আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্লজ্জ দলীয়করণ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাই রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গণতন্ত্রীকরণের অর্থাৎ এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত করে একটা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার দাবি উঠে। বিশেষ করে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সায়ত্ত্বশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি সামনে আসে।
অভ্যুত্থানের পরে গঠিত অন্তবর্তীকালীন সরকার প্রায় ১৮ মাস ক্ষমতায় ছিল। তারা এই সময়ে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে। কিছু অধ্যাদেশ ছিল প্রশ্নবিদ্ধ কিংবা ত্রুটিপূর্ণ। আবার কিছু অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল যা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উত্থাপিত সংস্কার আকাঙ্ক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এইসকল অধ্যাদেশের আইনী ভিত্তি প্রসঙ্গে সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- “পরবর্তী নির্বাচিত সংসদ অধিবেশনের প্রথম বৈঠকেই অধ্যাদেশসমূহ উপস্থাপন করতে হবে। সংসদ চাইলে তা পাস করতে পারে বা বাতিল করতে পারে। সংসদ বসার ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না পেলে অধ্যাদেশটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।”
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে গঠিত সংসদের প্রথম অধিবেশন এই কারণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি অধিবেশনের প্রথম দিনই সবগুলো অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন ও পরবর্তীতে সরকারি ও বিরোধীদলের সদস্যদের যুক্ত করে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটির দায়িত্ব ছিল অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনা করে গ্রহণ ও বর্জন সম্পর্কিত সুপারিশ প্রদানের। গত ২রা এপ্রিল এই কমিটি তাদের সুপারিশ পেশ করেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু আইনে রূপান্তরের জন্য বিল উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।
যে ৯৮টি অধ্যাদেশ সরকার হুবহু পাশ করতে যাচ্ছে, তার মধ্যে কিছু অধ্যাদেশ আছে, যা নিয়ে অন্তবর্তী সরকারের সময় বিএনপি নিজেই সমালোচনা করেছিল। যেমন: বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ ও প্রশাসক নিয়োগ, সরকারি কর্মচারীরা আন্দোলনে যুক্ত থাকলে ২৮ কার্যদিবসের মধ্যে বরখাস্ত করা ইত্যাদি। যে কোন সরকারই এই আইনগুলোকে যথেচ্ছ ব্যবহার করতে পারে। অথচ তারা ক্ষমতায় এসেই এগুলোকে আইনে পরিণত করলো এবং নিজেদের যথেচ্ছ ব্যবহারের পথ পরিষ্কার করলো।
বাকি ৩৫টি অধ্যাদেশের জন্য তিন ধরনের পরিণতি সুপারিশ করা হলো:
-এখনই রহিত করা হবে ৪টি অধ্যাদেশ
-পরবর্তীতে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে বিল হিসেবে উত্থাপন করা হবে ১৬টি অধ্যাদেশ
-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশোধিত আকারে বিল হিসেবে উপস্থাপন করা হবে ১৫টি অধ্যাদেশ
ফলে নিয়ম অনুযায়ী গ্রহণ না করায় বর্তমানে এই ৩৫টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারিয়েছে।
১.
যে ৪টি অধ্যাদেশ এখনই রহিত করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ। এগুলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ, পৃথক সচিবালয়- এই বিষয়গুলোর উল্লেখ আছে। বিদ্যমান সংবিধান অনুসারে উচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দ-অপছন্দের উপর নির্ভর করে।
এই অবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে, অধ্যাদেশ জারি করে বিচারপতি নিয়োগের এই ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের হাত থেকে সরিয়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কাউন্সিলের উপর ন্যস্ত করা হয়। এই কাউন্সিল বিচারপতি পদে নিয়োগের জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের বাছাই করবে এবং তাদের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে। এই প্রস্তাবকে প্রধান বিচারপতির পরামর্শ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং রাষ্ট্রপতি কাউন্সিলের সুপারিশ অনুযায়ী বিচারপতি নিয়োগ দেবেন। অর্থাৎ, বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়াটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে এনে তা সরকারপ্রধানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশটিকে আইনে রূপান্তর করা হচ্ছে না। ফলে সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগ আবারও কার্যত প্রধানমন্ত্রীর হাতেই থেকে যাচ্ছে।
একইভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরি, বদলি ও পদোন্নতির নিয়ন্ত্রণ আইন মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে প্রধান বিচারপতির হাতে দেওয়ার যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, সেটিও বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে নিম্ন আদালতের বিচারকদের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকছে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য একটি বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়।
২.
যে ১৬টি অধ্যাদেশ পরবর্তীতে যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছেÑ এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও গুম সংক্রান্ত অধ্যাদেশ।
গুম সংক্রান্ত অধ্যাদেশে গুমকে একটি ‘চলমান অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। বিএনপি জাতীয় নিরাপত্তার কারণে আটকের ঘটনাকে গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দিতে চায়। সেই সঙ্গে গুমের অভিযোগে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতি নেয়ার বিধান যুক্ত করতে চায়। গুমের ঘটনা ঘটায় নিরাপত্তা বাহিনী, নির্দেশ দেয় সরকার। গুম সংক্রান্ত অভিযোগ বাস্তবে এই দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই হয়। এ থেকে জনগণকে সুরক্ষা দেয়ার জন্যই গুম সংক্রান্ত অধ্যাদেশ। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে সরকারের অনুমতি নেয়ার বিধান রাখা মানে এই অধ্যাদেশকেই অকার্যকর করা। রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারীতা খর্ব করার যে আকাক্সক্ষা গণঅভ্যুত্থানে ঘোষিত হয়েছিল- এটা তার সম্পূর্ণ বিরোধী।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে গুম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করতে পারত। পাশাপাশি এসব বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত স্থান পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় নথি তলব করার ক্ষমতাও কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল। কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সরকারের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে একটি সার্চ কমিটি গঠনের বিধান করা হয়েছিল, যাতে সরকার ইচ্ছামতো তাদের নিয়োগ বা অপসারণ করতে না পারে। এমনকি চেয়ারম্যানকে অপসারণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের মতো কঠোর পদ্ধতি অনুসরণের কথাও বলা হয়েছিল, যা কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। সরকারের এর সবগুলো বিষয়েই আপত্তি। তারা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতির বিধান যুক্ত করতে চান এবং এই কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত করতে চান।
দুদক সংক্রান্ত অধ্যাদেশে দুদকে কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে সাত সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন করার বিধান করা হয়েছিল। বিধানে ছিল যে, এই বাছাই কমিটিতে অন্তত তিনজন সরকারি প্রতিনিধি থাকবেন। বিএনপি সরকার বাছাই কমিটিতে আরও বেশি সরকারি প্রতিনিধি যুক্ত করতে চায়। সাত সদস্যবিশিষ্ট সার্চ কমিটিতে তিনজনের বেশি সরকারি প্রতিনিধি থাকার অর্থ হলো, কমিটিতে সরকারি প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ করা, যাতে সরকারের পছন্দের ব্যক্তিরাই দুদকের কমিশনার হন। এতে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা সম্ভব হবে না।
৩.
যে ১৫টি অধ্যাদেশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক সংশোধনের মধ্য দিয়ে পরবর্তীতে উত্থাপন করা হবে বলা হচ্ছে, তার মধ্যে আছেÑ বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ ও পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ। গণতান্ত্রিক সংস্কারে এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিছু অধ্যাদেশ আছে যা সমালোচনামুক্ত নয়, কিন্তু আগের আইনের চেয়ে ভাল। যেমন- শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ। এই অধ্যাদেশে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়নি বা এ সম্পর্কিত কোন বাধ্যবাধকতা প্রয়োগ করা হয়নি। শ্রমিক ছাঁটাইয়ে মালিকের স্বেচ্ছাচারিতা থেকে শ্রমিকদের নিরাপত্তাও এই অধ্যাদেশ দেয়নি। কিন্তু এই অধ্যাদেশে ৫ বছরের বদলে প্রতি ৩ বছর পরপর ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিধান করা হয়েছে। ২০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার ও প্রতিষ্ঠানে ১০০ জন শ্রমিক থাকলে ভবিষ্য তহবিল গঠন বাধ্যতামূলক করার বিধান করা হয়েছে। নারী শ্রমিকের মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২০ দিন করা হয়েছে। শ্রমিকদের কালোতালিকাভুক্ত করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানপুঞ্জে ৫টি ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার দেয়া হয়েছে। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরও শ্রমিকের সংজ্ঞায় নিয়ে আসা হয়েছে।
দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও শ্রমিক-কৃষক অধ্যুষিত এই দেশে শ্রম আইন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। শ্রমিকরা অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেও বছরের পর বছর ধরে তারা অবহেলিত। কিন্তু গত ১৩ এপ্রিল শ্রম অধ্যাদেশ সংশোধন করে আইন পাশ করা হলো এবং সেটা হলো ত্রিপক্ষীয় বৈঠক ছাড়াই। এটা আইএলও সনদের গুরুতর লঙ্ঘন। শ্রম সংস্কার কমিশনের সভাপতি বলেছেন যে, সংশোধিত শ্রম আইনে মালিকদের স্বার্থই রক্ষা করা হয়েছে, তাদের আপত্তিগুলো বিবেচনায় নিয়েই সংশোধন করা হয়েছে। এতে একটি প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা ৫টি থেকে কমিয়ে ৩টি করা হয়েছে। শ্রমিকের সংজ্ঞা থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাদ দেয়া হয়েছে।
একইভাবে ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ সংশোধন করে যে আইন করা হয়েছে, তাতে শেখ হাসিনার আমলের ব্যাংক লুটপাটকারী ব্যাংক মালিকদের ওইসকল ব্যাংকে পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে। নতুন আইনের ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী, দুর্বল ও একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর আগের মালিক/পরিচালকরা মাত্র ৭.৫% অগ্রিম অর্থ জমা দিয়ে ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। বাকি অর্থ ২ বছরে ১০% সুদে পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। এটি এক কথায় দেশের অর্থ ‘লুটপাটকারীদের পুরস্কৃত করা’।
একইভাবে সংশোধন করা কবে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ যেখানে পুলিশ বিভাগের জন্য আলাদা একটি কমিশন গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে এবং তাকে পুলিশ সম্পর্কিত অভিযোগ নিষ্পত্তি করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। পুলিশের সমস্ত দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে রাখা হয়নি। এসব অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল আনার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এসব অধ্যাদেশের কোথায় কী ধরনের সংশোধনী আনা হবে, তা বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি দেখলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়- যে সংস্কার উদ্যোগগুলো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য দরকার, তার অনেকগুলো বাস্তবায়নের আগেই থেমে যাচ্ছে। এর ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নগুলো আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে। অর্থাৎ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যে অধ্যাদেশগুলো সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে সেগুলো আইনে রূপান্তরের সুপারিশ আর যেগুলো সরকারের জবাবদিহিতার জন্য জরুরি সেগুলো বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।
অর্থাৎ মুখে যা-ই বলা হোক না কেন, রাষ্ট্রের দমনের ক্ষমতাকে আরও বৃদ্ধি করা হচ্ছে। আমরা অভ্যুত্থানের আগেই আমাদের বিভিন্ন লেখায় বলেছিলাম- ফ্যাসিবাদ কোন দল আনে না, আনে শ্রেণি। আওয়ামী লীগের পতন ঘটলেই ফ্যাসিবাদের পতন ঘটবে না। কারণ সেই পুঁজিপতি-শিল্পপতি শ্রেণি রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন। আজকের যুগে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত পুঁজিপতি শ্রেণি কোনভাবেই মানুষের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তার নাগরিক অধিকার সুরক্ষা করতে পারে না। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য উন্নত, অনুন্নত, ছোট, বড় যে কোন পুঁজিবাদী দেশকেই আজ রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রকে নির্মমভাবে ব্যবহার করতে হয়, ফ্যাসিবাদী কায়দা গ্রহণ করতে হয়। আজকের যুগে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে কেউ দেশ চালাবে, অথচ জনগণকে অবাধ গণতন্ত্র চর্চা করার সুযোগ দেবে- এমন উপায় নেই। সংসদে বিরোধীদের আসনে বসে যারা আজ গণতন্ত্রের জন্য নরম চোখের জল ফেলছেন, তারাও ক্ষমতায় গেলে এই কাজই করতেন। এটাই আজকের দিনে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক পথে দেশ চালানোর পরিণতি।
