeসাম্যবাদসাম্যবাদ - মে-জুন ২০২৩স্বাধীনতা নিয়ে মতামতের স্বাধীনতাও হরণ

স্বাধীনতা নিয়ে মতামতের স্বাধীনতাও হরণ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলসহ এই আইনে গ্রেফতারকৃত সকল বন্দীদের মুক্তির দাবিতে ৭ এপ্রিল শাহবাগে ছাত্র-শিক্ষক ও জনতার প্রতিবাদ

২০২৩ সালের ২৬ মার্চ। দেশের ৫২তম স্বাধীনতা দিবস পালিত হলো। ‘দৈনিক প্রথম আলো’ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত একটা প্রতিবেদনে সেদিন দিনমজুর জাকির হোসেনের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়। জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায় প্রথম আলোর প্রতিবেদককে তিনি বলেছিলেন, “পেটে ভাত না জুটলে স্বাধীনতা দিয়া কী করুম। বাজারে গেলে ঘাম ছুটে যায়। আমাগো মাছ, মাংস আর চাইলের স্বাধীনতা লাগব।”
মন্তব্যটি সরল কিন্তু তীক্ষè। ফলে তা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। এর পরবর্তী ঘটনাগুলো আমরা জানি। প্রথম আলো পত্রিকার সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা ও সাংবাদিক শামসুজ্জামানকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া ও মামলা দেয়াÑ এই ছিল এবারের স্বাধীনতা দিবসের প্রাপ্তি।
মিথ্যা প্রচারে শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী মিডিয়া এ ঘটনার পর নতুন প্রশ্ন তুলেছেন, “স্বাধীনতা মানে কি শুধু মাছ-মাংস খাওয়া?” আবার কেউ বলছেন, “আগে মানুষ ডাল-ভাত পেলেই সন্তুষ্ট থাকতো। এখন মাছ-মাংস চাইছে। এতেই বোঝা যায় দেশের উন্নতি হয়েছে।”
গরীব মানুষ অভাবে ও কষ্টে আছে- স্বাধীনতা দিবসে একথা বললে কি স্বাধীনতাকে খাটো করা হয়? মুক্তিযুদ্ধে এদেশের মানুষের স্বপ্ন ছিল পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে মুক্ত হলে ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠিত হবে। সেখানে সবাই খেতে-পরতে পারবে, শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান পাবে, কথা বলার স¦াধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার থাকবে, সাম্য ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা হবে, সাম্প্রদায়িকতা ও ভেদাভেদ থাকবে না। সেই স্বপ্ন আজও বাস্তবায়িত হয়নিÑ একথাই দিনমজুর জাকির হোসেন তাঁর ভাষায় বলেছেন, প্রথম আলো সেটা ছাপিয়েছে। এটাই দেশের লক্ষ-কোটি মানুষের মনের কথা। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি প্রায়-উপনিবেশিক শোষণের অবসান ঘটেছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু সে স্বাধীনতার সুফল ভোগ করেছে মুষ্টিমেয় লোক, যারা ধনী এবং ক্ষমতাশালী হয়েছে। মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীনতাযুদ্ধে যারা সবচাইতে বেশি ভূমিকা রেখেছে, সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছেÑ সেই শ্রমিক-কৃষক-সাধারণ মানুষ অধিকারবঞ্চিত রয়ে গেছে।
দেশের বেশিরভাগ মানুষের প্রয়োজনমত ‘মাছ, মাংস আর চাল’ কেনার স্বাধীনতা অর্থাৎ ক্রয়ক্ষমতা যে নেইÑ এটা কি ‘অতিরঞ্জিত ও মিথ্যা’ তথ্য? দেশের জনগণের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে এটাই সত্য কিন্তু সরকারি মহলের বিবেচনা ভিন্ন। তাদের বিবেচনায় প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে, মানুষের জীবন-জীবিকা মেরে দিয়ে, লুটের মহোৎসবের মেগা প্রকল্প করাই একমাত্র সত্য প্রচার এবং সেটাই সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা। দেশের কোন সংকটই সরকার স্বীকার করেন না এবং সাংবাদিক বা অন্য কেউ এ নিয়ে ভিন্ন কোন কথা বলুক তাও তারা চান না।
কিছুদিন আগে এক মন্ত্রী বলেছেন, “মানুষ এখন তিনবেলা মাংস খেতে পারে।” অথচ মার্চ মাসেই গবেষণা সংস্থা সানেম দেশে ১৬০০ নিম্নআয়ের পরিবারের ওপর জরিপ চালিয়ে তথ্য পেয়েছে- দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৭১ দশমিক ১৯ শতাংশ পরিবার এখন প্রয়োজনের তুলনায় কম খাচ্ছে। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও, আয় বাড়েনি গরিব মানুষের। ফলে তাদের মধ্যে না খেয়ে থাকার প্রবণতা বেড়েছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি বলেছেÑ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবারের ফেব্রুয়ারিতে পরিবারপ্রতি খাবার খরচ বেড়েছে ২৫ শতাংশ।
এই যুক্তি সরাসরি তুলে ধরলে তখন তারা সারা দুনিয়ায় দাম বাড়ার কথা বলেন। কিন্তু যে কথা তারা বলেন না তা হলো, বিশ^বাজারে দ্রব্যমূল্য যে হারে এখন কমছে, বাংলাদেশে সে হারে কমছে না। এর কারণ আমদানী ও বিপণনে বৃহৎ ব্যবসায়ী সিণ্ডিকেটের আধিপত্য। সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণে কোন ভূমিকা নিচ্ছে না, বরং পৃষ্ঠপোষকতা করছে। তারা আরও বলেন না যে, উন্নত দেশগুলোসহ অনেক দেশেই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে জনগণকে রক্ষায় বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা বা সরকারি সহায়তা কর্মসূচি আছে, বাংলাদেশে যা নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে সামাজিকভাবে দুরবস্থাপন্ন মানুষের কোন তালিকা নেই। সামাজিক সুরক্ষা স্কিম যতগুলো চালু আছে সেগুলো স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বিতরণ হয় এবং তা কিভাবে হয় পত্রিকার পাতা একটু উল্টালেই বোঝা যায়, গ্রামে যেতে হয় না। এর বেশিরভাগ টাকাই লুটপাট হয়।
বাংলাদেশে যে অর্থনৈতিক সংকট তার জন্য শুধু ইউক্রেন যুদ্ধ বা বিশ্বপরিস্থিতি দায়ী নয়। ব্যাংকিং সেক্টরে সরকারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের লুটপাট, বিদ্যুৎ খাতে আমদানীকৃত তেলনির্ভর বেসরকারি আইপিপি-রেন্টাল প্ল্যান্টগুলোকে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ভর্তুকি, মেগাপ্রকল্পের জন্য ঋণের বোঝা বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, দুর্নীতি-অপচয়সহ আভ্যন্তরীণ কারণগুলোই প্রধানতঃ দায়ী। এসবের কারণে ভুগতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
স্বাধীনতার ৫২ বছর পরও দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অনিশ্চয়তা, মানসম্মত জীবনযাপনের অভাব আজো বেশিরভাগ মানুষের নিত্যসঙ্গী। কোনমতে দুমুঠো খেয়ে টিকে থাকা আর মানুষের মত বাঁচা এক কথা নয়। উন্নত শিক্ষা-চিকিৎসা, সামাজিক জীবন, বিনোদন, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এসবই মানুষের প্রয়োজন। আজকের বাংলাদেশে উন্নত জীবন দূরে থাক, মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকটে সাধারণ মানুষ চরম দুর্দশায়। জনগণ ভোটাধিকারবঞ্চিত, স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত।
অন্যদিকে ‘উন্নয়নের জোয়ারে’ রাতারাতি টাকার পাহাড় গড়ছে একদল লোক, ধনীদের সম্পদ ফুলে-ফেঁপে উঠছে। সর্বত্র চলছে দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার। সমাজে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে, সামাজিক সম্পর্ক ও দায়িত্ববোধ ধ্বংস হচ্ছে আত্মকেন্দ্রিকতা-ভোগবাদের আগ্রাসনে, মাদক-অপরাধ প্রবণতা গ্রাস করছে যুবসমাজকে, সাম্প্রদায়িকতা-ধর্মান্ধতা বাড়ছে, নারী-শিশু-বৃদ্ধরা নিরাপত্তাহীন। টিকে থাকা বা উন্নতি করার প্রতিযোগিতার অনিশ্চয়তায় সমাজে মানসিক সমস্যা বাড়ছে।
দেশের এই চিত্র ঢেকে রাখতে ও মানুষকে ভোলাতে অনির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার ‘উন্নয়ন’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ প্রতিষ্ঠার ঢোল পেটাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যে তারা নিজেরাই ধারণ করে না, তা তাদের কর্মকাণ্ডে পরিষ্কার। জবরদস্তি-কূটকৌশলের সাহায্যে ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দুর্বলতার কারণে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ সুবিধা বিতরণের মাধ্যমে যে অনুগত গোষ্ঠী জন্ম দিয়েছে, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল গণমাধ্যমের বড় অংশ। বেশিরভাগ টিভি চ্যানেল ও পত্রিকা তারা নানা কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রথম আলোর বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও এর সাংবাদিক গ্রেপ্তার-সম্পাদক হয়রানি মিডিয়ার ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। ২০১৮ সালে প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এক্ষেত্রে সরকারের বড় হাতিয়ার। সরকারের সমালোচনা করে এমন সাংবাদিক, লেখক বা রাজনৈতিক কর্মীদের ‘হয়রানি’ করার উদ্দেশ্যেই আইনটি ব্যবহৃত হয়। সেখানে বলা আছে- দেশের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুন্ন হয়, বিভ্রান্তির কারণ ঘটে, কারো মানহানি হয়, কারো অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন তথ্য ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারের জন্য যে কেউ দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন। সব মহল থেকে এই কালো আইন বাতিলের দাবি উঠলেও আন্দোলনের চাপ না থাকায় সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে সাংবাদিক শামসুজ্জামানের মুক্তি, প্রথম আলোর বিরুদ্ধে অন্যায় মামলা প্রত্যাহার ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে সোচ্চার হওয়া আজ জরুরি কর্তব্য।
জনগণের ‘মাছ, মাংস আর চাইলের স্বাধীনতা’ এবং মত প্রকাশের অধিকার দুই-ই আজ বিপন্ন। আওয়ামী লীগসহ স্বাধীনতার পর থেকে যারাই ক্ষমতায় থেকেছে তারা সবাই অল্প কিছু শোষক-লুটেরাদের স্বার্থ রক্ষা করেছে। দুর্নীতিগ্রস্ত-গণবিরোধী এই শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করতে গিয়ে তারা জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত করে স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে। শোষণ-বৈষম্যমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ যারা চান, তাদের আজ সংঘবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন শোষক-লুটেরা ধনিকশ্রেণী ও তাদের পাহারাদার দুর্নীতিবাজ-স্বৈরতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। গড়ে তোলা দরকার জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি।

RELATED ARTICLES

আরও

Recent Comments