Friday, May 1, 2026
Homeফিচারসাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি: ইরানে হামলার প্রকৃত কারণ

সাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি: ইরানে হামলার প্রকৃত কারণ

ইরানের উপর বিনা উস্কানিতে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও ইসরায়েল হামলা পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে হামলা চালিয়ে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খোমেনিসহ ইরানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছে। একটি স্কুলে বোমা মেরে হত্যা করা হয়েছে ১৮০ শিশুকে। আমেরিকার লক্ষ্য ইরানে তাদের অনুগত একটি পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা। সেজন্য সে সমস্ত আন্তর্জাতিক সভ্য রীতিনীতি, জাতিসংঘ সনদ পায়ে মাড়িয়ে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ ইরানের উপর আগ্রাসন নামিয়ে এনেছে।
সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা সারাবিশ্বে আজ নতুন করে যুদ্ধ উন্মাদনা তৈরি করেছে। কিছুদিন আগে ভেনিজুয়েলার উপর নগ্ন হামলা চালিয়ে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে অপহরণ করেছে। তাদেরকে আমেরিকায় নিয়ে এসে ‘মাদক পাচারের’ মিথ্যা অভিযোগে বিচারের নাটক সাজানো হয়েছে। কিউবার উপর আগ্রাসনের ক্রমাগত হুমকি দিচ্ছে আমেরিকা। এরই ধারাবাহিকতায় ইরানের উপর হামলা করা হলো, যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বকে নতুন করে ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
কেন ইরানের উপর আমেরিকা—ইসরাইলের হামলা?
অনেকেই মনে করেন ইরান বা ফিলিস্তিনের উপর হামলা মুসলিমদের উপর পাশ্চাত্য বা খ্রিস্টান রাষ্ট্রগুলোর হামলা। যদি তাই হতো তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মুসলিম দেশগুলো আমেরিকার পক্ষে কেন? ফলে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে এই হামলার প্রকৃত কারণ উদঘাটন সম্ভব নয়। এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠন এবং তেলসম্পদ ও কৌশলগত রুটের উপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ।
মধ্যপ্রাচ্যকে বলা যায় পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার জ্বালানি হৃদপিণ্ড। বিশ্বের বৃহৎ তেল ও গ্যাস মজুদের উল্লেখযোগ্য অংশ এই অঞ্চলে অবস্থিত। শিল্পায়িত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি, সামরিক শক্তি এবং প্রযুক্তিগত আধিপত্য এই জ্বালানি প্রবাহের উপর নির্ভরশীল। ফলে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণ মানে বিশ্ব অর্থনীতির উপর প্রভাব বিস্তার।
এই বাস্তবতার কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অঞ্চলটি ক্রমাগত সামরিক হস্তক্ষেপ, অভ্যুত্থান, প্রক্সি যুদ্ধের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। ইরান সেই ভূরাজনৈতিক দাবা খেলায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি। পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালী এবং আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যে ইরানের অবস্থান এমন যে, তাকে নিয়ন্ত্রণ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
১৯৫৩ থেকে বর্তমান: হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতা
ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান সামরিক আগ্রাসনের প্রকৃত চরিত্র বুঝতে হলে ইতিহাসের গভীরে ফিরে যেতে হবে। বিশেষ করে তাকাতে হবে ১৯৫৩ সালের সেই ঘটনাটির দিকে, যা শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না- বরং ছিল মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের আধুনিক মডেলের সূচনা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইরান ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র, কিন্তু বাস্তবে তার অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিল পশ্চিমা কর্পোরেট শক্তির হাতে। বিশেষ করে ইরানের তেলসম্পদ প্রায় সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো ব্রিটিশ মালিকানাধীন Anglo-Iranian Oil Company এর মাধ্যমে, যা পরবর্তীতে BP নামে পরিচিত হয়। ইরানের মাটির নিচের বিপুল সম্পদ থেকে যে মুনাফা অর্জিত হতো, তার সামান্য অংশই ইরানের জনগণের কাছে পৌঁছাত। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে ইরানে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে। ১৯৫১ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সেটি হলো- ইরানের তেলশিল্প জাতীয়করণ।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত পশ্চিমা শক্তির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে সরাসরি আঘাত হানে। ব্রিটেন প্রথমে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে, ইরানি তেল বয়কট শুরু করে এবং আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে। যখন এসব পদক্ষেপেও মোসাদ্দেককে নত করা সম্ভব হয়নি, তখন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেওয়া হয়। ১৯৫৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এম-সিক্সটিন যৌথভাবে পরিচালনা করে কুখ্যাত ‘Operation Ajax’। এই অভিযানের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে গণঅস্থিরতা সৃষ্টি, মিডিয়া প্রভাবিত করা, সামরিক কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়া এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করে মোসাদ্দেক সরকারকে উৎখাত করা হয়।
মোসাদ্দেককে হটিয়ে ক্ষমতায় পুনর্বহাল করা হয় শাহ মোহাম্মদ রেজা পাভলভিকে, যিনি পশ্চিমা শক্তির ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হন। শাহের শাসনামলে ইরান দ্রুত সামরিকীকরণ ঘটায় ও পশ্চিমা পুঁজির জন্য উন্মুক্ত অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু এই আধুনিকায়নের আড়ালে গড়ে ওঠে কঠোর দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। বিরোধী মত দমনে কুখ্যাত গোপন পুলিশ SAVAK গঠন করা হয়- যা হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীর উপর নির্যাতন চালায়। এই পর্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে একটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে- পশ্চিমা শক্তির কাছে গণতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ছিল না; গুরুত্বপূর্ণ ছিল অনুগত শাসক এবং সম্পদের নিরাপদ প্রবাহ। একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রকে সমর্থন দেওয়াই সেই বাস্তবতার প্রমাণ।
এই দীর্ঘ দমননীতি এবং বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের জন্ম দেয়। শাহের পতন ঘটে।
শাহের পতনের পর কথিত ইসলামী বিপ্লবের নামে শাহের পতনের আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকারী কমিউনিস্টদের উপর ব্যাপক দমন-পীড়ন, হত্যাযজ্ঞ শুরু করে নতুন সরকার। পরবর্তী সময়ে ইরান পশ্চিমা আধিপত্য থেকে বেরিয়ে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করলে তাকে দ্রুত ‘শত্রু রাষ্ট্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং আঞ্চলিক চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকে। পরবর্তী চার দশকে ইরানের বিরুদ্ধে নীতি প্রায় একই থেকেছে। অর্থনৈতিক অবরোধ, প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা, সাইবার হামলা, গোপন সামরিক অভিযান এবং আঞ্চলিক ঘেরাও কৌশল ইত্যাদিই ছিল তাদের পররাষ্ট্রনীতি। পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি করা হয়, যদিও আন্তর্জাতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রচেষ্টা বহুবার দেখা গেছে। তবুও নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ কখনো পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়নি। এই ধারাবাহিকতা দেখায় যে সংঘাতের মূল প্রশ্ন আদর্শিক নয়; বরং ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। যে রাষ্ট্র নিজস্ব সম্পদের উপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং বৈশ্বিক শক্তির প্রভাবের বাইরে নীতি অনুসরণ করে, তাকে বারবার চাপের মুখে ফেলা হয়।
যুদ্ধ কেন হয়?
লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্ব ও যুদ্ধের অনিবার্যতা
বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের মহান নেতা লেনিন দেখিয়েছেন, পুঁজিবাদ তার বিকাশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদের জন্ম দিয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো বিশ্বজুড়ে তাদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার দখল ও ভাগবাটোয়ারাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় এবং একে কেন্দ্র করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে সাম্রাজ্যবাদ যতদিন টিকে থাকবে, ততদিন যুদ্ধের সম্ভাবনাও টিকে থাকবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বিশ্বজুড়ে বাজার সংকট আরো তীব্র হয়েছে। সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী দেশই আজ ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে। উৎপাদনের পরিমাণে ঘাটতি না থাকলেও কেনার ক্ষমতা নেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের। ফলে সংকট কাটিয়ে উঠার জন্য দেশগুলো অর্থনীতির সামরিকীকরণের পথে যাচ্ছে।  এযুগের অন্যতম মার্কসবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষ দেখিয়েছেন, “এই শিল্পের সামরিকীকরণ বলতে কি বোঝায়? শিল্পের সামরিকীকরণ বলতে বোঝায়, সরকার যেখানে নিজেই অর্ডার দেয়, আবার সেই তৈরি মাল সরকার নিজেই কেনে। উৎপাদিত মাল বিক্রির জন্য বাজারের উপর, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার উপর নির্ভর করতে হয় না। শুধু সামরিক খাতে সরকারের বাজেট বাড়তে থাকে। ফলে, মন্দা অর্থাৎ, যাকে আমরা বলি বাজার নেই, কাজকর্ম নেই, অর্ডার নেই এই সমস্যার হাত থেকে সাময়িকভাবে হলেও শিল্পগুলো বাঁচে। অবস্থাটা দাঁড়ায় এইরকম যে, সরকার নিজেই ‘প্লেন’ তৈরি করার, ‘ফাইটার’ তৈরি করার এবং নানারকম সামরিক সরঞ্জাম তৈরী করার অর্ডার দেয়, আবার ঐ তৈরি মালগুলি সরকারই কেনে। ফলে, বাজারের উপর বা লোকের ক্রয়ক্ষমতার উপর নির্ভর করতে হয় না বলে সাময়িকভাবে ‘রিসেশন’ বা বাজার-মন্দার চাপ থেকে অর্থনীতিকে কিছুটা পরিমাণে রক্ষা করা সম্ভব হয়। কিন্তু, এই পরিকল্পনার আবার একটা কন্ট্রাডিকশন বা উল্টোদিক আছে। তা হল এই যে, যত মাল বা অস্ত্রশস্ত্র তৈরি হতে থাকবে সেগুলো যদি বসে থাকে, অর্থাৎ সেগুলো যদি খালাস করা না যায়, তাহলে মাল ক্রমাগত জমতে থাকার ফলে অর্থনীতিতে বন্ধ্যাত্বের ঝোঁক (ট্যান্ডেন্সি অব স্ট্যাগনেশন)—এর জন্ম হবে এবং এর ফলে সামরিক শিল্পেও আবার লালবাতি জ্বলতে শুরু করবে। অথচ, সরকারও বিনা প্রয়োজনে ক্রমাগত এই মালগুলো কিনে গুদামজাত করতে পারে না। কাজেই এই মাল খালাস করার প্রয়োজনেই তাদের চাই স্থানীয় এবং আংশিক যুদ্ধ। এই মূল অর্থনৈতিক বুনিয়াদ থেকেই একের পর এক যে সঙ্কট সৃষ্টি করে চলেছে তার থেকেই তার বর্তমান যুদ্ধনীতির উদ্ভব হয়েছে।”
যুদ্ধ অর্থনীতি ও অস্ত্রশিল্প: সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির অদৃশ্য চালিকাশক্তি
বিশ্ব অস্ত্রবাজারের দিকে তাকালে দেখা যায়, সামরিক ব্যয় বিগত দুই দশকে নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা Stockolm International Peace Research Institute–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় প্রথমবারের মতো ২.৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ মানবসভ্যতা শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা জলবায়ু সংকট মোকাবিলার চেয়ে বহু গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করছে যুদ্ধ প্রস্তুতিতে। এই ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ একাই বহন করে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় শিল্প অর্থনীতির একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৮৭০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়- যা সেই তালিকার পরবর্তী দশটি দেশের সম্মিলিত সামরিক ব্যয়ের কাছাকাছি। এই বিপুল অর্থ সরাসরি প্রবাহিত হয় বেসরকারি অস্ত্র নির্মাতা কর্পোরেশনগুলোর কাছে। বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে আছে মার্কিন কোম্পানিগুলো, যেমন-Lockheed Martin, Raytheon Technologies, Northrop Grumman, Boeing, General Dynamics!
শুধু Lockheed Martin একাই বছরে ৬৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করে। তাদের তৈরি F-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অস্ত্র প্রকল্প, যার মোট ব্যয় ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
যখন কোনো অঞ্চলে সংঘাত শুরু হয়, তখন অস্ত্রের চাহিদা হঠাৎ বৃদ্ধি পায়। মধ্যপ্রাচ্য এই বাজারের সবচেয়ে বড় ক্রেতা অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং ইসরায়েল- সবাই যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ অস্ত্র ক্রেতা। SIPRI-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব অস্ত্র রপ্তানির প্রায় ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তরাষ্ট্র। এর বড় অংশ যায় মধ্যপ্রাচ্যে। অর্থাৎ আঞ্চলিক উত্তেজনা যত বাড়ে, অস্ত্র বিক্রিও তত বৃদ্ধি পায়। এই বাস্তবতায় যুদ্ধ কখনো সম্পূর্ণভাবে সমাধান হয়ে গেলে অস্ত্রবাজার সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে স্থায়ী শান্তির পরিবর্তে ‘নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতা’ অনেক সময় অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভজনক হয়ে ওঠে।
ইরানে আমেরিকার হামলা কী ‘গণতন্ত্র’ আনবে?
ইরানের জনগণের মুক্তি, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কিংবা স্বৈরাচারের অবসান- এই সব শব্দগুচ্ছ সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত  প্রচারযন্ত্রে যতটা উচ্চারিত হয়, বাস্তবতা তা নয়।  ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাম্রাজ্যবাদ কখনো জনগণের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করে না; বরং জনগণের উপর তার অনুগত শাসন কাঠামো চাপিয়ে দেয়।
ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া কিংবা সিরিয়াসহ প্রায় প্রতিটি দেশে আক্রমণের সময়  একই নৈতিক ভাষা ব্যবহার করেছে।। প্রতিবারই বলা হয়েছে জনগণকে মুক্ত করা হবে, স্বৈরাচার দূর হবে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাস্তব ফলাফল কী? রাষ্ট্র ভেঙে পড়েছে, গৃহযুদ্ধ বিস্তার লাভ করেছে, উগ্রবাদী শক্তির উত্থান ঘটেছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে সৃষ্টি হয়েছে অস্থিতিশীলতা, যা বহিরাগত শক্তির দীর্ঘমেয়াদী সামরিক উপস্থিতিকে বৈধতা দিয়েছে। ইরানের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে। অথচ একটি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের অধিকার সেই দেশের জনগণেরই। আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের মৌলিক নীতিই এটি স্বীকার করে।
প্রতিরোধের প্রশ্ন: জনগণের মুক্তি কার হাতে?
ইরানে প্রবল ধমীর্য় প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিবাদী শাসন চালু আছে। জনগণের মধ্যে তার বিরুদ্ধে ক্ষোভও আছে। তাই বলে আমেরিকার আগ্রাসন সমর্থন করা যায় না। ইরানের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, দমননীতি- এসব প্রশ্ন ইরানের জনগণ নিজেরাই তুলছে এবং তার বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রাম চলমান। যারা একইসাথে ইরানের সরকারের ও আমেরিকার আগ্রাসনের বিরোধিতা করছে, বামপন্থী সেই শক্তিগুলোর উপর আমেরিকা হামলা করছে। একটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল সেই দেশের জনগণেরই। ইতিহাস দেখিয়েছে, বিদেশি আগ্রাসন কখনো জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে শক্তিশালী করে না; বরং রাষ্ট্রীয় দমনকে বৈধতা দেয় এবং জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধকে উসকে দেয়। বাহ্যিক হামলা জনগণের স্বাধীন সংগ্রামকে দুর্বল করে, কারণ তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিজেকে জাতীয় প্রতিরক্ষার নামে আরও কেন্দ্রীভূত করতে পারে।
লেনিনের সতর্কবাণী আজও প্রাসঙ্গিক- যতদিন সাম্রাজ্যবাদ থাকবে, ততদিন যুদ্ধের সম্ভাবনা থাকবে। এই বাস্তবতায় বিশ্বের শান্তিকামী জনগণের সামনে প্রশ্ন দাঁড়ায়- যুদ্ধ কি অনিবার্য নিয়তি, নাকি সংগঠিত প্রতিরোধের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব? ইতিহাস দেখায়, ভিয়েতনাম থেকে লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত জনগণের প্রতিরোধ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। আন্তর্জাতিক সংহতি, গণআন্দোলন এবং রাজনৈতিক সচেতনতা যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। সেই লক্ষ্যে বিশ্বের শ্রমজীবী, শান্তিকামী ও গণতন্ত্রপ্রত্যাশী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
RELATED ARTICLES

আরও

Recent Comments