নারীর মর্যাদা ও সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বেগবান করা এবং নারীর উপর সকল প্রকার বৈষম্য, নিপীড়ন, নির্যাতন, ধর্ষণ-গণধর্ষণ, হত্যা বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে চট্টগ্রামে ‘বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র’-এর মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত।

৮ মার্চ আন্তজার্তিক নারী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্রের উদ্যোগে আজ সকাল ১১ টায় নগরীর নিউ মার্কেট মোড়ে নারীর মর্যাদা ও সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বেগবান করা, শক্তিশালী নারী আন্দোলন গড়ে তোলা এবং নারীর উপর সকল প্রকার বৈষম্য, নিপীড়ন, নির্যাতন, ধর্ষণ-গণধর্ষণ, হত্যা বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে একটি মিছিল নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। আসমা আক্তারের সভাপতিত্বে ও সংগঠনের সদস্য নেভী দে’র পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সদস্য রিপা মজুমদার, গৃহকর্মী অধিকার রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আনজু আরা বেগম, অর্পিতা নাথ প্রমূখ।

বক্তাগণ বলেন, ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্কের সুতা কারখানায় নারী আন্দোলনের সুচনা হয়। প্রেক্ষাপট ছিল মজুরি বৈষম্য, কর্মঘণ্টা, অমানবিক- অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নির্যাতনের প্রতিবাদ এবং ভোটাধিকারের দাবী। সেদিন হাজার হাজার নারীদের মিছিলে পুলিশ নৃশংস হামলা চালায়। এতে আহত, নিহত ও গ্রেফতার হন অসংখ্য নারী শ্রমিক। এই আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে দেশে দেশে।তার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী তে ১৯১০ সালের ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সমাজতান্ত্রিক নারী নেত্রী ক্লারা জেটকিন ৮ মার্চ নারী দিবস ঘোষণার প্রস্তাব করেন এবং তা গৃহীত হয়।
বক্তাগণ আরও বলেন, নারী দিবস উদযাপন হচ্ছে কিন্তু নারী আজও তার মর্যাদা-অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়নি। তাই নারী দিবসের চেতনাকে ধারণ করে নারীর অধিকার ও মর্যাদা এবং বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণে সমাজতান্ত্রিক তথা সাম্যবাদী চেতনায় এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান।
বক্তারা আরও বলেন- ” সীতাকুণ্ডের ইরামনি, নরসিংদীর আমেনা, ঝিনাইদহের তাবাসসুম, পাবনা- ঈশ্বরদীর জামিলা, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আসমা সাদিয়া রুনাসহ সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ-গণধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো সমাজের সর্বস্তরের বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে কাঁপিয়ে দিয়েছে। এই সমাজ- রাষ্ট্র – মানুষকে ধীরে ধীরে এক অন্ধকার গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছে দেশের শাসকরা।এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল নারীরা এই দেশে কোনসময়ই নিরাপদ নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা থাকলেও তারপর থেকেই নারীরা নানাভাবে ধর্ষণ, নিপীড়ন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার সেসময় এসকল নিপীড়নের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তীতেও আমরা নারী নির্যাতনের ধারাবাহিক ঘটনা দেখছি। আমাদের দেশের শাসকদের নারীদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গী এবং সামাজিক পরিস্থিতিই নারী নিপীড়নের জন্য দায়ী। সকল সরকার দেশে মাদক, জুয়া, নারী বিরোধী নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন উৎসাহিত করার মধ্য দিয়ে নারীদের জন্য অনিরাপদ পরিবেশ তৈরি করেছে। এদেশে প্রায় ৫১ শতাংশ নারী হওয়ার পরও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা নারীকে নিকৃষ্ট হিসাবে দেখাতে চায়। নারীর উপর ঘটে যাওয়া নিপীড়নগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে বেশিরভাগ ঘটনায় অপরাধীরা ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। ফলে একটি সুস্থ পরিবেশ নির্মাণ করতে হলে সরকারকে অবিলম্বে নিম্নোক্ত দাবিগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।
১. ইতোপূর্বে ঘটে যাওয়া সকল নারী ও শিশু নিপীড়ন,ধর্ষণ,গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে ।
২. সংসদে নারী আসনের সংখ্যা ১০০-তে উন্নীত করা ও সরাসরি নির্বাচনের বিধান করা।
৩. ‘ইউনিফরম সিভিল কোড’ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারিবারিক আদালত চালু করা। সংরক্ষণ প্রত্যাহারসহ সিডও সনদ বাস্তবায়ন করা। কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমমজুরি ও সর্বক্ষেত্রে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা।
৪. ফতোয়াবাজীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ নেয়া।
৫. নারী ও শিশু পাচারকারী এবং নারীদের পতিতাবৃত্তিতে নিয়োগকারী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান কর। আর্থিক কারণে পতিতাবৃত্তিতে যুক্ত নারীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা কর।
৬. নাটক- সিনেমা- সাহিত্য – বিজ্ঞাপন, ওয়াজ- নসিহতে নারীদের অশ্লীল উপস্থাপনা ও তাদের সম্পর্কে অসম্মানজনক উক্তি বন্ধ করতে হবে।
৭. প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই সঙ্গীত-নাটক-নৃত্য-চিত্রাঙ্কনসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলার আয়োজন কর। মনীষী জীবনচর্চাসহ সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ নিশ্চিত কর।
৮. মাদক ও জুয়া বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৯. প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত কর। প্রবাসে বাংলাদেশের দূতাবাসকে শ্রমিক বান্ধব করতে হবে।
