Saturday, September 12, 2026
Homeফিচার‘বাসদ (মার্কসবাদী)’-এর ৩য় কেন্দ্রীয় কনভেনশনের ডাক

‘বাসদ (মার্কসবাদী)’-এর ৩য় কেন্দ্রীয় কনভেনশনের ডাক

‘বাসদ (মার্কসবাদী)’-এর ৩য় কেন্দ্রীয় কনভেনশনের ডাক—

ফ্যাসিবাদের বিলোপ ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বেগবান করুন!

১. জুলাই হত্যাকাণ্ডের যথাযথ বিচার কর। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাও। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কার কর। স্বাধীন গুম কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন গঠন কর। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত কর।
২. সবার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও কাজের অধিকার নিশ্চিত কর। মৌলিক অধিকারকে আইন দ্বারা সুরক্ষিত কর। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত কর।
৩. শ্রমিকের জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা ঘোষণা কর। বিকল্প ব্যবস্থা না করে হকার, রিকশা, বস্তি উচ্ছেদ করা চলবে না।
৪. কৃষি ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত কর। কৃষিতে বহুজাতিক কোম্পানির দৌরাত্ম্য বন্ধ কর। সার, বীজ, কীটনাশকের বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ কর ও এ খাতে পর্যাপ্ত ভর্তুকি দাও।
৫. মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিসহ বিদেশিদের সাথে সম্পাদিত সকল অসম চুক্তি বাতিল কর। দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন রুখো।
৬. জ্বালানি তেল আমদানি, বিদ্যুৎ বিতরণ, রেল, পর্যটন মোটেল ও ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া চলবে না। জালানির উপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা কর। জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি কর।

বন্ধুগণ,
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৫৫ বছর অতিক্রম করতে চলেছে। এই ৫৫ বছরে দেশের মধ্যে কী পরিবর্তন এলো? ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৫ জন। বর্তমানে কোটি টাকার উপরে একাউন্টধারীর সংখ্যা ১ লক্ষ ৩৬ হাজার ৪৮৫ জন। স্বাধীনতার পর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ২৫ শতাংশ ছিল ভূমিহীন। বর্তমানে এর পরিমাণ ৫৬ শতাংশ। আজ দেশের মোট সম্পদের অর্ধেকের বেশির (৫৮.৪%) মালিকানা শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের হাতে। এই ৫৫ বছরে দেশের পরিবর্তন হলো এই যে, গরীব ক্রমাগত আরও গরীব হলো, আর অল্প সংখ্যক ধনীর হাতে দেশের বেশিরভাগ সম্পদ কুক্ষিগত হলো।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি- এই বড় দলগুলোই এদেশে কোন না কোন সময় ক্ষমতায় ছিলো। গত ৫৫ বছর ধরে ক্ষমতায় যে দলই থাকুক না কেন, তাদের চরিত্র যাই হোক না কেন দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে নীতিগত কোন পার্থক্য দেখা যায়নি। ফলে যে কয়টি আপেক্ষিকভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে, সেগুলোতে জনগণ ভোট দিয়েছেন, মনে করেছেন যে পরিবর্তন আসবে, কিন্তু পরিবর্তন আসেনি।

তেল-গ্যাসসহ দেশের জাতীয় সম্পদের মালিকানাও বাস্তবে দেশের জনগণের হাতে নেই। দেশের জাতীয় সম্পদ ও অর্থনীতিতে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর প্রভাব প্রকট। বাংলাদেশের গ্যাস উত্তোলনের অর্ধেকের কম করছে আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। আমরা বিদেশি কোম্পানিগুলোকে অসম চুক্তিতে আমাদের রাষ্ট্রীয় সম্পদ তুলে দিচ্ছি। লাভজনকভাবে পরিচালনা করার পরও সমুদ্র বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অসম বাণিজ্য করা হয়েছে দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে। এই চুক্তিগুলো করা হচ্ছে ভীষণ গোপনীয়তায়, এ সম্পর্কে জানার সুযোগও জনগণের নেই। এভাবে দেশের সার্বভৌমত্বকে জিম্মি করা হয়েছে।

এই প্রকট বৈষম্য, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এবং শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতি-লুটপাট-বাক স্বাধীনতা-ভোটাধিকার হরণের কারণে মানুষও বারবার রাস্তায় নেমেছে। এই ৫৫ বছরে দুইটি গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ছিল সবচেয়ে বেশি আত্মদানের। প্রায় দেড় হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছেন এই অভ্যুত্থানে। এই অভ্যুত্থানের মধ্যে স্লোগান উঠেছে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের। অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি প্রাণ দিয়েছেন শ্রমিকরা। অভ্যুত্থানের ফলে চূড়ান্ত স্বেচ্ছাচারী আওয়ামী লীগ সরকার বিদায় নিয়েছে, কিন্তু ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও তারপর ছয় মাস পার করা নির্বাচিত সরকারের কর্মকাণ্ড আগের সরকারগুলোর পালন করা নীতির বাইরে যায়নি। অর্থাৎ সরকারি সম্পত্তি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার নামে লুটপাট, দেশের সম্পদ বিদেশি কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেয়া, বড় বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থে সকল প্রকার নীতি নির্ধারণে সবকিছুই আগের মতোই চলেছে। বৈষম্য থেকে মুক্তি ঘটেনি। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের কোন পতন ঘটেনি। সংসদীয় বৃহৎ দলগুলোর সরকার বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সেবা করে ও তাদের স্বার্থ দেখে। এরা কেউই কোনদিন জনগণের স্বার্থ দেখেনি। ফলে দেশের এই বিরাট আত্মত্যাগ, রক্তদান বারবারই পথ হারায়। রাষ্ট্র তার উপরের খোলসটা বদলায়, ভেতরটা একইরকম থাকে।

এবারের গণঅভ্যুত্থানে আমাদের দল সর্বশক্তি নিয়ে অংশগ্রহণ করেছিল। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধেও আমরা রাজপথে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের টার্মিনাল ইজারা দেয়া, শ্রমিকদের বকেয়া বেতনের দাবিতে, কৃষি ফসলের ন্যায্য মূল্যের দাবিতে আমরা লড়াই করেছি। আমরা জানি যে, শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত মুক্তি মিলবে না। তাই এখনও শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের নানা দাবি-দাওয়াকে কেন্দ্র করে আমরা লড়াই পরিচালনা করছি। পাশাপাশি অন্যান্য বামপন্থী দলগুলোকে সাথে নিয়ে যুক্ত আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। বামপন্থীদের নেতৃত্বে সারাদেশে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া, বিদ্যুৎ বিতরণ, জ্বালানী আমদানিসহ নানা খাতকে বেসরকারিকরণ বন্ধের দাবিতে আমরা লড়াই পরিচালনা করছি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই যে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা মাথা তুলেছিল, গণঅভ্যুত্থানের আবহে যা স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল, গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হওয়ায় তা আবার মাথা তুলছে। আমরা নিরবিচ্ছিন্নভাবে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই জারি রেখেছি।

বাসদ (মার্কসবাদী) এদেশের বুকে একটি সত্যিকারের বিপ্লবী দল গড়ে তোলার লক্ষ্যে লড়াই করছে। সমাজের এই বৈষম্য, অন্যায়, অবিচার থেকে মুক্তির লক্ষ্যে একটি সঠিক বিপ্লবী দলের নেতৃত্বে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এ ব্যতীত যে কোন লড়াই তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে। লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় বাসদ (মার্কসবাদী) তার ৩য় কেন্দ্রীয় কনভেনশন করতে যাচ্ছে। এই কনভেনশনে আপনাদের অংশগ্রহণ এবং নৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আরও

Recent Comments