(গত ৩১ জুলাই বাসদ (মার্কসবাদী)-এর আয়োজনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: গণতান্ত্রিক সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা, প্রাপ্তি ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোশাহিদ সুলতানা বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্যের নির্বাচিত কিছু অংশ সম্পাদনা করে প্রকাশ করা হলো।)
যদি গণঅভ্যুত্থান নিয়ে কথা বলতে হয়, প্রথমে প্রশ্ন আসে যে আসলে এর আকাঙ্ক্ষাটা কী ছিল? এই আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বহু রকমের বিশ্লেষণ আছে। কেউ বলছেন রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা, কেউ বলছেন কর্মসংস্থানের লড়াই, কেউ আবার বলছেন ফ্যাসিবাদী শক্তি পতন এবং রাষ্ট্র ক্ষমতা এমনভাবে পুনর্গঠন করার লড়াই যেন এই ধরনের স্বৈরাচারী শাসক আবার এখানে প্রশ্রয় না পায়। সবগুলোই আসলে আকাঙ্ক্ষা ছিল।
আমরা যখন বলি রাষ্ট্র সংস্কার, এটা কিন্তু একটা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, রাষ্ট্রের কাঠামোর সংস্কার। এর উদ্দেশ্যটা হচ্ছে প্রধানতঃ নতুনভাবে যেন আরেকটা ফ্যাসিবাদী শক্তি জন্ম না হয়, সংস্কারের মধ্য দিয়ে সেটা নিশ্চিত করা। এই রাষ্ট্র সংস্কারের ঘটনা কি পৃথিবীতে আর অন্য কোন জায়গায় ঘটেনি? অন্য অনেক জায়গায় এরকম গণঅভ্যুত্থান হয়েছে এবং সংস্কার হয়েছে। তিউনিসিয়ায় গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটা নতুন সরকার ক্ষমতায় এলো। তারা দুই বছরের মধ্যে কনস্টিটিউশনাল রিফর্ম করলো। পরবর্তীতে দেখা গেল আবার একটা অথরিটেরিয়ান গভর্নমেন্ট সেখানে এসেছে। তারা ২০২২ সনে এসে নতুন সংস্কার করল। এই সংস্কারের ফলে পুরনো বিষয়গুলোই আবার সংবিধানে চলে এলো। অর্থাৎ মানুষের মানবাধিকার, মানুষের নিরাপত্তা, মানুষের সুরক্ষা- এগুলো যে সংস্কার করলেই সবসময় নিশ্চিত হয়ে যাবে, সেটা কিন্তু বলা যায় না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কার হাত দিয়ে এই সংস্কার হচ্ছে, কোন ধরনের মতাদর্শের মানুষ এটার পিছনে আছে, তাদের উদ্দেশ্যটা কী এবং তারা এই সংস্কার কাঠামোটাকে কোন জায়গায় নিয়ে যেতে চায়।
কতগুলো সংস্কার কমিশন গঠিত হয়েছিল এবং সেই কমিশনগুলো খুব ভালো ভালো কিছু প্রস্তাবও নিয়ে এসেছিল। কিন্তু আমরা দেখেছি যে, অর্থনৈতিকভাবে আমাদের যে সংস্কারগুলো প্রয়োজন, সেই জায়গায় কোনো পরিবর্তন হয় নাই। বিএনপি সংস্কার করবে বলে করে নাই, এবং সংস্কারের নামে সুবিধামতো যেই কাঠামো গঠণ করছে যেখানে জবাবদিহিতা নেই। সংস্কারের প্রতিশ্রুতিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে সংস্কারের নামে জবাবদিহিহীন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মানই আমরা দেখলাম। আবারও প্রমান হল সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর না করে শুধু রাজনৈতিক সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা সফল হয় না।
এই অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের জন্য যা কিছু প্রয়োজন সেটার যখন কোনো আলামত মানুষ দেখতে পাচ্ছে না, তখন মানুষ আসলে এই রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতি অনেকটা আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। আবার এই সংস্কারের কথা দীর্ঘদিন ধরে চলছে অথচ সংস্কার হচ্ছে কি হচ্ছে না, হলো কি হলো না, এটা নিয়ে যে বিতর্ক থামছেই না- এসবে মানুষ আশাহত হচ্ছে। কিন্তু এতে গণঅভ্যুত্থানটা ব্যর্থ হয়ে গেল- তা আমি মনে করি না। আমি মনে করি যে এই গণঅভ্যুত্থানটা আসলে আমাদের জন্য একটা অ্যালার্মের মতো, একটা সতর্কতার মতো। সেই সতর্কতাটা হচ্ছে যে- জনগণের একটা শক্তি আছে, সেটা কোনোভাবেই দমিয়ে রাখা যায় না। যেকোনো স্বৈরাচারী শাসকের বারবার এটা মনে রাখা দরকার যে এইরকম একটা গণঅভ্যুত্থান আসন্ন, যদি সে মানুষকে সম্মান করতে না শেখে।
আমি এই সম্মানের কথাটা কেন বলছি? কারণ আপনারা দেখবেন যে আমাদের দেশে দারিদ্র্য আছে, বৈষম্য আছে। এখানে অর্থনৈতিক কাঠামোটা এমনভাবে বিন্যস্ত যে তীব্র শ্রেণিশোষণ চলছে এখানে। এই অর্থনৈতিক শোষণের সাথে যুক্ত হয়েছে শোষিত শ্রেণির প্রতি তীব্র অসম্মান, তাদেরকে মানুষই মনে না করা। এই অসম্মানবোধও গণঅভ্যুত্থান সংঘটনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরেও এর কোনো কিছুই পরিবর্তন হয় নাই। সেই যে অসম্মান, সেটা রয়েই গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যখনই কোনো প্রতিবাদ বা আন্দোলন হতো, আমরা দেখতাম যে যারা সমন্বয়ক ছিল, যারা এনসিপির সাথে যুক্ত, তাদেরকে ভিআইপি ট্রিটমেন্ট দিয়ে যমুনায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর আমাদের সহযাত্রী যারা, আমাদের রিকশাওয়ালারা, আমাদের নার্সরা, আমাদের শিক্ষকেরা, আমাদের বিদ্যুৎকর্মীরা, তারা তাদের দাবি জানাতে গিয়ে রাস্তায় মার খেয়েছেন, টিয়ার গ্যাসের হামলার শিকার হয়েছেন। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সমাজেও বৈষম্য থেকে গেলো। এটা কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্য না, একটা মানুষকে তার মূল্যায়নের জায়গা থেকে অসম্মান। এই অসম্মান মানুষ নিতে পারে না। কারণ প্রতিটি মানুষেরই আত্মসম্মান আছে।
মানুষের শুধু অর্থনৈতিক সমতাই দরকার নয়, মানুষের এই সম্মানও দরকার। এই সম্মানটা যখন আমরা তাদেরকে দিতে পারব, তখন তারা এই প্রগতিশীল বা বামপন্থী রাজনীতির দিকে আকৃষ্ট হবে। সেটা দিতে আমরা অনেক সময় ব্যর্থ হই। ব্যর্থ হওয়ার পিছনে একটা কারণ হচ্ছে যে, সম্মান সম্পর্কে মানুষের ধারণাকেই দিনে দিনে পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে। সম্মান বলতেই অনেকে এখন নিজের সুবিধার কথা চিন্তা করে। সকলের কথা সে চিন্তা করে না। সেই কারণে আমরা দেখছি যে যারা প্রচলিত রাজনীতিতে সক্রিয় হয়, তারা অনেক সময় সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে মিছিলে আসে। এখানে রাজনীতিটা এমনভাবে করাপ্টেড যে এখানে যারা আসে, তারা শুধু নিজের স্বার্থরক্ষার জন্যই আসে, তার কমিউনিটির স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে তাদেরকে খুব দেখা যায় না। এই জায়গাটায় একটা বিশাল পার্থক্য রয়েছে ডান ও বাম রাজনীতির মধ্যে। তাদের মধ্যে যে দৃষ্টিভঙ্গির তফাতটা রয়েছে, এটা আমাদেরকে বারবার মানুষের সামনে আনতে হবে। তাদেরকে দেখাতে হবে যে এইরকম এই অর্থের বিনিময়ে, সামান্য স্বার্থের জন্য মানুষ যে তার রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে একটা বিশেষ গোষ্ঠীর কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে- সেটা কোন নৈতিক মানদণ্ডেই সঠিক নয়। এই চিন্তা পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বামপন্থী রাজনীতির উপরে তাদের আস্থা তৈরি করতে হবে।
আরেকটা কথা বারবার শুনি। সেটা হচ্ছে, এই যে নারীরা এত সামনে ছিল, সেই নারীরা কোথায় গেল? সবাই শুধু এই একটা কথাই জিজ্ঞেস করে। এই কথাটা বলার সময় আপনাদের মনে রাখতে হবে, ক্ষমতাটা কারা দখল করেছে। যারা আসলে ক্ষমতাটা দখল করেছে এখানে, তারা তো কখনোই নারীকে সম্মান করে নাই। তারা তো নিজেদের দলের নারীদেরকেই সম্মান করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয় না। তারা আবার একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি যারা গণঅভ্যুত্থানের রাস্তায় ছিল, মাঠে ছিল, সামনে ছিল- তাকে কীভাবে সুযোগ দেবে? তাদেরকে সুযোগ দেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। এই পরিবেশটা যদি তৈরি না হয়, তাহলে আপনি যতই বলেন যে নারীদেরকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হচ্ছে না, যেতে দেওয়া হচ্ছে না, এটা তো কথাটা আসলে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হলো। নারীর জন্য পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
নারীরা যখন গণঅভ্যুত্থানে এসেছিল, সামনের সারিতে ছিল, সে কিন্তু মাথায় কল্পনা করে নাই যে আমি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করব। তার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে, প্রত্যাশার মধ্যে এগুলো ছিল না। তাদের প্রত্যাশা ছিল যে এই সরকারের পতন হবে, এই সরকার আমরা দেখতে চাই না। কিন্তু পরবর্তীতে ঘটনাচক্রে যে বিষয়গুলো একটার পর একটা ঘটেতে থাকলো, উগ্র ডানপন্থীদের উত্থান ঘটলো। তাদের এই উত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা দেখেলাম আস্তে আস্তে এই পরিবেশটা আসলে নাই হয়ে গেছে। যেখানে নারীরা আরও ক্ষমতায়িত হতে পারত, সেই জায়গাটা এখানে নষ্ট হয়ে গেছে। কাজেই আমি যখন বলি যে নারীর ক্ষমতায়ন, এটা কিন্তু পুরুষের কাছে বলার কিছু নাই যে আপনি পুরুষদের দিক থেকে নারীদেরকে ক্ষমতায়িত করেন। এটা আসলে একটা রাজনীতি, যে রাজনীতি আসলে নারীদেরকে দমিয়ে রেখেছে, যে রাজনীতির কারণে আসলে এখানে নারীদের যেই জায়গাটা পাওয়ার কথা ছিল, সেই জায়গায় তারা যেতে পারেনি।
আমাদের এই প্রজন্মের অনেক নারী-পুরুষ যারা এই সময়ে গণঅভ্যুত্থানটা দেখেছে, এটা তাদের সামনের জীবনের জন্য এটা একটা শিক্ষা। এটা একটা প্রাপ্তি এই দিক থেকে যে, এটার মধ্য দিয়ে তাদের যে রাজনৈতিক বোধ আরও শাণিত হবে। আমি মনে করি এটা একটা শেখার জন্য একটা বড় আমাদের সুযোগ ছিল। কারণ সভ্যতা কিন্তু একটু একটু করে আগায়, সংস্কার কিন্তু একটু একটু করে আগায়। মানুষের মধ্যে যে চেতনা, মানুষের মধ্যে যে বোধ, জীবনবোধ সেটাও কিন্তু কালক্রমে পরিবর্তন হয় এবং মানুষ সেটার সাথে নিজেকে অ্যাডাপ্ট করতে শেখে। কাজেই অনেকগুলো পারসপেক্টিভ থেকে গণঅভ্যুত্থানকে দেখার দরকার আছে। আমাদের একটা বদ্ধ ধারণা নিয়ে বসে থাকলে হবে না। আমাদেরকে অনেক মানুষের কথাগুলো শুনতে হবে এবং নিজের কোনো থিসিস এখানে হাজির করার আগে বুঝতে হবে যে আসলে আমার পাশের মানুষটা এই গণঅভ্যুত্থানকে কীভাবে দেখছে। এই জায়গাটা আমার কাছে মনে হয় যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকগুলো বিষয় আছে যেগুলো নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। মাঠের আন্দোলনের সাথে এগুলোর একটা একাত্মতা তৈরি করতে হবে। এভাবে আমাদের মধ্যে একটা ঐক্য তৈরি হবে। সেটা যদি আমরা ধরে রাখতে পারি, তবে নিশ্চয়ই সামনের দিনে এই রাজনীতির একটা আশা আমি দেখতে পাই। সবাইকে ধন্যবাদ।
