Monday, April 20, 2026
Homeফিচারনারীর প্রতি সহিংসতা ও নানা আক্রমণের প্রতিবাদে বাসদ (মার্কসবাদী) দলের ১০ জন...

নারীর প্রতি সহিংসতা ও নানা আক্রমণের প্রতিবাদে বাসদ (মার্কসবাদী) দলের ১০ জন নারী প্রার্থীর সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত

নির্বাচন ও তার পরবর্তী সময়ে দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নানা আক্রমণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বানে বাসদ (মার্কসবাদী) দলের ১০ জন নারী সংসদ সদস্য প্রার্থীর সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত

সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ ও প্রিয় দেশবাসী,

আপনাদের সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা! দেশে একের পর এক ঘটে যাওয়া নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে আজ আমরা অত্যন্ত উদ্বেগ ও ক্ষোভের সঙ্গে আপনাদের সামনে কিছু কথা বলতে উপস্থিত হয়েছি। সীতাকুণ্ডের ইরামনি, নরসিংদীর আমেনা, ঝিনাইদহের তাবাসসুম, পাবনা- ঈশ্বরদীর জামিলা, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আসমা সাদিয়া রুনাসহ সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ-গণধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো সমাজের সর্বস্তরের বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে কাঁপিয়ে দিয়েছে। এই সমাজ- রাষ্ট্র – মানুষকে ধীরে ধীরে এক অন্ধকার গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছে দেশের শাসকরা। ঘরে-বাইরে-কর্মক্ষেত্রে-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমনকি ধর্মীয় উপাসনালয়ে-কোথাও নারীর নিরাপত্তা নেই, মর্যাদা নেই। ধর্ষণ-নির্যাতনের সব খবর আসে না পত্রিকায়। দু’একটি ঘটনায় আলোড়ন উঠে-আবার হারিয়ে যায়। দিন দিন ঘটনার ব্যাপকতা, মাত্রা, বিভৎসতা ভয়াবহ মাত্রায় বাড়ছে! এক একটি নির্যাতনের বিভৎসতা- নৃশংসতা ছাড়িয়ে যাচ্ছে আরেকটিকে।

বিচারহীনতার কারণে বাড়ছে ধর্ষণ-নির্যাতন। কারণ অন্যায় প্রশ্রয় পেলে, এর বিচার না হলে অন্যায়কারীরা উদ্ধত হয়, বেপরোয়া হয়। অপরদিকে সাধারণ মানুষ, যারা অন্যায়ের শিকার হন; তাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ে, ক্ষোভ বাড়ে, সেটা প্রতিবাদের রূপ না পেলে সমাজে নেমে আসে হতাশা এবং মেনে নেয়ার সংস্কৃতি। অন্যায়ই তখন নিয়ম হয়, বিচার ও শাস্তি হয় বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

বন্ধুগণ

যেকোনো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে আইনের প্রয়োগ জরুরি। কিন্তু দেশের আইনে ধর্ষণ ফৌজদারি অপরাধ হলেও এটি প্রায় অকার্যকর। এর প্রয়োগ বা বিচার নেই বললেই চলে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে এই বছরের জানুয়ারিতে ৩১টি পারিবারিক সহিংসতা, ৩৫টি ধর্ষণ, ২টি যৌন হেনস্তা এবং ৬টি বাল্য বিবাহ ও দাম্পত্যবিষয়ক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে নারীকে অসম্মান, চরিত্রহনন এবং সংঘবদ্ধ সহিংসতার ঘটনা নিয়মিত উদ্বেগের কারণ। যেখানে প্রায়শই রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে নারীর পোশাক ও ব্যক্তিগত জীবনকে ‘টুল’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

গণপরিবহনে যৌন সহিংসতার ঘটনা নারীকে নিয়মিত মোকাবেলা করতে হয়। সম্প্রতি মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও ইউএন উইমেনের যৌথ জরিপে প্রকাশিত হয়েছে যে, দেশের প্রায় ৮৭ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে গণপরিবহনে হয়রানির শিকার হন।

দিনের পর দিন নারী ও শিশু নিপীড়নের ভয়াবহ চিত্র দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা, পারিবারিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহ ও শিশু নির্যাতনের হার বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে।

বন্ধুগণ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীরা সামনের সারিতে থেকে লড়াই করেছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের আন্দোলনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অথচ গণ-অভ্যুত্থানের পর পরই নারীদের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছে। নারীদের ভূমিকা আড়াল করা হয়েছে। নারী সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরোধিতা ও সরকারের নতজানু মনোভাবের কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। শুধু তা-ই নয়, কমিশনের সদস্যদের নানাভাবে অসম্মান ও অপমান করা হয়েছে। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর আলোচনা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল। দলীয় মনোনয়নে ৩০ শতাংশ নারী প্রার্থী অথবা সংরক্ষিত নারী আসন ১০০ তে উন্নীত করে সরাসরি নির্বাচনের দাবি ছিল। শেষ পর্যন্ত কয়েকটি দলের বিরোধিতায় তা বাস্তবায়িত হয় নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বর্তমান ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদলের কেউই সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে নি।

সাংবাদিক বন্ধুগণ ও দেশবাসী

নির্বাচনের সময় জামায়াতের আমির নারীদের নিয়ে অপমানসূচক বক্তব্য রেখেছেন। বরিশালে নারী প্রার্থীকে টকশো থেকে উঠিয়ে দেয়া হয়েছে ইসলামি আন্দোলনের পীরের আপত্তির কারণে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা মাধ্যমে নারীকে ধারাবাহিকভাবে সাইবার বুলিং করা হয়েছে। এসব ঘটনায় সরকার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে নি।

এদেশে প্রায় ৫১ শতাংশ নারী হওয়ার পরও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা নারীকে নিকৃষ্ট হিসাবে দেখাতে চায়।  নারীর উপর ঘটে যাওয়া নিপীড়নগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে বেশিরভাগ ঘটনায় অপরাধীরা ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।

ফলে একটি সুস্থ পরিবেশ নির্মাণ করতে হলে সরকারকে অবিলম্বে নিম্নোক্ত দাবিগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।

 

১. ইতোপূর্বে ঘটে যাওয়া সকল নারী ও শিশু নিপীড়ন,ধর্ষণ,গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের  দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে ।

২. সংসদে নারী আসনের সংখ্যা ১০০-তে উন্নীত করা ও সরাসরি নির্বাচনের বিধান করা।

৩. ‘ইউনিফরম সিভিল কোড’ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারিবারিক আদালত চালু করা। সংরক্ষণ প্রত্যাহারসহ সিডও সনদ বাস্তবায়ন করা। কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমমজুরি ও সর্বক্ষেত্রে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা।

৪. ফতোয়াবাজীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ নেয়া।

৫. নারী ও শিশু পাচারকারী এবং নারীদের পতিতাবৃত্তিতে নিয়োগকারী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান কর। আর্থিক কারণে পতিতাবৃত্তিতে যুক্ত নারীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা কর।

৬. নাটক- সিনেমা- সাহিত্য – বিজ্ঞাপন, ওয়াজ- নসিহতে নারীদের অশ্লীল উপস্থাপনা ও তাদের সম্পর্কে অসম্মানজনক উক্তি বন্ধ করতে হবে।

৭. প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই সঙ্গীত-নাটক-নৃত্য-চিত্রাঙ্কনসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলার আয়োজন কর। মনীষী জীবনচর্চাসহ সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ নিশ্চিত কর।

৮. মাদক ও জুয়া বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

৯. প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত কর। প্রবাসে বাংলাদেশের দূতাবাসকে শ্রমিক বান্ধব কর, শ্রমিকদের সকল রকম সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ কর ।

১০. গৃহপরিচারিকাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। তাদের ন্যূনতম মজুরি ও সাপ্তাহিক ছুটি নিশ্চিত করতে হবে।

১১. সকল শ্রেণির পেশাজীবী নারীদের গর্ভকালীন সময়ে ৬ মাস বেতনসহ ছুটি নিশ্চিত কর।

১২. নারীকে গৃহস্থালী শ্রম থেকে মুক্ত করা এবং কর্মক্ষেত্রে ডে কেয়ার সেন্টার চালু কর।

১৩. শহর এলাকায় নারীদের জন্য হোস্টেল নির্মাণ কর।

১৪. গণপরিবহণে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত কর।

ধন্যবাদসহ

১.সীমা দত্ত -ঢাকা-৭

২. আসমা আক্তার- চট্টগ্রাম-১০

৩. তসলিমা আক্তার বিউটি- গাজীপুর -১

৪.  দীপা মজুমদার -চট্টগ্রাম -১১

৫.রাহেলা খাতুন- গাইবান্ধা-৫

৬.তৌফিকা দেওয়ান লিজা- জয়পুরহাট -১

৭.প্রগতি বর্মণ তমা- রংপুর-৪

৮.সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী-মৌলভীবাজার-২

৯. মুনতাহার প্রীতি -নোয়াখালী-৫

১০. শাহিনুর  আক্তার সুমি- ঢাকা-৫

 

৫ মার্চ ২০২৬

সাগর-রুনি হল,

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি

RELATED ARTICLES

আরও

Recent Comments