শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, ফ্যাসিবাদের বিলোপ ও বৈষম্যহীন সমাজের জন্য চাই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাসদ (মার্কসবাদী) মনোনীত প্রার্থীদের কাঁচি মার্কায় ভোট দিয়ে গণ-আন্দোলনের শক্তিকে বিকশিত করুন
সংগ্রামী দেশবাসী,
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাদের দল বাসদ (মার্কসবাদী) কাঁচি প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। এই সময়ে বিভিন্ন দল আপনাদের কাছে ভোট চাইতে আসছে এবং তাদের বক্তব্য তুলে ধরছে। আমরাও দলের পক্ষ থেকে আমাদের রাজনৈতিক বক্তব্য আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই।
• বাসদ (মার্কসবাদী) কোন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়—
মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, “রাজনীতি হলো একটি মহৎ কর্মপ্রয়াস যার লক্ষ্য সমাজ হতে অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ ও নির্যাতনের অবসান ঘটানো।” পাকিস্তান পর্বে প্রায় উপনিবেশবিরোধী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে জাতি গঠনের বিরাট সংগ্রামে আপোষহীন নেতৃত্বে ছিলেন মওলানা ভাসানী। তিনি প্রথম প্রকাশ্য জনসভায় স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ভাসানী প্রকৃত অর্থেই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, বামপন্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও বামপন্থীদের বন্ধু। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংবিধান রচনার সমালোচনার পাশাপাশি তিনি গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে সংবিধানে যুক্ত করার ব্যাপারে জোর দাবি জানিয়েছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে শাসকগোষ্ঠীর রাজনীতি ছিল ভাসানীর এই চিন্তার বিরুদ্ধ। অথচ ভাসানীর আপোষহীন নেতৃত্বের কারণেই এ দেশের জাতি গঠনের আন্দোলন চূড়ান্ত জায়গায় যেতে পেরেছিল। তিনি বলেছিলেন, “রাজনীতির কেন্দ্রে থাকবে মানুষ।” আমরা মওলানা ভাসানীর এই উত্তরাধিকার বহন করে জনগণের জ্বলন্ত সমস্যাগুলোকে নিয়ে আন্দোলন করি। যে কোনভাবেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভোট জোগাড়, সিট বাড়ানো, সিট সংখ্যা বাড়াতে যেকোনো দলের সাথে ঐক্য এই ধরনের নীতিহীন সুবিধাবাদী রাজনীতির চর্চা একটা যথার্থ মার্কসবাদী দল হিসেবে আমরা কখনও করিনি। আমরা মনে করি, সমাজবিপ্লবের মধ্য দিয়ে বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই একমাত্র এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব। জনগণের সামনে নির্বাচন সম্পর্কে এই সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা ও সংসদের অভ্যন্তরে শোষিত জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি উত্থাপন ও প্রতিবাদ ধ্বনিত করার জন্য আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। একইসাথে সংসদের বাইরে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের সংগ্রাম ও গণআন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য নির্বাচনে লড়ি।
* সকল শাসকগোষ্ঠীই বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা করেছে—
আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত কৃতিত্ব তাদের দল ও শেখ মুজিবের বলে প্রচার করেছে। ভাসানীর ঐতিহাসিক সংগ্রামকে আড়াল করেছে। বিগত সময়ে বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া সকল দলই একই কাজ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং স্বাধীনতার লাভের পরও আওয়ামী লীগ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল শক্তিকে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করলো না, গণপরিষদ নির্বাচন না করেই সংবিধান প্রণয়ন করলো এবং সর্বোপরি স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচনে রিগিং করলো যে নির্বাচনে বিজয় তার নিশ্চিত ছিল। এরপর নিজেদের প্রণয়ন করা সংবিধান নিজেরাই সংশোধন করে এর মধ্যে গণতন্ত্রের যতটুকু চিহ্ন ছিল-সেটাও মুছে দিতে তৎপর হলো। সর্বশেষ চতুর্থ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে সকল দলকে বিলুপ্ত করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা ‘বাকশাল’ কায়েম করলো। এটা খুবই দুঃখজনক যে, এসময় একটি প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি না থাকায় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়নি। এরপরে যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারাই এই ব্যবস্থা বহাল রেখে, শোষণ-নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে। এই পটভূমিতেই আওয়ামী লীগের চরম ফ্যাসিবাদী শাসনের আবির্ভাব যার বিরুদ্ধে সংঘটিত হলো ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান।
* জুলাই অভ্যুত্থানের তাৎপর্য ও ফ্যাসিবাদ প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্য—
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রাষ্ট্রের প্রায় সকল প্রতিষ্ঠান অকার্যকর ও পঙ্গু হয়ে পড়েছিল। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর হাতেই সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিল। লুটপাট, দুর্নীতি, বৈষম্য সীমা ছাড়িয়েছিল। এসবের বিরুদ্ধে মানুষের মনে যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল তার ফলাফল এই গণঅভ্যুত্থান। আওয়ামী লীগের গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব জাগরণ এই গণঅভ্যুত্থানে প্রায় দেড় হাজারেরও অধিক মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। আহত হয়েছেন ২৫ হাজারেরও বেশি। এদেশে কোন গণঅভ্যুত্থানকেই এত রক্তের স্রোত পাড়ি দিতে হয়নি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গণঅভ্যুত্থানে আমাদের দল সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। আমাদের দল জ্বলাই হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত প্রতিটি ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে লড়বে।
এই গণঅভ্যুত্থান থেকে ফ্যাসিবাদ ধ্বংসের স্লোগান উঠেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের পতন মানেই ফ্যাসিবাদের পতন নয়। ফ্যাসিবাদ কোন দল আনে না, ফ্যাসিবাদ আনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে উন্নত কিংবা অনুন্নত সকল দেশেই ফ্যাসিবাদী প্রবণতা দেখা যায়। একদলীয় বা দ্বি-দলীয় এমন কি সামরিক শাসনের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ কায়েম হতে পারে। দুনিয়ার দেশে দেশে ফ্যাসিবাদ গণতন্ত্রের মুখোশ পড়েই এসেছে। আজকের যুগে কোন পুঁজিবাদী দেশই জনজীবনের সমস্যার সমাধান করতে পারে না। ফলে সে জনগণের বিক্ষোভ দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে। অর্থাৎ পুঁজিবাদী রাষ্ট্র মাত্রই সে আজ কমবেশি ফ্যাসিবাদী।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়েছে, পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটায়নি ফলে গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মেহনতি-শোষিত জনগণের জীবনের কোন পরিবর্তন আসেনি। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, ধনী-গরীব বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে দারিদ্র্য গত চার বছর ধরেই বাড়ছে। যা এখনও চলমান। দেশের প্রায় ১০ ভাগ মানুষ মোট সম্পদের প্রায় ৫৯ ভাগের মালিক। বিগত সরকারগুলোর মতোই দেশের সম্পদ, সমুদ্র বন্দরের টার্মিনাল ইত্যাদি বিদেশি কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। তাদের স্বার্থে, তাদের পরামর্শেই দেশ চলছে। ফলে এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিলোপ ঘটেনি। প্রকৃতপক্ষে এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার উচ্ছেদ না ঘটিয়ে ফ্যাসিবাদের উচ্ছেদ সম্ভবও নয়। আজকের বাংলাদেশে জনগণের ঐক্যের ভিত্তিতে গণআন্দোলনের শক্তিবৃদ্ধি না হলে, ভোটের অধিকার অর্জনের জন্য জনগণ বারবার রক্ত দিলেও তা হাতছাড়া হবে।
* মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্য—
গণঅভ্যুত্থানের পর মাজার ভাঙা, বাউল গানের আসরে আক্রমণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আক্রমণ, যাকে তাকে স্বৈরাচারের দোসর তকমা দিয়ে হামলা-মামলা-গ্রেফতার এখন প্রায় প্রতিদিনের চিত্র হয়ে পড়েছে। ধর্মান্ধ-সাম্প্রদায়িক শক্তি ধর্মের অপব্যাখ্যা করে মানুষের উপর জুলুম নামিয়ে আনছে। গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন মানুষ এসব দেখে এক আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ইতিহাসের শিক্ষা প্রমাণ করে যে, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লড়াই মানেই কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা নয়। ধর্মনিরপেক্ষতা কথার যথার্থ অর্থ হচ্ছে রাজনীতি, রাষ্ট্র, শিক্ষা, আইন, কানুন ইত্যাদির সাথে ধর্মের সম্পর্ক থাকবে না। ধর্ম পালনের অধিকার মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। ইউরোপের নবজাগরণ থেকে আসা এই চিন্তা আমাদের দেশ এবং উপমহাদেশে চর্চা করা হয়নি। ফলে ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, জাত-পাত এই বিষয়গুলো ধুরন্ধর রাজনৈতিক শক্তির ক্ষমতালাভের হাতিয়ার হয়ে জনসাধারণের ঐক্যকে ছিন্ন করতে পারছে। সাম্প্রদায়িকতা রুখতে গেলে গরীব-মেহনতি মানুষের উপর নেমে আসা একের পর এক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইকে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আদর্শিক লড়াইয়ের সাথে যুক্ত করতে হবে। জনগণকে সংগঠিত করে ক্রমাগত এই অর্থনৈতিক আক্রমণের বিরুদ্ধে জঙ্গি আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। শুধু কনভেনশন, মিটিং, মিছিলের কর্মসূচী দিয়ে এই আক্রমণ রোখা যাবে না। আজকের দিনে রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক মুল্যবোধ ও নৈতিকতার মর্মবস্তুকে হাতিয়ার করে বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক মানুষের ঐক্যের ভিত্তিতে এই আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে। বিগত সময়ে শাসন ক্ষমতায় থাকা প্রত্যেক দলের সাথেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সম্পর্ক গভীর। ভোটের রাজনীতি যারাই করেন, এই কাজ তারা জেনেবুঝেই করেন। ফলে ভোটের মাধ্যমে নয়, সাম্প্রদায়িকতাকে মোকাবেলা করতে হবে এর বিরুদ্ধে আদর্শিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে তীব্র করে।
* সাম্রাজ্যবাদ প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্য—
বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই দুনিয়ার বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, যেমন- ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো এবং পরবর্তীকালে চীন, রাশিয়া, জাপান ইত্যাদি দেশগুলো তাদের বাজার সম্প্রসারনের লক্ষে এদেশের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের উপর বারংবার হস্তক্ষেপ করেছে। বিগত সময়ে ভারতসহ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর কাছে আওয়ামী লীগের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি আমরা দেখেছি। গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা এমন একটি সরকার প্রত্যাশা করেছি- যে সরকার সকল ধরনের বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দেবে। আমাদের দল মনে করে, সবরকম সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত। দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখা সরকারের অবশ্য কর্তব্য।
* জুলাই সনদ প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্য—
রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দীর্ঘ ৮ মাসের আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের মর্মবস্তু জাতীয় ঐক্যমত কমিশন কর্তৃক প্রণিত জুলাই সনদে প্রতিফলিত হয় নি। কমিশনের সভাপতি হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা উদ্বোধনী সভায় বলেছিলেন, সবাই যে সকল বিষয়ে একমত হতে পারবে, সেগুলোই গ্রহণ করা হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল বিভিন্ন প্রস্তাবে প্রায় সকল দলই যে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিল, সেই ‘নোট অব ডিসেন্ট’-গুলোকে যুক্ত করেই সনদ রচনা করা হলো। উপরন্তু সনদের পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সনদের অঙ্গীকারনামা অংশে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। ভিন্নমতসহ (অর্থাৎ নোট অব ডিসেন্টসহ) একটি সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করলে নোট অব ডিসেন্টের কোন কার্যকারিতাই থাকে না। অঙ্গীকারনামায় বলা হয়েছে- “জুলাই সনদ নিয়ে কেউ আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবে না’। এটি নাগরিকের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থী। আমরা সংবিধানে বিদ্যমান চার মূলনীতি বজায় রেখে কমিশন প্রস্তাবিত মূলনীতিগুলো যুক্ত করার কথা বলেছিলাম। কমিশন সেটা আমলে নেয়নি। এইসকল কারণে আমরা জুলাই সনদের আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে, সংস্কারের বিষয়ে একমত হয়েও তাতে স্বাক্ষর করতে পারিনি। আমরা সেসময় সংবাদ সম্মেলন করে জাতির সামনে তুলে ধরেছিলাম যে, জুলাই সনদের সর্বসম্মত প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করা হউক।
* গণভোট প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্য—
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে আমরা নীতিগতভাবে গণভোটকে সমর্থন করেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যেভাবে সাংবিধানিক সংস্কারগুলোকে চারটি প্রশ্নের একটি প্যাকেজের মধ্যে এনে পুরো প্যাকেজের উপরেই ‘হ্যাঁ/না’ ভোটের সিদ্ধান্ত নেয়- তা পুরোপুরি অগণতান্ত্রিক। কেউ চারটি প্রশ্নে উল্লেখিত পয়েন্টের কয়েকটির সাথে একমত বা দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। সবগুলোর সাথে একমত কিন্তু কোন একটি প্রস্তাবের সাথে দ্বিমত হলেও যে কোন মানুষের সেই মত প্রকাশের অধিকার আছে। কিন্তু এই গণভোটে তাকে সেই সুযোগ দেয়া হয়নি। ফলে যে প্রক্রিয়ায় এই গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়াকে আমরা সঠিক মনে করি না। এতে মানুষের মতামতের যথার্থ প্রতিফলন ঘটবে না।
* গণআন্দোলনই অধিকার আদায়ের গ্যারান্টি—
গত পনের বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার যে ফ্যাসিবাদী শাসন চালিয়েছে তা থেকে মুক্তির জন্য জনগণ এই নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে ঠিক, কিন্তু এও ঠিক যে নির্বাচনের মাধ্যমেই এই আকাঙ্ক্ষিত মুক্তি আসবে না। দুঃশাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই মানুষ ২০০৮ সালে বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করেছিল। কিন্তু মুক্তি আসেনি, তার পরিবর্তে আরও বড় দুঃশাসন মানুষের উপর চেপে বসেছে। তাই মুক্তি পেতে ভোট নয়, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষকে নিজ নিজ জায়গা থেকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জনজীবনের বিভিন্ন জ্বলন্ত সমস্যা সমাধানের দাবিতে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। জনতা আন্দোলনমুখী হলে কোন অন্যায় সিদ্ধান্ত তাদের উপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া যায় না।
প্রিয় দেশবাসী,
এই গণআন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যেই আমরা নির্বাচনে লড়ব। আমাদের জয় কিংবা পরাজয়, গণসংযোগ থেকে শুরু করে নির্বাচনী মিছিল, মিটিং- সবকিছুই ভবিষ্যতের গণআন্দোলনে ভূমিকা রাখবে। আমাদের দল গরীব মানুষের। আমরা শিল্পপতি, বড় ব্যবসায়ী, কালোবাজারী, ব্যাংক লুটেরাদের টাকা নিয়ে দল পরিচালনা করি না। আমাদের দলের কর্মীরা ঘরে ঘরে, দোকানপাটে, অফিস-আদালতে, বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে। এই টাকা দিয়েই বিভিন্ন আন্দোলন, নির্বাচন ও অন্যান্য নিয়মিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। নির্বাচনী প্রচারের সময়কালেও আমরা দলের সদস্য, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী ও জনগণের নিকট থেকে নির্বাচনী ব্যয়ের অর্থ সংগ্রহ করব। আপনাদের কাছে আমাদের অনুরোধ, আমাদের বক্তব্যের আবেদন যদি আপনাদের কিছুটাও স্পর্শ করে, তবে নিজেরাই এলাকায় এলাকায় উদ্যোগী হয়ে আমাদের বক্তব্য পৌছে দেয়ার দায়িত্ব নেবেন। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়া, লোভ দেখানো, ভোট কেনাবেচার রাজনীতি আমাদের দল করে না। গরিব অত্যাচারিত মানুষের স্বার্থে বৈপ্লবিক সংগ্রামী আদর্শ, উন্নত রুচি ও সংস্কৃতির ভিত্তিতেই আমাদের দল কাজ করে তা আপনারা জানেন। গণআন্দোলনের শক্তি হিসেবে, নীতি-মূল্যবোধহীন রাজনীতির বিপরীতে একটি আদর্শবাদী শক্তি হিসেবে আমাদেরকে শক্তিশালী করুন। নির্বাচনকে টাকা, পেশীশক্তি ও বড় বড় মিডিয়ার হাতে আপনারা ছেড়ে দেবেন না। আপনাদের সমর্থন ও সহযোগিতাই আমাদের আন্দোলনের শক্তি গড়ে উঠতে ও বিকশিত হতে সাহায্য করবে।
