Saturday, February 24, 2024
Homeসাম্যবাদসাম্যবাদ - জানুয়ারি ২০১৬স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস || ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর মর্যাদা এদেশ কখনোই দিতে পারেনি

স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস || ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর মর্যাদা এদেশ কখনোই দিতে পারেনি

images-2ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীত জগতে অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব, ভারতীয় শাস্ত্রিয় সঙ্গীতে যন্ত্র সঙ্গীত ধারায় হিন্দু-মুসলিম যত শিল্পীই এসেছেন, তাঁর সমকক্ষ আগেও কেউ ছিলেন না, এখনও নেই। প্রায় সকল ধরনের বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী ছিলেন তিনি। সৃষ্টি করেছিলেন সংগীত দল ‘মাইহার ব্যান্ড’। এতবড় মহান শিল্পী ছিলেন এই বাঙালি। তাঁর জন্ম বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সেখানে তাঁর বাড়িতে, যেখানে তিনি মাঝে মাঝে এসে গান শেখাতেন, অনেক গুণী লোকের পদার্পণ হতো, সেই বাড়িতে একটি সংগীত স্কুল ও মিউজিয়াম গড়ে তোলা হয়েছিল। সেই বাড়িটি কিছু মাদ্রাসা ছাত্র জ্বালিয়ে দিল। তাঁর স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করে দিল। এদেশের এত বড় গৌরব সকলের চোখের সামনে এভাবে অপমানিত হলেন।

এই দেশে কখনই তাকে বুঝতে পারার মতো মানুষ দেখা যায়নি। বর্তমানে বাংলাদেশে যে বুদ্ধিজীবী-শিক্ষিত লোক, শিল্পী-সাহিত্যিকরা আছেন, তাদের গুণের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, তাদের বুঝতে পারার মতো ক্ষমতা নেই যে, তিনি কত বড় মানুষ ছিলেন। এ নাহলে তারা এভাবে চুপ করে থাকতেন না। বুদ্ধিজীবী এদেশে আছেন ঠিকই কিন্তু এতবড় মানুষকে বুঝতে পারার জন্য যে জ্ঞান দরকার, মানবিকতা ও মূল্যবোধ দরকার তার চিহ্নমাত্র এদেশে নেই। আমরা অনেক বুদ্ধিমান মানুষ বটে, তবে অনেক ক্ষুদ্র, নীচ মনের মানুষ আমরা। সেজন্য ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে বুঝতে পারিনি। বুঝতে যে পারিনি সেটা বুদ্ধির অভাবের জন্য নয়, মূল্যবোধের অভাবের জন্য। মূল্যবোধ আর বুদ্ধি এক জিনিস নয়। তাই তাঁর মূল্যও এদেশ দিতে পারেনি। ভারতও দিতে পারেনি। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর শিষ্য ভারতরত্ন হয়েছেন। কিন্ত যিনি গুরু, সমগ্র ভারতবর্ষের যন্ত্র সঙ্গীতের গুরু, অতুলনীয় সংগীতজ্ঞ — ভারতেও তাঁর যোগ্য সম্মান তিনি পাননি। সত্যিকারের যত বড় সম্মান ভারত দিতে পারে, সে সম্মান তারা তাঁকে দেয়নি। আর বাংলাদেশ তো তাঁকে চিনতেই পারেনি। চিনতে পারার কোনো সাধনাই বাংলাদেশে নেই। একটি শিল্পকে বোঝতে পারার জন্য যে রসের পরিবেশ থাকা দরকার বাংলাদেশ তার ধারে কাছেও নেই। তাই বোঝার লোক এদেশে খুব একটা নেই। না বোঝার জন্য তাঁর স্মৃতির উপর এই কান্ডটা হয়ে গেল।

এ উপমহাদেশের রাজনীতির অনেক বড় বড় মানুষ বাংলাদেশে জন্মেছেন। কিন্তু শিল্পের ক্ষেত্রে এতবড় মানুষ আলাউদ্দিন খাঁর সম্প্রদায় জন্ম দিতে পারেনি। বিদ্যাসাগর যত বড় মানুষ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ যত বড় মানুষ — শিল্পজগতে আলাউদ্দিন খাঁ তাঁদের সমকক্ষ মানুষ। তাঁর ঋণ শোধ করার ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। এত বড় মানুষকে বাঙালি তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা বুঝতে পারে না, চিনে না, জানে না। তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেদের এ ধরনের কোন মানুষ জন্ম দেয়ার বাস্তবতা এখন এদেশে নেই। তাঁর অসম্মানে কষ্ট হবে কেন? বুঝতে পারলে তো কষ্ট? বুঝতে পারলে যে কষ্ট, সে কষ্টবোধের মানুষও নেই। আছেন যে, তাঁর কোনো পরিচয়ও এদেশে কেউ দেখাতে পারেননি। প্রতি বছর ঢাকায় ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের কনসার্টে হাজার হাজার লোক হয়। কিন্তু সে রকম প্রতিবাদ হলো কই? এক হাজার লোকেরও তো একটি প্রতিবাদ হলো না।
ভারতের সঙ্গীতাঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে এ ঘটনায়। আলাউদ্দিন খাঁর মেয়ে অন্নপূর্ণার ছাত্র পন্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া বলেছেন, “এটা মানবতার মৃত্যু।” পন্ডিত যশরাজ বলেছেন, “বাংলাদেশের মানুষ সঙ্গীত এতো ভালবাসে, সেখানে এ ঘটনা কিভাবে ঘটলো?” ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর নাতি, ওস্তাদ আলী আকবর খাঁর পুত্র ওস্তাদ আশীষ খাঁ বলেছেন, “বাংলাদেশ কখনই দাদুকে যোগ্য সম্মান দেয়নি। খুবই মর্মাহত বোধ করছি।” প্রতিবাদ করেছেন ওস্তাদ রশীদ খাঁন, পন্ডিত তেজেন্দ্র নারায়ণ মজুমদারসহ আরও অনেকে।

আমরা চাই, এ ঘটনায় গভীর মর্মবেদনা সৃষ্টি হোক। এখনও প্রতিবাদের সময় আছে, লেখার সময় আছে। যারা শিক্ষিত, যারা সংস্কৃতির চর্চা করেন তারা নামুন। সরকারের ভাড়াখাটা বুদ্ধিজীবীদের কথা বলছি না। যারা স্বতন্ত্র, স্বাধীন চিন্তা করেন, তাঁদের কথা বলছি। আপনারা কেউই কেন প্রতিবাদ করতে পারলেন না ভেবে দেখুন। আসলে আপনাদের চিন্তায় তিনি কত বড় মানুষ এটা ধরতে না পারার অভাবের জন্য এই কান্ডটি হয়েছে।

অনেক লড়াই করে দেশের স্বাধীনতা আমরা এনেছি। গোলামী কেন সহ্য করিনি? স্বাধীন কেন হলাম? বড় মানুষ হওয়ার জন্য তো? বড় মানুষকে বুঝতে না পেরে, তাঁর মর্যাদা রক্ষা না করে কি নিজে বড় হওয়া যায়? আমরা আহবান জানাচ্ছি, দেশের শিক্ষিত-সচেতন মানুষরা এই জঘন্য কান্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন।

সাম্যবাদ জানুয়ারি ২০১৬

RELATED ARTICLES

আরও

Recent Comments