(গত ৩১ জুলাই বাসদ (মার্কসবাদী)-এর আয়োজনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: গণতান্ত্রিক সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা, প্রাপ্তি ও আমাদের করণীয়’শীর্ষক আলোচনা সভায় বাসদ (মার্কসবাদী)-এর সমন্বয়ক কমরেড মাসুদ রানা বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্যের নির্বাচিত কিছু অংশ সম্পাদনা করে প্রকাশ করা হলো।)
আপনারা আমাদের শ্রদ্ধেয় আলোচকবৃন্দের আলোচনা শুনেছেন। বক্তাদের কথা শুনতে শুনতে আমি ভাবছিলাম যে, একটা কী একটা সময় আমরা অতিক্রম করেছি! দুই বছর আগে আজকের দিনের কথা ভাবুন। তখন আমরা কেউ জানতাম না যে আমরা কে বাঁচব, কে মরব। একটা ভয়ঙ্কর পরিবেশের মধ্যে আমরা ছিলাম। কিন্তু সেই সময়ে একটা অনমনীয় মনোভাব নিয়ে আমরা লড়াই করেছি। এই গণঅভ্যুত্থানে আমাদের দলের নেতাকর্মীরা সর্বশক্তি নিয়ে অংশগ্রহণ করেছে। শুধুমাত্র এই গণঅভ্যুত্থান নয়, আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধেও আমাদের একটা ধারাবাহিক লড়াই ছিল। সেই সময় নির্দলীয় তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচন, জনজীবনের বিভিন্ন সংকট নিরসনের দাবিতে আমাদের ধারাবাহিক লড়াই আমাদের দল করেছে।
লড়াইয়ের এই কালপর্বে আমরা একটা কথা খুব জোর দিয়ে বলেছি- ফ্যাসিবাদ কোনো দল আনে না, ফ্যাসিবাদ আনে একটা ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থাটা হচ্ছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাই আজকের দিনে অনিবার্যভাবে ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়। ফলে আমাদের লড়াইয়ের গতিমুখ তেমনই হওয়া উচিত, যাতে এই ব্যবস্থারও একটা পরিবর্তন আমরা সংঘটিত করতে পারি। এটা আমরা আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময়ে বারবার বলেছি। আমরা তখন দেখেছি যে, অনেকেই আওয়ামী লীগের পতন আর ফ্যাসিবাদের পতনকে সমার্থক ভাবছিলেন।
এরপর এই গণঅভ্যুত্থান হলো। এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এতে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেনি, ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে মাত্র। শেখ হাসিনার শাসনামলে আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছি, প্রতিবাদ করেছি- তার অনেককিছুই আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ঘটতে দেখেছি। এখন বিএনপি সরকারের শাসনামলে দেখছি। যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে আমরা আছি, সেটা এই সংকটের সমাধান করতে পারছে না বলেই এমন ঘটছে। এই ব্যবস্থা এটা পারবেও না। বর্তমানে আমাদের দেশের মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা এবং চাওয়া, সেই চাওয়াকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য যে ধরনের সমাজব্যবস্থা দরকার, সেটা এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা না। এই ব্যবস্থা একটা ব্যর্থ ব্যবস্থা। এই সমাজব্যবস্থা মানুষের কোনো ধরনের সংকটের সমাধান করতে পারেনি- এটা বাংলাদেশের ৫৫ বছরের পুঁজিবাদী শাসনের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত। এই ৫৫ বছরের পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থায় জনজীবনের সংকটগুলো কোনোভাবেই সে দূর করতে পারেনি, বরং এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
ফলে এই ব্যবস্থাকে আমাদের চেনাটা খুব জরুরি। আমাদের এটা বোঝা দরকার যে সরকার এবং রাষ্ট্র- এই দুইটা আলাদা ব্যাপার। আমরা সরকারকে চিনি। আমাদের সরকারকে চেনানো হয়, আওয়ামী লীগকে চেনানো হয়, বিএনপিকে চেনানো হয়। একটা দল যায়, আরেকটা দল ক্ষমতায় আসে। ফলে এই সরকারের পরিবর্তন যে রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন না, বরং এই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পরিচালনা করছে এই সরকার, অনেকটা পলিটিক্যাল ম্যানেজার হিসেবে- এই দিকটা জনগণের সামনে নিয়ে আসা, জনগণকে এই জায়গায় সচেতন করা, সংগঠিত করা, ঐক্যবদ্ধ করা এই সময়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। এই জায়গা থেকে আমাদের লড়াইয়ের গতিমুখ আমরা নির্ধারণ করেছি। এর ভিত্তিতেই আমরা গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছি। এই কথাটা ঠিক যে, এই গণঅভ্যুত্থানে সমস্ত বামপন্থী দল যদি সর্বশক্তি নিয়ে অংশগ্রহণ করত, তাহলে গণঅভ্যুত্থানের পরিণতির ক্ষেত্রে এবং গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ক্ষেত্রে বামপন্থীদের আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি হতো।
আমরা অভ্যুত্থানে সর্বশক্তি নিয়ে অংশগ্রহণ করেছি শুধু আওয়ামী লীগ হঠানোর জন্য নয়। জনগণকে এই রাষ্ট্রব্যবস্থা চেনানো ও তাদের মধ্যে ফ্যাসিবাদ সম্পর্কিত সঠিক ধারণা তৈরি করা ছিল আমাদের সকল কর্মকাণ্ডের ভিত্তি। আমরা সবসময় সেই জায়গা থেকেই আমাদের কর্তব্য ঠিক করেছি। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময়েই বিরোধী দলগুলোর সর্বাত্মক ঐক্য হবে কি না, আমরা কাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হব, কাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হব না- এইগুলো প্রশ্নগুলো এসেছিল। আমাদের ফ্যাসিবাদ সম্পর্কিত বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই আমরা তখন করণীয় নির্ধারণ করতে পেরেছিলাম।
এই বোঝাপড়াটা আমাদের ছিল যে, বিগত সময়ে সরকারি ক্ষমতায় থাকা বৃহৎ পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী দলগুলো এবং যে দলগুলো সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি করে- সেই দলগুলোর সাথে আমরা একই প্লাটফর্মে বা যুগপৎভাবে ঐক্যবদ্ধ লড়াই পরিচালনা করবো না। এইক্ষেত্রে একটা দূরত্ব আমরা রক্ষা করেছিলাম। কিন্তু বিএনপি যখন আওয়ামী লীগের আক্রমণের শিকার হয়েছে, তার বিরুদ্ধে আমরা দাঁড়িয়েছি। আপনাদের মনে থাকতে পারে যে, ২০২৩ সালের ২৮শে অক্টোবরে, নয়াপল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশে একটা ভয়াবহ আক্রমণ হয়েছিল। ওই আক্রমণের পর যখন চারদিকে ছোটাছুটি, টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়া, নয়াপল্টন-পুরানা পল্টন-প্রেসক্লাব অঞ্চল রণক্ষেত্র, বিএনপির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে যাচ্ছে- এইসবের মধ্যে আমাদের দলের উদ্যোগে এই হামলার প্রতিবাদে পল্টনে মিছিল বের করেছিলাম আমরা। অর্থাৎ বিএনপির ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে আমরা তখন দাঁড়িয়েছি। কিন্তু তাদের সাথে জোট বা যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই হবে- এটা আমরা মনে করি নাই। কারণ ফ্যাসিবাদ বলতে আমরা শুধু আওয়ামী লীগের দমন-পীড়ন-নির্যাতন বুঝিনি, আমরা ফ্যাসিবাদকে বুঝেছি একটা ক্যাটিগরি হিসেবে, একটা বৈষম্যমূলক সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফলাফল হিসেবে। আমরা মনে করেছি, তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য এখানে গণতান্ত্রিক ও বামপন্থী শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করা দরকার। এই কাজটাই আমরা যত্নের সাথে করার চেষ্টা করেছি।
একইসাথে আমরা বলেছি রাজনৈতিক জোট বা কর্মসূচিতে আমরা এক হচ্ছি না, তার মানে এই নয় যে একটা একটা ব্যাপক আন্দোলন গড়ে উঠলে আমরা একইসাথে পথ চলতে পারব না। গণআন্দোলন ভিন্ন বিষয়। রাজপথের আন্দোলনের মধ্যে অনেক ধরনের ঐক্য হয়। এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান। গণঅভ্যুত্থানের সময় কোন ব্যানার সামনে আছে, কোন দল এই লড়াইয়ে আছে- সেটা আমরা দেখি নাই। গণঅভ্যুত্থানে যে শক্তিগুলো অংশগ্রহণ করেছে, সবার সাথে আমরা এই গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা রেখেছি। আমাদের এই রাজনৈতিক বোঝাপড়াটা খুবই স্পষ্ট ছিল। এ কারণে আমরা কোন দ্বিধায় ছিলাম না।
কিন্তু এই দ্বিধার মধ্যে অনেকেই পড়েছেন। বিগত সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখবো যে, বিভিন্ন সময়ে এই সকল দ্বিধার কারণে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে অনেকেই ভুল করেছেন। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন ১১ দল ভেঙে দিয়ে কয়েকটি বামপন্থী দল মৌলবাদ মোকাবেলার কথা বলে আওয়ামী লীগের সাথে জোট করেন। ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ আওয়ামী লীগের সাথে চলে গেল এই বলে যে, এখন মৌলবাদ আমাদের প্রধান শত্রু, তাকে মোকাবেলা করতে সর্বাত্মক ঐক্য বা বৃহৎ ঐক্য লাগবে। তখন ৬৪টি জেলায় একযোগে বোমা হামলা, বাংলা ভাইসহ চরমপন্থীদের উত্থান- এ ধরনের একটা ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। সেই অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের ছিল। আমরা দেখেছি, এর মধ্য দিয়ে কিন্তু মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লড়াই হয়নি, বরং মৌলবাদ আরও শক্তিশালী হয়েছে। ফলে লড়াইয়ের সময় আমি কোন শক্তিগুলোকে নিয়ে লড়াই করব, কারা আমার সত্যিকার অর্থে মিত্রশক্তি হবে- এই বিষয়গুলো আমরা নির্ধারণ করতে পেরেছিলাম।
বর্তমান সময়ে বামপন্থীদের কাজ কী? আজ মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হচ্ছে। এত লড়াই হলো, এত জীবনদান হলো, কোনো পরিবর্তন তো হলো না- এই প্রশ্নগুলো মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে। মানুষ দেখছে- সেই একই পুরনো পথে বাংলাদেশ হাঁটছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারিকরণের মাধ্যমে পানির দরে ব্যক্তি মালিকের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে, আমেরিকার সাথে বাণিজ্য চুক্তি হচ্ছে, বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়ন হচ্ছে- সেই একই চিত্রেই তো আমরা ফিরে আসছি। এই ঘটনাগুলো কেন ঘটে- সেটা দেখানো বামপন্থীদের কাজ। এখানেই শ্রেণি, সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি- এই বিষয়গুলো আসে। মানুষ যদি কারণটা ধরতে পারে, তবে সে হতাশ হয় না। এ কারণে লড়াইয়ের সাথে সাথে লড়াইয়ের দিকনির্দেশনা তৈরি করাও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমরা যারা সমাজের পরিবর্তনের জন্য লড়াই করছি, তারা তো মানুষকে এটাও দেখাতে চাই যে, এই পরিবর্তনটা কীভাবে ঘটবে? এই পরিবর্তন ঘটানোর জন্য আমাদের করণীয় কী?
আমরা যুগে যুগে দেখেছি- মানুষ লড়াইয়ে নামে, জীবন দেয়। মানুষ দাঁড়ায়। এদেশের যুবক-তরুণদের দেওয়ার জন্য কখনো রক্তের অভাব হয়নি। তারা দাঁড়িয়েছে, বারে বারেই দাঁড়িয়েছে, জীবন দিয়েছে, আত্মবলিদান করেছে। কিন্তু সেই আত্মবলিদান কেন আকাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না, কী করলে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে- এই দিকনির্দেশনা তৈরি করাটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমরা যে দেশের মধ্যে আছি, সেটা যে একটা পুঁজিবাদী দেশ এবং পুঁজিবাদ যে মানুষের সংকটের সমাধান করতে পারে না, পরিবর্তনের জন্য যে সমাজের আমূল পরিবর্তন দরকার, একটা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা দরকার, এই জায়গায় মানুষকে শিক্ষিত করা, মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা, সচেতন করা, সংগঠিত করা- এটাই যে কোন লড়াইয়ের মধ্যে করা দরকার। এই রাজনৈতিক সচেতনতার কাজ যতটুকু করা যায়, সেটাই লড়াইয়ের রক্ষাকবচ। শুধুমাত্র লড়াইয়ে নামিয়ে দিলাম আর সবাই লড়াই করল, জীবন দিল- এটা করেই লড়াই রক্ষা পায় না। এই কাজ করলেই পরিবর্তন ঘটে যায় না। আমরা ছোট-বড় সংগ্রামগুলোর মধ্য থেকে যতটুকু গণআন্দোলনের শক্তি গড়ে তুলতে পারব, সেটাই এই সংগ্রামগুলোর রক্ষাকবচ হবে। গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে লড়াই করতে করতে পরবর্তীকালে যে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি গড়ে উঠেছে- এটা তো একটা আন্দোলনের শক্তি। এভাবে যদি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আন্দোলনের শক্তি আমরা গড়ে তুলতে পারতাম, তাহলে কিন্তু এই শাসকগোষ্ঠী যা ইচ্ছা তাই করে পার পেতে পারত না। তখন জনগণ আবার লড়াই করত, মানুষ আবার রাস্তায় নামত।
আরেকটা ব্যাপার আমাদের মনে হয়, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটা নৈতিকতার সুর তৈরি করা খুব জরুরি। যদি নতুন ধরনের নৈতিকতার স্ফুরন না ঘটে, তবে আন্দোলন কেন? যে মানুষটা আন্দোলন করছে, জীবন দিতে দাঁড়িয়েছে- সেই মানুষদের মধ্যে যদি একটা নৈতিকতার সুর তৈরি না হয়, তাহলে কী ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে, সেটাও কিন্তু এবার আমরা দেখলাম। যারা গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিল, সেই মানুষদেরই খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমরা দেখলাম পাল্টে যেতে। তাদের মুখের ভাষা, কথা, আচার-আচরণ, জীবন- গণঅভ্যুত্থানের পরে কীভাবে পাল্টে গেল! মানুষ আতঙ্কিত হয়েছে এই অবস্থা দেখে। অল্প কিছু টাকার কাছে, ক্ষমতার কাছে তারা বিক্রি হয়ে যেতে পারে- এটা মানুষ ভাবতেও পারেনি! আমরা চোখের সামনে দেখে শিখলাম যে, আন্দোলনের মধ্যে যদি একটা নৈতিকতার সুর তৈরি না করা যায়, জীবনবোধ তৈরি করা না যায়- তাহলে এত বড় আত্মত্যাগও কিন্তু বৃথা হয়ে যায়। এত মানুষ জীবন দিয়েছে আমাদের ডাকে, ফলে কোনোভাবে আমরা বিক্রি হব না; এই মানুষদের প্রতি আমাদের কমিটমেন্ট আছে, আমরা কারো দালালি করব না- লড়াইয়ের মধ্যে এই জায়গাগুলো তৈরি না করা গেলে গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। আজকের নিপীড়িত আগামীকাল নিপীড়ক হয়ে দাঁড়ায়।
অভ্যুত্থান পরবর্তীকালে মৌলবাদের উত্থান নিয়ে আলোচনা এসেছে এখানে। আওয়ামী লীগের শাসনকাল যদি আরও দীর্ঘায়িত হতো, তাহলে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর শক্তি ও ক্ষমতা কমত না বাড়ত? এ প্রশ্ন যে কাউকে করলে, যারাই একটু সচেতন, তারাই বলবে যে, আওয়ামী লীগের এই শাসনকাল দীর্ঘ হলে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো আরও শক্তিশালী হতো। আওয়ামী লীগের পতনের মধ্য দিয়ে মৌলবাদী শক্তি বরং উন্মোচিত হয়েছে। তারা মানুষের সামনে এসেছে, তাদের রাজনীতি মানুষের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে। গণঅভ্যুত্থান না হলে এই গোষ্ঠীগুলো আরও ব্যাপক শক্তি নিয়ে সামনের দিনে আত্মপ্রকাশ করতো।
এখানে আমাদের দলের অনেক নেতাকর্মী উপস্থিত আছেন। তাদের উদ্দেশ্যে আমি বলতে চাই যে, জনগণের আন্দোলনের শক্তি যদি শক্তিশালী না হয়, আমাদের দলকে আমরা যদি শক্তিশালী না করতে পারি- তাহলে আজকের দিনে কোন গণঅভ্যুত্থান কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। সত্যিকার অর্থে জনগণের সামনে সেই শক্তি নাই যারা জনগণের এই আন্দোলনকে একটা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারে। আমাদের সেই শক্তি হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। প্রতিটি আন্দোলনে জনগণের সামনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উচ্ছেদের অপরিহার্যতা তুলে ধরতে হবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যেও কিছু গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য আমরা লড়ব, কিন্তু সেই লড়াইও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিপূরক হিসেবেই। সমাজতন্ত্র ছাড়া, শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা ছাড়া আজকে মানুষের মুক্তি কোনোভাবেই সম্ভব না। এই ব্যবস্থা বজায় রেখে কোন গণঅভ্যুত্থানই এই দেশের মানুষের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাও পূরণ করতে পারবে না। আমাদের দেশের গত ৫৫ বছরের শাসনব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। ফলে সেই ব্যবস্থা বদলের লড়াইকে আমরা শক্তিশালী করব, আমাদের দলকে শক্তিশালী করব, গণআন্দোলনকে শক্তিশালী করব- সেই কথা বলে আজকের আমাদের এই আলোচনা সভার কাজ আমরা এখানে শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।
