জুলাই সনদ
কিছু প্রশ্ন, কিছু আশঙ্কা
ভূমিকা
জুলাই গণঅভ্যুত্থান এদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। এত রক্ত, প্রাণত্যাগ পূর্ববর্তী আর কোন আন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থানে ঘটেনি। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনে অতীষ্ঠ, বিপর্যস্ত, বিক্ষুব্ধ মানুষ মুক্তি চেয়েছিলেন; চেয়েছিলেন মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, দুর্নীতিমুক্ত, সাম্রাজ্যবাদের হস্তক্ষেপমুক্ত একটি দেশ। ফলে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে রাষ্ট্রের সংবিধান ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের আলোচনা সামনে আসে। জনআকাঙ্ক্ষার কারণে সরকারও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয় ও ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করে।
প্রথমে ৬টি সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। কমিশনগুলোর প্রস্তাবনাগুলোতে ঐকমত্য সৃষ্টির জন্য গঠিত হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ৫টি সংস্কার কমিশনের বাছাই করা কিছু প্রস্তাবনা নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনায় বসে। দীর্ঘ ৮ মাস ধরে আলোচনার পর প্রণীত হয় জুলাই সনদ। এরপর ঘোষণা করা হয় ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’।
কিন্তু এটি কি জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করতে পেরেছে? আমাদের দল শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল এবং সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। কিন্তু জুলাই সনদে আমরা স্বাক্ষর করতে পারিনি।
দল হিসেবে আমাদের অভিজ্ঞতা ও ধাপে ধাপে দেয়া আমাদের বক্তব্যের সংক্ষিপ্ত সংকলন এই পুস্তিকা। সামগ্রিক আলোচনা তুলে আনতে গেলে বিরাট পরিসর প্রয়োজন, এই পুস্তিকায় শুধু এর সংক্ষিপ্তসারই তুলে ধরা হলো।
আমাদের রাজনৈতিক বক্তব্যগুলোর ক্ষেত্রে সকলের মতামত আমরা প্রত্যাশা করি এবং এর মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে আমরা উপকৃতও হয়েছি। আপনারা বইটি পড়ে আপনাদের মতামত রাখবেন এই প্রত্যাশা করি।
শুভেচ্ছোসহ
মাসুদ রানা
সমন্বয়ক
বাসদ (মার্কসবাদী)
.
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রাষ্ট্রের প্রায় সকল প্রতিষ্ঠান অকার্যকর ও পঙ্গু হয়ে পড়ে। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর হাতেই সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী কোন সরকারই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে ছিল না, কিন্তু আওয়ামী লীগের বিগত ১৫ বছরের শাসনামলের মতো রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকে এতখানি কুক্ষিগত কেউ করতে পারেনি। নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশনসহ সকল সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি দলীয় আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। কার্যতঃ অনির্বাচিত সংসদ, দলীয় প্রশাসন ও বিচার বিভাগের মাধ্যমে সমস্ত ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।
জনগণ ছিল অতীষ্ঠ। প্রতিবাদ করলেই তা দমন করা হত। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ২ হাজার ৬৯৯ জন, গুম হন ৬৭৭ জন, কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন ১ হাজার ৪৮ জন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের তালিকাসহ ২০২৪ সালের ঘটনা যুক্ত করলে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় তিন হাজার। (মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর তথ্য অনুযায়ী)
বোঝাই যায় কী ধরনের পরিস্থিতি দেশে সৃষ্টি হয়েছিল! অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির দেয়া তথ্য অনুসারে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিদেশে পাচার করা হয়েছে প্রায় ২৮ লক্ষ কোটি টাকা, শেয়ার বাজার থেকে আত্মসাৎ করা হয়েছে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা, বিভিন্ন প্রকল্প থেকে লুটপাট করা হয়েছে প্রায় পৌনে ৩ লক্ষ কোটি টাকা। ধনী-গরীবের বৈষম্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, বেড়েছে মুদ্রাস্ফীতি। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ নিঃশ্বাস নিতে পারছিলেন না। শ্রমিকদের সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাদের প্রতিবাদ সমাবেশে গুলি চালানো, কৃষকদের ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া- এ ছিল স্বাভাবিক চিত্র। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও দফতরগুলোতে ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাটের কারণে সাধারণ মানুষ ন্যূনতম পরিসেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছিলেন। শ্বেতপত্রে প্রকাশ- ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ নেতারা ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন, আমলারা নিয়েছেন ৯৮ হাজার কোটি টাকা।
ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান
এর বিরুদ্ধে মানুষের মনে যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল তার ফলাফল এই গণঅভ্যুত্থান। এই গণঅভ্যুত্থানে আমাদের দল একেবারে সামনের সারিতে থেকে লড়েছে। গণঅভ্যুত্থানের আগে থেকেই আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে আমরা সমস্ত শক্তি নিয়ে লড়াইয়ে ছিলাম। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্দলীয় তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ৫ দফা দাবিতে আমরা গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করি। সেই গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালনকালে বিভিন্ন স্থানে আমাদের কর্মীরা আক্রমণের স্বীকার হয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিসে ও থানায় আমাদের কর্মীদের আটকে রাখার ঘটনাও ঘটে কয়েকবার। এই সকল আক্রমণ মোকাবেলা করেও আমরা কর্মসূচী পালন করেছি। এর ধারাবাহিকতায় যখন গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়, তখন আমরা সর্বশক্তি নিয়ে এতে অংশগ্রহণ করি। সমস্ত বামপন্থী দল সর্বশক্তি নিয়ে গণঅভ্যুত্থানে সেদিন অংশগ্রহণ করলে এই গণঅভ্যুত্থানের চরিত্র ও পরিণতি ভিন্ন হতো।
আওয়ামী লীগের গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব জাগরণ এই গণঅভ্যুত্থান। প্রায় দেড় হাজারেরও অধিক প্রাণ দিয়েছেন এই আন্দোলনে। আহত হয়েছেন ২৫ হাজারেরও অধিক। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভ্যুত্থানে আমরাও সর্বশক্তি নিয়ে অংশগ্রহণ করেছিলাম। এদেশে কোন গণঅভ্যুত্থানকেই এত রক্তের স্রোত পাড়ি দিতে হয়নি। এত মানুষকে চোখের দৃষ্টি হারাতে হয়নি, পঙ্গু হতে হয়নি। এই বিরাট আত্মত্যাগ এই সময়ে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
এই গণঅভ্যুত্থান থেকে ফ্যাসিবাদ ধ্বংসের স্লোগান উঠেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের পতন মানেই ফ্যাসিবাদের পতন নয়। ফ্যাসিবাদ কোন দল আনে না, ফ্যাসিবাদ আনে একটি ব্যবস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে উন্নত কিংবা অনুন্নত সকল দেশেই ফ্যাসিবাদী প্রবণতা দেখা যায়। ফ্যাসিবাদ কায়েম একদলীয় শাসনের মাধ্যমে হতে পারে, দ্বি-দলীয় শাসনের মাধ্যমে হতে পারে, সামরিক শাসনের মাধ্যমে হতে পারে। দুনিয়ার দেশে দেশে ফ্যাসিবাদ গণতন্ত্রের মুখোশ পড়েই এসেছে। আজকের যুগে কোন পুঁজিবাদী দেশই জনজীবনের কোন সমস্যার সমাধান করতে পারে না। ফলে সে জনগণের বিক্ষোভ দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে। এই ফ্যাসিবাদী প্রবণতা এ যুগে প্রত্যেকটি পুঁজিবাদী দেশে বিদ্যমান। অর্থাৎ পুঁজিবাদী রাষ্ট্র মাত্রেই সে আজ কমবেশি ফ্যাসিবাদী।
এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিলোপ ঘটেনি, ফ্যাসিবাদ পিছু হটেছে মাত্র। রাষ্ট্রের নানা গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি এই অভ্যুত্থান পরবর্তীতে উঠেছে। কারণ আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে। এই গণতান্ত্রিক সংস্কার অপরিহার্য, তাতে দেশের গণতান্ত্রিক প্রথা ও প্রতিষ্ঠান কিছুটা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু তাতে ফ্যাসিবাদের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ সম্ভব নয়। এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার উচ্ছেদ না ঘটিয়ে ফ্যাসিবাদের উচ্ছেদ সম্ভব নয়। তা না হলে অনেক আত্মত্যাগের মাধ্যমে বারবার ভোটের অধিকার, মতপ্রকাশের অধিকার অর্জিত হবে- আর গণআন্দোলনের শক্তি দুর্বল হলে, আন্দোলনের নেতৃত্ব পুঁজিপতি-শিল্পপতিদের দলগুলোর হাতে থাকলে, বারবারই তা হাতছাড়া হবে। আবারও নেমে আসবে নির্মম গণতন্ত্রহীন পরিবেশ। তাই কোন পথে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন প্রকৃত অর্থেই সফল হতে পারে- সেটা নির্ধারণ করা ও সে পথে সংগ্রাম পরিচালনা করা গুরুত্বপূর্ণ। এটাই আমাদের দলের কাছে ধারাবাহিকভাবে ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, এরপর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পেরিয়ে আবার ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থান এবং এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের চেতনা।
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্রের সংস্কারের উদ্যোগ
গত ৫ আগস্ট, ২০২৪ তারিখে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়। গত ৮ আগস্ট অর্থাৎ ৫ মাস আগে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসে। এই সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। কারণ আমাদের দলও এই গণঅভ্যুত্থানের অংশীদার। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনজীবনের বিভিন্ন জ্বলন্ত সমস্যা সমাধানে যথার্থ পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়নি। গত দেড় বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তলানিতে ঠেকেছে, যথেচ্ছভাবে খুন-লুটপাট-অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বেড়েছে, শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত, প্রতিবাদ করলে তাদের উপর গুলি চালানো হচ্ছে, কৃষকরা ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না, তারা ঋণের ভারে জর্জরিত। আবার সাম্প্রদায়িকতাও বিষাক্ত ফণা তুলছে। আওয়ামী লীগ সরকারের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার দেশের অমূল্য সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দিচ্ছে। সবদিক থেকে গরীব-শ্রমজীবী মানুষ বিপর্যস্ত হচ্ছেন।
গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি উঠে। সরকার এই লক্ষ্যে সংষ্কার কমিশন গঠন করে। প্রথম দফায় সংবিধান, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন, পুলিশ ও জনপ্রশাসন- এই ৬টি সংস্কার কমিশন গঠিত হয়। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কার নিয়ে আমরা আওয়ামী লীগের শাসনামল থেকেই সোচ্চার ছিলাম। ফলে এই সংস্কার কমিশন গঠনকে আমরা স্বাগত জানাই। সংস্কার কমিশনগুলোর কাছে পাঠানোর জন্য আমরা একটা খসড়া প্রস্তাবনা প্রস্তুত করি।
এই খসড়া প্রস্তাবনা নিয়ে আমরা দলের উদ্যোগে গত ১১ নভেম্বর, ২০২৪ তারিখে ‘গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ ও সংস্কার ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করি। এই সেমিনারে উপস্থিত হয়ে আমাদের খসড়া প্রস্তাবনার উপর বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক সলিমুল্লাহ্ খান, সাংবাদিক নুরুল কবির, অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু, লেখক আলতাফ পারভেজ ও ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তাদের আলোচনা আমাদের প্রস্তাবকে আরও সমৃদ্ধ করে। পরবর্তীতে আমাদের প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করে আমরা ৬টি সংস্কার কমিশনে পাঠাই।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রসঙ্গে
৩১ জানুয়ারি, ২০২৫ তারিখের মধ্যে এই ছয়টি কমিশন তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করে। ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ তারিখে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়। ঐকমত্য কমিশনের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ তারিখে। সেই বৈঠক থেকে আজ পর্যন্ত ঐকমত্য কমিশনের প্রতিটি বৈঠকেই আমাদের দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। প্রতিটি বিষয়েই আমরা মতামত রেখেছি, ঐকমত্য কমিশনকে ও গোটা প্রক্রিয়াকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি।
১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ তারিখের প্রথম বৈঠকেই আমরা ৬টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে ৪টি কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে লিখিত মতামত রেখেছিলাম। খসড়া রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর তখনও বেশিদিন অতিক্রান্ত হয়নি, কমিশন তখনও মতামত আহবান করেনি- কিন্তু তখনই আমাদের প্রাথমিক মতামত আমরা রেখেছিলাম এবং সেটা লিখিতভাবে ঐকমত্য কমিশনকে দিয়েছিলাম।
এরপর ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে ৫টি সংস্কার কমিশনের (সংবিধান, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন ও জনপ্রশাসন) ১৬৬টি প্রস্তাবনার একটি স্প্রেডশিট আমাদেরকে পাঠানো হয়। পাঁচটি সংস্কার কমিশনের প্রায় ৪ শতাধিক সুপারিশ ছিল। সুপারিশগুলোর উপধারাগুলোকে যুক্ত করলে সুপারিশের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। এই বিরাট সংখ্যক সুপারিশের মধ্যে ১৬৬টি সুপারিশ নিয়ে তৈরি স্প্রেডশিটে আমাদের মতামত চাওয়া হয় টিক চিহ্নের মাধ্যমে। সেখানে মন্তব্য লেখার জায়গা থাকলেও বাস্তবে একমত, আংশিকভাবে একমত ও একমত নয়- এই তিনটির একটিতে টিকচিহ্ন দিতে হবে, এই প্রক্রিয়ায়ই মূলতঃ মতামত চাওয়া হয়। একইসাথে বাস্তবায়ন কীভাবে হতে পারে সে ব্যাপারেও কয়েকটি প্রস্তাব রাখা হয় ও সেগুলোতে টিকচিহ্ন দেয়া কথা বলা হয়।
টিকচিহ্ন দিয়ে মতামত নেয়ার বিষয়টি আমাদের সঠিক মনে হয়নি। ২০ মার্চ, ২০২৫ তারিখে ঐকমত্য কমিশনকে চিঠি দিয়ে আমরা বিষয়টি জানাই। স্প্রেডশিটে যেভাবে টিকচিহ্নের মাধ্যমে মতামত চাওয়া হয়েছে, সেভাবে মতামত দিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর পদ্ধতিটি আমাদের যথাযথ মনে হয়নি। কারণ যে প্রস্তাবগুলো উত্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো জটিল এবং বেশিরভাগ বিষয়ই ব্যাখ্যার দাবি রাখে। খুব অল্প কয়েকটি পয়েন্টে এককথায় উত্তর দেয়া যায়। ফলে টিকচিহ্নের প্রক্রিয়াটি সঠিক হয় না। আমরা আমাদের বক্তব্যটা মূলতঃ লিখিত আকারেই রাখব- এটা আমরা ঐকমত্য কমিশনকে জানাই।
পরবর্তীতে ২৩ মার্চ, ২০২৫ তারিখে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের লিখিত মতামত ঐকমত্য কমিশনে জমা দেই। এরই ধারাবাহিকতায় ৩ মে ঐকমত্য কমিশনের সাথে আমাদের দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং আমাদের মতামতগুলো নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করি।
এসময় ৩২টি দল ও জোট সংস্কার কমিশনগুলোর রিপোর্ট নিয়ে তাদের মতামত ঐকমত্য কমিশনকে জানায়। এরমধ্যে ৩০টি দল ও জোটকে নিয়ে ঐকমত্য কমিশন দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনায় প্রবেশ করে। কমিশন ১৬৬টি প্রস্তাবের মধ্যে ২০টি প্রস্তাব বাছাই করে এবং সেগুলোতে ঐকমত্যে আসার জন্য আলোচনা শুরু করে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সংবিধানের মূলনীতি, ৭০-এর অনুচ্ছেদ, জরুরী অবস্থা জারি, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা, কোন ব্যক্তির দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকা, প্রধানমন্ত্রীর একইসাথে সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান না থাকার বিধান, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও উচ্চকক্ষের নির্বাচন, সংসদে নারী আসন, বিরোধী দলকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা, সংসদীয় আসনে সীমানা নির্ধারণের জন্য বিশেষায়িত কমিটি, তত্তা¡বধায়ক সরকারব্যবস্থা, প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট বেঞ্চ, উপজেলা পর্যায়ে স্থায়ী আদালত- ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এরমধ্যে আলোচনায় কিছু বিষয়ে ঐকমত্য, কিছু বিষয়ে আংশিক ঐকমত্য, কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয়ে নতুন সিদ্ধান্ত, কিছু বিষয়ে প্রবল বিরোধ হয়।
দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা ৩ জুন, ২০২৫ তারিখ থেকে ৩০ জুলাই, ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত চলে। এরপর জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে তৃতীয় পর্যায়ে ৫ দিন আলোচনা হয় এবং ৮ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে বৈঠক শেষ হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনার সবগুলো বৈঠকেই আমরা উপস্থিত ছিলাম। প্রতিটি পয়েন্টে আমরা সুনির্দিষ্ট বক্তব্য রেখেছি এবং যথাসময়ে সেটি লিখিতভাবে সংবাদমাধ্যম ও জনগণকে দিয়েছি।
জুলাই ঘোষণা ও জুলাই সনদের পারস্পরিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও অন্তর্বর্তীকালিন সরকার জুলাই ঘোষণা প্রকাশ করেছে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার প্রতিফলন হিসেবে। এই ঘোষণাপত্রটির ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ করতেই সকল সংস্কার কমিশন ও জাতীয় ঐক্য কমিশন গঠিত হয়।
মোট ৩টি জুলাই ঘোষণা আমরা পেয়েছি। প্রথমটি ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪ তারিখে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন প্রকাশ করে। এরপর অন্তর্বর্তীকালিন সরকার ১৫ জানুয়ারি, ২০২৫ তারিখে সমস্ত রাজনৈতিক দলকে একটি খসড়া জুলাই ঘোষণা পাঠায়। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে ১৬ জুলাই, ২০২৫ তারিখে তৈরি করা আরেকটি খসড়া আমাদের হাতে আসে। এই তিনটি জুলাই ঘোষণার মধ্যে বেশকিছু পার্থক্য আছে।
সর্বমোট পাঁচবার জুলাই সনদের পাঁচটি খসড়া আমাদেরকে দেয়া হয়। প্রথমটি ২৮ জুলাই, দ্বিতীয়টি ১৬ আগস্ট, তৃতীয়টি ১০ সেপ্টেম্বর, চতুর্থটি ১৪ অক্টোবর ও পঞ্চমটি ১৭ অক্টোবর।
সমগ্র বিষয়টি আমাদের খুবই বিস্ময়কর লেগেছে! এটা বোঝাই যাচ্ছে যে, জুলাই ঘোষণা ও জুলাই সনদের প্রণেতারা এই অতিমূল্যবান ঐতিহাসিক দলিলগুলির হয় তাৎপর্য বোঝেননি, অথবা এতটাই অনৈক্যের বাতাবরণের মধ্যে এগুলো প্রণয়ন করেছেন যে, এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্থির করতে ব্যর্থ হয়েছেন। যার ফলশ্রুতিতে প্রতিটি দলিলের সাথে অন্য দলিলের পার্থক্য রয়ে গেছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যেহেতু জুলাই ঘোষণার আকাঙ্ক্ষাকে জুলাই সনদের ভিত্তি বিবেচনা করেছেন, ফলে এতগুলো দলিলের মধ্যে কোন নির্দিষ্ট জুলাই ঘোষণাটি কোন সনদের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে এবং চূড়ান্ত জুলাই সনদের ভিত্তি কোন জুলাই ঘোষণাটি- সেটা এখন বোঝা অসম্ভব।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনুস জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠনের পূর্বে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, এই কমিশন দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতেই জুলাই সনদ রচনা করবে। সেই সনদে রাজনৈতিক দলগুলো স্বাক্ষর করবে। দীর্ঘ ৮ মাস বিভিন্ন বিষয় আলোচনার পরে খুবই দুঃখের সঙ্গে আমরা লক্ষ্য করলাম যে, অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলির ঐক্য-অনৈক্য সকল প্রস্তাবই অগ্রাহ্য করে ৪৮টি প্রস্তাবের একটি প্যাকেজ হিসেবে জুলাই সনদ একটি সরকারি দলিলে পর্যবসিত হলো। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের পক্ষে এটি খুবই আশঙ্কাজনক যে, একটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরে সরকারি হস্তক্ষেপে আঁতুড়ঘরে তার মৃত্যু হলো।
কেন বাসদ (মার্কসবাদী) জুলাই সনদে স্বাক্ষর করতে পারল না
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে জুলাই সনদের এই ২য় খসড়ায় ৮৪টি প্রস্তাব যুক্ত করা হয়। এরমধ্যে ২৯টি প্রস্তাবে মোটামুটি সর্বসম্মত ঐক্য আছে বলে ধরে নেয়া যায়। বাকি ৫৫টি প্রস্তাবে আমরাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের মতভিন্নতা প্রকাশ করেছে ‘নোট অব ডিসেন্ট- এর মাধ্যমে। দীর্ঘ ৮ মাসে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় মিলে প্রায় ৭০টি বৈঠকের পর ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয় এবং ২৫টি রাজনৈতিক দল জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে। আমাদের দল এই সমগ্র প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণকারী দল হিসেবে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করার আকাঙ্ক্ষা আমাদের ছিল। তা সত্ত্বেও আমরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করতে পারলাম না কেন?
প্রথমত, জুলাই সনদের অঙ্গীকারনামার অভিমুখ গোটা সনদের বিপরীতমুখী ছিল। অঙ্গীকারনামার ১ নং অনুচ্ছেদে, “…নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দলিল হিসেবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ এর পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবো- এই কথাটি উল্লেখ করা হয়। অথচ সনদে যে ৮৪টি প্রস্তাব উল্লেখ করা হয়েছে, তার বেশিরভাগই সর্বসম্মত নয়। আমরা আগেই বলেছি যে, আমাদের ৮৪টি প্রস্তাবের প্রায় ৫৫টিতেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আছে। ফলে এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে, অঙ্গীকারনামার এই ঘোষণাটি ‘নোট অব ডিসেন্ট’-গুলোকে বিলুপ্ত করে দিল।
দ্বিতীয়ত, অঙ্গীকারনামার ২য় অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয় যে- “যেহেতু জনগণ এই রাষ্ট্রের মালিক, তাদের অভিপ্রায়ই সর্বোচ্চ আইন এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত জনগণের অভিপ্রায় প্রতিফলিত হয় রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে, সেহেতু রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহ সম্মিলিতভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে জনগণের অভিপ্রায়ের সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ গ্রহণ করেছি বিধায় এই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে সংবিধানে তফসিল হিসেবে বা যথোপযুক্তভাবে সংযুক্ত করব।”
এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য ছিল যে, ‘‘জনগণের অভিপ্রায় প্রতিফলিত ও প্রতিষ্ঠিত হয় রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে’- এই কথাটা আংশিক সত্য। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য দিয়ে জনগণের অভিপ্রায় প্রতিফলিত হয়, কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে এই অভিপ্রায় প্রতিষ্ঠিত হয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থায়, প্রচলিত গণতান্ত্রিক কাঠামোতে জনগণের অভিপ্রায়কে পরিমাপ করার এর চেয়ে ভাল কোন পদ্ধতির সন্ধান তারা আজও দিতে পারেননি। ফলে এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয়।”
এছাড়াও আমরা বলেছি যে, “সনদকে সংবিধানে যুক্ত করার ক্ষেত্রে আমাদের কোন আপত্তি নাই। তবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন দলের ভিন্ন ভিন্ন মতসহ লিখিত একটা দলিল কীভাবে সংবিধানে যুক্ত হতে পারে- সে ব্যাপারে আমরা স্পষ্ট হতে পারছি না।”
তৃতীয়ত, অঙ্গীকারনামার ৩য় অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয় যে- ‘…এর বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কোন আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করব না, উপরন্তু উক্ত সনদ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করব।”
এ প্রসঙ্গে আমরা বলেছিলাম যে, “কোন দল যদি দেখে, যে বিষয়গুলোতে তারা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিল, সেগুলোই অনুমোদিত ও কার্যকর হতে যাচ্ছে, তবে তার পক্ষে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। জুলাই সনদের মতো একটা গণতান্ত্রিক সনদে এই ধরনের অঙ্গীকার থাকাটা অনভিপ্রেত।”
আমরা সেদিন প্রস্তাব করেছিলাম- সর্বসম্মতভাবে ঐকমত্য হওয়া পয়েন্টগুলোকে ভিত্তি করে জুলাই সনদ রচনা করা হউক। তাহলে সেগুলোর ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর একটা কমিটমেন্ট থাকবে। একইসাথে ঐকমত্য কমিশনের সম্পূর্ণ কর্মকাণ্ড অর্থাৎ প্রথম দফায় ৩৫টি দল ও জোটের লিখিত বক্তব্য, ৩২টি দলের সাথে মত বিনিময় এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩০টি দল ও জোটের সাথে আলাপ-আলোচনার সার-সংক্ষেপ তৈরি করা হউক। সেখানে বিভিন্ন দল ও জোটের অবস্থান স্পষ্টভাবে উঠে আসবে। এটা ইতিহাসের দলিল এবং একইসাথে সহস্রাধিক প্রাণের বিনিময়ে সংঘটিত এই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার সম্পর্কিত চিন্তার একটা ধারণা আমরা এর মধ্য দিয়ে পাব।
চতুর্থত, ঐকমত্য কমিশনের স্প্রেডশিটে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত করার যে সম্ভাব্য প্রক্রিয়াগুলো দলগুলিকে বাছাই করতে দেয়া হয় তা মোটাদাগে চার রকম- অধ্যাদেশ, গণভোট, গণপরিষদ ও নির্বাচিত সংসদ। জুলাই সনদ প্রস্তুত হয়ে যাবার পর স্বাক্ষরের ঠিক পূর্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রথমে বলেন যে, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে তারা কোন আলাপ-আলোচনায় রাজি নয়। এটা তাদের এখতিয়ার বহির্ভূত। এরপরে আবার এই কমিশনই সনদ বাস্তবায়নের জন্য কী সুপারিশ করবে- এই ভাবনায় অস্থির হয়ে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মতামত যাচাই করতে থাকে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়েও বসা হয়। কিন্তু সেখানে কোন ঐকমত্য হয়নি।
এরপর তারা বিশেষ দুটি বিষয় আলোচনায় আনেন- বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ ও গণভোট। আমরা বলেছিলাম, সংবিধান নিয়ে কোন নির্বাহী আদেশ হয় না। নতুন সংবিধান লিখতে পারে একটি নির্বাচিত গণপরিষদ আর সংবিধান সংশোধন করতে পারে নির্বাচিত সংসদ। আমরা তখন বলি যে, দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই সনদ প্রণীত হতে যাচ্ছে, এর সাংবিধানিক ও আইনি ভিত্তি এমন না হয় যাতে ভবিষ্যতে তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। ফলে বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ নামে কোন কিছু প্রণয়ন করা ঠিক হবে না।
গণভোটের ব্যাপারে আমরা বলেছিলাম যে- গণভোট নিয়ে আমাদের আপত্তি নেই, কিন্তু এটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে সেই বিষয়টি সম্পর্কে আমরা এখনও স্পষ্ট নই। কারণ আমাদের বর্তমান সংবিধানে গণভোটের বিধান নেই। উপরন্তু জুলাই ঘোষণার ২৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদে প্রতিশ্রুত সাংবিধানিক সংস্কার’ করা হবে। জুলাই সনদের ভিত্তি যেহেতু জুলাই ঘোষণা, ফলে জুলাই ঘোষণা পরিবর্তন না করে কীভাবে গণভোট বাস্তবায়ন হবে, সে সম্পর্কে অস্পষ্টতা থেকেই যাচ্ছে।
বারবার বলা সত্ত্বেও সর্বস্মত প্রস্তাব নিয়ে জুলাই সনদ রচনা করা হলো না, অঙ্গীকারনামায় গুরুত্বপূর্ণ যে সকল পয়েন্ট আমরা তুলেছিলাম- সেগুলোকে সংশোধন করা হলো না, অঙ্গীকারনামায় নোট অব ডিসেন্টের স্বীকৃতি দেয়া হলো না, সনদের শেষে প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষের যুক্তি-তর্কের সার-সংক্ষেপ যুক্ত করা হলো না। বাস্তবায়ন প্রস্তাবও সুনির্দিষ্ট করা হলো না। এসকল কারণে আমরাও জুলাই সনদে স্বাক্ষর করতে পারলাম না। সনদে স্বাক্ষর না করার ব্যাপারে আমাদের বক্তব্য আমরা সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছি।
ঐকমত্য কমিশন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এমনকি জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী দলগুলোরও বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে
৮ মাস ধরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলিকে নিয়ে যে আলাপ-আলোচনা পরিচালনা করলেন, যার ফলশ্রুতিতে মোট ৮৪টি পয়েন্টের প্রায় ৫৫টিতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’-সহ জুলাই সনদ চূড়ান্ত করলেন এবং ১৭ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে ২৫টি রাজনৈতিক দল সেই সনদে স্বাক্ষর করলেন- পরবর্তীতে সনদ বাস্তবায়নের প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে এই পুরো প্রক্রিয়াটি রাতারাতি তারা ছুড়ে ফেলে দিলেন।
স্বাক্ষর পরবর্তীতে আগের আলোচনাগুলোকে গ্রাহ্যের মধ্যে না নিয়ে ঐকমত্য কমিশন ৪৮টি প্রস্তাবকে নিয়ে একটি প্যাকেজ তৈরি করেন। সেগুলোর উপর ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ সরকারের কাছে প্রস্তাব করেন। এই প্রস্তাবে তারা ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়নে অবিলম্বে সরকারি আদেশ জারি করে একটি গণভোট আয়োজনের সুপারিশ করেন। তাদের প্রস্তাবনা ছিল, সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাবের উপর গণভোট হবে। এগুলো সেই প্রস্তাব যা সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে কার্যকর করতে হবে, নির্বাহী আদেশে বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে কার্যকর করা যাবে না। কিন্তু তারা সেখান থেকে দলগুলোর দেয়া নোট অব ডিসেন্ট তুলে নেন। এই ৪৮টি প্রস্তাব একটি প্যাকেজের মধ্যে থাকবে। গণভোটে কেউ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে ধরে নেয়া হবে যে সে ৪৮টি প্রস্তাবকেই সমর্থন করে, কেউ ‘না’ দিলে ধরে নেয়া হবে যে, সে কোনটাকেই সমর্থন করে না। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তন নিয়ে এই ধরনের হরেদরে মতামত নেয়ার নজির কোথাও আছে বলে আমরা জানি না। গত ১৩ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা তার সর্বশেষ ভাষণে গণভোটের ঘোষণা দিয়েছেন। সেটিতে চারটি বিষয়ে গণভোট হবে বলে উল্লেখ করেছেন। এই চারটি বিষয়ের মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাবের প্রায় সবগুলোই আছে (আমাদের হিসাবে ৩৬ এরও অধিক) একইসাথে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে হবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে বিভিন্ন পয়েন্টে বিভিন্ন দলের যে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আছে, তা আর কার্যকর থাকবে না। ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবনাই পাশ হয়েছে ধরে নেয়া হবে। তাহলে এই ছয়মাসব্যাপী বিভিন্ন দলের আলোচনা, সমালোচনা, মতামত, প্রস্তাবনা, দ্বন্দ্ব ও সমঝোতার কী মূল্য থাকলো? প্রায় প্রতিটি দলেরই বিভিন্ন বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আছে। সেইগুলো রেখে রাজনৈতিক দলগুলোই বা কীভাবে এই গণভোটে অংশগ্রহণ করবে? অর্থাৎ প্রায় সকল রাজনৈতিক দলকে নিয়ে আলোচনা শুরু করা এই ঐকমত্য কমিশন এই সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে দলগুলোকে দূরে ঠেলে দিলো।
ফলশ্রুতিতে সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে এক জটিল সংকট সৃষ্টি হলো। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যবৃন্দ ও এতে অংশ নেয়া রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ দীর্ঘদিন ধরে যে আলোচনা ও তর্কবিতর্ক হলো সেটির পরিণতি ভাল হলো না। বাস্তবে ঐকমত্য কমিশনই এতদূর এসে একটা অনৈক্য ও সংঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি করলো।
আমরা কোন কোন বিষয়ে আমরা একমত ছিলাম
সংস্কারের প্রধান দাবিগুলোর সাথে আমরা একমত ছিলাম। অর্থাৎ-
১. আমরা দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি করে আসছি। ফলে সংস্কার প্রস্তাবনায় আমরা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে এককক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রস্তাব করেছিলাম। কারণ উচ্চকক্ষের বিশেষ কোন ক্ষমতা নেই। উচ্চকক্ষ সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে গঠিত হলেও বিশেষ কোন গুণগত পরিবর্তন আসবে না। ফলে উচ্চকক্ষের আলোচনাটা যখন সামনে আসে, তখন আমরা বলি যে, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সংসদ এক কক্ষেরই হতে পারে কিন্তু সেটা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে হতে হবে। পরবর্তীতে ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় পর্যায়ের বৈঠকে ঐকমত্যের প্রয়োজনে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের প্রস্তাব আমরা মেনে নেই।
২. আমরা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা বিষয়ক প্রস্তাবগুলোর সাথে একমত ছিলাম। ফলে একজন ব্যক্তি দশ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না- এই প্রস্তাবে আমাদের দ্বিমত করার কিছু ছিল না। প্রধানমন্ত্রী দলীয় প্রধান হতে পারবেন না- এই প্রস্তাবেও আমরা একমত ছিলাম।
৩. তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রবর্তন সম্পর্কে আমরা একমত ছিলাম। প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন বিষয়ে ঐকমত্য কমিশন প্রস্তাবিত পদ্ধতির সাথে আমরা একমত ছিলাম।
৪. সংসদে স্থায়ী কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে মনোনীত করার বিষয়ে আমরা একমত ছিলাম।
৫. ৭০ এর অনুচ্ছেদ সংস্কারের (যদিও আমরা এই ধারা বাতিল চেয়েছি) বিষয়ে আমরা একমত ছিলাম।
৬. আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহ আইনসভায় অনুমোদন করাতে হবে- এই বিষয়ে আমরা একমত ছিলাম।
৭. আমরা নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত বিচার বিভাগ দাবি করেছি। ফলে ঐকমত্য কমিশনের উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগে কমিশন গঠন, আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারককে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ- এই প্রস্তাগুলোতে আমরা একমত ছিলাম। কিন্তু উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগে কমিশন গঠনের বিষয়ে সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে যে রূপরেখা দেয়া হয়েছিল- সে ব্যাপারে আমাদের ভিন্নমত ছিল। কারণ সেই নিয়োগ কমিশনে এটর্নি জেনারেলকেও রাখা হয়েছিল। আমরা বলেছিলাম যে, এই পদটিতে মূলতঃ সরকারপক্ষের লোকই আসীন হন। আবার এটর্নি জেনারেলকে আপিল বিভাগের বিচারকদের সামনে দাঁড়াতে হয় সরকারের পক্ষ হয়ে। তিনি যদি আপিল বিভাগের বিচারক নিয়োগ কমিটিতে থাকেন সেটা ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ হবে।
৮. নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষকসহ সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের ব্যাপারে আলাদা কমিশন গঠনের বিষয়ে আমাদের প্রস্তাবনা ছিল। পরবর্র্তীতে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের ব্যাপারে যে বাছাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয় ঐকমত্য কমিশনে, আমরা তার সাথে একমত ছিলাম।
অর্থাৎ প্রধান প্রধান কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্নে আমরা একমত ছিলাম।
আমরা কোন বিষয়গুলোতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি
মূলনীতি পরিবর্তন সম্পর্কিত আলোচনার সাথে আমরা একমত ছিলাম না। সে বিষয়ে পরবর্তীতে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব। এ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ যে সকল বিষয়ে আমাদের নোট অব ডিসেন্ট ছিল, তা হলো-
১. আমরা জরুরী অবস্থা জারি সম্পর্কিত প্রস্তাবনায় নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি। আমরা মনে করি, গণতান্ত্রিক সংবিধানে জরুরী অবস্থার বিধান থাকা উচিত নয়। আধুনিক গণতান্ত্রিক বেশিরভাগ দেশেই এই ধরনের কোন ধারা নেই। প্রাকৃতিক বা মানবিক কোন সংকটের কালে জরুরি সেবাগুলোকে সচল ও কেন্দ্রীভূত করার জন্য ওই নির্দিষ্ট এলাকায় কিছু বিশেষ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেটা সরকার তার নির্বাহী ক্ষমতাবলেই নিতে পারে। বাস্তবে জরুরি মানবিক প্রয়োজনের কথা বলে জরুরি অবস্থাকে যুক্তিসঙ্গত করা হয়, কিন্তু আমাদের দেশে এই প্রয়োজনে কখনও জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়নি। এদেশে রাজনৈতিক সংকটের সময়ে জনগণকে নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে রাষ্ট্র জরুরি অবস্থাকে বারবার ব্যবহার করেছে। বাহাত্তরের সংবিধানেও জরুরি অবস্থার বিধান ছিল না, শেখ মুজিব প্রথম সংশোধনীর মধ্য দিয়ে এটি যুক্ত করেন। এটি ছিল সংবিধানের প্রথম কালিমালিপ্ত সংশোধনী। এত সংস্কার ও গণতন্ত্রের কথা বলার পর এই জরুরি অবস্থার বিধান রাখাটা আমাদের ঠিক মনে হয় না।
২. সনদের ৯ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের সম্পর্কিত ধারায় ‘মৌলিক অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে কোন শর্ত যুক্ত থাকবে না’- একথার উল্লেখ নেই। বরং রাষ্ট্রের সম্পদের সীমাবদ্ধতার কথা বলে এর প্রাপ্যতা সাপেক্ষে প্রধান মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা হবে এমন শর্তই যুক্ত করা হয়েছে। মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত বিধানগুলো বাংলাদেশের সংবিধান রচয়িতাদের সৃষ্টি নয়। এগুলো একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণা বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে বিকশিত হয়েছে। এগুলো Natural Law ও সে কারণেই এগুলো Higher Law এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এগুলো ছাড়া কোন রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হতে পারে না। ফলে এগুলোতে কোন শর্ত যুক্ত করা যায় না। আমাদের বর্তমান সংবিধানে এগুলোর সাথে শর্ত যুক্ত করা হয়েছে এবং বাস্তবে এই অধিকারগুলো খর্ব করা হয়েছে। বাহাত্তরের সংবিধানে বলা হয়েছিল, ‘এগুলো আইন দ্বারা বলবৎযোগ্য নয়।’ সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনায় মৌলিক অধিকারগুলোর সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও আইন দ্বারা বলবৎযোগ্যতার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ কোন নাগরিক এই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে আদালতে যেতে পারবে- সেই অধিকার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু ‘রাষ্ট্রের বিদ্যমান সামর্থ্য ও সম্পদের আওতায়’-এই শর্ত যুক্ত রাখা হয়েছিল। মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে আমরা এই ধরনের শর্ত যুক্ত করাকে সঠিক মনে করিনি। ঐকমত্য কমিশনের দেয়া স্প্রেডশিটে প্রস্তাবগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল-
“বিদ্যমান সংবিধানের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগের অধিকারসমূহ সমন্বিত করে ‘মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা’ নামে একটি ‘ভাগ’ হিসেবে একীভূতকরণ।
সংবিধানের ‘মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা’ ভাগে ‘খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, ইন্টারনেট প্রাপ্তি, তথ্যপ্রাপ্তি, ভোটাধিকার ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা, ভোক্তা-সুরক্ষা, শিশু, উন্নয়ন, বিজ্ঞান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার’ অন্তর্ভুক্ত করা।
বিদ্যমান অধিকারের অনুচ্ছেদসমূহের সংস্কার যেমন বৈষম্য নিষিদ্ধকরণের সীমিত তালিকা বর্ধিতকরণ, জীবনের অধিকার রক্ষায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম থেকে সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, জামিনে মুক্তির অধিকার অন্তর্ভুক্তকরণ এবং নিবর্তনমূলক আটক সংক্রান্ত বিধান বিলুপ্তি করা।”
এই কথাগুলোর সাথে আবার এই লাইনও যুক্ত করা হয়েছিল যে, “…যেসব অধিকার (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান ইত্যাদি) বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য সম্পদ ও সময় প্রয়োজন, সেগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি রেখে সম্পদের প্রাপ্যতার ভিত্তিতে কার্যকর করা।”
আমরা এই শর্তের বিরুদ্ধে বলেছিলাম। বলেছিলাম যে, নাগরিককে মামলা করার অধিকার দিলে রাষ্ট্র বারবারই দেখাবে তার পর্যাপ্ত সম্পদ নেই। ফলে এই বিষয়গুলোকে মৌলিক অধিকার অধ্যায়ে যোগ করে, আইনি স্বীকৃতি দিয়েও, ‘সম্পদের প্রাপ্যতার ভিত্তিতে’ শর্ত যুক্ত করলে শেষ পর্যন্ত কোন লাভ হবে না। আমরা একে শর্তমুক্ত করার দাবি করেছিলাম। কোন একটি মৌলিক অধিকার পূরণ একবারে অসম্ভব হলে কতদিন পরে রাষ্ট্র কার্যকর করতে বাধ্য থাকবে সেটা সংবিধানে উল্লেখ করার কথা বলেছিলাম। কিন্তু সেটা করা হয়নি।
ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনার পর এই বিষয়টি কিছু মোটা কথার মধ্যে সীমিত হয়ে পড়ে। জুলাই সনদে মৌলিক অধিকার বিষয়ে প্রস্তাব করা হয় যে, “নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, সেগুলোর সুরক্ষা এবং বাস্তবায়নে সাংবিধানিক ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রস্তাবগুলো জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের রিপোর্টে উল্লেখ করা হবে, যাতে রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং ভবিষ্যতে জনপ্রতিনিধিরা সাংবিধানিক ব্যবস্থা ও আইনি বিধানাবলী পরিবর্তন করতে পারেন।” অর্থাৎ চূড়ান্ত সনদে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলোও আর থাকলো না।
আমরা জনগণের মৌলিক অধিকারের জন্য লড়াই করা দল। আমরা ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। ফলে মৌলিক অধিকারের প্রশ্নটি আমাদের কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আমরা এ প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছি।
৩. ২৪ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখিত ‘জাতীয় সংসদে নারী আসনের বিধান’ সম্পর্কিত আলোচনায় আমরা সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ১০০-তে উন্নীত করা ও তাতে সরাসরি নির্বাচনের দাবি করেছিলাম। কিন্তু সেটা শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। আমরা মনে করি যে প্রস্তাবটা এসেছে, সেটা বর্তমান অবস্থা থেকে সামান্য উন্নত হলেও প্রয়োজন ও প্রত্যাশার কাছাকাছি নয়। আমরা বিবেচনা করে দেখেছি, ১০০টি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন ছাড়া এই ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়। ফলে এই প্রস্তাবে আমরা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছি।
সংস্কারের দাবিগুলো আমরা দীর্ঘদিন ধরেই তুলছি
জুলাই সনদে স্বাক্ষর করতে না পারলেও আমরা রাষ্ট্রের সংস্কারের পক্ষে ছিলাম সবসময়। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর থেকেই সংস্কার সম্পর্কিত আলোচনাগুলো অনেক বেশি করে সামনে আসতে থাকে। আমাদের দলসহ বর্তমান বাম গণতান্ত্রিক জোটের সকল দলই এই সংস্কারের পক্ষে ছিল। ২০১৭ সালের ১ আগস্টে সিপিবি-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বামমোর্চার [বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ (বর্তমানে বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন] যৌথ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সেই সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনী আইন ও বিধিসহ গোটা নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার (পিআর পদ্ধতি) প্রবর্তন, গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল, বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিল, ২য় ও ৮ম সংশোধনীসহ সংবিধানের স্বৈরতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িক, জাতিসত্ত্বাবিরোধী সকল বিধান বাতিল, সাংবিধানিক কমিশনের মাধ্যমে সাংবিধানিক পদে নিয়োগের বিধান চালু করা; ৫৪ ধারা, ৫৭ ধারা, তথ্য প্রযুক্তি আইন, জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা, নিবর্তনমূলক ও অগণতান্ত্রিক সকল আইন ও সার্বজনীন মৌলিক অধিকার পরিপন্থী সকল কালাকানুন বাতিল করার দাবি তোলা হয়। অর্থাৎ কমিশন প্রস্তাবিত সংস্কার প্রস্তাবের অনেকগুলোই আমাদের দল ও বামপন্থী অন্যান্য দল বেশ আগে থেকেই তুলেছিল।
গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদের দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সংস্কার কমিশনগুলোতে সংস্কার প্রস্তাবনা দেয়া হয়। সংবিধানের তৃতীয়ভাগে বর্ণিত মৌলিক অধিকারসমূহকে শর্তের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করা, সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ সংস্কার করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের উপর প্রধানমন্ত্রীর অন্যায় হস্তক্ষেপের সুযোগ বন্ধ করা এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনা, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সংস্কার করা, স্থানীয় সরকারব্যবস্থার সংস্কার করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, পুলিশ প্রশাসনের সংস্কার করা, পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীসহ অন্যান্য জাতিসত্ত্বার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা, জরুরি অবস্থা জারির বিধান বাতিল করাসহ বিভিন্ন প্রস্তাবনা আমাদের পক্ষ থেকে আমরা সংবিধান সংস্কার কমিশনের কাছে তুলে ধরি। একইভাবে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, বিচারবিভাগ সংস্কার কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন ও দুদক সংস্কার কমিশনের কাছে আমরা আরও ৩৪টি প্রস্তাবনা দেই।
জুলাই ঘোষণা ও জুলাই সনদে বাংলাদেশের জাতি গঠনের ইতিহাসকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে
জুলাই সনদ রচিত হয়েছিল সংবিধান সংস্কার ও রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কারের উদ্দেশ্যে। এই সনদে পটভূমি অর্থাৎ বাংলাদেশের জাতি গঠনের ইতিহাসকে যুক্ত করা খুব প্রাসঙ্গিক ছিল না। আমাদের কাছে খুবই আশঙ্কাজনক মনে হয়েছে যে, বাংলাদেশের জাতি গঠনের ইতিহাসকে এই সনদে সম্পূর্ণ ভ্রান্তভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার ফলে সমগ্র জুলাই সনদের উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
এদেশের ২৩ বছরের প্রায়উপনিবেশবিরোধী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে জাতি গঠনের বিরাট সংগ্রাম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পরিণতি পায়। ইতিহাসের এই সমগ্র অধ্যায়টিকে পেছনে ঠেলে দেয়ার একটা চেষ্টা গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমাদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের বিজয় একাত্তরে নয়, বরং সূচিত হয়েছিল সাতচল্লিশে, একাত্তর এর চূড়ান্ত পর্যায়- এই ভাষ্যটা বিভিন্ন রূপে ও ভাষায় সামনে আসছে। এই ভাষ্য অনুসারে স্বাধীন জাতিগঠনের ঐতিহাসিক ভরকেন্দ্র করা হয়েছে সাতচল্লিশকে এবং সাথে সাথে পাকিস্তান আন্দোলনকে। ফলে এই ভাষ্যটা খুব স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানভিত্তিক মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিপরীতে যে ধর্মনিরপেক্ষ ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উত্থান সেদিন ঘটেছিল- একে অস্বীকার করে।
এই চিন্তার প্রতিফলন অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় দলিলপত্রেও দেখতে পাওয়া যায়। এ বছরের ডিসেম্বর মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি প্রস্তাবিত এবং জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রস্তাবিত- এই দুইটি খসড়া জুলাই ঘোষণা খুঁটিয়ে দেখলে সেটা বোঝা যায়। এই ঘোষণাগুলো, বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জানুয়ারিতে দেয়া খসড়া জুলাই ঘোষণায় স্বাধীন জাতি গঠনের ঐতিহাসিক ভরকেন্দ্র করা হয়েছে অবিভক্ত ভারতবর্ষের পাকিস্তান আন্দোলনকে। এই বিষয়টিকে আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, “বৃটিশ আমলের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে লাহোর প্রস্তাব। ৃবাংলাদেশের জনগণের রাষ্ট্র গঠনের সুস্পষ্ট অভিপ্রায় লাহোর প্রস্তাবে প্রতিফলিত হয়।” (সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন, পৃষ্ঠা ১৪)
ইতিহাস বর্ণনার ক্ষেত্রেও এ তিনটি প্রতিবেদনের মধ্যে একটা অদ্ভূত সাদৃশ্য আছে। তিনটিতেই ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা প্রাপ্তি হয়েছে উল্লেখ করে তারা চলে গেছেন সরাসরি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের পরই তাদের ইতিহাসটা চলে এসেছে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে। একইভাবে তিনটি প্রতিবেদনেই ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য লড়াইগুলো এবং একাত্তরের পর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থান- এই পর্বটি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসকে যথার্থভাবে উপস্থাপনের ব্যত্যয় ঘটেছে।
বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, সায়ত্ত্বশাসনের দাবির ভিত্তিতে ছেষট্টির ছয়দফা আন্দোলন, সায়ত্ত্বশাসন ও কৃষক-শ্রমিকদের মুক্তির ১১ দফা দাবিতে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের গণপরিষদ নির্বাচন- এগুলো ছিল পাকিস্তানের প্রায়উপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ও নতুন জাতি হিসেবে নিজেদের আত্মপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ছিল এই গণআন্দোলনগুলোরই স্বাভাবিক পরিণতি। ইতিহাস থেকে এই অধ্যায়গুলো বাদ দেয়ার অর্থ হলো ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানো এবং বাংলাদেশের জাতি গঠনের ইতিহাসকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা। আবার এই সংগ্রামের মধ্যেই গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, শোষণমুক্তি, সমাজতন্ত্র- এই কথাগুলো মওলানা ভাসানীসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজনীতিবিদ, লেখক, শিল্পী, নির্মাতা, বুদ্ধিজীবীরা জনগণের মধ্যে নিয়ে আসেন এবং এর পক্ষে একটি গণআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। এই দীর্ঘ আন্দোলনের সকল পর্যায়ে বামপন্থীদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। বিশেষত মওলানা ভাসানী এ সময়ের আপোষহীন, অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে ১৯৭০ সালের নভেম্বরে সর্বপ্রথম স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের কথা উচ্চারণ করেছিলেন। এই ইতিহাস আওয়ামী লীগ সরিয়ে দিয়ে মুজিবকেন্দ্রিক ইতিহাস লিখতে চেয়েছে, এখন সাতচল্লিশকেন্দ্রিক ইতিহাস লেখার প্রচেষ্টা চলছে।
জুলাই সনদে ১৯৪৭ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যে ইতিহাস স্থান পেয়েছে, তাতে একটা অর্থে মুক্তিযুদ্ধসহ উপনিবেশবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনসমূহকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ধরে গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধকে তার একচেটিয়া সম্পত্তি হিসেবে দেখাতে চেয়েছে। এর বিরোধীতা করতে গিয়ে জুলাই সনদের রচয়িতারা আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছেন এবং ১৯৪৭ থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পুরো সময়টাকেই কার্যতঃ অগ্রাহ্য করেছেন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের এই বিষয়ে আমাদের দলের তীব্র বিরোধীতা ও মওলানা ভাসানীকে সামনে রেখে বাংলাদেশের জাতি গঠনের যথার্থ ইতিহাসের উপস্থাপনা এবং জনগণের চাপের মুখে দাঁড়িয়ে তারা জুলাই সনদের পরবর্তী খসড়াগুলিতে এই মারাত্মক ভ্রান্তি খানিকটা মেরামত করার চেষ্টা করলেও, চূড়ান্ত সনদেও এই সর্বনাশা ভুল চোখে পড়ে।
আমরা মনে করি, একটা দেশের জন্মের ইতিহাস ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনভাবেই তা বিকৃত হয়ে গেলে বা ভুলভাবে উপস্থাপিত হলে তার ফলাফল হয় সর্বনাশা।
আমাদের উপস্থাপিত বাংলাদেশের যথার্থ রাজনৈতিক ইতিহাস
১৯৪৭ সালে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সমগ্র জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের একটা পর্যায় শেষ হয় এবং ১৪ আগস্ট স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ব পাকিস্তান মূলতঃ পশ্চিম পাকিস্তানি পুঁজিপতি গোষ্ঠীর কাঁচামাল ও পুঁজি সংগ্রহের উপনিবেশ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। এ অঞ্চলের জনগণ চূড়ান্ত শোষণের শিকার হয়। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রায় ৬০% মানুষ পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসী হলেও, এ অংশে ১৯৫০-৫১ থেকে ১৯৫৪-৫৫ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ ছিল মাত্র ২০%। এই নির্মম শোষণ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ নিরবে মেনে নেয়নি। পূর্ব পাকিস্তানের উপর এই নির্মম শোষণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিরাট ভৌগলিক দূরত্ব এবং পাকিস্তানের দুই অংশের ভাষা ও সংস্কৃতিগত পার্থক্য। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ এই শোষণ ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের রক্তস্নাত বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়- এই আন্দোলনগুলি মানুষের চিন্তার মধ্যে প্রথম স্বাধিকারের ধারণা নিয়ে আসে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা নির্বাচনী কর্মসূচীর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের সায়ত্ত্বশাসনের একটা ধারণা মূর্ত হয়। উল্লেখ্য যে, শ্রমিক-কৃষকদের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয় মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী এই পর্ব থেকে একটার পর একটা গণআন্দোলন সংগঠিত করেছেন, যা শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে পরিণতি লাভ করেছিল। কিন্তু ইতিহাসে উনার এই ভূমিকার কথা সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি। ১৯৭০ সালের ২০ ও ২১ নভেম্বর খুবই অসুস্থ অবস্থায় মওলানা ভাসানী ঘূর্ণিঝড়ে ও জলোচ্ছাসে বিধ্বস্ত এলাকা ঘুরে আসেন। ২৩ নভেম্বর পল্টনে তিনি এক ঐতিহাসিক জনসভায় বক্তব্য রাখেন। সে বক্তব্যের শেষে স্লোগান তুলেন,“স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান জিন্দাবাদ!” আবার ৩০ নভেম্বর ‘জনগণের প্রতি মওলানা ভাসানীর ডাক’ শীর্ষক এক প্রচারপত্রে তিনি আবেদন রাখেন, “পূর্ব পাকিস্তানের আজাদি রক্ষা ও মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া পড়ুন।” বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সম্ভবত এটাই প্রথম পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি।
এরপর বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, সায়ত্ত্বশাসনের দাবির ভিত্তিতে ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, সায়ত্ত্বশাসন ও শ্রমিক-কৃষকদের মুক্তির দাবিসহ ১১ দফার ভিত্তিতে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান- এই ঘটনাগুলো পাকিস্তানের পুঁজিপতিদের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। এর পরবর্তীতে ১৯৭০ সালের গণপরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় শুধুমাত্র একটা দলের নির্বাচনী বিজয় ছিল না। এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের আত্মপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু এই সকল আন্দোলনে বামপন্থীদের একটা ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল।
১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ এই গণআন্দোলনগুলোর স্বাভাবিক পরিণতি। এতে প্রায় সকল রাজনৈতিক দল ও লক্ষ-কোটি জনগণ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু এই গৌরব আওয়ামী লীগ একা আত্মসাৎ করতে গিয়ে এই মহান মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই মুক্তিযুদ্ধে জাতির একটা অতি ক্ষুদ্র অংশ রাজাকার, আলবদর বাহিনী যেমন ন্যাক্কারজনক ভূমিকা পালন করেছে, তেমনি লক্ষ-কোটি জনগণ অসীম সাহসিকতার সাথে লড়াই করে পাক বাহিনীকে প্রতিহত করেছে।
পরবর্তীকালে বাংলাদেশের ঘটনাবলী মহান লেনিনের সেই অবিস্মরণীয় উক্তি ম্মরণ করিয়ে দেয়,“সাম্রাজ্যবাদের যুগে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালিত না হয়ে যদি বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়, তাহলে সে স্বাধীনতা হবে আধসেঁকা রুটির মতো।” বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটল। লক্ষ লক্ষ মেহনতি মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশের যে স্বাধীনতা অর্জিত হলো, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদ চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে যাওয়ার ফলে ও সাম্রাজ্যবাদী স্তরে উত্তরণ হওয়ার ফলে এদেশে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে যে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র গঠিত হলো তা প্রথমদিন থেকেই শোষণ, জুলুম, অত্যাচার ও স্বেচ্ছাচারীতার দিকে পা বাড়ালো। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ এই চার বছরে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে একটার পর একটা জনবিরোধী নীতি রাষ্ট্র কার্যকরী করতে শুরু করে। সাংবাদিক ও বিরোধীদের ধরপাকড় ও হত্যা করতে শুরু করে। বন্দী অবস্থায় হত্যা করা হয় পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ সিকদারকে। জাসদের ৩০ হাজার কর্মীকে হত্যা করা হয়। একটার পর একটা সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়। সর্বশেষ ১৯৭২ সালে রচিত সংবিধানকে কবরস্থ করে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে জরুরী অবস্থা জারি করা হয়, ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসন কায়েম করা হয় এবং জুন মাসে বাকশাল গঠন করার মাধ্যমে সেই একক জাতীয় দল গঠন করা হয়। বাকশাল ছাড়া অন্য সকল দল নিষিদ্ধ করা হয় এবং ৫টি বাদে সকল সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা হয়। এ সময় যদি একটি যথার্থ মার্কসবাদী দল উপস্থিত থাকতো তাহলে হয়তো এর বিরুদ্ধে সত্যিকারের প্রতিরোধ গড়ে তোলা যেত।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর ১৯৯০ সাল পর্যন্ত একের পর এক ক্যু, পাল্টা ক্যু চলতে থাকে এবং সর্বশেষে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসক এরশাদ ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয়। সামরিক শাসনের অবসানের পরও দেশের স্থায়ীত্ব আসেনি। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আরোহণের সময় শেখ হাসিনা জামায়াতের সাথে কৌশলগত ঐক্য করেন, ২০০১ সালে বিএনপি জামায়েতের সাথে জোট করে ক্ষমতায় আসে। পরবর্তীতে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। এই প্রতিটি সরকারই ক্রমাগত গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন করেছে, একের পর এক জনবিরোধী নীতি কার্যকর করেছে এবং শেষ ১৫ বছর আওয়ামী লীগ এই শোষণ-জুলুম-অত্যাচার-বাক স্বাধীনতা হরণকে চূড়ান্ত জায়গায় নিয়ে গেছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করে আওয়ামী লীগ তার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের পথ প্রশস্ত করেছে। সংক্ষেপে এইটুকু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস। ইতিহাসের এই বর্ণনায় আমরা নতুন কিছু আনিনি। জুলাই ঘোষণা ও জুলাই সনদের মধ্যে যে উল্লেখযোগ্য ফাঁকটি থেকে গিয়েছিল তা ভরাট করেছি মাত্র।
জুলাই সনদে বিদ্যমান চার মূলনীতি প্রসঙ্গে বিতর্ক ও আলোচনা
এ প্রসঙ্গে প্রথমে একটা কথা বলে নেয়া দরকার। আমরা মনে করি না যে, সংবিধান বা তার মূলনীতি শাশ্বত কোন বিষয়, এগুলোর পরিবর্তন হতে পারে না। তেমনি বাহাত্তরের সংবিধান সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক একটি সংবিধান, আমরা সেটাও মনে করি না। বাহাত্তরের সংবিধানের যে অংশে রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামো বর্ণনা করা হয়েছে, সেটি পরিবর্তনের আলোচনা রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে চলমান এবং আমরা সেটা সমর্থন করি। এ কারণে এর বিভিন্ন বিধান সংস্কারের প্রস্তাব আমরা রেখেছি। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর ছাত্রনেতৃত্ব ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে অনেকের বক্তব্য, সরকারের বিভিন্ন মহলের বক্তব্য, জুলাই ঘোষণার খসড়া, সংবিধান সংস্কার কমিশনের লেখা ও সর্বশেষ ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবনা- এসব দেখে আমাদের স্পষ্ট মনে হয়েছে যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এ সম্পর্কিত বিভিন্ন আলোচনার মধ্যে সংবিধান পুনর্লিখনের দাবিও এসেছে। একটি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দল হিসেবে আমরা মনে করি, রাষ্ট্রক্ষমতায় বৃহৎ ব্যবসায়ী-পুঁজিপতি শ্রেণির রাজনৈতিক দল ও তার সহযোগী সামরিক বাহিনী ও আমলাতন্ত্র বসিয়ে রেখে সবচেয়ে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংবিধান প্রণয়ন করলেও দেশের অবস্থার তেমন কোন পরিবর্তন হবে না। জনগণ কতটুকু অধিকার পাবে সেটা সংবিধানে কী আছে, তার উপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে সংবিধানের প্রয়োগ কারা ঘটাচ্ছে, তাদের উপর। যে শক্তি রাষ্ট্র চালায়, যে শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতায়- তার রাজনৈতিক চরিত্রই রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করে, সংবিধান নির্ধারণ করে না। আজকের দুনিয়ায় সকল পুঁজিবাদী রাষ্ট্রই কমবেশি ফ্যাসিবাদী। এই ফ্যাসিস্ট নিপীড়ন থেকে জনগণের অধিকারকে রক্ষা করতে পারে একমাত্র গণআন্দোলন ও জনগণের ঐক্য। তারপরও আমরা সংবিধানের সংস্কার চাই এ কারণে যে, এই ফ্যাসিবাদী জুলুমের বিরুদ্ধে জনগণের লড়াইকে যাতে খানিকটা সুরক্ষিত করা যায়, সংবিধান দিয়ে যাতে নিপীড়ক তার নিপীড়নকে জায়েজ করতে না পারে।
মূলনীতি পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আমাদের এ অবস্থান বাস্তবে ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান। চার মূলনীতির মধ্যে জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গটি আমরা কীভাবে দেখি সেটাও আমরা ঐকমত্য কমিশনের প্রথম সভায় ও পরবর্তীতে স্প্রেডশিটে দেয়া প্রস্তাব নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সাথে আলোচনায় তুলে ধরেছি। আমাদের মুখপত্র ‘সাম্যবাদ’-এর মার্চ ও মে, ২০২৫- দুইটি সংখ্যায় সেটা প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তীতে মূলনীতি প্রশ্নে ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক বর্জন করার পর আমরা একটি বক্তব্য প্রকাশ করেছিলাম। এই লেখায় সেগুলোরই অংশবিশেষ আমরা তুলে ধরব।
ক) মুজিববাদ বলে আসলেই কি কিছু আছে
পূর্ব পাকিস্তানের উঠতি ব্যবসায়ী-পুঁজিপতি গোষ্ঠী ও ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ সমর্থনে মুক্তিযুদ্ধের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত গণপরিষদের পরিবর্তে ১৯৭০ সালে নির্বাচিত গণপরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে সংবিধান রচনার উদ্যোগ নেয়, যা ছিল অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ। মওলানা ভাসানীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এর প্রতিবাদ করেন। গণআকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষিতে এই ধারণাগুলোকে তারা মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে রাখতে বাধ্য হয়। আমরা এই কথাটা বলছি এ কারণে যে, সংবিধান রচনার তিন বছরের মধ্যেই শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার সকল গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করে, হাজার হাজার বিরোধী নেতাকর্মীকে খুন করে, সংবিধানের চারটি কলঙ্কজনক সংশোধনী এনে শেখ মুজিব ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠন করেন ও একদলীয় শাসনের দিকে পা বাড়ান। এরপর থেকে যারাই ক্ষমতায় এসেছে, প্রতিটি সরকারই ক্রমাগত গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন করেছে, একের পর এক জনবিরোধী নীতি কার্যকর করেছে এবং গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ এই শোষণ-জুলুম-অত্যাচার-বাক স্বাধীনতা হরণকে চূড়ান্ত জায়গায় নিয়ে গেছে।
বাহাত্তরের সংবিধান প্রনয়নের আগে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভায় জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে দলীয় নীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে সংবিধানে এটাকেই মূলনীতি করা হয়। এটাকে কেন্দ্র করে এই প্রশ্ন এখন এসেছে যে, এই সংবিধানের ভাবাদর্শগত ভিত্তি হলো মুজিববাদ। এক্ষেত্রে জেনে রাখা উচিত যে, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা একটা আধুনিক, গণতান্ত্রিক সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ১৭৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বুর্জোয়ারা সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, নারীস্বাধীনতা, এক মানুষ-এক ভোট এসকল প্রগতিশীল ধারণাগুলো নিয়ে এসেছিল। এরপর থেকে সকল বুর্জোয়া রাষ্ট্রই তাদের সংবিধানকে এই ধারণাগুলোর উপর দাঁড় করায়। যদিও আজকের এই সাম্রাজ্যবাদের যুগে আন্তর্জাতিকভাবে বুর্জোয়ারা প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে যাওয়ার কারণে সকল দেশেই এই ধারণাগুলো সংবিধানে লেখা আছে, বাস্তবে রাষ্ট্রের কোথাও এর কার্যকরিতা নেই।
১৯১৭ সালে রুশদেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ফলে সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠিত হয়। বিশ্বের বড় বড় মনীষীরা তখন এই নতুন সমাজকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ২ এপ্রিল পল্টনে ভাসানী বলেন, “একটি ন্যাশনাল কনভেনশন ডেকে সকলের মতামত নিয়ে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা উচিত ছিল। কিন্তু সরকার তা করেনি।”… “পরিষদের যে একদলীয় শাসনতন্ত্র প্রণীত হচ্ছে তাতে কৃষক-শ্রমিক-সর্বহারা মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং খাঁটি সমাজতন্ত্রের নিশ্চয়তা থাকতে হবে।” ১৯৭২ সালের ১৪ এপ্রিল সন্তোষে ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটি সভায় এক প্রস্তাব গৃহীত হয়- “সংবিধান হবে ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক। সকল ধর্মমতের অনুসারী বাঙালি অবাঙালি নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ যাতে আইনের দৃষ্টিতে সমান অধিকার পায়, সেজন্য শাসনতন্ত্রে নিশ্চয়তা থাকতে হবে।” ফলে মুজিববাদ বলে যা দাবি করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়।
খ) চার মূলনীতি কি ফ্যাসিবাদের উৎস
আরেকটি যুক্তি এই সময়ে এসেছে যে, মুজিববাদ অর্থাৎ এই চার মূলনীতি হলো ফ্যাসিবাদের উৎস। আমরা ফ্যাসিবাদ প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্য পুস্তিকাকারে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশ করেছি। সেখানে আমরা দেখিয়েছি যে, ফ্যাসিবাদ কোন দল কিংবা সংবিধানের মূলনীতি আনে না। দেশের অর্থনীতি গুটিকয়েক বৃহৎ ব্যবসায়ী শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত হলে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সেটাই একটা কেন্দ্রীভূত শাসনকাঠামো সৃষ্টি করে। অর্থনৈতিক ভিত্তির সাথে রাজনৈতিক উপরিকাঠামোর সম্পর্ক না বুঝতে পারলে, কখনও মুজিববাদ, কখনও আওয়ামী লীগ, কখনও সংবিধান, কখনও আমলাতন্ত্রকে ফ্যাসিবাদের উৎস মনে হবে। এ দিয়ে ফ্যাসিবাদ মোকাবেলা করা যাবে না। এতে এই শাসকশ্রেণিরই সুবিধা হবে। একদিকে বৃহৎ ব্যবসায়ীরা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্রকে পুনরায় কুক্ষিগত করবে, অন্যদিকে মুজিববাদের বিরুদ্ধে কাল্পনিক লড়াই চলবে। আমরা তা-ই এখন ঘটতে দেখছি।
ঐকমত্য কমিশন বরাবর লিখিত চিঠিতে আমরা এ প্রসঙ্গে বলেছিলাম যে, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তরপর্বে কী ছোট, কী বড়, কী উন্নত, কী অনুন্নত- সকল পুঁজিবাদী দেশেই ফ্যাসিবাদ শিকড় গেড়েছে। ফ্যাসিবাদের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি অর্থাৎ পুঁজির ক্রমাগত কেন্দ্রীকরণ, প্রশাসনে ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীকতা ও কঠোরতা এবং বিজ্ঞানের কারিগরি দিকের সাথে আধ্যাত্ম্যবাদের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সাংস্কৃতিক যন্ত্রীকরণের চেষ্টা- এগুলিকে হাতিয়ার করে সকল পুঁজিবাদী দেশের শাসকশ্রেণি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো, প্রতিষ্ঠান ও মূল্যবোধ ধ্বংস করতে চেয়েছে। ফ্যাসিবাদকে হাতিয়ার না করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দ্বারা জনজীবনের জ্বলন্ত সমস্যার সমাধান করা তার পক্ষে অসম্ভব। ফলে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ ঐক্যবদ্ধ জনগণের সচেতন, সংগ্রামী, দীর্ঘস্থায়ী লড়াই ব্যতিরেকে সম্ভব নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গণআন্দোলনের যে হাতিয়ারগুলি তৈরি হয়েছিল, পুঁজিবাদী শাসন যদি সেইগুলোকে বিকল করে দেয় এবং জনগণের ঐক্য বিনষ্ট করতে সক্ষম হয়, তবে বাংলাদেশে অন্য কোন শক্তির মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ কায়েম হবে। ইতিহাস এর স্বাক্ষী।”
গ) চার মূলনীতি নিয়ে আমাদের বক্তব্য
চার মূলনীতির মধ্যে জাতীয়তাবাদ নিয়ে আলোচনা সবচেয়ে বেশি। পাকিস্তানি প্রায়উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাঙালী জাতীয়তাবাদ এদেশের সকল শোষিত জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। একটা ভৌগলিক ভূখণ্ডে বিভিন্ন জাতিসত্ত্বার অস্তিত্ব থাকতে পারে। একটা নতুন জাতি ও নতুন রাষ্ট্র গড়ে উঠার পথে যে স্বাধীনতা আন্দোলন, সেখানে একটি অখণ্ড জাতিসত্ত্বা তখনই তৈরি হবে, যখন ওই সময়ে বিদ্যমান সমস্ত জাতিসত্ত্বাগুলোর সমঅধিকার নিশ্চিত হবে এবং তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি সুরক্ষিত থাকবে। প্রথম যুগে বুর্জোয়ারা যখন সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে আপোষহীনভাবে লড়েছে, তখন তারা খানিকটা হলেও এ প্রচেষ্টা করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিকভাবে পুঁজিবাদ চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল সাম্রাজ্যবাদের স্তরে প্রবেশ করেছে। স্বাভাবিকভাবেই এদেশে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বে থাকা আওয়ামী লীগের মতো বুর্জোয়া শক্তি অখণ্ড জাতিসত্ত্বা নির্মাণের কোন উদ্যোগই নেয়নি।
ফলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতীয়তাবাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের প্রগতিশীল চরিত্রকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে একেই অন্য জাতিগোষ্ঠীর উপর নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। যে জাতীয়তাবাদ মুক্তির লড়াই করলো, বুর্জোয়ারা ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সে বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিজেই আগ্রাসী হয়ে উঠলো। আজকের দিনে প্রতিক্রিয়াশীল সাম্রাজ্যবাদের যুগে জাতীয়তাবাদ একটা অখণ্ড জাতি তৈরি করতে পারে না। একমাত্র আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ রাষ্ট্রই সকল জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি, সমান অধিকার ও বিকশিত হওয়ার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে।
আমরা ঐকমত্য কমিশনের কাছে এ ব্যাপারে বলেছিলাম, “বাহাত্তরের সংবিধানে যেভাবে জাতীয়তাবাদের ধারণা দেয়া হয়েছে, তা অবশ্যই প্রশ্নসাপেক্ষ ও আলোচনার দাবি রাখে। আবার এটাও ঠিক, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় উপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভিত্তি করে ধারাবাহিক লড়াই, আত্মনিয়ন্ত্রণের সশস্ত্র স্বাধীনতার লড়াই গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আবার আওয়ামী লীগ এই বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করে অন্য জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি দেয়নি। উল্লেখ্য যে, ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দটির ধারণা ইউরোপীয় নবজাগরণ থেকে আসা। শব্দটি দেশপ্রেম, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। বাহাত্তরের সংবিধানে দেশের অন্যান্য জাতিসত্ত্বাকে স্বীকৃতি না দিয়ে জাতীয়তাবাদ বলতে শুধুমাত্র ‘বাঙালি জাতি’-এর স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল ভুল। আমরা মনে করি, সংবিধানে বাংলাদেশের সব জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি ও সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।” প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার এই সময়ে, সাম্রাজ্যবাদের যুগে জাতীয়তাবাদ দিয়ে দেশপ্রেম, সার্বভৌমত্ব আসবে না- এটাই বাস্তব। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদের সুনির্দিষ্ট ধারণা না অর্জন করলে আজকের দিনে জাতিসত্ত্বাগুলোর সমঅধিকার সুরক্ষিত করা অসম্ভব। এ সত্ত্বেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সুবিশাল সংগ্রামের ঐতিহাসিক উপাদান হিসেবে আমরা একে রাখতে চাইছি এবং এর উপর আবশ্যিক কিছু শর্ত যুক্ত করছি।
সমাজতন্ত্র বাদ দেয়ার যৌক্তিকতা দেখাতে গিয়ে সংবিধান সংস্কার কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, “সমাজতন্ত্র গণতান্ত্রিক শাসনবিরোধী।” (সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন, পৃষ্ঠা ৬৯) আমরা এই প্রসঙ্গে কমিশনকে বলেছিলাম, “এই বক্তব্য ইতিহাসসম্মত নয়, বিজ্ঞানসম্মতও নয়। ১৯১৭ সালে রুশ দেশে মহান লেনিনের নেতৃত্বে মার্কসবাদের মূলনীতিগুলোকে কার্যকরী করে সর্বহারা শ্রেণি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন করে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই রাষ্ট্রের প্রতি সারা দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের প্রবল আকর্ষণ তৈরি হয়। এই রাষ্ট্রব্যবস্থা বেকারত্ব দূর করে, নারীকে ব্যাপক স্বাধীনতা দেয়, বিনামূল্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ সবগুলো মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। আইনস্টাইন, রমাঁ রল্যাঁ, বার্ট্রান্ড রাসেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মওলানা ভাসানীসহ বহু মনীষী এই সভ্যতাকে কুর্নিশ করেছিলেন। একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত রাষ্ট্র একমাত্র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যেই সম্ভব হতে পারে।”
সমাজতন্ত্রকে বাদ দেয়ার সুপারিশের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংবিধান সংস্কার কমিশন আরও লিখেছেন, “সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা মুক্তবাজার অর্থনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।” (তৃতীয় অধ্যায়, সুপারিশের যৌক্তিকতা, সংবিধান সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন, পৃষ্ঠা ৬৯)
অর্থাৎ মুক্তবাজার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াও সমাজতন্ত্রকে বাদ দেয়ার একটা কারণ। অথচ আমাদের দেশের পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা গত ১৫ বছর ধরে দেশের বৃহৎ ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষা করার জন্য এই মুক্তবাজার অর্থনীতিকেই কার্যকর করেছিলেন। এই ব্যবসায়ীরা দেশকে প্রায় লুট করে নিয়েছেন। মুক্তবাজার অর্থনীতির ঠিকাদারদের নিজেদের দেশেই মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু নেই। তারা নিজেদের বাজারে শুল্ক বসিয়ে অন্য দেশের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে প্রতিষ্ঠা করে, সেটা এই কয়দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ ও নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্টের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট। কিন্তু সমাজতন্ত্র খারাপ, কারণ এই দেশ বিক্রি করে দেয়া মুক্তবাজার অর্থনীতির উপর সে সীমাবদ্ধতা আরোপ করবে!
ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কমিশনের বক্তব্য আরও অদ্ভূত। বলা হয়েছে, “মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব রাজনৈতিক আলোচনায় ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল একপ্রকার অপরিচিত ধারণা। ধর্মনিরপেক্ষতা সমাজ ও রাষ্ট্রে বিভক্তি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, এবং অতীতে ফ্যাসিবাদী শাসনের আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এটি বাংলাদেশের বিদ্যমান বহুত্ববাদী সমাজের ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, এবং মূলত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বিরোধী।” (সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন, পৃষ্ঠা ৬৯)
এ হেন আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা সেদিন লিখেছিলাম যে, “বলা হচ্ছে, ধর্মনিপেক্ষতা নাকি বিভক্তি সৃষ্টি করে। অথচ ধর্মীয় বিভক্তি ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কাছে একটা রক্ষাকবচ। ধর্মনিরপেক্ষতা সকল ধর্মবিশ্বাসীকে স্বাধীনভাবে নিজ নিজ বিশ্বাস বা ধর্ম পালনের নিশ্চয়তা প্রদান করে। ধর্মনিরপেক্ষতার আসল অর্থ হলো- ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং ধর্ম পালনের অধিকার একটি মৌলিক অধিকার; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে ধর্ম সংযুক্ত থাকতে পারে না।” ধর্মনিরপেক্ষতা কীভাবে ফ্যাসিবাদের আদর্শিক ভিত্তি হয়, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিরোধী হয়, আবার ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া ছাড়া একটা রাষ্ট্র কীভাবেই বা গণতান্ত্রিক হয়- তা আমাদের জানা নেই।
বাস্তবে সরকার ও তার পিছনে যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো দাঁড়িয়ে আছে, তারা বিদ্যমান মূলনীতিগুলোকে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের একচেটিয়া সম্পত্তি বলে দেখাতে চাইছেন এবং এরই কারণে তাদের ইতিহাসকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যার পথ নিতে হচ্ছে। সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাসহ এ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের কিছু মৌল আকাঙ্ক্ষাকে বাদ দিতে চাওয়ার অর্থ হলো গোটা জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম ও প্রাণ দেয়া লাখো শহিদের আকাঙ্ক্ষাকে অমর্যাদা করা।
ঘ) ঐকমত্য কমিশনে আমাদের সর্বশেষ প্রস্তাবনা
আমরা সর্বশেষ ঐকমত্য কমিশনকে বলেছিলাম, আপনাদের প্রস্তাবনাগুলোকে (সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি) বিদ্যমান মূলনীতিগুলোর সাথে যুক্ত করুন। কিন্তু সেটা তারা মানেননি। তারা বলেন যে, তাদের প্রস্তাবিত মূলনীতিগুলো পরবর্তীতে সংস্কার বা সংশোধন করা সংবিধানের মূলনীতি অংশে অবশ্যই উল্লেখ থাকবে- এই মর্মে একমত হওয়ার জন্য। বিদ্যমান সংবিধানের চার মূলনীতি রাখা কিংবা না রাখার ব্যাপারে কোন আলোচনা ঐকমত্য কমিশন করবে না, পরবর্তী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসা জনপ্রতিনিধিরা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। আমরা বলেছি যে, এই ধরনের বিষয় নিয়ে কোন মাঝামাঝি সমঝোতা হয় না। বিদ্যমান মূলনীতির ব্যাপারে কোন শব্দ খরচ না করে, কেবল নতুন নীতিগুলো রাখার ব্যাপারে সম্মতি দেয়া মানে এটা স্বীকার করা যে, বিদ্যমান মূলনীতিগুলো পরবর্তী সংস্কার বা সংশোধনীতে নাও থাকতে পারে। এই সম্মতি আমাদের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। মূলনীতিগুলো যেহেতু জাতি গঠনের ইতিহাসের সাথে যুক্ত- ফলে জনগণই এই প্রশ্ন ফয়সালা করুক।
আমরা বলেছিলাম, আমরা কমিশনে আলোচনায় মিলিত হয়েছি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের বিষয়ে ঐক্যমত হওয়ার জন্য। মূলনীতি রাষ্ট্রের কাঠামোগত বিষয় নয়। বিভিন্ন আদর্শ ও মতের রাজনৈতিক দলের মধ্যে এ নিয়ে ঐক্যমতে আসা সম্ভবও নয়, আবার এসব ব্যাপারে মাঝামাঝি কোন সমঝোতাও হয় না। আপনারা এটা নিয়ে আলোচনা বাদ দিন। কিন্তু তারা শোনেননি।
জুলাই অভ্যুত্থানে আমরা সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলাম। বিভিন্ন সময় সরকারের সাথে বিভিন্ন বৈঠকে প্রায়শই আমরা লিখিত মতামত দিয়েছি। সংস্কার কমিশনগুলোতে লিখিতভাবে আমাদের প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি, ঐকমত্য কমিশনেও পাঠিয়েছি। ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনায় আমরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি, বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের মতামত রেখেছি, তর্ক-বিতর্ক করেছি। অনেক ক্ষেত্রে আমরা সামগ্রিক স্বার্থে কমিশনের প্রস্তাব মেনে নিয়েছি। মূলনীতি প্রশ্নে আমাদের অবস্থানের যুক্তিসঙ্গত কিছু কারণ আছে। সে কারণে আমাদের এই অবস্থান নিতে হয়েছে।
আওয়ামী লীগ ইতিহাসের কী ধরনের বিকৃতি ঘটিয়েছিল, তা আমরা ভুলে যাইনি। জাতি গঠনের ইতিহাসকে পাল্টে ফেলার প্রচেষ্টা ও ইতিহাস বিকৃতির এই পরিপ্রেক্ষিতের উপর দাঁড়িয়ে যখন মূলনীতি পরিবর্তনের আলোচনা আসে, তখন এটাকে সাধারণভাবে সংবিধানের কয়েকটি শব্দ পরিবর্তন, কিংবা নতুন কথাগুলোর মধ্যে পুরনো মূলনীতির নির্যাসগুলোতো পাওয়া গেলে বদলাতে সমস্যা কী- এত সাধারণভাবে আমরা নিতে পারছি না। প্রতিটি পরিবর্তনকেই তার প্রেক্ষাপট থেকে বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে সরলীকৃত চিন্তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে ইতিহাসের এমন এক পরিবর্তনের অংশীদার আমরা হব, যার জন্য ভবিষ্যত আমাদের ক্ষমা করবে না।
সংস্কার দিয়ে রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদ প্রতিহত করা যাবে না, সমাজতন্ত্রই একমাত্র বিকল্প পথ
বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে এই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী এক বছরে দেশের বৈষম্য কমেনি, বরং বেড়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী এক বছরে দারিদ্র বেড়েছে, পিপিআরসির তথ্য অনুসারে বর্তমানে দেশের প্রতি চারজনের একজন দরিদ্র। আবার একই সময়ে দেশে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে, প্রায় ৫ হাজারেরও অধিক নতুন করে কোটিপতি হয়েছে। অর্থাৎ বৈষম্য ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
গণঅভ্যুত্থানের পরও বৈষম্য কমলো না কেন? গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কি ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে? আমরা এখন আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে বলতেই পারি, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বৈষম্য দূর হয়নি, ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেনি। আওয়ামী লীগের পতন হলেই কেন বৈষম্য দূর হবে না, ফ্যাসিবাদের পতন ঘটবে না- এ বিষয়ে আমরা গত জানুয়ারিতেই আমাদের ফ্যাসিবাদ সম্পর্কিত পুস্তিকায় বক্তব্য রেখেছিলাম।
রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার আমরা চাই, তবে সাথে সাথে এটাও আমরা মনে করি যে, এই সনদ ও এই সংস্কার দিয়ে রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী নিপীড়ন কিংবা ধনী-গরিবের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা সম্ভব হবে না। কোন দল কিংবা সংবিধান ফ্যাসিবাদ আনে না। বর্তমান যুগে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, সে যে রূপেই থাকুক না কেন- তার মধ্যে ফ্যাসিবাদী ঝোঁক থাকতে বাধ্য। এই বিষয়টি আমরা এই লেখায় পূর্বেও উল্লেখ করেছি।
ফলে এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার উচ্ছেদ না ঘটিয়ে ফ্যাসিবাদের উচ্ছেদ সম্ভব নয়। তা না হলে অনেক আত্মত্যাগের মাধ্যমে বারবার ভোটের অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার অর্জিত হবে- আর গণআন্দোলনের শক্তি দুর্বল হলে, আন্দোলনের নেতৃত্ব পুঁজিপতি-শিল্পপতিদের দলগুলোর হাতে থাকলে, বারবারই তা হাতছাড়া হবে। আবারও নেমে আসবে নির্মম গণতন্ত্রহীন পরিবেশ। ফলে কোন সংস্কারই শেষ পর্যন্ত মুক্তি দিতে পারবে না। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া ফ্যাসিবাদ থেকে কোন মুক্তি নেই।
সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি নেই, একথা ঠিক। পুঁজিবাদের সংকটগ্রস্ত সময়ে, প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিবাদের যুগে বৃহৎ পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষার জন্যই ফ্যাসিবাদের উদ্ভব হয়েছে। বুর্জোয়ারা আজ বুর্জোয়া গণতন্ত্রেরই প্রতিশ্রুত অধিকার তথা সর্বজনীন ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতাসহ সমস্ত গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছে। তাই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একসময় যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো অর্জিত হয়েছিল তা রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার দাবিতে এ যুগে শ্রমিকশ্রেণিই একমাত্র নির্ভরযোগ্য শক্তি। শ্রমিকশ্রেণির শ্রেণি সংগ্রাম ও সর্বাঙ্গীন মুক্তির আন্দোলনের বিকাশের স্বার্থের প্রশ্নেই এই অধিকারগুলোকে রক্ষার সংগ্রামও তাকে করতে হবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে অবস্থান করে গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক পরিধি বৃদ্ধি করার সংগ্রাম মেহনতি জনসাধারণের পূর্ণাঙ্গ মুক্তির পথ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সাথে বিরোধাত্মক নয়- বরং পরিপূরক। এ প্রসঙ্গে লেনিনের একটি শিক্ষা আমাদের স্মরণে রাখা প্রয়োজন। লেনিন বলছেন,“গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম শ্রমিকশ্রেণিকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে বিপথে চালিত করতে পারে বা সে লক্ষ্যকে ভুলিয়ে দিতে বা চাপা দিতে পারে এরকম ধারণা করলে- একটা মৌলিক ভুল করা হবে। বরং, পূর্ণ গণতন্ত্র প্রবর্তন না করে যেমন সমাজতন্ত্র জয়যুক্ত হতে পারে না, তেমনি শ্রমিকশ্রেণি যদি গণতন্ত্রের জন্য বহুমুখী, সুসঙ্গত ও বিপ্লবী সংগ্রাম না চালান, তাহলে বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে জয়যুক্ত হবার জন্য তৈরি হতেও তাঁরা অপারগ হবেন।”
আমরা মনে করি, এই সংস্কার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিধিটাকে একটু বাড়াতে সাহায্য করবে মাত্র। প্রকৃত মুক্তি কেবল ব্যবস্থা পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই আসতে পারে।
দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে সকল প্রকার সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ রুখে দাঁড়ান
বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই দুনিয়ার বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, যেমন- ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো এবং পরবর্তীকালে চীন, রাশিয়া, জাপান ইত্যাদি দেশুগলো তাদের বাজার সম্প্রসারনের লক্ষে এদেশের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের উপর বারংবার হস্তক্ষেপ করেছে। বর্তমান সময় এই হস্তক্ষেপ অনেকগুণ বেড়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল দরপত্র ছাড়াই, গোপন চুক্তির মাধ্যমে যেভাবে ইজারা দেয়া হচ্ছে এবং এ ব্যাপারে সরকার যে ধরনের বেপরোয়া ভাব দেখাচ্ছেন- তাতে আমরা শঙ্কিত। বিগত সময়ে ভারতসহ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর কাছে আওয়ামী লীগের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি আমরা দেখেছি। গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা এমন একটি সরকার প্রত্যাশা করেছি- যে সরকার সকল ধরনের বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দেবে। আমরা মনে করি, সবরকম সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত। দেশকে কোনভাবেই জিম্মি রাখা যাবে না। দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা সরকারের অবশ্য কর্তব্য।
বাংলাদেশের যথার্থ বিপ্লবী দল ‘বাসদ (মার্কসবাদী)’-কে শক্তিশালী করুন
বিরাট আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল দেশের স্বাধীনতা। কিন্তু মানুষ মুক্তি পায়নি। বারবার এদেশে বাকস্বাধীনতার উপর, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর আক্রমণ এসেছে- বারবার মানুষ লড়াইয়ে নেমেছে, প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু মুক্তি আসেনি। এই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে প্রায় দেড় হাজার মানুষ প্রাণ দিল, প্রায় ২৫ হাজার মানুষ আহত হলো। এ দেশের কোন আন্দোলনে এত মানুষের আত্মত্যাগ করতে হয়নি। কিন্তু বৈষম্য কমেনি, ফ্যাসিবাদ যায়নি, মুক্তি আসেনি। কোন পথে মুক্তি আসবে, সেই পথের দিশায় তাকিয়ে আছে দেশের লোক। বিগত সময়ে ক্ষমতায় থাকা বড় বড় দলগুলোর গণবিরোধী অবস্থান তাদেরকে হতাশাগ্রস্ত করছে।
এই সময়ে দেশের জনগণের কাছে আমাদের আবেদন- তারা যাতে তাদের রাজনীতিটা বুঝতে চেষ্টা করেন। শুধু টিভি-পত্রিকা দেখে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার দেখে দল চেনা নয়, রাজনীতি বুঝে দল বিচার করেন। প্রতিটি দলের শ্রেণিচরিত্র বোঝার চেষ্টা করেন। বোঝার চেষ্টা করেন যে- যে দলকে সমর্থন করেন, সেই দলের নেতা-কর্মীরা প্রতিদিনের জীবনে, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ব্যবহার ও আচরণে কী ধরনের সংস্কৃতি অনুসরন করে।
আমরা বিনয়ের সাথে বলতে চাই-“সব দলই দেখলাম, সবাই সমান। যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ। ক্ষমতায় গেলে সবাই একইরকম- এই ধরনের উক্তি আমাদের মুক্তি দেবে না। ফ্যাসিবাদ উচ্ছেদের জন্য, অসহনীয় অত্যাচার থেকে মুক্তির জন্য, প্রকৃত স্বাধীনতার জন্য- প্রতিটি দলের রাজনীতি মানুষকে বুঝতে হবে। এই আন্দোলনে আমাদের দল এ যুগের সর্বোন্নত আদর্শ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তার ভিত্তিতে যে সংগ্রাম পরিচালনা করছে, সেই সংগ্রামকে শক্তিশালী করার জন্য দেশের জনগণকে আমরা আহবান জানাই।
বর্তমান সময়ে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা মানবতাবাদী মূল্যবোধ কোনটাই পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বেপরোয়া লুণ্ঠন, শোষণ ও অত্যাচার রুখতে পারবে না। পুঁজিবাদী সমাজের মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয়, অসহনীয় বেকারত্ব, একটার পর একটা দেশে ভয়াবহ যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ নরনারী ও শিশু হত্যাকাণ্ড, অনাহারে ও বিনা চিকিৎসায় লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু- এই অধঃপতিত সমাজের একমাত্র বিকল্প সমাধান মার্কসবাদ। তাই একটা দেশে একটা যথার্থ মার্কসবাদী দলের নেতৃত্বে সমাজ পরিবর্তনের লড়াই ছাড়া সমাজমুক্তি অসম্ভব।
আমরা যদি যথার্থভাবে না লড়ি, আমাদের কথা ও কাজের ফারাক জনগণই ধরিয়ে দেবেন, আমাদের পরিত্যাগ করবেন। আমরা বিশ্বাস করি- সঠিক আদর্শ, সঠিক বিপ্লবী লাইন ও কর্মসূচি নিয়ে আমরা লড়ছি। আপনারা আমাদের লড়াই, আমাদের চরিত্র, আমাদের নৈতিকতা, আমাদের সমাজ বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করবেন, আমাদের দলকে শক্তিশালী করবেন- মুক্তিপ্রয়াসী ও গণতন্ত্রকামী সকল সংবেদনশীল মানুষের কাছে এ আমাদের একান্ত আবেদন।
