Monday, December 8, 2025
Homeফিচারখসড়া জুলাই সনদ প্রসঙ্গে ‘বাসদ (মার্কসবাদী)’-এর বক্তব্য

খসড়া জুলাই সনদ প্রসঙ্গে ‘বাসদ (মার্কসবাদী)’-এর বক্তব্য

(জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা শেষে খসড়া জুলাই সনদ আমাদের দলকে পাঠানো হয়েছে। এই খসড়া সনদের বিষয়ে আমাদের বক্তব্য চিঠি আকারে আমরা ঐকমত্য কমিশনকে পাঠিয়েছি। এই চিঠিটি সামান্য সম্পাদনা করে আমরা জনগণের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করছি।)

‘জাতীয় জুলাই সনদ ২০২৫’-এর ‘পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত খসড়া (সংশোধিত)’ আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। আমরা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সক্রিয় অংশীদার। এই লড়াইয়ে আমরা যেমন প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছি, তেমনি গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে যখন যে বিষয়ে মতামত প্রদানের জন্য রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, সে বিষয়ে সরকার, বিভিন্ন কমিশন ও জনগণের কাছে আমাদের মতামত ব্যক্ত করেছি। জুলাই ঘোষণা, সংস্কার কমিশনগুলোর প্রতিবেদন, ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবনা- এই সকল বিষয়ে আমরা আমাদের লিখিত বক্তব্য রেখেছি। ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনায় আমাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা জুলাই সনদেও স্বাক্ষর করতে চাই।

কিন্তু খসড়া জুলাই সনদ সম্পর্কে আমাদের কিছু বক্তব্য আছে। এই সনদে প্রায় ৮৪টি পয়েন্ট তুলে ধরা হয়েছে এবং সনদের বিভিন্ন স্থানে অনেকবার সর্বসম্মত কথাটা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা ৮৪টি পয়েন্ট নিয়ে হয়নি। সনদেই বলা আছে, সে সময় আলোচনা হয়েছে ২০টি পয়েন্ট নিয়ে। সনদে যে ৮৪টি পয়েন্ট উল্লেখ করা হয়েছে, এর বেশিরভাগ পয়েন্টেই ঐকমত্য নেই। ফলে এই ৮৪টি পয়েন্ট সর্বসম্মত সনদ নয়। এমনকি ২০টি পয়েন্টেরও বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই ঐকমত্য হয়নি।

দ্বিতীয়ত, পুরো সনদ নিজেই স্বাক্ষ্য দেয় যে এটা সর্বসম্মতভাবে প্রণীত হয় নাই। যে সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মত ছিল, সেগুলো নিয়ে সনদ ঘোষিত হলে একে সর্বসম্মত বলা যেত। একই কারণে অঙ্গীকারনামা অধ্যায়ে লিখিত, “…এই সনদের সকল বিধান, নীতি ও সিদ্ধান্ত সংবিধানে অন্তর্ভুক্তকরণ নিশ্চিত করবো…”- এই বলে যে অঙ্গীকারনামা দেয়া হয়েছে, তাতে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলেরই স্বাক্ষর করা সম্ভব নয়। কারণ অনেকগুলোতেই তারা একমত হননি, অনেক পয়েন্টে নোট অব ডিসেন্ট দেয়া হয়েছে, অনেক বিষয়ে ওয়াক আউটও করেছেন অনেক দল। ফলে এটা একটা ঐক্যমতের সনদ হিসেবে দাঁড়ায়নি, ৮৪টি সংস্কারের পয়েন্টে কার কী অবস্থান সেটাই এখানে তুলে ধরা হয়েছে। এটা সনদ নয়, বরং এটাকে একটা প্রতিবেদন বলা যায়।

পয়েন্টগুলোতে কয়টি দল একমত, কয়টি দল দ্বিমত, কার নোট অব ডিসেন্ট- সেটাই শুধু তুলে ধরা হয়েছে। যারা দ্বিমত তাদের যুক্তি কী- সেগুলো তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল। কারণ সম্পূর্ণ দুই বিপরীত জায়গা থেকে দুইটি দল একই পয়েন্টে দ্বিমত করতে পারে, এমনকি নোট অব ডিসেন্টও দিতে পারে। জনগণের কাছে প্রকৃত যুক্তিগুলো আসা উচিত বলে আমরা মনে করি।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আলোচনার সময় জুলাই সনদের সাথে একটি পরিশিষ্ট (appendix) প্রকাশ করার কথা হয়েছিল যেখানে এই যুক্তিগুলো বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। আমাদের মনে হয়, এটি প্রকাশ করা উচিত।

 পটভূমি প্রসঙ্গে

শুরুতে পটভূমির বর্ণনায় যে বক্তব্যটি তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে উপস্থাপিত ইতিহাসের ব্যাপারে আমরা একমত নই। এর আগে সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে আলোচনার সময়েও এই বিষয়টি আমরা তুলে ধরেছিলাম। বর্তমান খসড়ায়ও আমরা একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখলাম। পটভূমিতে অংশে লেখা হয়েছে, “…১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বর্ণিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের নীতিকে ধারণ করে সংঘটিত মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, দীর্ঘ ৫৩ বছরেও তা অর্জন করা যায়নি।”

এখানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বর্ণিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের নীতিকে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে অর্থাৎ এগুলোই মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা বা আকাঙ্ক্ষা- এইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুধু এই নীতিগুলো নয়, আরও অনেকগুলো নীতি, যা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যক্ত হয়েছে- সেই সবগুলো নীতিকেই ধারণ করে সংঘটিত হয়েছে। এই জনপদের মানুষের সংগ্রামের মধ্যে সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষা ছিল। সে সবকিছুই মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি ছিল। পাকিস্তান সৃষ্টি থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়- এই ২৩ বছরের লড়াই সেই স্বাক্ষ্যই দেয়।

এই ২৩ বছরের লড়াইয়ের বড় বড় মাইলফলকগুলোর কোন উল্লেখ আমরা পূর্বেও জুলাই ঘোষণা, সংবিধান সংস্কার কমিশনের রিপোর্টে পাইনি। এবারেও পেলাম না। বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, সায়ত্ত্বশাসনের দাবির ভিত্তিতে ছেষট্টির ছয়দফা আন্দোলন, সায়ত্ত্বশাসন ও কৃষক-শ্রমিকদের মুক্তির ১১ দফা দাবিতে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের গণপরিষদ নির্বাচন- এগুলো ছিল পাকিস্তানের প্রায়উপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ও নতুন জাতি হিসেবে নিজেদের আত্মপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ছিল এই গণআন্দোলনগুলোরই স্বাভাবিক পরিণতি। ইতিহাস থেকে এই অধ্যায়গুলো বাদ দেয়ার অর্থ হলো ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানো এবং বাংলাদেশের জাতি গঠনের ইতিহাসকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা। আবার এই সংগ্রামের মধ্যেই গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, শোষণমুক্তি, সমাজতন্ত্র- এই কথাগুলো মওলানা ভাসানীসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজনীতিবিদ, লেখক, শিল্পী, নির্মাতা, বুদ্ধিজীবীরা জনগণের মধ্যে নিয়ে আসেন এবং এর পক্ষে একটি গণআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়।

যেহেতু খসড়া জুলাই সনদে অতীত ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বর্তমানকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, ফলে অতীত ইতিহাসের সঠিক ও নির্মোহ উপস্থাপন খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু আমরা এক্ষেত্রে ঘাটতি লক্ষ করছি।

চার মূলনীতি

চার মূলনীতি প্রশ্নে যখন সিদ্ধান্ত হয়, তখন আমরাসহ চারটি দল ঐকমত্য কমিশনের সভা বয়কট করেছিলাম। আমরা বলেছিলাম, এ বিষয়ে কোন সমঝোতা হয় না, এটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। এই বিষয়টি বাদ দিয়ে আপনারা আলোচনা করুন। আমাদের এই বক্তব্য রেকর্ড করার জন্যও আমরা বলেছিলাম। আমরা কমিশনের প্রস্তাবনাগুলোকে (সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি) বিদ্যমান মূলনীতিগুলোর সাথে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কমিশন চেয়েছিলেন, তাদের প্রস্তাবিত মূলনীতিগুলো পরবর্তীতে সংস্কার বা সংশোধন করা সংবিধানের মূলনীতি অংশে অবশ্যই উল্লেখ থাকবে- এই মর্মে যাতে আমরা একমত হই। কমিশনের বক্তব্য ছিল- বিদ্যমান সংবিধানের চার মূলনীতি রাখা কিংবা না রাখার ব্যাপারে কোন আলোচনা ঐকমত্য কমিশন করবে না, পরবর্তী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসা জনপ্রতিনিধিরা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।  সনদে বিষয়টি সেভাবে আসেনি।

কমিশনে অনেকে আলোচনা করেছেন যে, চারটি মূলনীতি মুজিববাদ, সুতরাং একে বাদ দিতে হবে। আমরা যুক্তি করেছি যে, বাহাত্তরের সংবিধানের তিনটি মূলনীতি অর্থাৎ গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র কখনই শেখ মুজিবর রহমান কিংবা আওয়ামী লীগের সম্পত্তি ছিল না। মহান মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে এই ভূ-খণ্ডের বহু বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী এই ধারণাগুলো ব্যাখ্যা করেছেন। মওলানা ভাসানী প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন এই দেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সর্বাধিক জনপ্রিয় নেতা। ১৯৭২ সালের ১৪ এপ্রিল টাঙ্গাইলের সন্তোষে ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক থেকে সংবিধানে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র ধারণাগুলি যুক্ত করার জোর দাবি জানানো হয়েছে।

এটাও উল্লেখ করা জরুরী যে, বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়নের পরপরই চারটি সংশোধনী এনে ১৯৭৫ এর মধ্যেই শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ তাদেরই প্রণীত সংবিধানকে বাস্তবে অকার্যকর করে দেন। জরুরী অবস্থা জারি করে, সমস্ত রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে, সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ও স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপের দ্বারা বাকশাল গঠন করেন এবং জনগণের উপর চূড়ান্ত অত্যাচার নামিয়ে আনে। এরপর থেকে যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে তারাই সংবিধানে একের পর এক সংশোধনী এনেছে, মোট ১৭টি সংশোধনীর মধ্য দিয়ে গত ৫৪ বছর ধরে শাসকগোষ্ঠী সংবিধানকে জনগণের উপর নিপীড়নের কাজে লাগিয়েছে।

আরেকটি আলোচনায় এসেছে যে, এই চার মূলনীতি হলো ফ্যাসিবাদের উৎস। ফ্যাসিবাদ প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্য পুস্তিকাকারে আমরা ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশ করেছি। সেখানে আমরা দেখিয়েছি যে, ফ্যাসিবাদ কোন দল কিংবা সংবিধানের মূলনীতি আনে না। দেশের অর্থনীতি গুটিকয়েক বৃহৎ ব্যবসায়ী শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত হলে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সেটাই একটা কেন্দ্রীভূত শাসনকাঠামো সৃষ্টি করে। অর্থনৈতিক ভিত্তির সাথে রাজনৈতিক উপরিকাঠামোর সম্পর্ক না বুঝতে পারলে, কখনও মুজিববাদ, কখনও আওয়ামী লীগ, কখনও সংবিধান, কখনও আমলাতন্ত্রকে ফ্যাসিবাদের উৎস মনে হবে। এ দিয়ে ফ্যাসিবাদ মোকাবেলা করা যাবে না।

ঐকমত্য কমিশন বরাবর পূর্বে লিখিত চিঠিতে আমরা এও বলেছিলাম যে, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তরপর্বে কী ছোট, কী বড়, কী উন্নত, কী অনুন্নত- সকল পুঁজিবাদী দেশেই ফ্যাসিবাদ শিকড় গেড়েছে। ফ্যাসিবাদের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি অর্থাৎ পুঁজির ক্রমাগত কেন্দ্রীকরণ, প্রশাসনে ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীকতা ও কঠোরতা এবং বিজ্ঞানের কারিগরি দিকের সাথে আধ্যাত্ম্যবাদের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সাংস্কৃতিক যন্ত্রীকরণের চেষ্টা- এগুলিকে হাতিয়ার করে সকল পুঁজিবাদী দেশের শাসকশ্রেণি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো, প্রতিষ্ঠান ও মূল্যবোধ ধ্বংস করতে চেয়েছে। ফ্যাসিবাদকে হাতিয়ার না করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দ্বারা জনজীবনের জ্বলন্ত সমস্যার সমাধান করা তার পক্ষে অসম্ভব। ফলে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ ঐক্যবদ্ধ জনগণের সচেতন, সংগ্রামী, দীর্ঘস্থায়ী লড়াই ব্যতিরেকে সম্ভব নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গণআন্দোলনের যে হাতিয়ারগুলি তৈরি হয়েছিল, পুঁজিবাদী শাসন যদি সেইগুলোকে বিকল করে দেয় এবং জনগণের ঐক্য বিনষ্ট করতে সক্ষম হয়, তবে বাংলাদেশে অন্য কোন শক্তির মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ কায়েম হবে। ইতিহাস এর স্বাক্ষী।”

আমরা আলোচনার ক্ষেত্রে যে নীতি নিয়ে চলছিলাম সেটা হলো, কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্নে অবস্থিত পরিস্থিতি থেকে যদি খানিকটা উন্নতিও ঘটে- তাহলে সেই প্রস্তাবে আমরা একমত হয়েছি। কিন্তু এ প্রসঙ্গে আমাদের প্রস্তাব কী, কী করা উচিত বলে আমরা মনে করি- সেটাও আমরা রেখেছি। মূলনীতিগত প্রশ্নে আমরা যেহেতু কোন আপোষ করতে পারব না, ফলে সেক্ষেত্রে আমরা আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি।

জরুরি অবস্থা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

উল্লেখিত বিষয়গুলোর মধ্যে ৬ নং পয়েন্টে উল্লেখিত জরুরি অবস্থা ঘোষণার ব্যাপারে আমাদের দ্বিমত ছিল। আমরা এই প্রশ্নে কমিশনের সাথে একমত হইনি। সে সময় নোট অব ডিসেন্টের আলোচনা আসেনি বলে নোট অব ডিসেন্ট আমরা দেইনি। গণতান্ত্রিক সংবিধানে এই ধরনের বিধান থাকা উচিত নয়। প্রাকৃতিক বা মানবিক কোন সংকটের কালে জরুরি সেবাগুলোকে সচল ও কেন্দ্রীভূত করার জন্য ওই নির্দিষ্ট এলাকায় কিছু বিশেষ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেটা সরকার তার নির্বাহী ক্ষমতাবলেই নিতে পারে। বাস্তবে জরুরি মানবিক প্রয়োজনের কথা বলে জরুরি অবস্থাকে যুক্তিসঙ্গত করা হয়, কিন্তু এই প্রয়োজনে কখনও জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়নি। বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত বিধান রাজনৈতিক সংকটের সময়ে রাষ্ট্রের কাছে জনগণকে নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বারবার। বাহাত্তরের সংবিধানেও জরুরি অবস্থার বিধান ছিল না, শেখ মুজিব প্রথম সংশোধনীর মধ্য দিয়ে এটি যুক্ত করেন। এটি ছিল সংবিধানের প্রথম কালিমালিপ্ত সংশোধনী। এত সংস্কার ও গণতন্ত্রের কথা বলার পর এই জরুরি অবস্থার বিধান রাখাটা আমাদের ঠিক মনে হয় না।

২৪ নং পয়েন্টে জাতীয় সংসদে নারী আসনের বিধানের বিষয়ে প্রস্তাবনায় আমরা নিম্নকক্ষের ১০০ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা ও সেখানে সরাসরি নির্বাচনের কথা আমরা বলেছি। পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধতা ও তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে এই সিদ্ধান্ত হয় যে, পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে প্রতিটি দল ন্যূনতম ৫% নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবেন এবং পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে বাড়াতে থাকবেন যতক্ষণ না তা ৩৩% এ উন্নীত হবে। এটা সর্বসম্মত মতও ছিল না। এই বিষয়টা নিয়ে পরবর্তীতে কোন প্রশ্ন তোলা যাবে না- সেরকম কিছু্ও আলোচিত হয়নি।

৪৯ নং পয়েন্টে আদালত প্রাঙ্গনে দলীয় কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তের সাথেও আমরা একমত নই। আমরা মনে করি, এটি গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করবে এবং আদালতে সরকারী দলের নিয়ন্ত্রণই প্রতিষ্ঠা করবে।

জনপ্রশাসনের প্রস্তাবনাগুলো নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় পর্যায়ের সভাগুলোতে কোন আলোচনা হয়নি। প্রথম পর্যায়ের লিখিত বক্তব্য ও স্প্রেডশিটের উপর ভিত্তি করে সনদে এই প্রস্তাবনাগুলো রাখা হয়েছে। ৬৩ নং পয়েন্টে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় রাজনৈতিক দলগুলোকে আনার ব্যাপারে আমরা আপত্তি তুলেছিলাম। আমরা বলেছিলাম, এই আইন সরকারি ও সায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, রাজনৈতিক দলের মতো কাঠামোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে নজরদারির জন্য নির্বাচন কমিশনের নানা আইন ও বাধ্যবাধকতা আছে। তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা মানে বিরোধী দলগুলোর উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রকে আরও বাড়িয়ে তোলা।

৬৪ নং পয়েন্টে উল্লেখিত অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট আমরা বাতিল করার কথা বলেছিলাম। কারণ এই আইনের সুযোগ নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের যাবতীয় দুর্নীতি গোপন করে ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বাধা সৃষ্টি করে।

৬৫ নং পয়েন্টে উল্লেখিত কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুইটি বিভাগ সৃষ্টিকেও আমরা অপ্রয়োজনীয় বলে মত দিয়েছিলাম।

অঙ্গীকারনামা প্রসঙ্গে    

আমরা আগেই বলেছি, এতগুলো পয়েন্টের ভিত্তিতে এতবড় প্রতিবেদন তৈরি না করে সর্বসম্মত ঐক্যের পয়েন্টগুলোর ভিত্তিতে সনদ রচনা করলে সেটি বাস্তবসম্মত হতো। বর্তমান সনদে লিখিত অঙ্গীকারগুলোর কার্যকরিতা থাকবে না, কারণ কেউই সব বিষয়ে একমত নন। ফলে ‘…এই সনদের সকল বিধান, নীতি ও সিদ্ধান্ত সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার…’ অঙ্গীকারের কোন মূল্য এই পরিস্থিতিতে থাকে না।

দ্বিতীয়ত, অঙ্গীকারের ২ নং পয়েন্টে বলা হয়েছে- ‘জনগণের অভিপ্রায় প্রতিফলিত ও প্রতিষ্ঠিত হয় রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে’- এই কথাটা আংশিক সত্য। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য দিয়ে জনগণের অভিপ্রায় প্রতিফলিত হয়,  কিন্তু সুনির্দষ্টভাবে এই অভিপ্রায় প্রতিষ্ঠিত হয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থায়, প্রচলিত গণতান্ত্রিক কাঠামোতে জনগণের অভিপ্রায়কে পরিমাপ করার এর চেয়ে ভাল কোন পদ্ধতির সন্ধান তারা আজও দিতে পারেননি। ফলে এই ধরনের এপ্রোচ সঠিক নয়।

অঙ্গীকারনামার ৩ ও ৪ নং অনুচ্ছেদ আমাদের পরস্পরবিরোধী মনে হয়েছে। ৩ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “এই সনদের বিধান, প্রস্তাব বা সুপারিশের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত যে কোনো প্রশ্নের চূড়ান্ত মীমাংসার এখতিয়ার বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের উপর ন্যস্ত থাকবে।”

আবার ৪ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “…এর প্রতিটি বিধান, প্রস্তাব ও সুপারিশ সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে বলবৎ হিসেবে গণ্য হবে বিধায় এর বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা কিংবা জারির কর্তৃত্ব সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না।”

আমাদের প্রশ্ন হলো, কোনো প্রস্তাব বা সুপারিশের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যদি আদালতে প্রশ্নই তোলা না যায়, তাহলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কীভাবে এর ব্যাখ্যা দেবে? কীভাবে তার কাছে এর ব্যাখ্যা সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো পৌঁছাবে যাতে সে এর মীমাংসা করতে পারে? এই বিষয়টি সম্পর্কে কমিশনের ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করছি। এ ছাড়াও জুলাই সনদ সম্পর্কে আদালতে প্রশ্ন করা যাবে না- এই প্রস্তাবকে আমাদের গণতান্ত্রিক মনে হয়নি। আবার সকল ক্ষেত্রে (সমস্ত আইন ও সংবিধান) এ সনদের অগ্রাধিকারের কথা যে ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে, সেটাও খুব বিবেচনাপ্রসূত হয়নি বলে আমাদের মনে হয়। এই সনদ কার্যকর করার পথ নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু একে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দলিল হিসেবে ঘোষণা করাটা ভাল উদাহরণ হয় না।

৬টি কমিশনের বাইরেও শ্রম, নারী ও স্বাস্থ্য্ সম্পর্কিত সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনাগুলো এই সনদে যুক্ত করার প্রস্তাব আমরা করছি- কমিশন এই বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারেন। শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনাগুলোতে শ্রমিক সংগঠন ও মালিকপক্ষের সম্মতিও আছে। ফলে এগুলো নির্বাহী আদেশে সেগুলো বাস্তবায়ন করা যায়।

আমাদের প্রস্তাব হলো, সর্বসম্মতভাবে ঐকমত্য হওয়া পয়েন্টগুলোকে ভিত্তি করে জুলাই সনদ রচনা করা হউক। তাহলে সেগুলোর ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর একটা কমিটমেন্ট থাকবে। একইসাথে ঐকমত্য কমিশনের সম্পূর্ণ কর্মকাণ্ড অর্থাৎ প্রথম দফায় ৩৫টি দল ও জোটের লিখিত বক্তব্য, ৩২টি দলের সাথে মত বিনিময় এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩০টি দল ও জোটের সাথে আলাপ-আলোচনার সার-সংক্ষেপ তৈরি করা হউক। সেখানে বিভিন্ন দল ও জোটের অবস্থান স্পষ্টভাবে উঠে আসবে। এটা ইতিহাসের দলিল এবং একইসাথে সহস্রাধিক প্রাণের বিনিময়ে সংঘটিত এই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার সম্পর্কিত চিন্তার একটা ধারণা আমরা এর মধ্য দিয়ে ‍পাব।

পরিশেষে আমরা বলতে চাই যে, সনদের এই ত্রুটিগুলো শুধরে নিলে আমরা এই সনদে স্বাক্ষর করতে আগ্রহী। রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে আমরা কথা বলে আসছি। তবে সাথে সাথে এটাও আমরা মনে করি যে, এই সনদ ও এই সংস্কার দিয়ে রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী নিপীড়ন কিংবা ধনী-গরিবের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা সম্ভব হবে না, এটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিধিটাকে একটু বাড়াতে সাহায্য করবে মাত্র। প্রকৃত মুক্তি কেবল ব্যবস্থা পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই আসতে পারে।

 

RELATED ARTICLES

আরও

Recent Comments