(গত ৩১ জুলাই, ২০২৬ তারিখে বাসদ (মার্কসবাদী)-এর আয়োজনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: গণতান্ত্রিক সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা, প্রাপ্তি ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্যের নির্বাচিত কিছু অংশ সম্পাদনা করে প্রকাশ করা হলো।)
আজকের এই অনুষ্ঠানের সংগ্রামী সভাপতি, উপস্থিত বন্ধুগণ। আপনারা সবাই কোনো না কোনোভাবে গণঅভ্যুত্থানের সাথে ছিলেন, গণঅভ্যুত্থানের অনেক আগে থেকেও বিভিন্ন লড়াইয়ের মধ্যে ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের পরে বহুজনের মধ্যে একটা হতাশা আছে, প্রশ্ন আছে। অনেকের মধ্যে এরকম আক্ষেপও আছে যে, এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কি আমরা আরও পেছনে চলে গেলাম? আরও অধিকতর প্রতিক্রিয়াশীল, এমনকি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী- তাদের দাপট তৈরি হলো কি বাংলাদেশে? তাহলে কি গণঅভ্যুত্থান ভুল হলো? এই সমস্ত প্রশ্নগুলো এখন বিভিন্নভাবে আমরা শুনি বা আসে।
আমরা যারা গণঅভ্যুত্থানে বিভিন্নভাবে ছিলাম, আমরা এখন সাধারণত দুই দিক থেকে আক্রান্ত হই। একটা আক্রমণ হলো- ‘আপনারাই তো এই সর্বনাশটা করলেন, প্রতিক্রিয়াশীলদের ক্ষমতায় নিয়ে আসলেন।’ আবার আরেকটা আক্রমণ আসে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে। তারা বলতে চান যে, এখানে যারা বাম ঘরানার লোকজন, গণঅভ্যুত্থানে এদের কোনো ভূমিকাই ছিল না। এরা হচ্ছে একেবারেই প্রান্তিক, তারা আসলে এখানে কোনো পক্ষই না। সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক, গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট কিংবা বাম গণতান্ত্রিক জোট- এরা এখন জোর-জবরদস্তি করে নিজেরা একটু জায়গা নেওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে দুইদিক থেকেই আক্রমণ আসছে।
আমরা জাতীয়ভাবে যে তিনটা বড় আকারের গণঅভ্যুত্থান দেখলাম- ৬৯, ৯০ এবং ২৪-এ- তিনটারই পেছনে উন্নয়নের একটা বড় কাহিনী আছে। জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে সামরিক ক্যু করে ক্ষমতায় এসেছিলেন। তিনি তার শাসনের উন্নয়ন দশক পালন করেছিলেন ১৯৬৮ সালে। উন্নয়ন দশক খুবই সাড়ম্বরে পালিত হয়েছিল সারা পাকিস্তান জুড়ে। উন্নয়ন দশকও শেষ হলো এবং তারপরেই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আইয়ুব খানের পতন হলো।
তারপরে আমাদের আরেকটা উন্নয়ন দশক হলো এরশাদের সময়। এরশাদ ১৯৮২ সালে আইয়ূব খানের মতো সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতায় আসল। তার শাসনের অবশ্য দশক পূর্ণ হয় নাই, দশকের কাছাকাছি তিনি গিয়েছেন। তার সময়েও নানা উন্নয়নের কথা আমরা শুনেছি। উপজেলা হলো, জেলা হলো অনেকগুলো, অনেক রকম বিল্ডিং ও নির্মাণ কাজ হলো। দশক পূর্ণ হওয়ার আগেই তারও পতন ঘটল গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ১৯৯০ সালে।
শেখ হাসিনা তো আইয়ুব খান বা এরশাদের মতো না- নির্বাচন করেই ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু ২০১৪ থেকে ছিল অনির্বাচিত সরকার এবং সেই সময়ই ‘উন্নয়নের মহাসড়ক’, ‘কম গণতন্ত্র, বেশি উন্নয়ন’-এই সমস্ত কথাবার্তা আমরা শুনতাম সে সময়। সেই সময় পদ্মা সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে, অনেকগুলো হাইওয়ে, মেট্রোরেল- ইত্যাদি হলো। বলা যায়, কনস্ট্রাকশন বুম হলো একটা। কিন্তু তিনিও ক্ষমতায় টিকতে পারলেন না।
এখানে একটা প্রশ্ন আসে। প্রত্যেকটা জায়গায় উন্নয়নের পরে কেন গণঅভ্যুত্থান হয়? মানুষ কেন উন্নয়নের সাথে থাকে না? মানুষ উন্নয়নের বাইরে কেন যায়? উন্নয়ন যারা করে, তাদের বিরুদ্ধে মানুষ কেন ফুঁসে ওঠে? তাহলে কী ধরনের উন্নয়ন হলো সেটা?
শেখ হাসিনা উন্নয়নের প্রধান ব্যক্তি হিসেবে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, মার্কিন দূতাবাস এবং অন্যান্য বহুজাতিক কোম্পানি- সবার কাছে খুবই সম্মান পাচ্ছিলেন। কারণ সব রকম প্রতিবাদ দমন-পীড়ন করে, স্বৈরশাসনের মধ্য দিয়ে দেশকে যে উনি চালাতে পারেন- সেটার প্রমাণ উনি রেখেছেন। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা অন্যান্য যত ধরনের উন্নয়ন প্রজেক্ট আছে, মেগা প্রজেক্ট আছে, একের পর এক তিনি করে যাচ্ছেন। কেউ ঠেকাতে পারছে না, কোনো প্রতিবাদ কেউ করতে পারছে না- বহুজাতিক পুঁজির জন্য এই ধরনের নেতৃত্ব দরকার। দেশের মধ্যে যে নতুন ধনিক শ্রেণি তৈরি হচ্ছে, তাদের জন্য এরকম নেতৃত্ব দরকার। সুতরাং দেশের ধনিক শ্রেণি, আন্তর্জাতিক ধনিক শ্রেণি, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলো, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো- প্রত্যেকেই শেখ হাসিনাকে মাথায় তুলে রেখেছে।
কিন্তু এটা টিকল না। এটাও টিকল না, যেমন আগেরগুলোও টেকে নাই। না টেকার কারণ হচ্ছে উন্নয়নের অন্যপিঠ। এই সমস্ত উন্নয়নের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটেছে, কোনো সন্দেহ নাই। ষাটের দশকে বাংলাদেশে, পাকিস্তানে পুঁজিবাদের যে অবস্থা ছিল, এই শেখ হাসিনার আমলে সেটা অনেক বিকশিত হয়েছে। পুঁজিবাদের বিকাশ হয়েছে, ধনিক শ্রেণি তৈরি হয়েছে। কিন্তু তার মধ্য দিয়ে বৈষম্য বেড়েছে, প্রাণ-প্রকৃতি- পরিবেশের একটা বিপর্যয় ঘটেছে। কিন্তু যাকে বলা হয় ডিসেন্ট জব, একটা সম্মানজনক কর্মসংস্থান- সেটার জায়গা তৈরি হয় নাই। বরং ভয়ঙ্কর রকম লুণ্ঠন ও সম্পদ পাচার হয়েছে। আর সেগুলো করার জন্য দমন-পীড়ন হয়েছে, স্বৈরশাসন এসেছে। এসব কারণে মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ, সেই ক্ষোভ থেকে এই বিস্ফোরণটা হয়েছে।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ে স্পষ্ট কোন ঘোষণা বা নেতৃত্ব ছিল না, যেমন ৬৯-এ কিংবা ৯০-এ আমরা দেখেছি। আগের অভ্যুত্থানগুলোতে দলগুলো সামনে ছিল, দাবিদাওয়া সামনে ছিল এবং নেতারা চিহ্নিত ছিলেন। পরিষ্কার একটা চিত্র ছিল মানুষের সামনে। ২০২৪ সালে সেরকম অবস্থা ছিল না। একটা তরল অবস্থা ছিল। ছাত্রদের আন্দোলন থেকে এটা যে দ্রুতগতিতে গণঅভ্যুত্থানের দিকে গেল; এই দ্রুতগতিতে যাওয়ার পেছনে প্রধান ভূমিকা যদি কারও থাকে, যদি কাউকে কৃতিত্ব দিতে হয়, সেটা শেখ হাসিনাকে দিতে হবে। কারণ ১৪ জুলাই ও ১৫ জুলাই থেকে যে অবস্থাটা তৈরি হলো, সেটা তো শেখ হাসিনার সৃষ্টি।
একনায়ক বা স্বৈরশাসকের মনে একটা কর্তৃত্ববাদ কিংবা ঔদ্ধত্য তৈরি হয়। তারা মনে করে যে আমি যা খুশি তাই করতে পারি। কিন্তু পারে নাই, কেন পারে নাই? কারণ তাঁর যে শেষ অস্ত্র, সামরিক বাহিনী কিংবা কারফিউ- এটা আর কাজ করছিল না। একটা দেশে, একটা সমাজে, মানুষ যখন কারফিউকে ভঙ্গ করে, কারফিউ প্রত্যাখ্যান করে, তখনই সেটা হলো গণঅভ্যুত্থানের মুহূর্ত। আপনি ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের কথা চিন্তা করেন, ‘চিলেকোঠার সেপাই’ পড়লে দেখবেন, কারফিউ প্রত্যাখ্যান করে শ্রমিকরা বেরিয়ে আসছে, ছাত্ররা বেরিয়ে আসছে, গ্রামাঞ্চলে কৃষকরা বেরিয়ে আসছে। আর পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, এত শক্তিশালী সেনাবাহিনী- সেটা আর কাজ করছে না। ১৯৯০-এ এরশাদের সেনাবাহিনীও কাজ করে নাই। এটা, এটা হচ্ছে মুহূর্ত। ওই মুহূর্তটা তখন তৈরি হয়েছিল।
এই ঘটনাগুলো কালার রেভোলিউশন না কিংবা ষড়যন্ত্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এসব করছে- এটা বলে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এই কাজগুলো তো শেখ হাসিনার নির্দেশেই হচ্ছে। আন্দোলনকারী সবাই সন্ত্রাসী, সন্ত্রাসী দেখামাত্র গুলি করতে হবে- এটা তো মার্কিন দূতাবাস থেকে বলা হয় নাই। এটা তো শেখ হাসিনা বলেছে। ফলে এই ঘটনাগুলো কোন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
গণঅভ্যুত্থানের পর জামায়াত কিংবা বিভিন্ন ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তিগুলো যে তাণ্ডব চালিয়েছে কিংবা তাদের যে দাপট তৈরি হয়েছে- এটা হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়ে নাই। তারা এই সমাজের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল এবং সমাজে তারা আওয়ামী লীগের মধ্যেও ছিল। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন না হলে আওয়ামী লীগের মধ্যেই তারা কাজ করত, যেমন করছিল। আওয়ামী লীগের সময়ই হেফাজতের কথা অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নামেই মোরাল পুলিশিং হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন যে চুক্তিগুলো করছে, এই চুক্তিগুলো কি হঠাৎ করে করছে? এই চুক্তিগুলো তো অনেক আগে থেকেই হচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানের পরে আজকে আমরা যে শক্তি সমাবেশটা দেখতে পাচ্ছি, এই শক্তি সমাবেশটা সেই ধারাবাহিকতারই ফল। এটা হঠাৎ করে আসেনি।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে আলাদা কোনো রাজনৈতিক দলের ঘোষণা ছিল না। বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রত্যাশা নিয়ে একটা গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। সেই বৈষম্যহীনতা বলতে কী বোঝায়? শ্রেণিবৈষম্য, জাতিগত বৈষম্য, ধর্মীয় বৈষম্য, লিঙ্গীয় বৈষম্য- এগুলো থেকে মুক্ত একটা দেশ। যে কোন সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য- সেটা ভারত, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, রাশিয়া, যাই হোক না কেন- সেটা থেকে মুক্ত একটা দেশ। এসব থেকে মুক্ত একটা দেশের কথা যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে এই আকাক্সক্ষা কী ধরনের আকাক্সক্ষা? এটা কি কোনো ডানপন্থী প্রত্যাশা হতে পারে? বৈষম্যহীন বাংলাদেশের চিন্তা, বৈষম্যহীন একটা সমাজের প্রত্যাশা কি কোনো ডানপন্থী বা মধ্যপন্থী এজেন্ডা হতে পারে? বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বলা মানেই হচ্ছে এটা আসলে একটা বামপন্থী এজেন্ডা। এটা বাম প্রত্যাশা, বামপন্থী চিন্তা। ডানপন্থী রাজনীতি, মতাদর্শ কখনো বৈষম্যহীনতার ওপরে দাঁড়াতে পারে না। ডানপন্থী রাজনীতি দাঁড়িয়ে থাকে শ্রেণি বৈষম্য, ধর্মীয় বৈষম্য, লিঙ্গীয় বৈষম্য, বিভিন্ন ধরনের জাতিগত বৈষম্যের ওপর। এটাই হচ্ছে ডানপন্থী রাজনীতি। আমরা যেটাকে ডানপন্থী রাজনীতি বলি, আর যেটাকে বৈষম্যবাদী রাজনীতি বলি- এই দুইটা আসলে একই রাজনীতি। মধ্যপন্থী মানে, ওই ডানপন্থী জিনিসটাকে কোনো না কোনোভাবে আড়াল করে একভাবে সেটাকে রেশনালাইজ করার চেষ্টা করার রাজনীতি।
তার মানে এই কথাটা আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে যে, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য থেকে সমাজের মধ্যে যে আকাক্সক্ষাটা প্রকাশিত হলো, যে প্রত্যাশাটা সামনে আসল- সেটা একেবারেই বামপন্থী প্রত্যাশা। কিন্তু যারা ক্ষমতার দাপট নিয়ে পরে সামনে আসল, তারা সবাই হচ্ছে বৈষম্যবাদী। তার মানে এখানে এই যে ‘মিস-ম্যাচ’ এই সমাজের মধ্যে; সমাজের প্রত্যাশা এবং সমাজের সংগঠিত শক্তি, এই দুইয়ের মধ্যে যে অসঙ্গতি কিংবা ভারসাম্যহীনতা- এটাই হচ্ছে বর্তমান সময়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সমাজের প্রত্যাশার সাথে সংগঠিত শক্তির একটা দ্বন্দ্ব এখন দেখা দিচ্ছে। সেটারই ফলাফল আমরা এখন দেখছি।
আপনারা দেখবেন যে, দুইটা কথা পরস্পরবিরোধী কথা এখন প্রচলিত আছে। ফেসবুকেও পাবেন, বাইরেও পাবেন। একটা হচ্ছে, বামপন্থীদের কোনো শক্তি নাই, বামপন্থীদের সাথে কোনো লোক নাই, বামপন্থীরা একেবারেই জনবিচ্ছিন্ন। আরেকটা হচ্ছে, বামপন্থীরাই দেশের জন্য একটা ভয়াবহ বিপদ নিয়ে আসছে, বামপন্থীরাই সর্বনাশ করছে। তো যার শক্তি নাই, সে কী করে বিপদ তৈরি করতে পারে? সে কী করে দেশের জন্য একটা এত বড় সর্বনাশ তৈরি করতে পারে? এই দুইটা কথা কিন্তু পাশাপাশি শুনবেন এবং সেই কারণে দেখা যায় যে, বাম এবং সেক্যুলারবিরোধী একটা অপপ্রচার সারাক্ষণ চলছে। কুৎসা দিয়ে কিংবা বিভিন্ন ধরনের মিথ্যাচার দিয়ে তাদেরকে যতটা সম্ভব কালিমালিপ্ত করার একটা ব্যাপক, সংগঠিত চেষ্টা এখন আমরা দেখতে পাই, যেটা সরাসরি গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করার শামিল। কারণ গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, সেটার জন্য যারা লড়াই করছে, সেটার স্বপ্ন যারা দেখছে, সেটার রাজনীতি যাদের- তাদেরকেই কোণঠাসা করার একটা সামগ্রিক চেষ্টা এটি। মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে সাম্রাজ্যবাদী বড় প্রজেক্ট এখন চলছে, সেই প্রজেক্টের বিরুদ্ধে যখন আন্দোলন তৈরি হচ্ছে কিংবা বামপন্থীদের কণ্ঠস্বর দিনে দিনে সরব হচ্ছে, তখন কিন্তু এই প্রচারটাও বাড়ছে। সেখানে দেখবেন যে, আওয়ামী লীগ, জামায়াত, এনসিপি, বিএনপি সবাই ঐক্যবদ্ধভাবেই আক্রমণগুলো করছে। কাদের বিরুদ্ধে? যাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে শক্তিশালী একটা প্রতিরোধশক্তি হিসেবে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। যারা মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। তারা কারা? যারা ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধেও যারা লড়াই করেছিল। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, সীমান্ত হত্যাকাণ্ড, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে আন্দোলন করেছিল। সুতরাং এই অপপ্রচার এবং এই আধিপত্য- এই দুইটার একটা সুনির্দিষ্ট রাজনীতি এবং মতাদর্শিক জায়গা আছে।
এখানেই আমাদের কাজ। আমাদের এখন বহুমাত্রিক কাজ। একটা কাজ রাজনৈতিক দলের। সেটা হলো বাম রাজনৈতিক সংগঠিত শক্তি তৈরি করা। এটা একটা বড় কাজ। শ্রেণি প্রশ্নটাকে সামনে আনা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণি প্রশ্ন যদি আজকে যথেষ্ট গুরুত্ব পেত, তাহলে এই যে ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা কিংবা ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে শোষকদের স্বার্থ রক্ষা করা তাদের জন্য সহজ হতো না। তাই শ্রেণি প্রশ্নটা সামনে নিয়ে আসা দরকার। নারী প্রশ্নটাকে সামনে আনা দরকার এবং সমস্ত কাজের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো দরকার। আদিবাসী, দলিত তাদের যে মবিলাইজেশন এবং তাদের যে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি, সাংগঠনিক তৎপরতা- সেটা বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের যারা আছে তাদের মবিলিটি বাড়ানো দরকার। ইসলাম ধর্মের মধ্যেই অনেক মাইনরিটি আছে, ইসলাম ধর্মের মধ্যেই নিপীড়িত অনেক অংশ আছে। তারা শুধু আক্রান্ত না, তাদের রীতিমতো খুন করা হচ্ছে। তাদের পুরো আবাসস্থল, ঘরবাড়ি ভেঙেচুরে দেওয়া হচ্ছে। মানে ইসলাম ধর্মের অনুসারী হয়ে যে কেউ নিরাপদ থাকবে, তাও পারবে না। এরকম একটা অবস্থা। সেই প্রত্যেকটা জায়গাতেই আমাদের বহুরকম কাজ আছে। সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করার আছে। বুদ্ধিবৃত্তিক কাজটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উন্নয়ন সম্পর্কিত চিন্তা যদি আইয়ুব খান, এরশাদ, হাসিনার মতোই থাকে, মানে উন্নয়ন বলতে যে ধরনের উন্নয়ন তারা করে, সেই উন্নয়ন চিন্তার মধ্যেই যদি আমরা থাকি- তাহলে রাজনীতিও কিন্তু নতুনভাবে দাঁড়াতে পারবে না। উন্নয়ন যদি পুরনো ধরনের চিন্তার মধ্যে থাকে, রাজনীতিটাও দেখা যাবে যে ওই পুরনো ধারার মধ্যেই থাকবে। সুতরাং এই বহুমাত্রিক কাজ, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ, পাঠচক্র, পাঠাগার এবং অন্যান্য যত ধরনের কাজ আছে, সবগুলো কাজই বাড়ানো দরকার। লেনিনের একটা কথা আছে, “যেখানেই জনগণ আছে, যেখানেই জনগণের লড়াই আছে, সেখানেই আমাদের থাকতে হবে।” এটা খুব পরিষ্কার একটা কথা। খুব সহজ কথা। এই কথাটা মনে রাখলেই কিন্তু অনেক ধরনের সমস্যার সমাধান হবে। সেইক্ষেত্রে আমি আশা করি যে, আজকে যারা এখানে আছেন তারাও বহুদিক থেকে এই ভূমিকা পালন করবেন এবং আমাদের সবার দিক থেকেই, সবদিক থেকেই এই চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এই চেষ্টাটা অব্যাহত রাখতে পারলে আমরা বুঝতে পারব যে, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান আমাদের একটা শক্তির জায়গা, আমাদের একটা আত্মবিশ্বাসের জায়গা এবং আমাদের আত্মপর্যালোচনারও জায়গা। এটা নিজেদের পর্যালোচনার এবং সাহসেরও জায়গা। আমাদের নিজেদের অর্জনকে নিজেরা অবহেলা করলে হবে না, নিজেদের অর্জনের ওপরেই নিজেদের দাঁড়াতে হবে এবং দাঁড়িয়ে আরও বড় অর্জনের দিকে আমাদের অগ্রসর হতে হবে। এই প্রত্যাশা রেখে এবং আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি শেষ করছি।
